
অর্ধেক নগরী তুমি, অর্ধেক কল্পনা (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ১)
প্যারিসকে প্রথম জেনেছিলাম অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘পারী’ থেকে। মাধ্যমিক শ্রেণিতে আমাদের পাঠ্য ছিল। স্কুলের বই ভালোবেসে পড়ার মতো আঁতেল ছিলাম না, ননফিকশন তেমন ভালো লাগতও না। তবে এই লেখাটা আমাকে টেনেছিল। পারী নেওয়া হয়েছিল ‘পথে প্রবাসে’ বই থেকে, অনেক পরে যা পড়ার সুযোগ হয়েছিল। পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম—অন্নদাশঙ্কর নিজে নাকি কৈশোরে প্রমথ চৌধুরীর ‘চার ইয়ারী কথা’ পড়েছিলেন। ওদিকে প্রমথ চৌধুরী ব্যারিস্টারি পড়েছিলেন ইংল্যান্ডে। ফলে বিলিতি সাহিত্য আর জীবনযাপন সম্পর্কে তাঁর বিশেষ মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। শিল্পীদের মুগ্ধতা বিপজ্জনক ব্যাপার। আর দশজনকে মুগ্ধ না করলে তাঁদের চলে না। বারো বছরের কিশোর অন্নদাশঙ্করকেও তিনি মোহগ্রস্ত করলেন, ইউরোপকে স্বর্গের কাছাকাছি একটা ব্যাপার করে তুললেন। অবশ্য ধরাছোঁয়ার বাইরের সবই স্বর্গসম।
১৯২৭ সালে অন্নদাশঙ্কর ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সে-সময় এই চাকুরিতে উত্তীর্ণ ভারতীয়দের শিক্ষানবিশি করার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানো হতো। এই সুযোগ পেয়ে অন্নদাশঙ্করও দুই বছরের জন্য ইউরোপে গেলেন। তখনকার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। সেগুলোই পরে গ্রন্থাকারে ছাপান হয় ‘পথে প্রবাসে’ নামে। মজার ব্যাপার হলো, ‘পথে প্রবাসে’-র ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন খোদ প্রমথ চৌধুরী। তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসায় সিক্ত করেছেন বইটিকে, বলেছেন এটি একটি “বিশুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট ভ্রমণকাহিনী”। অর্থাৎ অন্নদাশঙ্করের লেখা সার্থক! লেখকদের আলাদা কোনো জীবনচক্র থাকলে এটাই বোধহয় তার উৎকর্ষসীমা।
অন্নদাশঙ্কর তাঁর লেখাটা শুরু করেছিলেন এভাবে—
ফরাসীদের পারী নগরীর নামে পৃথিবীসুদ্ধ লোক মায়াপুরীর স্বপ্ন দেখে। আরব্য রজনীর বোগ্দাদ্ আর কথাসাহিত্যের পারী উভয়েরই সম্বন্ধে বলা চলে, “অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা।” পৃথিবীর ইতিহাসে পারীর তুলনা নেই। দুই হাজার বৎসর তার বয়স, তবু চুল তার পাক্লো না। কতবার তাকে কেন্দ্র ক’রে কত দিগ্বিজয়ীর সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলো, কতবার তার পথে পথে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার রক্তগঙ্গা ছুট্ল, কত ত্যাগী ও কত ভোগী, কত জ্ঞানী ও কত কর্মী, কত রসজ্ঞ ও দুঃসাহসী, বিপ্লবে ও সৃষ্টিতে স্বাধীনতায় ও প্রেমে তাকে অমর মানবের অমরাবতী করলেন, সাহিত্যে চিত্রকলায় ভাস্কর্যে নাট্যকলায় সুগন্ধিশিল্পে পরিচ্ছদকলায় স্থাপত্য ও বাস্তুকলায় সে সভ্যজগতের শীর্ষে উঠল। পারীই তো আধুনিক সভ্যতার সত্যিকারের রাজধানী, অগ্রসরদের তপস্যাস্থল, অনুসারকদের তীর্থ। এর একটি দ্বার প্রতি দেশের কাঞ্চনবান সম্ভোগপ্রার্থীদের জন্যে খোলা, অন্য দ্বারটি প্রতিদেশের নিঃসম্বল শিল্পী ভাবুক বিদ্যার্থীদের জন্যে মুক্ত। একদিক থেকে দেখতে গেলে পারী রূপোপজীবিনী, আমেরিকান ট্যুরিস্টদের হীরা-জহরতে এর সর্বাঙ্গ বাঁধা পড়েছে, তবু জাপান অষ্ট্রেলিয়া আর্জেণ্টিনা থেকেও শৌখিন বাবুরা আসেন এর দ্বার-গোড়ায় ধর্না দিয়ে একটা চাউনি বা একটু হাসির উচ্ছিষ্ট কুড়োতে। অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে পারী অন্নপূর্ণা, সর্বদেশের পলাতকদের আশ্রয়দাত্রী, তার জাতিবিদ্বেষ নেই, সে পোল্ রুশ্ রুমেনিয়াকেও শ্রমের বিনিময়ে অন্ন দেয়, নিগ্রোকেও শ্বেত-সেনার নায়ক করে এবং নানাদেশের যে অসংখ্য বিদ্যার্থীতে তার প্রাঙ্গণ ভরে গেছে, তাদের কত বিদ্যার্থীকে সে বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে জীবিকাও যোগায়। পৃথিবীর অন্য কোনো নগর দেখতে পৃথিবীর এত দেশের এত ট্যুরিস্ট্ আসে না; পারী দেখতে প্রতি বৎসর যে কয়-লক্ষ বিদেশী আসে, তাদের পনেরো আনা আমেরিকান ও ইংরেজ। আমেরিকানদের চোখে পারীই হচ্ছে ইউরোপের রাজধানী, আর ইউরোপের লোকের চোখে পারী হচ্ছে লণ্ডন ভিয়েনা বার্লিন মস্কোর চেয়েও আন্তর্জাতিক।
