আইবেরিয়ান উপদ্বীপে

০২৩ সালের স্প্রিং সেমিস্টারে একটা ঐচ্ছিক কোর্স নিয়েছিলাম—যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতাধীন ছিলো। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতরে সহযোগিতার সম্পর্ক অনেক বেশি। এরকম যৌথ সহযোগিতামূলক প্রকল্প আর তার অধীনে কোর্স, গবেষণা, ফান্ডিং ইত্যাদি সবসময়ই চলমান থাকে। এটা ছিলো সেরকমই একটা কোর্স। এ-জাতীয় কিছু কোর্স সাধারণত পুরোপুরি দূরশিক্ষণভিত্তিক (Distance Learning)। কিছু কোর্সে আবার মিশ্রশিক্ষণের (Blended Learning) সুযোগ থাকে, অর্থাৎ কিছুটা অনলাইনে আর বাকি অংশ সশরীরে। সশরীরের অংশটুকুকে একটা গালভরা নামেও ডাকা হয়—মোবিলিটি। এর ভালো বাংলা কী হতে পারে? জানা নেই। বাংলাভাষী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধরাবাঁধা কোর্সের বাইরে পছন্দমত ঐচ্ছিক কোর্স করার সুযোগই নেই। সেখানে মোবিলিটি অনেক পরের কথা।

যাইহোক, আমার নেওয়া কোর্সটি পরিচালিত হচ্ছিলো TESTEd নামক একটি নেটওয়ার্কের অধীনে। তাদের প্রকল্পটির শিরোনাম বাংলা করলে দাঁড়ায়: ‘শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ইউরোপীয় পাঠ্যক্রমের সন্ধানে’। এতে পার্টনার ছিলো ফিনল্যান্ডের অউলু বিশ্ববিদ্যালয়, স্পেনের সেভিল বিশ্ববিদ্যালয়, পর্তুগালের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক এবং জার্মানির রুর বিশ্ববিদ্যালয় বখুম। পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছিলো পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে—শিক্ষা প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং বহুভাষিক শ্রেণিকক্ষ।

কোর্সটা সংক্ষিপ্তই। দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। কোর্সের শেষে একটা ঐচ্ছিক বৃত্তি-আবেদনেরও সুযোগ ছিলো। নেটওয়ার্ক থেকে বৃত্তিপ্রাপ্তদেরকে থিসিস করার জন্য এককালীন কিছু ফান্ড দেবে, গবেষণার কাজে সাহায্য করবে, আর থিসিসের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে একমাসের একটা মোবিলিটিরও সুযোগ করে দেবে। অর্থাৎ এককথায়, মাস্টার্স পাশের জন্য যে-থিসিস আমার এমনিতেও করতেই হতো, সেটার কাজ ওরা খানিকটা এগিয়ে দেবে। মন্দ কী? মাস্টার্স থিসিসের জন্য একটা গবেষণার প্রস্তাবনা তৈরি করাই ছিলো, সেটাকেই খানিকটা কেটেছেঁটে জমা দিলাম। গবেষণার বিষয়বস্তু বিবেচনা করে আমি আবেদনে পছন্দ হিসেবে দিয়েছিলাম পর্তুগীজ ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যাদের নির্ধারিত বিষয়বস্তু গণতান্ত্রিক শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়টার অবস্থান পর্তুগালের ব্রাগা শহরে। প্রপোজালটা অবশ্য খুব জুতসই হয়নি, আমি বিশেষ আশাবাদীও ছিলাম না—কিন্তু সৌভাগ্যবশত এক বিকেলে মনোনয়নের ইমেইল পেলাম।

মনোনীত হবার পরে পর্তুগীজ প্রফেসর এবং তাঁর গবেষণা-সহযোগীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার অনলাইনে মিটিং হলো, ইমেইল চালাচালি হলো। ওদের কাছ থেকে শহরটা সম্পর্কে জানলাম। পারস্পরিক সমঝোতায় এক্সচেঞ্জের সময় ঠিক করা হলো ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে।

এর মাঝে আরেকটা ব্যাপার হলো। ইরাসমুস প্রজেক্টের আওতায় আমি আরেকটা কোর্স নিয়ে ফেলেছিলাম, কিছুটা অনিচ্ছাতেই বলা যায়। একটা উন্মুক্ত ইমেইলে কোর্সটা অফার করা হয়েছিল, আর আমি ফিরতি ইমেইলে কোর্সটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলাম। পরে দেখি আমাকে সরাসরি এনরোলই করে ফেলেছে। এই কোর্সেও পাঁচদিনের একটা মোবিলিটি আছে, সেটা স্পেনের লেওন শহরে। গোলমাল বাধালো মোবিলিটির সময়টা, সেটা নাকি ওই জানুয়ারিতেই। স্পেন অবশ্য পর্তুগালের পাশের দেশ, চাইলে বাসে করেও চলে যাওয়া যায়। কিন্তু একটা এক্সচেঞ্জের ভেতরে কি পর্তুগীজ প্রফেসর আরেকটা এক্সচেঞ্জ করার অনুমতি কি দেবেন? নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু দেখা গেল, ভদ্রলোক বেশ উদার মানুষ। বিশেষ আপত্তি করলেন না।

