জুল ভার্নের সঙ্গে একদিন (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৩)

জুলাই মাসের শেষদিক। ইউনেস্কোতে ইন্টার্নশিপ করতে আসার প্রায় মাসখানেক হয়ে গেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে প্যারিসের পথেঘাটে ইতস্তত ঘুরে বেড়াই, একা-একাই। করার মতো তেমন কিছু নেই। তবু প্যারিস ভালো লাগে। মাসকাবারি টিকিটের সুবাদে শহর আর শহরতলীর অনেকটা দেখা হয়ে গেছে ততোদিনে। তবে প্যারিসের বাইরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

প্যারিসের কোন জায়গাগুলোতে যেতে চাই, সেই তালিকা করার সময়ই জুল ভার্নের (ফরাসি উচ্চারণ অনুসরণ করলে সঠিক বানান জ্যুল ভের্ন হবে, তবে আমি প্রচলিত বানানটিই ব্যবহার করছি) কথা ভেবেছিলাম। জানতাম, তিনি ফরাসি—আর কে-না জানে, সৃজনশীল ফরাসিদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল প্যারিসই। কিন্তু ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, ভার্ন দীর্ঘসময় প্যারিসে ছিলেন ঠিকই, তবে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন বলতে যা বোঝায় সেসব প্যারিসের বাইরে। কতোটা বাইরে? দেখলাম খুব দূরে নয়। প্যারিস থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরের ছোট্ট শহর আমিয়েঁতে তাঁর শেষজীবন কেটেছে। সমাহিতও হয়েছেন সেখানকার লা মাদলেন সিমেট্রিতে, আর বাসভবনকে পরিণত করা হয়েছে জাদুঘরে।

জাদুঘরে ঢোকার টিকিটটা রিজার্ভ করতে হবে কিনা দেখতে ওদের ওয়েবসাইটে গেলাম। আগেই বলেছি ফ্রান্সের অনেক দর্শনীয় স্থাপনায় আগেভাগে রিজার্ভ করে যেতে হয়। তারিখ তো বটেই, ক্ষেত্রবিশেষে সময়ের স্লট পর্যন্ত বুক করতে হয়—বিশেষ করে যেগুলোর জনপ্রিয়তা বেশি। অতিরিক্ত ভিড় কমানোর কৌশল। এখানে দেখলাম রিজার্ভ করার ঝামেলা নেই। প্যারিসের বাইরে বলেই হয়তো লোকসমাগম কম। অনলাইনে টিকিট করার সুযোগ আছে, তবে না করলেও ক্ষতি নেই। ওয়েবসাইট স্ক্রল করতে করতে একদম নিচের দিকে একটা টইটুম্বুর রসগোল্লাকে ঘাপটি মেরে থাকতে দেখলাম। প্রতি শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার পরে সকল দর্শনার্থীর জন্য জাদুঘরে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। টিকিটের দাম সাত ইউরো, অর্থাৎ খুব বেশি নয়। কিন্তু বাঁচাতে পারলে মন্দ কী? মুশকিল হচ্ছে দিনটা কর্মদিবস, মানে একদিন ছুটি নিতে হবে। সুপারভাইজর মানা করবে না এই বিশ্বাস ছিলো, কাজেই সবার আগে বাসের রাউন্ড ট্রিপের টিকিট করে ফেললাম। বেজায় সস্তা, মাত্র বারো ইউরো। প্যারিস থেকে বাস ছাড়বে সকাল নটায়, আর ফেরার বাস রাত নটায়। যাতায়াতের সময়টা বাদ দিলে হাতে নয়-দশ ঘন্টার মতো থাকবে। যথেষ্টই।

যেহেতু যাচ্ছিই, খুঁজে খুঁজে বের করলাম আরও কিছু জায়গা। দীর্ঘ সময়ের সদ্ব্যবহার তো করতে হবে! দেখা গেলো, শহরটা ছোটো হলেও একেবারে ফেলনা নয়।