প্যারিসের কথা এলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’-র কথাও বলতেই হয়—যার খানিকটা জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের গল্প থাকলেও বেশিরভাগটাই ফ্রান্স নিয়ে, বিশেষত প্যারিস। প্যারিস দেখার আগে আমি বইটা পড়ে উঠতে পারিনি যদিও, ফেরার পথে বিমানে বসে পড়েছি।
ভ্রমণকাহিনীর কথা যখন এলো, তাও বাংলা ভাষায়, সৈয়দ মুজতবা আলীকে এড়িয়ে যাওয়ার দুঃসাধ্য আমার নেই। ভ্রমণ ও রম্যের অসামান্য যুগলবন্দী করতে পারেন সেরকম নমস্যপুরুষ আমাদের এই একজনই ছিলেন। ‘দেশে বিদেশে’-র পর যদি তিনি বিশেষ কিছু না-ও লিখতেন তবু তাঁর মাহাত্ম্য ক্ষুণ্ণ হতো না। পাঠকদের ওপরে তিনি অতটা অপ্রসন্ন হননি অবশ্য। দুহাতে লিখেছেন। ফ্রান্স নিয়ে আলাদাভাবে কোনো বই লেখেননি (লিখলেই পারতেন), তবে বিভিন্ন লেখায় প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। আর ‘প্যারিস’ নামে ছোটো একটা লেখা রয়েছে তাঁর ‘পঞ্চতন্ত্র’-তে। সেটায় প্যারিস শহর নয়, সেখানকার মেয়েদের কথাই প্রাধান্য পেয়েছে। ভুয়োদর্শী লোক কিনা—কে জানে হয়তো বুঝেশুনেই ওরকম করেছেন। মেয়েদের দিয়েই তো পুরুষের সত্যিকারের দিগ্দর্শন হয়।
বাংলা ভাষায় সার্থক ভ্রমণকাহিনী খুব বেশি লেখা হয়নি। ঘুরেফিরে কয়েকজনের নামই করতে হয়। ভ্রমণের বই অবশ্য লেখা হচ্ছে বিস্তর, তবে সেগুলো ভ্রমণের কড়চাতে সীমাবদ্ধ থাকে, সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে না। লেখায় সাহিত্যগুণ সকলের থাকে না, সেটা সমীচীনও হতো না—নয়তো লেখকরা খাবে কী! তবে এ-কথা মানতেই হবে, যোগাযোগব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতির ফলে ঘুরতে যাওয়া যত সহজ হয়ে উঠছে, ভ্রমণ ঠিক ততোটাই দুর্লভ হয়ে পড়েছে, আর ভালো ভ্রমণসাহিত্যও হয়ে উঠেছে দুষ্প্রাপ্য। তাছাড়া যুগধর্মের প্রভাব তো আছেই। ভ্রমণ এই সময়ে এসে অনেকটাই ছবি আর রিলসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে পাঠকও কমেছে। সেটা অবশ্য সাহিত্যের সব শাখার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পড়ায় অনাগ্রহ একটি ইদানীন্তন ও বিশ্বজনীন সমস্যা।
ভালো ভ্রমণসাহিত্য কীভাবে তৈরি হয়? এর সহজ উত্তর নেই। কোনো সাহিত্যের ক্ষেত্রেই বাঁধাধরা ফর্মুলা থাকা সমীচিন নয়, বরং প্রচলিত আঙ্গিক ভাঙতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে আমি এরকম লেখায় তিনটি স্তর প্রত্যাশা করি—দর্শনীয় কোনোকিছু পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা, অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রজ্ঞার সংযোগ ঘটানো এবং নান্দনিক উপস্থাপনা। ভ্রমণে দেখার অংশটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই। তবে আমরা সম্ভবত দেখানোর স্পৃহায় দেখতে ভুলে গেছি। ভ্রমণে গিয়ে ছবি তুলতে বাধা নেই, তবে নিজের চোখজোড়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিতে পারলে অনেককিছুই চোখ এড়িয়ে যায়।
এছাড়া ভ্রমণের আগে কিছু প্রস্তুতির ব্যাপার থাকে, বৌদ্ধিক প্রস্তুতি। যেখানে যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি? সেখানকার ইতিহাস কী? সমাজব্যবস্থা কেমন? ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য? অধিবাসী কারা? তাদের সংস্কৃতি? নৃতত্ত্ব? এসব নিয়ে কিছুটা পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে দেখার সঙ্গে জ্ঞানের সংযোগ ঘটানো কষ্টসাধ্য। তাছাড়া ভ্রমণে গিয়ে দেখতে হয় সেখানকার মানুষকেও। একটু খেয়াল করলেই দেখব আমাদের চারপাশে বিচিত্র বর্ণিল অজস্র মানুষ যাদের আমরা গুরুত্বই দিই না, খুঁটিয়ে দেখা অনেক পরের কথা।