এবার খানিকটা ভূগোল কপচাই।

উপদ্বীপ বা পেনিনসুলা বলতে বোঝায় এমন ভূখণ্ডকে—যার সীমান্তের বেশিরভাগ অংশ জল দিয়ে ঘেরা। সহজভাবে বললে, তিনদিকে সাগর বা মহাসাগর থাকলেই তাকে উপদ্বীপ বলা যায়। চতুর্দিকেই জল থাকলে অবশ্য চলবে না—তাহলে সেটা দ্বীপ হয়ে যাবে। সারা পৃথিবীজুড়ে অনেকগুলো উপদ্বীপ আছে। এর মাঝে ইউরোপের পশ্চিমদিকের সবচেয়ে বিখ্যাত উপদ্বীপটিকে বলা হয় আইবেরিয়ান পেনিনসুলা বা আইবেরীয় উপদ্বীপ। এর তিনদিক উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে ঘেরা, আর ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড়ো অংশজুড়ে আছে পর্তুগাল ও স্পেন। এর বাইরে অ্যান্ডোরা এবং আরো কিছু বিচ্ছিন্ন অঞ্চলও এই পেনিনসুলার অন্তর্ভু‌ক্ত। যাইহোক, আইবেরিয়ান উপদ্বীপস্থ স্পেনের দুটি শহর (মাদ্রিদ ও লেওন) আর পর্তুগালের চারটি শহর (ব্রাগা, পোর্তো, ভালোঙ্গো ও লিসবন) ভ্রমণ নিয়েই এই ব্লগ।

ক্রমশ এক্সচেঞ্জের সময় ঘনিয়ে এলো। ফ্লাইট ১ জানুয়ারি দুপুরবেলা। অর্থাৎ ২০২৪ সালের পয়লা দিনের বেশিরভাগটাই কাটবে লম্বা ফ্লাইটে। আগের রাতেই আমাকে অউলু থেকে হেলসিঙ্কি যেতে হবে। ট্রেনই ভরসা। ফিনল্যান্ডের ট্রেনগুলো অনেক আরামদায়ক, ভিড়টিড়ও কখনো হতে দেখিনি। ওঠার পর শুরুতে কিছুক্ষণ জেগে ছিলাম। তখন আকাশে ইতস্তত বাজি ফুটছিলো। অবশ্য নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আতশবাজি ফোটানো শুরু হয়েছিলো একত্রিশ ডিসেম্বর সন্ধ্যাতেই। অউলুতে দেখে এসেছিলাম—শীত উপেক্ষা করে বিভিন্ন বয়সের লোকজন বাইরে ঘোরাফেরা করছিলো। বলাই বাহুল্য—তখন ডিসেম্বরের ভরা শীত। আর ফিনল্যান্ডের শীতের তো জবাব নেই। তবে ফিনরা এসব শীতটিত বিশেষ গায়ে মাখে না। যাইহোক, প্রায় ঘুমিয়ে-ঘুমিয়েই পৌঁছে গেলাম হেলসিঙ্কির তিক্কুরিলা স্টেশনে। সেখান থেকে এয়ারপোর্ট।

বলে রাখা ভালো—ফিনল্যান্ডের তাপমাত্রা তখন মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, কিছুদিনের ভেতরেই একটা ভয়াবহ শীত ঘনিয়ে আসবে—এমনকি ফিনল্যান্ডের মানদণ্ডেও সেটি নাকি ভয়াবহ। ঋণাত্মক পঁচিশ-ত্রিশে নাকি নেমে যাবে। শীত সহ্য করা যায়, তবে এতটা নামলে বাইরে হাঁটাচলা কষ্টদায়ক। বিশেষ করে বোথনিয়া উপসাগরের উপকূলবর্তী শহর হওয়ায় অউলুতে শীতল বাতাসের তোড় অনেক বেশি। পরে পর্তুগালে থাকা অবস্থায় জেনেছিলাম, অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে ফিনল্যান্ডে ট্রেন পর্যন্ত থেমে গিয়েছিলো, শিডিউল বিপর্যয় হয়েছিলো। অর্থাৎ এত শীত যে—এমনকি ফিনল্যান্ডও আর সামলাতে পারছিলো না। আর ওইসময়ে পর্তুগালে বসে আমি উপভোগ করছিলাম ধনাত্মকের ঘরে পাঁচ থেকে পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের মতো ভয়াবহ শীত সেন্ট্রাল ইউরোপে পড়ে না। অর্থাৎ মোক্ষম সময়েই ফিনল্যান্ড ছেড়েছিলাম।

বাংলাদেশের হিসেবে আমি মোটামুটি শীতসহিষ্ণু এবং ঠাণ্ডায় অভ্যস্ত, কারণ উত্তরবঙ্গের মানুষ। তারপরও ফিনল্যান্ডের শীতের সঙ্গে তার তুলনা চলে না। হেলসিঙ্কি এয়ারপোর্টে অলস বসে-বসে গোটাচারেক আজেবাজে পংক্তি মাথায় খেলে গেলো—

জগতের ফেরে তুষার কোথাও
ঝরছে কোথাও আগুন,
গুণীজন কহে, পড়লে ঠাণ্ডা
ফিনল্যান্ড ছেড়ে ভাগুন!