প্যারিসে সেন নদীর পাড়ে বেরসি পার্কের অবস্থান। পার্কের পাশেই বাস টার্মিনাল, যেখান থেকে দূরপাল্লার বাসগুলো ছাড়ে। চমৎকার বাস, রাস্তাও খাসা। ঘণ্টায় প্রায় একশো কিলোমিটার গতিতে আমিয়েঁর দিকে যেতে যেতে আমি জুল ভার্নে‌র কথাই ভাবতে থাকি,  নিমেষে যেন চলে যাই শৈশবে।

আমার বয়স তখন নয় কী দশ। বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে আবিষ্কার করি একটা হার্ডকভার বই, নাম ‘সাগরতলে’। লেখকের নাম জুল ভার্ন। বইপত্র পড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে ততোদিনে, তবে এই বইয়ের নাম আগে কখনো শুনিনি। লেখকের নামটাও আজগুবি। তখন বইপত্র বেছে পড়ার বয়স নয়। স্বভাবের কারণে যা পাই পড়ে ফেলি। তবে আমাকে বিশেষভাবে টানলো এই বইটার প্রচ্ছদ। গাঢ় নীলজলের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে তিমির মতো দেখতে একটা ডুবোযান, আর ডুবুরির জবড়জং পোশাকে জলের বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে কেউ একজন। লেখকের নাম জুল ভার্ন, অনুবাদক শামসুদ্দিন নাওয়াব (অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেন। নাকি তাঁর গোস্ট রাইটার? থাক, এসব কাসুন্দি না ঘাঁটাই মঙ্গল)।

ওইদিন আক্ষরিক অর্থেই গোগ্রাসে গিলেছিলাম বইটা, একটানা, আমার বন্ধুর বাড়িতে বসেই। লেখাটা আমার মনে রোমাঞ্চের একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। সেবা প্রকাশনীর বইয়ের একটা সমস্যা হলো, এরা মূল লেখাকে বিস্তর ছেঁটে ফেলে। সেটা অবশ্য বুঝেছি পরে। অনেক পরে সম্পূর্ণ সংস্করণটিও পড়েছিলাম। ততদিনে আমি পাঠক হিসেবে অনেকটা পরিণত—তারপরও পড়তে গিয়ে শৈশবের সেই দুর্দান্ত অনুভূতিই যেন ফিরে আসে আবারও। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে যেসব খুঁটিনাটি বাদ পড়েছিল, সেগুলো পড়ে মুগ্ধতা বাড়ে বৈ কমে না। আমি নিজেই যেন প্রফেসর পিয়ের আরোনাক্স; বিস্ময়কর ডুবোযান নটিলাসের বুকে চেপে রহস্যমানব ক্যাপ্টেন নিমো, তিমিশিকারী নেড আর প্রভুভক্ত কনসিলকে সঙ্গে নিয়ে সাগরের গূঢ় অন্ধকারে নিজেই যেন ঝাঁপ দিই বারবার। একজন মানুষ কতোখানি কল্পনাশক্তির অধিকারী হতে পারে ভেবে বিস্ময়ের থই থাকে না আমার। ‘দ্য মিস্ট্রিয়াস আইল্যান্ড’, ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’, ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ’, ‘ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন’—ভার্ন আমাকে মুগ্ধ আর রোমাঞ্চিত করেছেন প্রতিবারই। জুল ভার্ন তাই আমার কাছে স্রেফ একজন শিশুসাহিত্যিক নন, একটা স্বপ্নমাখানো অনুভূতির নাম।

বিশ্বজুড়ে অন্তত দেড়শো ভাষায় জুল ভার্নের বিভিন্ন লেখা অনূদিত হয়েছে। মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ ‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’। বিশ্বজুড়ে হাজারেরও বেশি সংস্করণ আছে কেবল এই একটি বইয়েরই।