দেখা আর জানা দুই-ই হলো। এবার প্রয়োজন পড়বে খানিকটা সাহিত্যরসের। বলাবাহুল্য যে ভ্রমণকাহিনী রোজনামচা কিংবা ইতিহাস নয়। এই পার্থক্যটা জরুরি। তবে ভ্রমণকাহিনী কতটা সুপাঠ্য হবে সেটি লেখকের ভাষাজ্ঞান, শিল্পবোধ আর সাহিত্য-দর্শনের ওপরেই নির্ভর করে, যা নিরন্তর অনুশীলনের বিষয়।
নিজের সংজ্ঞাতেই আমার এই লেখাগুলো পরিপূর্ণ ভ্রমণকাহিনী নয়। লিখতে শুরু করেছিলাম নিতান্তই খেয়ালবশত। প্যারিসে আমার সামাজিক জীবন ছিল একেবারেই সীমিত। অফিস শেষে প্যারিসের রাস্তায় ইতস্তত ঘোরাঘুরির বাইরে করার মতো কিছু ছিল না। মাঝে মাঝে ঘুরতে গিয়েই ফোনের নোট্সে এটা-ওটা লিখতাম। ল্যাপটপ নিয়ে লাইব্রেরিতে প্রচুর সময় কাটিয়েছি, সেখানেও কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ লিখেছিলাম। পরিমাণে অনেক হয়ে যাওয়াতে কোথাও খালাস করা দরকার ছিল। করলাম। তবে এতগুলো বিচ্ছিন্ন সূত্র জোড়া দিতে ভালোই মেহনত হয়েছে।
জার্মানি, অতঃপর প্যারিস
২০২৩ সালের জুনের কথা। ফিনল্যান্ডে মাস্টার্স করছি। বহুল প্রতীক্ষিত গ্রীষ্ম এসেছে। বস্তুত গ্রীষ্মও যে এত আরাধ্য হতে পারে ধারণাও করিনি। ফিনিশ শীত আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছে। তখন তুষারের পুরু স্তর সরছে, সবুজ ঘাস উঁকি দিচ্ছে, হাইবার্নেশনে থাকা গাছপালায় প্রাণ ফিরছে। এত চমৎকার আবহাওয়ার আমি সামান্য উদ্বিগ্ন। যে-কাজে গেছি, সেই মাস্টার্স ডিগ্রি বাগাতে হলে একটা ইন্টার্নশিপ করতে হবে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টার্নশিপের জন্য কিছুটা পয়সাকড়ি দেয়। খুঁজতেও সাহায্য করে, তবে সেটা যথেষ্ট নয় সাধারণত। নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। ভিসা-জটিলতায় ফিনল্যান্ডে যেতে শুরুতেই আমার মাসতিনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। এজন্য ইন্টার্নশিপ খোঁজার দৌড়ে সহপাঠীদের চেয়ে খানিকটা পিছিয়ে পড়ি। প্রচুর আবেদন করছিলাম, সুমিষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যানের ইমেইলও পাচ্ছিলাম। এসবের ভেতরে ইউনেস্কোতে একটা আবেদন করে রেখেছিলাম। ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে আশা করিনি। কিন্তু সৌভাগ্যবশত ইউনেস্কোর প্রধান কার্যালয় থেকে ডাক পেলাম। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কাজে যোগ দিতে হবে। আনন্দের ছাপিয়ে উদ্বেগই প্রকট হলো, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ড মঞ্জুর করানো বাকি আছে। সমস্যা হলো আবহাওয়া খানিকটা উষ্ণ হতে-না-হতেই ফিনল্যান্ডে ছুটির আমেজ চলে আসে, দাপ্তরিক কাজ ঝিমিয়ে পড়ে। পুরো শীতজুড়ে গমগম করতে থাকা আমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তখন প্রায় মৃত্যুপুরী। শীতকালে মধাহ্নভোজের সময়ে কাফেগুলোতে বসার জায়গা পাওয়া কঠিন হতো। তার বেশিরভাগই এখন বন্ধ। যেগুলো টিমটিম করে চলছে, সেখানে চাইলে এখন শুয়ে-শুয়েও খাওয়া যেতে পারে। তবে শুয়ে খাওয়া উচিত হবে না।
উদ্বিগ্নভাবে কিছুদিন অপেক্ষা করলাম, বেশকিছু ইমেইল চালাচালি হলো। অবশেষে জুনের শেষদিকে আন্তর্জাতিক দপ্তর থেকে সবুজবার্তা পাওয়া গেলো। আহ্, প্যারিস! যাওয়া হচ্ছে তাহলে।
ফ্লাইট খুঁজতে খুঁজতে জার্মানির কথা মাথায় এলো। স্কুলজীবনের বন্ধু থাকে সেখানে। ফ্রাঙ্কফুর্টে কয়েকটা দিন কাটিয়ে তারপর রেলপথে প্যারিস যাওয়া যেতে পারে। জুনের শেষদিকে ইদও আছে। ভেবেচিন্তে ইদের দিন ভোর পাঁচটায় হেলসিঙ্কি থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের টিকিট করলাম। সরাসরি নয়, মাঝখানে রিগায় ঘন্টাদেড়েকের লেওভার আছে। তাতে অসুবিধা ছিল না, তবে বিমান যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট পৌঁছাবে ততক্ষণে সেখানকার ইদের নামাজ শেষ হয়ে যাবে। ঈদ নিয়ে আমার ভাবাবেগ ততদিনে কমে গেছে, তবে নামাজে যেতে না পারলে মন খুঁতখুঁত করে। অনেককালের অভ্যাস তো!