ইকোনমি ক্লাসের টিকিটে সিট বাছাই করতে হলে অতিরিক্ত পয়সা খসাতে হয়। এর ভেতরেও ক্যাটাগরিভেদে দামের কমবেশি আছে। যেমন পা ছড়িয়ে বসতে চাইলে খরচ বাড়ে। আমি অবশ্য সিট-টিট বাছিনি। মূলত পয়সা বাঁচাতেই, তাছাড়া জানালার পাশের আসন নিয়েও আমার খুব আগ্রহ নেই; কয়েকমিনিট দেখার পরই উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু এবারে দৈবচয়নে আমার ভাগ্যে যে-সিট পড়লো, তাতে এক্সট্রা লেগরুম আছে, উইন্ডোও আছে। ফিনএয়ার বিনেপয়সায় আমার প্রতি এত প্রসন্ন হলো কেন—কে জানে।

সিট খুঁজে বসার পরপরই ধারালো চেহারার এয়ারহোস্টেস প্রায় উড়ে এলেন, এরপর অনেকক্ষণ ধরে আমাকে আমার দায়দায়িত্ব সম্পর্কে সবক দিলেন। সারকথা হলো—এক্সট্রা লেগরুম কেবল পা ছড়িয়ে বসার জন্যই নয়। গোলাপের সঙ্গে মুফতে যেমন কাঁটা মেলে, চাঁদের যেরকম অজস্র কলঙ্করেখা আছে, ঠিক তেমনি এই আসনের পাশেই আছে জরুরী বহির্গমনের পথ। সংক্ষেপে তিনি বোঝালেন—এই ফ্লাইটের ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে এবং জরুরি বহির্গমনের প্রয়োজন পড়লে আমাকে কাণ্ডারী হয়ে উঠতে হবে। জানালার পাশে স্বচ্ছ গ্লাসে ঢাকা একটি লালরঙ্গের লিভারও তিনি দেখিয়ে দিলেন। এ-হলো এমার্জেন্সি এক্সিটের হাতল। বিপদের সময়ে এই লিভার ধরে ঝুলে পড়লেই চিচিংফাঁক। কিন্তু আমার দায়িত্ব কেবল আলিবাবার রোলপ্লে করাতেই শেষ নয়। তিনি আমাকে দিয়ে সজ্ঞানে এ-ও কবুল করিয়ে নিলেন যে—কিছু হলে-টলে আক্রান্ত যাত্রীদের হিতার্থে আমি তাৎক্ষণিকভাবে স্বেচ্ছাসেবকের অবৈতনিক পদে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবো এবং যাত্রীরা যাতে নিবিঘ্নে বেরোতে পারেন সেটি নিশ্চিত করবো। বলাবাহুল্য, রাজি হতেই হলো। মেয়েদের ঠিক না করা যায় না।

বিমান যখন মাঝ-আকাশে, নেদারল্যান্ডসের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তুমুল গতিতে, তখন আমি মুগ্ধ চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম লিভারটার দিকে। চাপ দিয়ে জিনিসটা টানলেই সড়াৎ করে গেট খুলে যাবে—আহা, কী অসীম ক্ষমতা আমার! কিন্তু কথা হচ্ছে, কেউ যদি চলন্ত বিমানে লিভারটা ধরে টান মারে, তাহলে কী ঘটতে পারে? ইন্টারনেটও নেই যে ছাই একটু দেখবো। এই অদ্ভুতুড়ে কৌতূহল আমাকে সাময়িকভাবে অস্থির ও বিমর্ষ করে তুললো। পরে অবশ্য জেনেছি যে, উড়ন্ত অবস্থায় কেবিনের ভেতরে-বাইরে বাতাসের চাপের তারতম্যের কারণে জিনিসটা  চাইলেও খোলা যায় না।

আমার পাশে বসা তরুণীটি (সম্ভবত স্প্যানিশ) সরুচোখে অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। এবারে সে বলে উঠলো, ‘এই, ওটাকে এইভাবে দেখছো কেন বলো তো?’

