প্যারিসের ইতিহাস, ইতিহাসের প্যারিস (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৪)

শি জুশিরোনাম পড়ে কেউ কেউ হয়তো ভাবছে, এই রে! এবার শুরু হবে সাল-তারিখের কচকচানি।

ইতিহাস মানেই যেন হিজিবিজি তথ্যের সমারোহ। অবশ্য স্কুলজীবনে ইতিহাস পড়ার কথা মনে পড়লে বিরক্তি আসে আমারও। দারুণ একটা বিষয়কে কত অনাদরেই না আমাদের মস্তিষ্কে ঠেসে ঠেসে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে! শিখনবিজ্ঞানের খুব সাধারণ একটা কথা হলো, মানুষ বিচ্ছিন্ন তথ্য মনে রাখতে পারে না। নতুন কিছু শিখতে হয় চেনাজানা জগতের সঙ্গে মিলিয়ে—জন ডিউই যাকে বলেছেন নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার প্রবাহ। আর ইতিহাস তো মানুষেরই হাজার বছরের যাপিত জীবনের গল্প। সময়ের প্রেক্ষিতে কিছু বদলেছে কিনা যাচাই করার জন্য এনসিটিবির ওয়েবসাইটে নতুন পাঠ্যবইগুলো দেখলাম। নাহ, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। রোমাঞ্চ নেই, রসকষ নেই, উদ্দীপনা জাগানোর রসদ নেই, অনুসন্ধিৎসু মনকে খুঁচিয়ে তোলার প্রয়াস নেই, অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার পথ দেখানো নেই। আছে কেবল তথ্য আর তথ্য। কবে যে এসব বদলাবে—কে জানে!

ইতিহাস কেন জানতে হয়? গৎবাঁধা উত্তর তৈরিই আছে আছে: ইতিহাস অতীতের ভুল ধরিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে টেকসই করে, সংকটময় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এসব হলো বইপত্রের কথা। যদি সহজভাবে বলি—ইতিহাস আসলে আমাদের নিজস্বতা, আমাদের পরিচিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাস না জানলে মানুষ তার শেকড় চেনে না, মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ যাত্রার অংশ হিসেবে নিজেকে ভাবতেও পারে না। তাছাড়া ইতিহাস অবধারিতভাবেই আমাদের পারিপার্শ্বিকতা আর ভ্রমণকে অর্থবহ করে তোলে। জানা থাকলে আর সংযোগ ঘটাতে পারলে খুব সাধারণ বস্তু, ঘটনা বা স্থানও অসাধারণ হয়ে ওঠে। আর ইতিহাসচর্চাও আনন্দদায়ক কাজ, কারণ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা এতটাই রোমাঞ্চকর যে জনপ্রিয় থ্রিলারকেও টেক্কা দিতে পারে। তবে ইতিহাস সবসময় নিরপেক্ষ কিংবা নিষ্কলুষ নয়; বরং প্রায়শই অসম্পূর্ণ, একপেশে বা অনির্ভরযোগ্য। সেখান থেকে নেড়েঘেঁটে আসল ব্যাপারটা বুঝে নিতে হয়। সেটাও অবশ্য একরকম থ্রিলিং কাজ!

ইউরোপকে ইতিহাসের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না। বস্তুত সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসই ওতপ্রোতভাবে ইউরোপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন ধরুন ফ্রান্সের ইতিহাস, যা কল্পনাতীত রকমের সমৃদ্ধ—যার বেশ খানিকটা বিস্তৃত প্যারিসের অলিগলিতে, আবার অনেকটা ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে। সেই অংশটা অবশ্য গর্বভরে বলার মতো নয়।

আমার এই লেখা ভ্রমণকেন্দ্রিক। ফ্রান্সের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য নয়, সেটি সম্ভবও নয়। প্রাসঙ্গিকটুকুই বলব কেবল। এখানে জানিয়ে রাখি, লেখার সময়ে আমি অজস্রবার তিনটি গ্রন্থের শরণ নিয়েছি। তবে বারবার তথ্যসূত্র উল্লেখ করে লেখাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। এজন্য শুরুতেই কৃতজ্ঞতাস্বীকার সেরে ফেলা যাক।

France: A Short History (2021) by Jeremy Black
The Cambridge Illustrated History of France (1999) by Colin Jones
France: A History (2018) by John Julius Norwich