জুল ভার্ন জন্মেছিলেন ১৮২৮ সালে, প্যারিস থেকে চারশ কিলোমিটার দূরের নঁত শহরে। শুরুর জীবন সেখানেই কেটেছে। এরপর বাবার সিদ্ধান্তে আইন পড়ার জন্য প্যারিসে যান। পড়ছিলেন আইন, কিন্তু মনেপ্রাণে পুরোদস্তুর লেখক। প্যারিসে থাকাকালে লেখক-শিল্পীদের আড্ডা বা সালোঁতে যাতায়াত করছেন, আলেক্সঁদ্র দ্যুমার মতো সাহিত্যিকদের সংস্পর্শেও আসছেন। এসব করে লেখালিখির ভূত আরও জেঁকে বসে। শেষে আইনজীবী হবার ইচ্ছে চিরতরে বিসর্জন দিয়ে পেশাদার লেখক হবার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললেন। তাঁর বাবা এই সিদ্ধান্তে মোটেও খুশি হননি। দুজনের ভেতরে এটা নিয়ে মনোমালিন্যও হয়েছে। এর মাঝে ঘটলো এক অদ্ভুত যোগাযোগ।

বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে আঠাশ বছর বয়সী জুল ভার্ন আমিয়েঁ শহরে গিয়েছিলেন ১৮৫৬ সালে। সেখানে কনের বিধবা বোনকে মনে ধরে যায়। তারপর ভাববিনিময়, বিয়ে। প্যারিসে সংসারও করলেন কিছুদিন। স্ত্রী চাইছিলেন বাপের বাড়ির কাছাকাছি থাকতে। ভার্নও ভাবলেন, মন্দ কী, লেখালিখির জন্য আবশ্যকীয় নির্জনতা তো জুটবে। ১৮৭১ সালে জনাকীর্ণ প্যারিস ছেড়ে তাঁরা পাকাপাকি চলে এলেন আমিয়েঁতে। তখন ভার্নের বয়স তেতাল্লিশ। এরপর তাঁর জীবনের বাকি চৌত্রিশটি বছর এই শহরেই কেটেছে। এখানে এসে দু-তিনটে ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন। এগুলোর ভেতরে যেখানে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বসবাস করেছেন—প্রায় আঠারো বছর—সেটাই এখন জাদুঘর।

১১ আগস্ট, ২০২৩। আমিয়েঁতে নামলাম বেলা বারোটার দিকে। আকাশ কিছুটা গোমড়া। জাদুঘরে যাবো সাড়ে চারটায়, অর্থাৎ তখনও অঢেল সময় হাতে। প্রথমে সিমেট্রিটা ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ সেটা মূল শহর থেকে কিছুটা বাইরে। বাসে যেতে আধঘন্টার মতো লাগলো। গুগল ম্যাপ দেখে খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু ভেতরে ঢুকে কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। ইতোমধ্যে আমি প্যারিসের সিমেট্রি দেখেছি, তবে এটা যেন অন্যরকম। কেমন গা-ছমছমে ভূতুড়ে ভাব। আঠারো হেক্টরের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা সিমেট্রিটা প্রায় দুশো বছরের পুরনো। সবুজ গাছপালা আর ঝোপঝাড় চিরে গভীরে ঢুকে গেছে গোটাকতক অপরিসর পিচঢালা পথ। দর্শনার্থী তেমন নেই বললেই চলে। নাম-না-জানা কিছু পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দও নেই কোথাও। স্নিকারের তলায় পিষে যাওয়া নুড়িপাথর আর জামাকাপড় খসখস শব্দও যেন কানে এসে লাগে, মনে হয় যেন অজ্ঞাতসারে জায়গাটার সযত্নে আগলে রাখা মৌনব্রত ভঙ্গ করিয়ে ফেলছি। অপরিসর পাকা রাস্তার দুপাশে শতবর্ষী গাছপালা ঘন ডালপালা ছড়িয়ে সৌম্যভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে অল্প অল্প আকাশ দেখা যায়। আলোকস্বল্পতায় দিনের বেলাতেও স্তূপীকৃত হয়ে আছে চাপ চাপ অন্ধকার। সমাধির আশপাশে কেটেছেঁটে সামলে রাখা বেয়াড়া ঝোপঝাড় সেই অন্ধকারকে আরও জমাট করে তোলে। সমাধিগুলোকে মনে হয় যেন জীবন্ত; হয়তো আচমকা একটা ভাঙ্গা কবরের ইটের পাঁজার ভেতর থেকে হিলহিলে অ্যাডার ফোঁস করে উঠবে, কিংবা একশো বছর ধরে শুয়ে থাকতে থাকতে তিতিবিরক্ত হয়ে কফিন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে একজন ফরাসি সাহেব। উফ্‌, এমন গোরস্থানও হতে হয় বুঝি! পঞ্চাশ কী একশো কী দুশো বছরের পুরনো ভাঙ্গাচোরা শ্যাওলাধরা সমাধিগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটতে বেশ অস্বস্তিই হচ্ছিল আমার।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ-সময় আমার খুব করে মনে পড়ছিল ফেলুদার ‘গোরস্থানে সাবধানে’-র কথা। সিমেট্রিতে হাঁটতে হাঁটতে জটায়ু যেভাবে বলছিলেন—