আমি সহাস্যে বলি, ‘আরে না, এই এমনি দেখে-টেখে রাখছি।’

কথাটা বলে সাময়িকভাবে মনোযোগ অন্যদিকে সরালাম। কিন্তু বিমানে করার মতো আর আছেই বা কী? ফিনএয়ারের ইউরোপীয় রুটে ডিসপ্লে থাকে না সাধারণত। আমার কাছে অবশ্য ট্যাব আছে, তাতে বইপত্র-চলচ্চিত্র ইত্যাদি সব রসদই আছে। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ভালো লাগলো না। কিছুক্ষণ পর সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম—আমি আবার লিভারটাকে মনোযোগ দিয়ে দেখছি।

তরুণীটি এ-পর্যা‌য়ে বলেই ফেললো, ‘কিছু মনে কোরো না, আমরা সিট বদলাবদলি করি? তুমি যেভাবে জিনিসটা দেখছো, তাতে আমার ভয় লাগছে। প্লিজ? আমি আসলে খুব অল্পেই ভয় পাই। আমি অল্পের জন্য একটা প্লেন ক্রাশ থেকে বেঁচে গেছি।’

মেয়েটার সঙ্গে সিট বদলেছিলাম কিনা—সেই কথাটা আর ভাঙলাম না। ওর ভয়ের কারণটা যৌক্তিক। বিমান দুর্ঘটনা এমনিতে সহজে হয় না, কিন্তু একবার হলে সেখান থেকে সহজে বেঁচে ফেরা যায় না। ফলে এরকম ট্রমা আজীবনেও যায় না অনেকের। মেয়েটা যে আবার বিমানভ্রমণ করছে এ-ই ঢের। অবশ্য কী ধরনের দুর্ঘটনা সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।

কিন্তু কথা সেটা নয়। আমি নিজেকে নিয়েই যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে পড়লাম। প্লেন থেকে নেমেও সে-চিন্তা কাটেনি। বয়স ত্রিশের ঘরে। এখনো কি আমার চেহারা দেখলে কি মনে হয়—আমি মাঝ-আকাশে একটা চলন্ত প্লেনের এমার্জেন্সি গেট খুলে ফেলার চেষ্টা করবো? ভয়ঙ্কর সিরিয়াস ভাবটা চোখেমুখে আর যে কবে আসবে—কে জানে!

বলে রাখা ভালো, মাঝ-আকাশে চাইলেও ওভাবে দরজা খুলে ফেলা যায় না। বিমান যে-উচ্চতায় ওড়ে, সেখানে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত কেবিনের ভেতরে বাতাসের চাপ বাইরের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এই তথ্য আমি অবশ্য পরে জেনেছি।

সাড়ে পাঁচঘন্টার দীর্ঘযাত্রা শেষে লিসবনে নামলাম। সেখান থেকে মেট্রোতে খুবই তাড়াহুড়ো করে গেলাম বাস টার্মিনালে। হাতে মাত্র ঘন্টাদেড়েকের মতো সময়, এরপরই আমার ব্রাগার বাস ছেড়ে দেবে। যাইহোক, কেলেঙ্কারি হলো না। টার্মিনালে পৌঁছানোর পর ভ্রাম্যমাণ এক ভারতীয় দোকানে খানিকটা বিরিয়ানি খাওয়ারও সময় জুটে গেল। কিন্তু মজা সেখানেই শেষ নয়। সেখানে দাঁড়িয়ে যেদিকেই তাকাই—সেদিকেই কেবল দক্ষিণ এশীয়। ভারতীয় ভাষায় ভাষায় পুরো এলাকা ভেসে যাচ্ছে। পর্তুগাল যে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে, তা জেনেছিলাম প্যারিসে থাকতেই। এখন তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। বাংলাদেশিও কম নয়। বাংলার বিভিন্ন ডায়ালেক্টে পুরো অঞ্চল গমগম করছে।

বাসটা বেশ আরামদায়ক, রাস্তাও সুন্দর। এরকম কম্বিনেশন হলে আমার খুব ঘুম পায়। লিসবন থেকে বেরোনোর সময়ে অল্পক্ষণ চোখ খোলা রাখতে পেরেছিলাম। তাতে দেখলাম অজস্র পাহাড়, বাড়িঘর, জনপদ ইত্যাদি এসব পাহাড়ের গায়ে-গায়েই। দুঃখজনকভাবে যাত্রাপথের আর কোনো বর্ণনা আমার কাছে নেই। তবে ঘুমটা দরকার ছিলো।

ব্রাগায় যখন নামি, তখন রাত প্রায় দশটা। ম্যাপ ধরে ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় উপস্থিত হলাম। আমার হোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আমার হয়ে একটা ক্যাথলিক হাউজে ঘর বুক করে রেখেছে। ২০ Obra de Santa Zita নাম। আমার যাওয়ার দিনক্ষণও হাউজকে জানিয়ে দিয়েছে সে। তবু খুঁজে পেতে একটু অসুবিধা হলো। প্রথম কারণ, বাড়িঘরের নম্বর কিছুটা উল্টোপাল্টা, অনেকটা বাংলাদেশের মতো। আমি ফিনল্যান্ডে নম্বর দেখে দেখে বাড়ি খুঁজে পেতে অভ্যস্ত, আর বলতেই হবে, এই জিনিসটা ফিনল্যান্ডে অনেক সুশৃঙ্খল। আমার সেই অভ্যাস এখানে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আরেকটা মুশকিল হলো, হাউজটার কোনো সাইনবোর্ড ছিলো না। তখনো ক্রিসমাসের ছুটি শেষ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে আরো দুদিন পরে, অর্থাৎ ওদিকের কাউকে ফোন করার উপায় নেই। আবার হাউজের কাউকে ফোন করেও বিশেষ ফায়দা হবে না, কারণ এরা সাধারণত ইংরেজি পারে না। প্রায় আধঘণ্টা এ-রাস্তা-ও-রাস্তা ঘোরাঘুরি করে অবশেষে ভবনটা খুঁজে পাওয়া গেলো। ত্রিতল ভবন। সামনে সবুজরঙের বিশাল আকারের পুরোনো দরজা। কলিংবেল বাজিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকলাম ডোরক্যামের দিকে।