মাটিচাপা ইতিহাস

ইতিহাস সম্ভবত দুভাবে চাপা দেওয়া সম্ভব, ধামাচাপা আর মাটিচাপা। প্রথমটা আমরা হরহামেশাই দিই—নিজের নাক কাটা যাবে এমন তথ্য বেমালুম গায়েব করে ফেলি। তবে কেবল ব্যক্তিগত পরিসরেই নয়, আয়োজন করেও ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়া হয়। মাত্র অর্ধশতক আগে ঘটে যাওয়া জলজ্যান্ত মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে অস্বীকার কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা তো এখনও চলছেই। অতীতেও রাজাদের ভাড়াটে ইতিহাসবিদের অভাব ছিল না। নিতান্ত পাপিষ্ঠকেও অনেক সময় তারা বিশ্ববিবেকের অবতার বানিয়ে ফেলত। তাছাড়া কে না জানে—ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের পক্ষে। এভাবে কত ইতিহাস যে বিদীর্ণ-বিকৃত-বিনষ্ট-বিপন্ন-বিবর্তিত হয়েছে তার গোনাগুনতি নেই। কিছু ইতিহাস অবশ্য সময়ের পরিক্রমায় স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা পড়ে যায়। কিছু আবার আক্ষরিক অর্থে এমন গভীরে চলে যায় যে আর্কিওলজিস্ট দিয়ে খুঁড়ে তুলতে হয়। সেটাকেই আমি মাটিচাপা ইতিহাস বলছি।

প্যারিসের মাটিচাপা ইতিহাস দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা শহরের কেন্দ্রস্থিত একটি সুখ্যাত দ্বীপ—ইল দ্য লা সিতে। মাত্র দু-তিনশো মিটার চওড়া দ্বীপ, যার দুদিক দিয়ে বয়ে গেছে সেন নদীর ধারা। প্যারিসের উত্তর আর দক্ষিণ অংশের মাঝামাঝি অবস্থান বলে দ্বীপটি ভৌগলিকভাবেই প্যারিসের কেন্দ্রবিন্দু। আবার ঐতিহাসিকভাবেও। প্রচুর সেতু চারিদিক থেকে সিতের সঙ্গে যুক্ত আছে, ফলে দ্বীপ বলে অনেক সময় মনেই হয় না। একটি মেট্রো স্টেশনও আছে, যার অবস্থান নদীরও নিচের স্তরে। আর মেট্রোর লাইন চলে গেছে সেন নদীর তলা দিয়ে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পঁচিশ মিটার গভীরে।

প্যারিস ভ্রমণকারীদের জন্য সিতে একটি অনিবার্য গন্তব্যস্থল, কারণ এখানেই রয়েছে জগদ্বিখ্যাত নোত্র্‌ দাম ক্যাথেড্রাল। মনে পড়ে ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নোত্র্‌ দাম’-এর কথা? সেই যে—মর্নিং ইন প্যারিস, দ্য সিটি অ্যাওয়েকস টু দ্য বেলস্‌ অব নোত্র্‌ দাম! ক্যাথেড্রালের সামনে আমি অনেকবারই গিয়েছি। সামনে, কারণ ভেতরটা এখন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। ২০১৯ সালের অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই সংস্কারকাজ চলছে। প্যারিস অলিম্পিকের সময়েই নাকি আবার খুলে দেওয়া হবে। বাইরে থেকে অবশ্য দেখা যায়। কিন্তু চারিদিকে ঘিরে থাকা দৈত্যাকার ক্রেন আর লোহালক্কড়ের ভিড়ে ব্যাপারটা জমে না।

প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে আমার প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল ক্যাথেড্রালের ঠিক সামনে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ ‘ক্রিপ্ত্ আর্কিয়োলজিক দ্যু ইল দ্য লা সিতে’। নাম থেকে বোঝা যাওয়ার কথা যে জায়গাটা প্রত্নতাত্ত্বিক। অর্থাৎ এর সঙ্গে ইতিহাসের যোগসূত্র আছে। সেই ইতিহাস আবার যেনতেন নয়, খোদ প্যারিস নগরী কীভাবে গড়ে উঠল—তারই ইতিবৃত্ত।