দোহাই পামার সাহেব, দোহাই হ্যামিলটন সাহেব, দোহাই স্মিথ মেমসাহেব—ঘাড়টি মটকিও না বাবা, কাজে ব্যাগড়া দিয়ো না! তোমরা অনেক দিয়েচ, অনেক নিয়েচ, অনেক শিখিয়েচ, অনেক ঠেঙিয়েচ…ক্যাম্বেল সাহেব, অ্যাডাম সাহেব, আর—হুঁ হুঁ—তোমার নামের তো বাবা উচ্চারণ জানি না!— দোহাই বাবা, তোমরা ধুলো, ধুলো হয়েই থাকো বাবা, ধুলো…ধুলো…।

ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমি হেসে ফেলি সশব্দে, পরক্ষণে নিজের হাসির শব্দে নিজেই চমকে যাই। বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার।

তখনও পাখির ডাক আর নিজের পায়ের শব্দের বাইরে আর কিচ্ছু নেই, কেউ নেই। এই শিরশিরে অনুভূতির ভেতর দিয়ে পায়ে-পায়ে জুল ভার্নের সমাধিতে পৌঁছলাম। খুঁজে পেতে খুব কসরত করতে হয়নি অবশ্য, কারণ এটাই এই সমাধিক্ষেত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত সমাধি—ফলে কিছুদূর পরপরই দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। তবে ঢোকার গেট থেকে অবস্থান খানিকটা ভেতরে হওয়াতে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে হয়। সিমেট্রিটা আবার সমতলও নয়, উঁচুনিচু। ফলে হাঁটার খাটুনি একেবারে কম নয়।

সমাধির সামনে আমি চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। কী ভাবছিলাম? নশ্বর মানবজীবনে একজন মানুষ কতো বিচিত্র-বর্ণিল কাজ করে যেতে পারে, সেটাই হয়তো। সম্বিৎ ফেরে কয়েকজনের গলার স্বরে। সম্ভবত আমেরিকান। ওরাও ভার্নকে দেখতেই এসেছে।

জুল ভার্নের সমাধির নকশাকার আলবের রোজ। ভাস্কর্যটা দেখে মনে হয় যেনো ভার্ন কবর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। প্রতীকী অর্থটা নিমেষে আমার জন্য অনেক তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। জুল ভার্ন তো বেঁচে আছেনই, পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ শেলফে, কোটি কোটি পৃষ্ঠায়, আর অজস্র মানুষের স্মৃতিতে। এই আমাকেও যেমন সুদূর আমিয়েঁতে টেনে আনলেন সেই কোন বাংলাদেশ থেকে। এই যোগাযোগ অপার্থিব।

