অনামিকা রেস্টুরেন্ট

Published On: February 11, 20230 Comments on অনামিকা রেস্টুরেন্টViews: 20Categories: Fiction

সিরাজগঞ্জ-পাবনা হাইওয়ের মাঝামাঝি জনবিরল কোথাও বাসের পেছনের একজন চাকা দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানালেন। ড্রাইভার সেখানে থামতে চাইছিলো না, কারণ সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আর জায়গাটাও ডাকাতে। আশপাশে লোকালয় বা দোকানপাট নেই। গতি অসম্ভব কমিয়ে সে ওই অবস্থাতেই গাড়িটাকে মাইলদুয়েক টেনে নিলো, বাজারমতো একটা জায়গায় ছোটোখাটো গ্যারেজের সামনে এনে দাঁড় করালো। গ্যারেজের মধ্যবয়সী মেকানিক আমাদের বাসের ছোকরা হেল্পারটির পূর্বপরিচিত। দুজন মিলে দ্রুতই কাজে লেগে পড়ে। ড্রাইভার গ্যারেজের সামনে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে উদাসভাবে সিগারেট টানে, মাঝে মাঝে চোখমুখ কুঁচকে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করে। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা। শীতের সন্ধ্যার হিসেবে সময়টা বড়ো কম নয়। ইতোমধ্যেই অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরা বিভিন্ন বয়সী বিশ-পঁচিশজন শীতকাতর বিভ্রান্ত যাত্রী ইতস্তত ঘোরাফেরা করি, ইতিউতি তাকাই। বিক্ষিপ্ত কিছু দোকানপাট থাকলেও মোটের ওপরে জায়গাটা অখাদ্যই। আমি অনুভব করি, প্রচণ্ড খিদেয় পেট মোচড় দিচ্ছে। রাস্তার বিপরীতদিকের অনামিকা রেস্টুরেন্ট তখন আমার চোখে পড়ে। আশপাশে খাওয়ার আর কোনো জায়গা না থাকায় অধিকাংশই সেদিকে এগোয়। প্লাস্টারবিহীন দেয়ালে ঘেরা আর টিনের চালে ছাওয়া রেস্তোরাঁটিতে তেমন লোকজন নেই, সম্ভবত হয়ও না। এরকম জায়গায় যাত্রীবাহী বাস সাধারণত থামে না। ভেবেছিলাম পুরি-সিঙ্গারা জাতীয় কিছু খেয়ে নিলেই হবে, এরপর বাইরের দোকান থেকে এককাপ চা, সঙ্গে সিগারেট। কিন্তু ভেতরে ঢোকার পর কয়েকজনকে মুর্গির ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে দেখে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। ক্যাশ কাউন্টারের পাশের টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার খাবার আসে। দেখতে খুব আকর্ষণীয় নয় অবশ্য। ট্যালট্যালে ঝোল,  হয়তো দুপুরে রাঁধা, কিংবা তারও আগে। স্বাদগ্রন্থিকে যথাসম্ভব অগ্রাহ্য করে দ্রুত খানিকটা খেয়ে ফেলি, পরে খিদে কিছুটা মিটে গেলে এই অপ্রয়োজনীয় লড়াইতে ইস্তফা দিই। এরচেয়ে কী পুরি-সিঙ্গারাই ভালো হতো না?—বরফশীতল পানিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবি। এ-সময় একজন কাঁচাপাকা আটপৌরে চেহারার লোক ক্যাশ কাউন্টারের পাশে এসে দাঁড়ান। খুব নিচু আর নরম গলায় ডাকেন—‘সুবলদা!’

ক্যাশে বসা ম্যানেজারকে এতক্ষণ সেভাবে লক্ষ করিনি। অভিযোগ বা বিরক্তি প্রকাশের প্রয়োজন না থাকলে রেস্তোরাঁর ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে থাকেই বা কে? সুবলের চেহারায় তেমন বিশেষত্ব নেই। পঞ্চাশের মতো বয়স, গায়ে ঘিয়েরঙা আধময়লা পাঞ্জাবি, খোঁচা খোঁচা দাড়ি—যার সংখ্যাগরিষ্ঠই তাদের সেরা সময়টা পেরিয়ে এসেছে। তবে এই সবকিছু ছাপিয়ে চোখে পড়ে তাঁর অন্যমনস্ক চেহারা। এত বিক্রিবাটা দেখে উৎফুল্ল হয়েছেন কিনা বোঝা যায় না একেবারেই। নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর মতো নিরুত্তাপভাবে তিনি বলেন, ‘ও, তুই আয়ছিস।’

‘আলাম তো। আপনেক কুন সময় থেন উটকেচ্ছি! কনে গিছিলেন?’ আগন্তুক উত্তরের অপেক্ষা করেন না, তবে গলা নামান, যদিও আমার শুনতে অসুবিধা হয় না—‘ওন্তে আর কিছু শুইনলেন, দাদা? অনু মা-রে আর মারধর করিছে?’

মহাকাশ ছেড়ে আচমকা যেন মর্তলোকে ফিরে আসতে হয় সুবলকে, গলাও বোধহয় একটু কেঁপে ওঠে—‘নারে, কী আর—নতুন কইরে কিছু শুনি নাই।’

‘কী করা যায়, ভাবিছেন কিছু? এবা কইরে দুইদিন পর পর করলি তো—’

‘লিয়ে আসপো।’ সুবল শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে বসেন। ‘আমার মা তো আমার কাছে বেশি হইয়ে যায় নাই, কাত্তিক।’ অপর্যাপ্ত আলোতে হয়তো ভুলই দেখি, কিন্তু সুবলের ভাবলেশহীন চোখজোড়া যেন মুহূর্তের জন্য জ্বলজ্বল করে ওঠে।

বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে কী ভেবে অনামিকা রেস্টুরেন্টের দিকে তাকাই। রংচটা হলদে সাইনবোর্ডের দিকে চোখ পড়ে যায়। পচে যাওয়া কাঠের ফ্রেম জায়গায় জায়গায় খসে গেছে, দুর্বল কাঠামোটা বাতাসে অল্প-অল্প দোল খায়। সেখানে বিবর্ণ হয়ে আসা সুবল চন্দ্র মোহন্ত আর অনামিকা নামদুটো হঠাৎ যেন হাঁচড়ে-পাঁচড়ে বেরিয়ে পড়তে চায়, সবকিছু ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চায় মুহূর্তের জন্য। এই বিষণ্ন শীতসন্ধ্যায় অনামিকাও হয়তো কখনোসখনো মনের ভুলে এই বীভৎস সাইনবোর্ডটার কথা ভাবে। কিংবা হয়তো আরও অনেকবছর আগের সেই দিনটিকেই তার মনে পড়ে যায়, যেদিন সে সুবলচন্দ্রের চওড়া কাঁধে বসে মুগ্ধচোখে চকচকে নতুন সাইনবোর্ডটাকে দেখছিলো। শরীরের এখানে-ওখানে বসে যাওয়া দাগগুলোর ওপরে সে হাত বোলায়, মিশিয়ে দিতে চায় মহাকালে।

১৯ নভেম্বর ২০১৬
রংপুর

Leave A Comment

Share this with others