দরজা খুলে আমাকে যিনি অভ্যর্থনা জানালেন, তিনি একজন প্রৌঢ়া। দু-এক কথাতেই বোঝা গেল, তিনি ইংরেজি মোটেই পারেন না। কিন্তু ত্রাতা হয়ে এলো প্রযুক্তি, অর্থাৎ গুগল ট্রানস্লেটর। ভদ্রমহিলা জিনিসটা ব্যবহারে দক্ষ। টেক্সট-টু-স্পিচ ব্যবহার করে আমাকে কেবল ঘরই বুঝিয়ে দিলেন না, আরো জানালেন রুম সার্ভিসের নিয়মকানুন, চাবি রাখার জায়গা, ডাইনিংরুমের সময়সূচি, ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড ইত্যাদি প্রায় সবই।

আমার ঘরটা তিনতলায়। দেখেই ভীষণ পছন্দ হলো। একজনের জন্য যথেষ্ট বড়ো ঘর, তাতে অ্যাটাচড বাথ, টেবিল-চেয়ার, রুম হিটার সবই আছে। একদম খাপে-খাপ! এমনিতে ভবনের কাঠামোটা বেশ পুরোনো। স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ১১ অক্টোবর। পরে আধুনিকীকরণ করা হয়েছে, এমনকি লিফট পর্যন্ত আছে। কিন্তু আধুনিক এই পরিবর্তনগুলো বেখাপ্পা নয়। ফলে প্রাচীন একটা আবহ এখনও পাওয়া যায়। ঘরের দরজা-জানালা, ফার্নিচার ইত্যাদি প্রায় সবই অ্যান্টিক, অন্তত একশো বছর পুরোনো তো হবেই। ঘরে ঢোকার মূল দরজাটাই মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত বিস্তৃত। সবমিলিয়ে ক্যাথলিক হাউজটি বিভিন্ন কারণে আমার ভালো লাগলো। এর বিভিন্ন দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা বেশ বয়স্ক, অত্যন্ত নিবেদিত ও ধার্মিক ক্রিশ্চান। এরকম পরিবেশে আগে কখনো থাকিনি, তাই যা দেখি, তা-ই ভালো লাগে। ডাইনিংরুমে কিছুটা অস্বস্তি হতো অবশ্য, কারণ বেশিরভাগ মানুষের সঙ্গেই আলাপ করা যেতো না ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে।

পর্তুগালের প্রাচীনতম শহর বলা হয় ব্রাগাকে। রোমানরা এটি স্থাপন করেছিলো আজ থেকে দুহাজার বছরেরও বেশি আগে। তখন এর নাম ছিলো ব্রাকারা অগাস্টা। ইউরোপের অনেক পুরোনো শহরেই রোমানদের সেই সময়কার বিভিন্ন চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তবে ব্রাগায় এসব খুব বেশি পাওয়া যায়নি। প্রত্নতাত্মিক অনুসন্ধান চালিয়ে একটি রোমান হাম্মামখানার সন্ধান অবশ্য পাওয়া গেছে। সেটা অবশ্য আমার দেখা হয়ে ওঠেনি। ব্রাগা অবশ্য কেবল পুরনোই নয়, একটা ভীষণ ক্যাথলিক শহরও। এমনকি আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি, সেটাও একটা ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়। স্বভাবতই থিওলজিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমার পর্তুগীজ সুপারভাইজর পাওলো দিয়াজ জানিয়েছিলেন সে-সময়ে চলমান একটা গবেষণা প্রকল্পের কথা। ধার্মিকরা ঈশ্বরচিন্তার অংশ হিসেবে যে জপ করেন, সেই সময়ে কতোটা মানসিক শান্তি ও স্থিরতা আসে—তা নিয়ে। ধার্মিক শহর বলেই কিনা অনেকগুলো ক্যাথেড্রাল আর ব্যাসিলিকা ছড়িয়ে আছে পুরো শহরজুড়ে। যখন ঘণ্টাধ্বনি হয় একটার পর একটা, অন্যরকম আমেজ তৈরি হয়। অনেকটা কাছাকাছি বেশকিছু মসজিদে সুরেলা আজান হওয়ার মতো। মাঝে মাঝে কেমন যেন দেজা ভ্যু হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন এই ঘণ্টার শব্দ, এই ঘোরলাগা সন্ধ্যা, হঠাৎ শান্ত হয়ে আসা শহর—এসব কবে যেন আমারই প্রাত্যহিক অভ্যাসের অংশ ছিলো—যদিও কস্মিনকালেও এরকম কিছুর সুদূরতম সম্ভাবনা নেই বলেই জানি।