অউলু থেকে প্রায় ঘন্টাসাতেক রেলভ্রমণ করে হেলসিঙ্কি পৌঁছলাম রাত বারোটায়। বিমানবন্দরে ঘণ্টাপাঁচেক বসে থাকতে হবে। সেটা সমস্যা নয়। ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোতে অনেকেই রাত কাটায়, বিশেষ করে বাজেট ট্র্যাভেলার বা ব্যাকপ্যাকাররা। মানুষজনের ভিড়ের মাঝে তারা দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমায়। আমি অবশ্য ঘুমাইনি, একটু পড়তে-পড়তে আর ল্যাপটপে লিখতে-লিখতেই বোর্ডিং-এর সময় হয়ে গিয়েছিল।
ঘণ্টাখানিক পর লাটভিয়ার রিগা বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। মাত্র দেড়ঘণ্টার বিরতি, অর্থাৎ বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। খুবই ছোটো এয়ারপোর্ট, জাঁকজমক নেই, ভিড় নেই। রাতজাগা ক্লান্তির কারণে রিগা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রায় পুরোটাই গেলাম ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। স্থানীয় সময় আনুমানিক নয়টার দিকে ফ্রাঙ্কফুর্টে নামলাম। জার্মানির ব্যস্ততম বিমানবন্দর। জনস্রোত আর তাড়াহুড়ো চোখে পড়ার মতো।
আমাকে নিতে আমার বন্ধু লিয়ন এসেছিল তার কিছু প্রবাস-বন্ধুসহ। বিমানবন্দর থেকে শহরে যেতে যেতে আমি সবিস্ময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট দেখি। জার্মানির মতো ধনী দেশের সঙ্গে ফিনল্যান্ডের তুলনা হয় না; সহজেই চোখে পড়ে তারতম্য। আবহাওয়ার বৈসাদৃশ্যও আকাশ-পাতাল। শীতকালে ফিনল্যান্ডের মাত্রাতিরিক্ত তুষার, অন্ধকার আর ঠাণ্ডা সইতে সইতে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। এগুলোরও নিজস্ব সৌন্দর্য আছে মানছি, তবে তারও একটা সীমা থাকা চাই তো! মাঝে মাঝে এমনও মনে হতো যে পৃথিবীতে সাদা আর ধূসরের বাইরে কোনো রঙের অস্তিত্বই নেই। অভ্যস্ত হয়ে পড়ার আগে বিষুবীয় উষ্ণতার দেশের মানুষদের কাছে এই অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট মনে ধরলো আমার। বন্ধুর বাসা শহরের একটু বাইরে। দশতলা ভবনটাতে ছোটো ছোটো অনেকগুলো অপরিসর ঘর, সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হেঁশেল আর স্নানাগার। একা মানুষের জন্য যথোপযুক্ত। রান্নাবান্নার জন্য বন্ধুর আগে থেকেই সুখ্যাতি ছিল। এখানে এসে সেই গুণের ভালো কদর হয়েছে দেখলাম। ঈদের আমেজ তৈরি হলো দুপুরে, যখন লিয়নের পরিচিত কিছু মানুষজন এল, আর মধ্যাহ্নভোজে পাতে উঠল সুস্বাদু অনেকগুলো বাংলাদেশি পদ। বলা ভালো অনেকদিন পরে।
এখানকার গণপরিবহন ব্যবস্থা বেশ সুশৃঙ্খল। টিকিটের দাম ছয় ইউরোর মতো, আর সেই একটি টিকিটেই যেকোনো যানবাহনে যতবার খুশি যাতায়াত করা যায়। ইউরোপের বড় শহরগুলোর গণপরিবহনে মূলত এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়, যা যাত্রীদের হয়রানি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ট্রামে চেপে গেলাম ফ্রাঙ্কফুর্টের বিখ্যাত মাইন নদীর তীরে, যার সন্নিকটে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তর।
ফ্রাঙ্কফুর্টের দাপ্তরিক নাম Frankfurt am Main, অর্থাৎ নামই বলছে এটি মাইন নদীর পাড়ের শহর। নদী সবসময় মানব-ইতিহাসের কেন্দ্র ছিল বলেই হালের বড়ো শহরগুলো নদীতটে অবস্থিত। পানীয় জল থেকে শুরু করে সেচ, যাতায়াত, বাণিজ্য সব কিছুতেই নদীর ভূমিকা অনবদ্য। নদীকে ঘিরে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে, শক্তিশালী হয়েছে, এমনকি ধ্বংসের কারণও হয়েছে। যেমন সিন্ধুনদের পাড়ে খরা দেখা দিলে ক্রমশ বিলীন হতে হয়েছে সিন্ধু সভ্যতাকে, খরার কারণে শেষ হয়ে গেছে শক্তিশালী মায়ান সভ্যতাও।
কথাপ্রসঙ্গে আমাদের বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়ে। জায়গাটা আমাদের ভৌগলিক প্রতীক আর ভ্রমণের মনোরম স্থান হয়ে উঠতেই পারত। অবশ্য এখনো বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু সেটাকে আর দর্শনীয় জায়গা বলা চলে না। যেভাবে চলছে তাতে কিছুদিন পর আর ব্যবহারযোগ্যও থাকবে না।
মাইন নদীতীরের ফুরফুরে হাওয়া আর স্নিগ্ধ পরিবেশে মন ভালো হয়ে গেল। ছোটোবড়ো অনেক জলযান চলছে। বিশালাকারেরও কয়েকটিকে দেখা গেল, অর্থাৎ গভীরতা ভালই। চওড়া তেমন নয়। লিয়নের বন্ধুবান্ধবদের কথা বিশেষ করে বলতে হয়। খুবই অমায়িক আর হাসিখুশি মানুষজন। বাড়তি পাওনা হিসেবে রাতে নিমন্ত্রণ ছিল শহরের উপকণ্ঠে বসবাসরত এদেরই ঘনিষ্ঠ একটি অতিথিপরায়ণ বাঙালি পরিবারে। নিতান্ত অপরিচিত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও উষ্ণ আতিথেয়তা পেলাম। সবমিলিয়ে ইদের দিনটি ইদের মতই কাটলো বললে অত্যুক্তি হবে না।