বয়সের হিসেবে প্যারিস পুরনো। যথেষ্টই পুরনো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্যারিসের বের্সি এলাকা থেকে নব্যপ্রস্তরযুগের একটি কাঠের নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে, যা বর্তমানে প্যারিসের কার্নাভালে জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ অনায়াসেই বলা চলে যে, এখানে লোকবসতি তৈরি হয়েছে অন্তত ছয় হাজার বছর আগে। আমি অবশ্য অত পেছনে যাব না, তার প্রয়োজনও নেই। আমরা বরং একলাফে চলে আসতে পারি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে, যখন অধুনা প্যারিসের গোড়াপত্তন হচ্ছিল। তখন ইউরোপে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রদায় ছিল কেল্ট, জার্মানিক, ইতালিক আর স্লাভরা। কেল্টদের একটি বড়ো অংশ পরিচিত ছিল ‘গল’ (Gaul) নামে। ‘প্যারিসি’ (Parisii) নামে এমনই এক গল-গোত্র এসে বসত গেড়েছিল সেন নদীর মাঝখানের এই দ্বীপে, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি আজ অতীত হাতড়াচ্ছি। জায়গাটা তখন আজকের মতো এত চমৎকার ছিল না। একে তো জলকাদাময় ভূপ্রকৃতি, তার ওপর বর্ষায় বন্যার পানিতে ডুবেও যেত। তবে দ্বীপে থাকার বড়ো সুবিধা হলো, চারদিকে সেন নদী প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। আবার নদীপথ ব্যবহারেরও অবাধ সুযোগ। সব মিলিয়ে জায়গাটা তাদের মনে ধরেছিল। পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাচীন শহরের অবস্থানই যে নদীর পাড়ে, সেটা আসলে নিতান্ত কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়।

নতুন আগন্তুকরা ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিতে শুরু করল। ক্রমে দ্বীপ ছাড়িয়ে আশপাশেও তাদের লোকবসতি ছড়িয়ে পড়ল। মোটামুটি নির্বিঘ্নেই কেটে গেল প্রায় দুশো বছর। জায়গাটা ততদিনে বেশ রমরমা হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে নিরাপত্তার আশায় তারা দ্বীপে এসে উঠেছিল, শেষ রক্ষায় তা আর কাজে দিলো না। ইতিহাসের ওই সময়টা রোমানদের; যারা তখন আগ্রাসীভাবে উত্তর ইউরোপে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে চলেছে, দখল করছে একের পর এক অঞ্চল। খ্রিস্টপূর্ব ৫২ অব্দে জুলিয়াস সিজারের নির্দেশে তাঁর অন্যতম সেরা সেনানায়ক টাইটাস ল্যাবিয়েনাস এই জনপদ দখল করতে আসেন। ওই একই সময়ে বিখ্যাত গল নেতা ভার্সেনজেটরিক্সের নেতৃত্বে গলরা রোমানদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়ছিলো। প্যারিসিরাও সেই প্রতিরোধে যোগ দেয় এবং প্রাণপণ লড়ে। কিন্তু রোমানদের সুশৃঙ্খল রণকৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত তাদের হার মানতেই হয়। দখলের পর রোমানরা এই বিজিত জনপদের নাম রাখল ‘লুতেতিয়া পারিসিওরাম’ (Lutetia Parisiorum)। উচ্চারণের পার্থক্যের কারণে লুতেসিয়াও বলা হয়। আদি অধিবাসীরা, অর্থাৎ প্যারিসিরা আগে জায়গাটাকে কী নামে ডাকত তা ইতিহাসে খুব একটা স্পষ্ট নয়, তবে জলকাদার দেশ জাতীয়ই কিছু হবে। রোমানরা এসে সেটিকে ল্যাটিন রূপ দিল কেবল। ‘লুতো’ কথাটার মানে জলাভূমি। রোমান শাসনামলেই কালক্রমে নামের প্রথম অংশ ‘লুতেতিয়া’ খসে পড়ে শুধু ‘প্যারিসি’ টিকে গিয়েছিল। পঞ্চম শতকের দিকে রোমান সাম্রাজ্য যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়তে শুরু করল, এই অঞ্চলেও রোমানদের নিয়ন্ত্রণ আলগা হলো। ক্ষমতায় এলো ফ্রাঙ্করা (Franks)। তাদের শাসনামলে শহরের নাম বিবর্তিত হয়ে ‘প্যারিস’ হলো অবশেষে।