আসার পরদিনই হেঁটে হেঁটে শহরটা চিনতে লেগে পড়লাম। সেটা ছিলো চমৎকার ঝকঝকে দিন, শহরের কেন্দ্রেও অনেক মানুষজনের দেখা মিললো। ব্রাগার চারদিকেই বিশাল বিশাল পাহাড়, যদিও একেবারে কাছেপিঠে নয় সেগুলো। ম্যাপ দেখে কাছাকাছি একটা পাহাড় বাছাই করলাম, নাম পিকোতো পার্ক। হেঁটে পৌঁছতে প্রায় ঘন্টাখানিক লাগলো। পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে রাস্তা। উঠতে উঠতে দেখি, এর বিভিন্ন স্তরে বসার, বনভোজনের আর খেলাধুলার জায়গা করা আছে। জায়গাগুলো বেশ নোংরা হয়ে ছিলো, বোঝাই যাচ্ছিলো সামারের পর সেভাবে আর ব্যবহার হয়নি। তার ওপরে সময়টা বৃষ্টির। আগের রাতেও বৃষ্টি হয়ে গেছে। পাহাড় বেয়ে ওঠার অভ্যাস নেই, তবে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটাকে আরো সুন্দর দেখাতে লাগলো বলে ওঠা থামাইনি। কিছুক্ষণ পর একদম চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। ওঠার পর কিছুটা দূরে অস্পষ্টভাবে একটা ফুটবল স্টেডিয়াম দেখা গেল। জানা গেলো সেটি এফসি ব্রাগার মাঠ। খালিচোখে দেখতে চমৎকার লাগছিলো, যেন দালানকোঠার ভিড়ে একচিলতে উজ্জ্বল সবুজ রঙের ফুল ফুটে আছে।

আমি যে-হাউজটায় উঠেছিলাম, তিনবেলা খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত তাদেরই। ফিনল্যান্ডে থাকা অবস্থায় নিজে রান্না করে খেতাম। ফ্রান্সেও নিজেই রেঁধে খেয়েছি। ফলে উপলক্ষ ছাড়া এবং দুই ক্লাসের মধ্যবর্তী সময়ে মধ্যাহ্নভোজের সময়ে হয়ে যাওয়া ছাড়া ইউরোপীয় ডিশ বিশেষ চেখে দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এই সুযোগে সেটি উশুল হলো। প্রতিদিনই ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পর্তুগীজ ডিশ পাতে পড়তে লাগলো।

এর মাঝে ডাইনিংরুমে খাওয়া নিয়ে এক কাণ্ড হলো।

মাছের সঙ্গে আমার শত্রুতা বেশ পুরোনো। মেছো পদগুলো উপাদেয় হয় নিঃসন্দেহে, কিন্তু আমি তো কাঁটার কাছে ধরা। এতে অবশ্য আমি বিশেষ বেইজ্জতি দেখি না; সুইজ প্রবাসী কামরুজ্জামান কামরুজ্জামানই যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে ধরা। মুশকিল হলো, পর্তুগীজ অনেক ডিশেই আস্ত মাছ থাকে। খালিহাতে মাছের পেটি বাছতেই যেখানে আমি গলদঘর্ম হই, সেখানে ছুরি-কাঁটা দিয়ে মাছ বাছতে গিয়ে আমাকে যেরকম কসরত করতে হয়েছে, তা রীতিমতো দেখার মতো ব্যাপার। বেশিরভাগ সময়ই মাছটা ঘেঁটে গেছে, আর বিশালায়তন প্লেটের গায়ে ইম্প্রেশনিজমের দুর্দান্ত কম্পোজিশন তৈরি হয়েছে। এভাবে দুদিন রাতের খাবার খেতে গিয়ে গোটাদুয়েক মাছ আমার হাতে বিধ্বস্ত হলো। খাই যতোটা, ফেলে-ছড়িয়ে আসি তার দ্বিগুণ। খাদ্য পরিবেশনকারী একজন বৃদ্ধা বিষয়টা লক্ষ করলেন, যাঁর নাম দোনা আন্তোনিয়া। ধবধবে সাদা চুল, ছোটখাটো গড়ন, বয়স আশির কাছাকাছি। মানুষটা এমনিতেই ভালো। বিদেশি একজনকে সামান্য মাছের কাছে বারবার পরাস্ত হতে এবং অর্ধেক খাবার ছেড়ে আসতে দেখে তিনি সদয় হলেন। কিছু বললেন না, তবে সম্ভবত বিষয়টা মাথায় রাখলেন।