পরের দুদিন ফ্রাঙ্কফুর্টেরই বিভিন্ন অংশে ঘোরাঘুরি হল আমি আর লিয়ন মিলে। আমার আগ্রহ ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাকে ঘিরে। ছেলেবেলায় পত্রিকা পড়ে জেনেছিলাম এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা। তখন অবশ্য বইমেলার সময় নয়। তবে বাকি যা হলো মন্দ কী। বেটমানপার্ক দেখলাম। স্থাপিত হয়েছিল ১৭৮৩ সালে। বলে রাখা ভালো— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রাঙ্কফুর্ট মোটামুটিভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তারপর প্রায় সবকিছুই নতুন করে গড়তে হয়েছে। ফলে এই পার্কটিও তার আদিরূপে নেই। পার্কের অংশবিশেষ এশীয় থিমে গড়া। কাঠের ছোট সেতু, জলাধার, মাছ, চিনেহাঁস, মিনিমালিস্ট কাঠামো আর প্রচুর গাছপালায় ঢাকা।
গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ও দেখা হলো। জগদ্বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার গ্যেটের শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট, এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নামেই করা। কয়েকটি ক্যাম্পাস আছে, যার ভেতরে এটিই সবচেয়ে বড়ো। প্রাণোচ্ছল পরিবেশ দেখে ভালো লাগলো। অনেকে লাইব্রেরিতে মুখ গুঁজে পড়াশোনা, অনেকে ক্যাফের সামনে দলবেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। বহুভাষিকতার থিমে তৈরি একটি নামকরা ভাস্কর্যও দেখলাম। বিভিন্ন ভাষা সেখানে। তবে অনেক খুঁজেও আমরা তাতে বাংলা খুঁজে পেলাম না। এরপর গেলাম সিটি সেন্টারে। বলে রাখা ভালো তখন পর্যন্ত ইউরোপীয় শহর হিসেবে আমি দেখেছিলাম ফিনল্যান্ডের অউলুকেই। সেটা নিতান্তই ছোটো শহর, কয়েক পা হাঁটলেই সিটি সেন্টার ফুরিয়ে যায়। সঙ্গত কারণেই ফ্রাঙ্কফুর্ট আমাকে বিস্মিত করল। প্রচুর মানুষ, অজস্র রেস্তোরাঁ, শপিংমল আর দোকানপাট, কনসার্ট, অপেরা ইত্যাদি দিয়ে পুরো অঞ্চল গমগম করছে। গ্যেটের একটি চমৎকার ভাস্কর্যও দেখলাম। আর সন্ধ্যার সময়ে গ্যেটে হাউজ দেখলাম বাইরে দাঁড়িয়ে। তিনি এখানে জীবনের প্রথম ছাব্বিশটি বছর কাটিয়েছিলেন। অবশ্য, যেমনটা আগে বলেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের আক্রমণে অল্পকিছু অংশ ছাড়া এই বাড়িটিও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা, নকশা আর ছবির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বাড়িটাকে আদিরূপে নতুন করে গড়া হয়েছে। বলা হয় কাজটা নাকি খুবই নিখুঁত হয়েছে। এছাড়া বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র আক্রমণের আগেই সরিয়ে রাখা হয়েছিল। সেসব নিয়েই এই বাড়ি এখন ‘গ্যেটে মিউজিয়াম’।
সেদিন রাতে মাইন নদীর পাড় ধরে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম আমরা। এত ব্যস্ত শহর, এত মানুষ, এত আলো, তবু সবকিছু কতো স্নিগ্ধ।
জার্মানি ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। হাইডেলবার্গ! কাছেপিঠে কোথায় যাওয়া যায় সেই আলাপ করতে করতেই হাইডেলবার্গের কথা এসেছিল। নামের মধ্যেই কেমন একটা মোহ আছে। খুব দূরেও নয়, ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে মাত্র নব্বই কিলোমিটার। পয়লা জুলাই সকাল-সকাল আমরা একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে হাইডেলবার্গ রওনা হলাম। যেতে যেতে জানলাম যে জার্মানির শহরের বাইরের প্রধান সড়কগুলোর (অর্থাৎ autobahn) কিছু কিছু অংশে বাধ্যতামূলক গতিসীমা থাকলেও বেশিরভাগ অংশেই কোনো নির্দিষ্ট গতিসীমা নেই। ফলে বিস্মিত হয়ে দেখলাম গাড়ি প্রায় উড়ে চলল। মাত্র চল্লিশ কী পঞ্চাশ মিনিটে হাইডেলবার্গ। ছবির মতো সুন্দর, এই কথাটাকে এতদিন আমার কাছে অতিশয়োক্তি মনে হতো। কিন্তু হাইডেলবার্গকে কি এরচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা সম্ভব!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বেশিরভাগ শহরের ওপরেই মিত্রশক্তি নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করেছিল। ব্যতিক্রম হাইডেলবার্গ। শত্রুরা কেন হাইডেলবার্গ আক্রমণ করেনি তা নিয়ে অনেক জনশ্রুতি আছে। কোনোটিই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। অনেকে বলেন, এত সুন্দর শহরকে তারা নষ্ট করতে চায়নি। খুব নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা নয়, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে আবেগিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। এমন মতামতও বেশ জনপ্রিয় যে যুদ্ধে জিতলে মার্কিন সেনারা হাইডেলবার্গে নিজেদের গ্যারিসন স্থাপন করবে বলে আক্রমণ করেনি, তবে এর পেছনেও তেমন তথ্যপ্রমাণ নেই। সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা সম্ভবত এটিই যে, হাইডেলবার্গ তখন ভৌগলিক বা সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, ফলে অনর্থক আক্রমণেরও প্রয়োজন পড়েনি। কারণ যেটাই হোক না কেন হাইডেলবার্গ বেঁচে গেছে সেটাই আসল কথা।