লেখার এই পর্যায়ে একটা দুর্দান্ত ব্যঙ্গ-তথ্যচিত্র বা মকুমেন্টারির কথা মনে পড়ছে। অনেকে হয়তো দেখে থাকবেন—‘কাঙ্ক অন আর্থ’। জিনিসটা পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে একরকম ডকুমেন্টারি, আবার কমেডিও। কেউ ঠিকঠাক ইতিহাস না জেনে দেখতে গেলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। উপস্থাপক ফিলোমিনা কাঙ্কের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন ডায়ান মর্গ্যান। কাঙ্ককে বলা যায় অজ্ঞতার মহারানি। সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুলভাল তথ্য দেয়, হাই-প্রোফাইল বিশেষজ্ঞদের সিরিয়াস ভঙ্গিতে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে। একটা পর্বে জনৈক বিশেষজ্ঞকে কাঙ্ক জিজ্ঞেস করে—প্রস্তরযুগের মানুষ তাদের হাতিয়ার মাটির তলায় পুঁতে রাখত কেন? চুরি যাবে বলে? বেখাপ্পা প্রশ্নের সামনে বিশেষজ্ঞটি শুরুতে থতমত খেয়ে যান, তারপর সামলে নিয়ে বলেন—এগুলো তখন ওপরেই ছিল, সময়ের পরিক্রমায় মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আমরা সেগুলো খুঁড়ে বের করেছি।

স্তরে স্তরে ইতিহাস চাপা পড়ার এই ব্যাপারটা দেখা যায় ক্রিপ্ত্‌ আর্কিয়োলজিকেও। বলে রাখা ভালো—এটিই ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো ক্রিপ্ট। জায়গাটার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল কিছুটা অদ্ভুতভাবে। নোত্র্‌ দাম ক্যাথেড্রালের দর্শনার্থীদের জন্য একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কার পার্কিং করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। সেই উদ্দেশ্যে সামনের ফাঁকা জায়গাটায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে ক্রিপ্টটার সন্ধান পাওয়া যায়।

ক্রিপ্টের ভেতরকার পরিবেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, শীতল, শান্ত।  দেখে বোঝার উপায় নেই যে মাথার ঠিক ওপরেই প্যারিস শহর গমগম করছে। চাইলে জোরালো আলোর ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু তাতে অতীত খুঁড়তে চাওয়া দর্শনার্থীদের অনুভূতিটা মাঠে মারা যেত। এই ইন্টেরিয়রের নকশা যারা করেছে তাদের জবাব নেই।

ক্রিপ্টের দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার পথ করা আছে, আর ভাঙ্গাচোরা নিদর্শনগুলো রাখা আছে মাঝখানে। এখানে রোমানযুগের একদম শুরুর দিকের লুতেসিয়ার কিছু কাঠামো আছে। রোমানদের বিপুল ইতিহাস এখানে বিধৃত করা অসম্ভব ও অপ্রাসঙ্গিক। যেটুকু না বললেই নয়—রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান কেবল গায়ের জোরে হয়নি—হয়েছে উৎকর্ষতায়, সৃজনশীলতায়, সুনিপুণ পরিকল্পনায় আর অসামান্য প্রকৌশল-দক্ষতায়।

সিতে দ্বীপটা নদীপথে বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত সে-কথা আগেই বলেছি। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের আমলে লুতেসিয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেক বেড়ে গেল। যিশুখ্রিস্টের জন্মের সময়সাময়িক কালের কথা সেটা। ক্রমে শহরের পরিসর বাড়ল। তৃতীয় শতকের দিকে দ্বীপটাকে আমূল সংস্কার করা হয়েছিল। তৃতীয় আর চতুর্থ শতকের এসব সংস্কারকৃত ভবনের নিদর্শনও ক্রিপ্টে পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, দ্বাদশ শতকে তৈরি পাথরে-বাঁধানো হাঁটাপথেরও বেশ খানিকটা এই ক্রিপ্টেই চাপা পড়ে ছিল। এখানে আরও আছে সপ্তদশ শতকের একটি শিশু হাসপাতালের অংশবিশেষ। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগের ইতিহাস এখানে এসে মিশেছে। অভিন্ন স্থানে একাধিক সময়ের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া অবশ্য খুব অভিনব কিছু নয়। ক্রিপ্টগুলো এরকমই হয়। কারণ স্থাপনা মাত্রই ক্ষয়িষ্ণু, ফলে সময়ের প্রয়োজনে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, আর পরিত্যক্ত যা-কিছু সবই মাটিচাপা পড়ে যায়।

ক্রিপ্ত্‌ আর্কিওলজিকের অন্যতম আকর্ষণ রোমান স্নানাগারের অংশবিশেষ। দেওয়াল খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল কাঠামোটা দেখে বোঝা যায় এটা বাথহাউজই। এখানে কী ধরনের সুবিধা ছিল জানলে চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য—সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম! বাইরে বসানো ফার্নেসের মাধ্যমে উৎপন্ন তপ্ত বায়ু প্রবাহিত হতো মেঝের নিচে আর দেওয়ালে থাকা নলে, যা স্নানাগারকে উষ্ণ রাখত। সেই প্রথম শতক থেকেই রোমানদের পাবলিক স্নানাগারগুলোতে এরকম হিটিং সিস্টেম বসানো শুরু হয়। প্রযুক্তিটির নাম হাইপোকস্ট (Hypocaust)। প্রকৌশলে রোমানরা যা করে গেছে তার জবাব নেই।