এরপর একরাতের কথা। ডাইনিং-এ বসলাম, শুরুতে স্যুপ দেয়া হলো, তার সদ্ব্যবহার করতে লাগলাম। এরই ফাঁকে আড়চোখে পাশেরজনের প্লেটের দিকে তাকালাম এবং ঘাবড়ে গেলাম। আজও মাছ, এবং ভয়ঙ্কর রকমের বড়ো আকারের মাছ। থালায় পুরোপুরি জায়গা হচ্ছে না। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। গেল, আজকের খাওয়াটাও গেল।

কিন্তু না, মুস্কিল আসান হয়ে এগিয়ে এলেন দোনা আন্তোনিয়া। খাবারটা দিয়েই তিনি চলে গেলেন না, দাঁড়িয়ে হাসিমুখে পর্তুগীজে কী সব বললেন। বলাই বাহুল্য যে বুঝলাম না কিছুই, কিন্তু মুখে চওড়া হাসি ধরে রাখলাম। দুয়েকবার আন্দাজে বললামও, সি, সি।

দোনা আন্তোনিয়া এবারে ছুরি আর কাঁটা হাতে নিলেন, একটানে নিপুণভাবে সযত্নে মাছটা থেকে বড়ো কাঁটাটা বের করে ফেললেন। এরপর কাঁটাবিহীন অংশগুলো ছোটো ছোটো স্টেকের মতো কেটে আমার প্লেটে তুলে দিলেন। এই অযাচিত ভালোবাসায় আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম। এজন্যই শরৎচন্দ্র বলেছেন, বড়ো মাছ শুধু পেটই ভরায় না, ইহা কাছেও আনিয়া ফেলে।

এরপর প্রায়ই খাবারে মাছ ছিলো। প্রতিবারই বেছে দিয়েছেন দোনা আন্তোনিয়া। যেদিনের কথা বলছি, সেদিন রাতের খাবারেও মূলপদ ছিলো মাছ। যেহেতু কাঁটার বিড়ম্বনা আর নেই, কাজেই খেতেও আর আপত্তির কিছু নেই। মোটামুটি চেঁছেপুঁছেই খেলাম। খাওয়া শেষ হলে দোনা আন্তোনিয়া প্লেট ইত্যাদি নেবার জন্য এলেন। পর্তুগিজে গড়গড় করে কিছু বললেন। একবর্ণও বুঝলাম না, তবে দৃশ্যমান লেভেলে হাসি ধরে রাখলাম। আন্দাজ করলাম, সম্ভবত খাবার ভালো হয়েছে কিনা জানতে চাইছেন। সুতরাং তাঁর শেষ তিনটি প্রশ্নের উত্তরে গদগদকণ্ঠে বললাম, সি, সি, সি। এরপর পানি-টানি খেয়ে উঠতে যাবো, এমন সময় তিনি আবার আমার কাছে এসে হাজির হলেন। তাঁর হাতে প্লেট, আর তাতে শুয়ে শুয়ে আমাকে পরিহাস করছে, কী বলুন তো? হ্যাঁ, অবশ্যই, আরেকটি মাছ। এটা আগেরটার চেয়েও বড়ো।

বুঝলাম, সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। আগের কনভার্সেশনটা তাহলে খুব সম্ভবত এরকম ছিলো:

– ভাইস্তা, খাওয়া ভাল্লাগছে?
– হ!
– এখনো খিদা আছে?
– হ!
– আরেকটা আনমু? খাবা?
– হ!

খিদে একফোঁটাও নেই। আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মাছটা ফেরত দেওয়া যায় কিনা ভাবতে ভাবতেই ওদিকে দোনা আন্তোনিয়া কাটাকুটি শুরু করে ফেলেছেন। অগত্যা আরেকটা মাছ গলা অব্দি ঠেসে আসতে হলো।

এরপর আমার যে-অবস্থা হলো, সেটা প্রকাশে কবিগুরুর শরণ নেওয়া যেতে পারে—

“মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,
বাজিল বুকে সুখের মত ব্যথা।”

আমি তখন দিব্যি বুঝতে পারছিলাম এই কবিতার অনুপ্রেরণার উৎস। সম্ভবত উনিও সক্ষমতার চেয়ে বেশি মাছ খেয়ে ফেলেছিলেন। বেচারা!

একমাস খুব বেশি সময় নয়, তবে একা-একা কাটানোর পক্ষে বেশ দীর্ঘ। তাছাড়া থিসিস সংক্রান্ত কাজো খুব বেশি ছিলো না। ব্রাগায় ঘুরেছি অনেক। ঘোরাফেরা বেশিরভাগই হয়েছে পদব্রজে। তাতে একটা জায়গাকে আরো ভালোভাবে চেনা যায়, কাছ থেকে দেখা যায়। এমনিতে অনেক ছিমছাম, গোছানো শহর। শহরে প্রথম যেদিন আসি, সেদিন সিটি সেন্টারের সবুজ ঘাসের মাঝে ফুলগাছের চারা লাগানো হচ্ছিলো। ফিরবার সময় ঘনিয়ে আসার সময়ে দেখি সেসবে ফুল এসেছে। লাল-নীল-বেগুনি-হলুদ—বিচিত্র সুন্দর সব ফুল।