হাইডেলবার্গকে খুব ভালোভাবে দেখার জন্য সেরা স্থান কেনিংশ্টুল (Königstuhl), পাহাড়ের চূড়া। প্যাঁচানো খাড়া রাস্তায় উঠতে হয়। রাস্তা ছাড়াও পায়ে হেঁটে ওঠা-নামার হাইকিং ট্রেইল আছে, আছে ফার্নিকুলার রেলওয়ে। আমরা ব্যক্তিগত গাড়িতেই চূড়ায় উঠেছিলাম। সেখান থেকে চোখের সামনে পুরো শহরটা দৃশ্যমান হলো। শুরুতেই নজর কাড়ে হাইডেলবার্গের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অপরূপ নদী নেকার। পরে নিচে নেমে নদীকে আরো কাছ থেকে দেখেছি। চূড়ায় প্রায় ঘন্টাখানিক ছিলাম। এত চমৎকার জায়গা যে সহজে ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করে না।
পাহাড় থেকে নামার পর আমরা যাই হাইডেলবার্গের সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গায়, হাইডেলবার্গ দুর্গে। তবে একে ‘দুর্গ-প্রাসাদ’ বলাই বোধহয় বেশি যুক্তিসঙ্গত। তেরো শতকে এটি সামরিক উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়। তবে ষোলো ও সতেরো শতকের দিকে ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে এটি রাজকীয় ও বিলাসবহুল প্রাসাদের রূপ নেয়। এজন্য এখানে কাঠামোগত গাম্ভীর্য যেমন আছে, রয়েছে রাজসিক আভিজাত্যও। প্রাসাদটির এখনকার ভগ্নদশার পেছনে ফরাসিদের বড় হাত রয়েছে। সতেরো শতকের শেষার্ধে ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের সেনাবাহিনী এই প্রাসাদে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরবর্তীতে বিপুল অর্থব্যয়ে এটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল আলাদা। সংস্কারকাজ চলাকালেই পরপর দুবার ভয়াবহ বজ্রপাত আঘাত করে। তখন মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায়, ঈশ্বরই হয়তো চান না এই প্রাসাদে আর মানুষের বাস থাকুক। সেই থেকে পরিত্যক্তই রয়ে যায় এটি, যা পরবর্তীতে জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়। সময়ের অভাবে ঐতিহাসিক দুর্গ-প্রাসাদটির একেবারে অন্দরমহলে আমাদের আর যাওয়া হয়নি।
আরও দুটি বিশেষ জায়গা দেখা বাকি ছিল আমাদের—নেকার নদীর ওপরে হাইডেলবার্গের ঐতিহ্যবাহী পুরনো সেতু এবং হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়। সেতুটির প্রায় আড়াইশ বছর বয়স। কালক্রমে এটি হাইডেলবার্গেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে। শহরের যেকোনো স্মারকচিহ্ন মানেই তাতে এই সেতু থাকবে। অন্যদিকে ১৩৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জার্মানির সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় হাইডেলবার্গে। দর্শনীয় শহরটির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। নোবেলজয়ী অ্যালামনাই পঞ্চাশজনেরও বেশি। প্রখ্যাতদের মধ্যে আছেন মেন্দেলিয়েভ, সমারসেট মম, মাক্স ভেবার। এখানে দর্শন পড়িয়েছেন খোদ হেগেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিউটিটের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বিশেষ যোগসূত্র আছে। এখানকার অধ্যাপক হান্স হার্ডার মাইজভাণ্ডারি তরিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন, বই লিখেছেন। বিশেষত মাইজভাণ্ডারি সাধক ও গীতিকার আবদুল গফুর হালি তাঁর গবেষণার অন্যতম উৎস।
বিকেলে যখন ফ্রাঙ্কফুর্টে ফিরলাম, বুঝতে পারছিলাম জীবনের অন্যতম সেরা দিন কাটিয়ে এসেছি।
এত ঘোরাঘুরির ভেতরেও একটা বিষয় আমাকে উদ্বিগ্ন করে রেখেছিল। তেসরা জুলাই সকালে প্যারিসে আমার রিপোর্টিং। আগেরদিন সকালে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে প্যারিসগামী ট্রেনে টিকিট করা। কিন্তু প্যারিস তখন প্রচণ্ড উত্তাল। কয়েকদিন আগে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গেছে সেখানে। আলজেরীয় বংশোদ্ভূত সতের বছরের নাহেল মেরজুককে ফরাসি পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। তারপর থেকেই ফ্রান্সজুড়ে চলছে সহিংসতা-বিক্ষোভ। সারা পৃথিবীর চোখ তখন ফ্রান্সের ওপরে। কী আর করা, যা থাকে কপালে। এতদূর এসে তো পিছিয়ে যাওয়া যায় না!
একটা মজার বিষয় জানিয়ে রাখি। প্যারিসযাত্রার আগে আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে যা শুনেছিলাম, জার্মানিতে শুভানুধ্যায়ীদের থেকেও ঠিক তা-ই শুনলাম—প্যারিসে গিয়ে ফোন সাবধান, মানিব্যাগ সাবধান। মনে হচ্ছিল যেন প্যারিসে নয়, গুলিস্তানে যাচ্ছি। যাওয়ার পর অবশ্য নিজেই বুঝতে পারি এর মর্মার্থ।
দোসরা জুলাই সকাল আটটায় ফ্রাঙ্কফুর্ট কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল। মাঝখানে একবার ট্রেন বদলাতে হয়েছে। দ্রুতগতির আরামদায়ক ট্রেন। হাঁটাহাঁটি, বারকয়েক কফি, অলসভাবে তাকিয়ে দেখা উন্মুক্ত প্রান্তর, বনজঙ্গল, ছোটো-বড়ো শহর ইত্যাদি পেরিয়ে প্যারিসের গার দ্য লেস্ত্ স্টেশনে ট্রেন পৌঁছল দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে বুঝতে পারলাম হাওয়া ভালো নয়। দাঙ্গাহাঙ্গামা থামলেও বেশিরভাগ দোকানপাট তখনও বন্ধ। রাস্তায় মানুষজন নেই। অথচ গ্রীষ্মের এই সময়টায় নাকি ট্যুরিস্টে গিজগিজ করে প্যারিসের পথঘাট। খবরে বলছে তাদের অনেকে বুকিং বাতিল করেছে। আসতে সাহস পাচ্ছে না। উৎকণ্ঠার ভেতরেও আমি অবশ্য চোখ সরাতে পারি না। প্যারিস তো!