সেখানে আরও কিছুক্ষণ থাকার পর আমিয়েঁ শহরে ফিরতে মনস্থির করি। কিন্তু সেখানেই বাধল গোল। শহরের বাইরের দিকে হওয়াতে খুব বেশি বাস এদিকটায় যাতায়াত করে না। পরের বাস অন্তত আরও ঘন্টাখানিক পর, এমনটাই দেখলাম অ্যাপে। তখন গ্রীষ্মকাল। বাংলাদেশের মতো না হলেও মাথার ওপরে থাকা মাঝদুপুরের সূর্য মাঝে মাঝে বেশ চড়া হয়ে উঠছে। নয়তো এই পাঁচ কিলোমিটারের মতো রাস্তা কি হেঁটেই মেরে দেওয়া যেত না? খুব যেত। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না মনে হয়। অগত্যা বাসের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু সময় কাটানো যায় কী করে? ম্যাপে দেখলাম, কাছেই একটা সরু নদীমত আছে। অবশ্য খাল হলেই বা কে ঠেকাচ্ছে। বেশ তো, খালই সই। আমার তো আর কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না যে অখ্যাত খালেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছি কী করতে। অখ্যাত জায়গাগুলোই বরং ভালো, ভিড় থাকে না, নিজের মতো অনেককিছু কল্পনা করে নেওয়া যায়, খানিকটা একান্ত সময়ও কাটে।

সেদিন যদি ওদিকে হেঁটে হেঁটে না যেতাম, একটা অপূর্ব দৃশ্য আমার দেখা হতো না। দুপাশে দীর্ঘ গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে সরু পথ। আহা, পথও এত সুন্দর হয়! সবুজ ঝোপঝাড় দিয়ে কেউ যেন সযত্নে পথটাকে সাজিয়েছে। ওপরে ঠায় দাঁড়িয়ে সুদীর্ঘ বৃক্ষের দল। একটু এগোতে একটা ছোট্ট বাড়ি। কাঁটাতারের জালে ঘেরা। বাসার সামনে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। স্বামী-স্ত্রী মিলে গৃহস্থালি কিছু একটা করছেন, দুজনই আনুমানিক চল্লিশ। তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে মাঠময়, বয়স দশ-বারোর বেশি নয়। ওদের পেছনে ছুটে ক্লান্ত হচ্ছে একটা বাদামী-সাদা হাস্কি। চোখ বুজলে আজও যেন বাড়িটা দেখতে পাই। জীবনের অন্যরকম মানে করতে ভালো লাগে। একটা জীবন কতো রকমভাবেই তো কাটতে পারে। জুল ভার্ন কি এরকম মায়াময় নির্জনতার খোঁজেই প্যারিসের ব্যস্ততা ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলেন?

কিছুক্ষণ পর বাসে করে শহরে ফিরলাম, মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। জাদুঘরে যেতে তখনও ঢের সময় বাকি। কাছাকাছিই ছিল নোত্র্‌ দাম ক্যাথেড্রাল। সেদিকে এগোলাম। এটা অবশ্য প্যারিসের নোত্র্‌ দামের মত অত বিখ্যাত নয়, যদিও দেখতে কাছাকাছি, গথিক ধাঁচের। আর আমিয়েঁর ক্যাথেড্রালটাই আকারে বড়ো, প্যারিসেরটার প্রায় দ্বিগুণ। প্যারিসের নোত্র্‌ দামে তখন সংস্কারকাজ চলছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই সেটা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ। অগত্যা দুধের স্বাদ ঘোলেই মিটুক। চমৎকার বাহারি কারুকাজ ক্যাথেড্রালের ভেতরে-বাইরে। অনতিদূরে আছে একটা প্রখ্যাত বেল টাওয়ার। আজ অবশ্য সেটা বন্ধ। বাইরে থেকেই যেটুকু দেখা গেল।

সময়ের একটু আগে-আগে জাদুঘরে পৌঁছে দেখি ইতোমধ্যেই বেশকিছু মানুষজন চলে এসেছে। তারাও সাড়ে চারটা বাজার অপেক্ষা করছে। বাইরে থাকতে থাকতেই বাড়ির কয়েকটা ছবি নিলাম। বাড়ির মূল নকশা সেরকম বদলানো হয়নি সেটা বুঝেছি ভেতরে গিয়ে, পুরনো সময়ের ফটোগ্রাফ দেখে।