প্রাতরাশে হাউজ থেকে তাদের নিজেদের বানানো পূর্ণশস্য রুটি বা বাদামি রুটি দেওয়া হতো, সঙ্গে মাখন আর জেলি, আর চমৎকার স্বাদের কফি। খেয়েদেয়ে শহরের যেকোনো একটা দিক ঠিক করে বেরিয়ে পড়তাম। মধ্যাহ্নভোজের আগ পর্যন্ত ঘোরাঘুরি চলতো। শহরের আনাচ-কানাচ কিছু বোধহয় বাদ রাখিনি। পাহাড়ি শহর বলে উঁচুনিচুতে মাঝে মাঝে অসুবিধা হতো। কিছুদিনের ভেতরে অবশ্য মানিয়ে নিয়েছিলাম। কোনো একদিন হয়তো চোখে পড়ে গেলো একটা আদুরে বেড়াল, শীতসকালে বাড়ির কার্নিশে বসে চুপচাপ বসে রোদ পোহাচ্ছে। আবার হয়তো রেলস্টেশন ছাড়িয়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পড়লাম, যেখানটায় একটা বাগানে কমলার ছড়াছড়ি, সবুজ আর কমলা রঙের সেই ক্যানভাস পেরোলে গভীর খাদ শুরু, আর দূরে, অনেক দূরে উঁচু উঁচু পাহাড় গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে শতসহস্র বছর ধরে।

আগেই বলেছি, ব্রাগায় প্রধানত হাঁটাহাঁটিই করেছি। বাসে উঠেছিলাম মোটে একদিন, যেদিন বোম জিসাসে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এটিই ব্রাগার সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান। জায়গাটা মূল শহর থেকে অবশ্য খুব দূরে নয়, কিন্তু অনেক উঁচুতে। সুউচ্চ পাহাড়ের ঢালে চতুর্দশ শতকে স্থাপিত একটি ক্যাথলিক স্যাংচুয়ারি এটি, ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবেও স্বীকৃত। পাহাড়ের গা বেয়ে তিনটি ভিন্নধরনের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। এর মাঝে সবচেয়ে ওপরের স্তরের সিঁড়িটিই এর সবচেয়ে আইকনিক দিক। ওপরে ওঠার পুরো পথটিই বৃক্ষাচ্ছাদিত, দৃষ্টিনন্দন। সবমিলিয়ে মোট ধাপের সংখ্যা ৫৭৭, আর উচ্চতা ১১৬ মিটার। অবশ্য এত সিঁড়ি ভাঙতে না চাইলে একটি বিশেষ ট্রেনে চেপেও ওঠানামা করা যায়। আর গাড়ির প্যাঁচানো রাস্তা তো আছেই। পাহাড়ের একদম চূড়ায় যে-ক্যাথলিক গির্জাটি আছে, সেটি অবশ্য কিছুটা পরে নির্মিত হয়। ১৭৮৪ থেকে ১৮১১ সালের মধ্যে। গির্জার পাশে একটি বিলাসবহুল রিসোর্টও আছে।

যেদিন ব্রাগায় এসেছিলাম, সেদিনটা ছিলো মেঘাচ্ছন্ন আর বৃষ্টিস্নাত। যেদিন ফিরে গেছি, সেদিনও তাই। মাঝের দিনগুলো অবশ্য উজ্জ্বল আর উষ্ণতায় ভরপুর ছিলো। ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে যখন হ্যান্ড লাগেজটা টেনে টেনে ব্রাগা বাস টার্মিনালের দিকে যাই, অদ্ভুত অনেক কথাই মাথায় আসে। এ-কথা সত্যি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা একটা সরলরৈখিক জীবনের বেশিকিছু পাই না—ফলে না চাইলেও সেটাকেই সাজিয়ে-গুছিয়ে নিতে হয়। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে জীবনে অনেক ঘটনাবহুল—কিন্তু এসবকে জায়গা দিতে গিয়েই তো আরো অজস্র সুযোগ মহাশূন্যে মিশে যায়। যখন বাসে করে বোম জিসাসে যাচ্ছিলাম, তখন পাহাড়ের ঢালের নির্জনতায় কিছু দ্বিতল বাড়ি দেখেছিলাম। খুব লোভ হয়েছিলো। এরকম একটা ছোট্ট সুন্দর ছিমছাম শহরে, পাহাড়ের ঢালে একটা অপরিসর দ্বিতল বাড়ি, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, অনেক পড়া, আর প্রচুর লেখা—এই ইচ্ছেগুলো হয়তো কোনো অল্টারনেট টাইমলাইনে এই আমার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সেই আমি তো আমি নই। যাইহোক, ইচ্ছেরা মরে না, এটাই যা স্বস্তির।

বিদায়, ব্রাগা!

Leave A Comment

Share this with others