পরবর্তী খুঁটিনাটি বর্ণনায় আর যাচ্ছি না। সংক্ষেপে বলি—পূর্বনির্ধারিত বাসায় গেলাম, কিছুক্ষণ জিরিয়ে বাইরে বেরোলাম, যাতায়াতের জন্য একটা মান্থলি পাস নিলাম, আর বিকেলের দিকে গেলাম আইফেল টাওয়ারের দিকটায়। ইউনেস্কো সেটার কাছাকাছিই। পরদিন কাজটাজ শুরু করলাম। সে-কথা পরে। প্যারিসের কথাই বলি এখন।
কোরাতে (Quora) একজন বলেছিল—প্যারিসে মিলিয়ন মিলিয়ন জাদুঘর আছে। কথাটা নিছক মজা করেই বলা, তবে প্রকৃত সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। ফ্রান্সে হাজারেরও বেশি জাদুঘর আছে। শুধু প্যারিসেই আছে প্রায় দেড়শ মিউজিয়াম। আমি এসেছি মোটে মাসদুয়েকের জন্য, আর কাজটাও পূর্ণকালীন। প্রতিদিন জাদুঘর দেখে বেড়ালে চলবে না। তাছাড়া জাদুঘর দেখা মানে কি কেবলই দেখে যাওয়া? একদিনে ভালোভাবে লুভ্র দেখে শেষ করতে চাওয়া কিংবা দশ মিনিটের ভেতরে চন্দ্রজয় করে মর্তধামে নেমে আসার পরিকল্পনার ভেতরে বিশেষ পার্থক্য নেই। তাছাড়া দুর্মূল্যের শহর প্যারিসে আমাকে অর্থকড়ি খরচ করতে হবে খুব হিসেব করে। অর্থাৎ এবারের যাত্রায় প্যারিসের বেশিরভাগ জাদুঘরই আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। এজন্য ভেবেচিন্তে বাছতে হয়েছে।
জাদুঘর দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে জাদুঘর দেখার আগ্রহ থাকা। স্বাভাবিকভাবেই জাদুঘর দেখতে সবাই ভালোবাসেন না। যার যা অভিরুচি। লালন বলেছেন—“যার যা ধর্ম সেই সে করে, তোমার বলা অকারণ।” এজন্য শুধু নিজের কথাই বলি। আমি জাদুঘর উপভোগ করি। এর আগে কেবল বাংলাদেশ আর ভারতে জাদুঘর দেখেছি। পরবর্তীতে যখন ইউরোপীয় জাদুঘরগুলো দেখার সুযোগ হলো, তখন অনুধাবন করেছিলাম যে—বাংলাদেশের জাদুঘরে পড়ে থাকা সম্পদগুলোর মূল্যমান আকাশছোঁয়া হলেও তার যথাযথ মূল্যায়ন নেই। প্রদর্শনের মতো জিনিসের অভাব নেই আমাদের, কিন্তু সেগুলো কীভাবে প্রদর্শন করতে হয় সেই বিদ্যাচর্চার অভাব রয়েছে। জাদুঘর মানে জ্ঞান, শিল্প আর সৃজনশীলতা। কিন্তু বাংলাদেশের জাদুঘরগুলো মোটাদাগে আমলাতন্ত্রের অংশ, আর আমলাতন্ত্রের অলিখিত প্রধান কাজ সবকিছুকে কঠোর নিয়মে বেঁধে ফেলে সৃজনশীলতাকে শক্তহাতে দমন করা। ফলে একজন প্রচণ্ড মেধাবী মানুষও বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অংশ হয়ে গেলে ক্রমশ কিছু অর্থহীন নিয়মসর্বস্ব হয়ে পড়েন। তাঁদের ভেতরকার সৃজনশীল সত্তাটিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যায়। সবাই তো আর শহীদুল জহির হন না।
অপরাপর দর্শনীয় স্থান দেখার সঙ্গে জাদুঘর দেখার কিছুটা তফাৎ আছে। জাদুঘর দেখতে হয় সময় নিয়ে, রসিয়ে রসিয়ে। বিষয়টা তুলনা করা যেতে পারে এভাবে—আপনি রাজকীয় কোনো ভোজে নিমন্ত্রণ পেয়েছেন, আর সেখানে দেশবিদেশের খ্যাতনামা পাচকদের দুর্দান্ত সব পদ থরে-বিথরে সাজানো আছে। কীভাবে খাবেন, সিদ্ধান্ত আপনার। যদি তাড়াহুড়ো করেন, তাহলে তুলনামূলক কম সুস্বাদু কয়েকটা পদ খেয়েই পেট ভরে আইঢাই হয়ে যাবে, অনেককিছু হয়তো চেখে দেখাই হবে না। ধীরেসুস্থে এগোলেও সব পদ খেতে পারবেন না, কারণ পদের সংখ্যা আপনার ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে, যদি ধরেও নেন এই ভোজসভা অনন্তকাল ধরে চলবে, আপনি তো এখানকার মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারবেন না। আপনারও বিষয়কর্ম আছে। হুড়োহুড়ি করে ভালো ভালো পদ বেছে খেতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে কি জিভ যথেষ্ট সময় পাচ্ছে? খাবারগুলোর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারছে? সঙ্কটের শেষ নেই।
জাদুঘর দেখার আগ্রহ থাকলেও স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে আমি শিল্পকলার ঝানু সমঝদার নই। শিল্পের ইতিহাস অল্পস্বল্প জানি, কিছু বিখ্যাত শিল্পীকে চিনি, এটুকুই। তবে শিল্পকলায় আনাড়ি হলেও সাগ্রহে দেখে যেতে পারি ঘন্টার পর ঘন্টা—এই গুণ আমার আছে। তাছাড়া প্যারিসের প্রায় সব জাদুঘরেই অডিওগাইডের ব্যবস্থা আছে।
সমর-ইতিহাস-শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন—এই সবকিছুতেই ফরাসিদের উৎকর্ষ আকাশ ছুঁয়েছে, এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। প্যারিস সবসময়ই সৃজনশীল আর মননশীল মানুষদের রঁদেভু ছিল। ফরাসিরা ছাড়াও সারা দুনিয়ার তাবৎ প্রতিভাবানরা এসে জুটেছিলেন প্যারিসে, এমনকি আজকের দিনেও। যেমন মিলান কুন্দেরা। চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি প্যারিসেই ছিলেন দীর্ঘদিন। আমি প্যারিসে যাওয়ার দিনকয়েক পরই তিনি প্রয়াত হলেন। আমাকে অনর্থক অপয়া সাব্যস্ত করার দরকার নেই। ভদ্রলোকের চুরানব্বই বছর বয়স হয়েছিলো।