বাড়িটা বেশ বড়ো। কক্ষগুলোও বাহারি। খাওয়া, পড়াশোনা, আপ্যায়ন, ধূমপান সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা ঘর ছিলো। সময়ের প্রয়োজনে সব ঘরই অল্পবিস্তর সংস্কার করতে হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ভার্নের ডাইনিং কক্ষ, যেটা প্রায় অবিকৃত রাখা সম্ভব হয়েছে। ছাদ থেকে শুরু করে আসবাবপত্র বা ফায়ারপ্লেস, এমনকি ব্যবহৃত তৈজসপত্রগুলো পর্যন্ত সযত্নে রক্ষিত আছে সেই ঘরে। আরো দেখলাম ভার্নের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। এখানে নাকি হাজারের বেশি বই ছিল একসময়। ভার্ন যেরকম লেখা লিখতেন, সেজন্য তাঁকে প্রচুর পড়তে হতো, ঘাঁটাঘাঁটি করতে হতো, নোট নিতে হতো। সেসবের বেশিরভাগই অবশ্য পরে হারিয়ে গেছে।

জুল ভার্নের প্রথম উপন্যাস ‘ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন’ থেকে শুরু করে প্রায় সব বইয়েরই প্রকাশক পিয়ের-জুল হেৎজেল। এই বাড়িতেই ছিলো তাঁর অফিসরুম। লেখক-প্রকাশকের কেজো সম্পর্ক ছাপিয়ে দুজনের ভেতরে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়েছিলো।

বাড়িতে কাঠের একটা সিঁড়ি রয়েছে, আর সেটা একটা সরু টাওয়ারের ভেতর দিয়ে উঠে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি অ্যাটিকে চলে যাওয়া যায়। গোলাকৃতি টাওয়ারের ওপরের একটা অংশে নটিলাসের মত করে সাবমেরিনের একটা কন্ট্রোল প্যানেল বানানো হয়েছে। এই সংযোজন অবশ্য পরে করা। জুল ভার্ন‌ের এসব রদ্দি জিনিস বানাতে বয়েই গেছে। স্রেফ লিখেই কল্পনাকে যিনি অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন, তাঁর অন্য কোনো মাধ্যমের দরকার পড়ে না। যেমন টলকিয়েন—কল্পনার চোখে যিনি একটা আস্ত ইউনিভার্সই বানিয়ে ফেলেছিলেন।

আমিয়েঁর মানুষের কাছে জুল ভার্নে‌র গুরুত্ব অসামান্য। শহরের অনেক জায়গাতেই তাঁর ভাস্কর্য কিংবা তাঁর চরিত্র বা গল্প নিয়ে তৈরি ভাস্কর্য, বইয়ের তথ্যফলক ইত্যাদি চোখে পড়ে। একটা প্রিস্কুলের সাইনবোর্ডেও দেখলাম অতিকায় অক্টোপাসের তলায় নটিলাস ভেসে বেড়াচ্ছে। বোঝা যায়, মানুষটাকে শহরবাসী আজও ভালোবাসে, তাঁর জন্য গর্ববোধ করে। আমিয়েঁবাসী তো তবু তাঁকে সশরীরে পেয়েছে। স্পেনের উপকূলীয় শহর ভিগো-তে ভার্নে‌র একটা ভাস্কর্য আছে, যদিও তিনি কোনোদিনই যাননি সেখানে। সেটা তৈরি করা হয়েছে কেবল এই কারণে যে—‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ বইতে ভিগোর উল্লেখ আছে।

সন্ধ্যা নামতে থাকে। প্যারিসে ফিরতে হবে। যাওয়ার আগে আমিয়েঁর দিকে ফিরে তাকাই। অনেক বিক্ষিপ্ত ভাবনা মাথায় আসে। আমাদের মানবজীবন কি আসলেই ক্ষুদ্র, নাকি আমরাই তাকে কেটেছিঁড়ে অকিঞ্চিৎকর বানিয়ে ফেলি—যেমনটা সেনেকা বলেছেন?

ধন্যবাদ, প্রিয় জুল ভার্ন‌, পৃথিবীর সকল ভাষার অগুনতি শিশুর রঙিন শৈশবের জন্য।

Leave A Comment

Share this with others