প্যারিস প্রসঙ্গে আসি। মূল শহরের গঠন কিছুটা বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার। শহরকে ঘিরে রাখা একটা প্রধান সড়ক এই বৃত্তের পরিধি। এর একদিক দিয়ে শহরে ঢুকে অন্যদিকে বেরিয়ে গেছে সেন নদী। পরে ম্যাপ ঘেঁটে আবিষ্কার করেছি যে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক বড়ো শহরের গঠনই এরকম—মস্কো, বুদাপেস্ট, শিকাগো, আমস্টারডাম, বাগদাদ। অর্থাৎ নদীকেন্দ্রিক সুপরিকল্পিত নগরায়ন।
প্যারিসের বেশিরভাগ বিখ্যাত স্থাপনা সেন নদীর আশপাশে অবস্থিত। মূল প্যারিস শহরের বাইরেও শহরতলি ছড়িয়ে আছে বেশ খানিকটা জুড়ে। এই জায়গাগুলো তেমন ঘিঞ্জি নয়। ছড়ানো বাড়িঘর, লোকজন কম, পর্যটকের আনাগোনাও তেমন নেই। হৈহট্টগোল এড়াতে প্যারিসের অভিজাতরা বাইরের দিকেই থাকেন। আমার আস্তানা ছিল এরকমই এলাকায়। তবে তার কারণ আভিজাত্য নয়, ঘরভাড়া কম বলে।
প্যারিস শহর ২০টি আরোঁদিসমঁ বা প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। আমি শুরুর একমাস ছিলাম ১৮ নম্বর আরোঁদিসমঁতে, যার অবস্থান ম্যাপের একদম উত্তরদিকে। আর পরের একমাস থেকেছি মঁরুজ এলাকায়, ১৪ নম্বর আরোঁদিসমঁতে, ম্যাপের ঠিক দক্ষিণে।
আমার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল প্যারিসের গোটাকতক বিখ্যাত স্থাপনায় যাওয়া, স্বনির্বাচিত কিছু জাদুঘর দেখে ফেলা, আর কয়েকটা সিমেট্রি ভ্রমণ। আগেই বলেছি, প্যারিসের সিমেট্রিগুলোতে অনেক বিখ্যাত মানুষ চিরশায়িত আছেন। তবে গোরস্থানে ঘোরাঘুরির আরও কারণ আছে। ইন্টারনেটে আগেই দেখেছিলাম, প্যারিসের এই সমাধিগুলোও বেশ শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন। শুধু তা-ই নয়, উন্মুক্ত পার্ক বা স্থাপনাগুলো, এমনকি পথের ধারে বিনামূল্যে খাবার জল সংগ্রহ করার ফোয়ারাটিতেও যেসব কারুকাজ বা ভাস্কর্য আছে তা সুরুচিরই পরিচয় দেয়। সব বাড়িঘরের বহিরাবরণে একধরণের আভিজাত্যের ছাপ আছে, বিশেষত বাহারি ব্যালকনি, দরজা বা ব্যালকনিতে। এটি পরিকল্পিত। উনিশ শতকে তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়ে প্যারিসকে ঢেলে সাজানো হয়।
প্যারিস এখন নানাবিধ বিড়ম্বনায় জর্জরিত, যার ভেতরে অন্যতম হচ্ছে অভিবাসী। ডানপন্থীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমি একে ‘অভিবাসী-সমস্যা’ বলব না। কারণ বৈধ-অবৈধ উপায়ে বেশিরভাগ অভিবাসীই আসে সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে, অর্থাৎ আফ্রিকা থেকে। সবচেয়ে বেশি আসে আলজেরিয়া আর মরক্কো থেকে। তবে সেখানেই শেষ নয়। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদেরও অন্যতম প্রধান গন্তব্যস্থল ফ্রান্স। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই অবৈধভাবে ফ্রান্সে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করে। বেশিরভাগই অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে ফ্রান্স সরকার এদের জোর করে বের করে দিতে পারে না। নমনীয় অভিবাসী আইন যাতে কঠোর করা হয় সেজন্য রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ অব্যাহত রয়েছে যদিও। ইত্যবসরে অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে। এটা নিয়েও আমি কোনো পক্ষাবলম্বন করতে চাই না। আমি সাদাচোখে দেখেছি পথেঘাটে মেট্রো স্টেশনে গৃহহীন কর্মহীন মানুষের ছড়াছড়ি। দেখে ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত কলিটা মনে পড়ে যায়—“আমি দেখেছি অনেক গগনচুম্বী অট্টালিকার সারি, তার ছায়াতেই দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী।” সবকিছু সাদা-কালোতে ভাগ করা গেলে তো হতোই।
এতকিছুর পরও প্যারিসের আকর্ষণ পৃথিবীজুড়ে একটুও কমছে না। এখন গ্রীষ্মকাল, অর্থাৎ ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে প্রশস্ত ঋতু। বিশেষত উইকএন্ডে তো কথাই নেই, প্যারিস একেবারে লোকে লোকারণ্য।
অন্নদাশঙ্কর প্যারিস ভ্রমণ করেছিলেন প্রায় শতবর্ষ আগে। সুনীলের প্যারিস দেখারও পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে। তাঁদের ধ্রুপদী বর্ণনার তুলনায় আজকের প্যারিসে অনেককিছুই বদলেছে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজও বোধহয় অন্নদাশঙ্করের মতো করেই বলতে হয়—তবু চুল তার পাকলো না।