ক্রিপ্ট আলোকিত করে আছেন আরেক বিশিষ্টজন—ভিক্টর হুগো (ফরাসি উচ্চারণ অবশ্য উগো)। বলা হয়ে থাকে তিনি একাই নোত্র্‌ দাম ক্যাথেড্রালকে বাঁচিয়েছিলেন। ক্রিপ্টের বিভিন্ন স্থানে সেই গল্পই লেখা। ১১৬৩ সালে তৈরি হওয়া ভূবনবিখ্যাত ক্যাথেড্রালটি উনিশ শতকের দিকে এসে সীমাহীন অবহেলার শিকার হয়। এই অবস্থায় একজন লেখকের পক্ষে সর্বোচ্চ যা করা সম্ভব হুগো তাই করলেন—লিখলেন। ক্যাথেড্রালকে কেন্দ্র করে রচিত হলো প্রখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নোত্র্‌ দাম’। ব্যাপক পাঠকপ্রিয় হলো সেটি। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।

ক্যাথেড্রালটাকে লোকে এতদিন অবহেলার বস্তু হিসেবেই জানত। ভেঙ্গেচুরে পড়ে আছে, বিশ্রী আর ভূতুড়ে দেখতে, কাছে যেতেই ইচ্ছে করে না। কিন্তু উপন্যাস সেই ধারণা খোলনলচে পাল্টে দিলো। মানুষ ক্যাথেড্রালটাকে রীতিমত ভালোবেসে ফেলল। কেবল লেখা দিয়েই পাঠককে আন্দোলিত করে তুলেছেন হুগো, ক্যাথেড্রালটাকে স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন পাঠক-মানসে। তখন এরকম জনমত তৈরি হলো—আরে, এরকম অমূল্য জাতীয় সম্পদকে আমরা ফেলে রেখেছি, ছিছি! ফলে ক্যাথেড্রাল সংস্কারের প্রবল দাবি উঠল। অবশেষে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সংস্কার হলো। এই সংস্কার কিন্তু কেবল জানালা-দরজা সারানোতেই সীমাবদ্ধ রইল না। হুগোর লেখা জনমানসে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে সংস্কারের সময়ে স্থাপত্যেও তার ছাপ পড়ল। হুগোর উপন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে এমন অনেককিছুই ক্যাথেড্রালে নতুন করে সংযুক্ত হলো যা মূল কাঠামোতে ছিলই না। আজকাল কি এরকম ভাবা যায়!

ডাক্তার গিলোটিনের দাওয়াই

প্রাচীনকাল থেকে এবার আসা যাক খানিকটা আধুনিক সময়ে, আঠারো শতকে। ফরাসি বিপ্লবের কথা অনেকেই কমবেশি জানেন। যাঁরা একেবারেই জানেন না কিংবা ভাসা-ভাসা জানেন—তাঁদের আমি খানিকটা গভীরে নিয়ে যেতে চাই। খুব একঘেয়ে লাগবে না আশা করি। বিদগ্ধজনও পড়তে পারেন, এই সুযোগে রিভিশন হয়ে যাবে।

চরম বৈষম্য, অভাব আর অদূরদর্শিতা মিলে কী ঘটাতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে ফরাসি বিপ্লবকে। তখনকার পুরো ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনভাগে বিভক্ত ছিল, যেগুলোকে এস্টেট (Estate) নামে ডাকা হতো। প্রথম এস্টেট রোমান ক্যাথলিক চার্চকেন্দ্রিক সম্প্রদায় (Clergy), দ্বিতীয় এস্টেট অভিজাত সম্প্রদায় (Nobility) এবং তৃতীয় এস্টেট সাধারণ মানুষ (Commoners)। ক্ষমতাপ্রবাহ বিবেচনায় সবচেয়ে শক্তিমান ছিল প্রথম এস্টেট, আর সবচেয়ে অপাংক্তেয় তৃতীয় এস্টেট। ফরাসি রাজাকে তিন এস্টেটের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হতো।

প্রত্যেক এস্টেটের কাছ থেকে এরকম ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল—

প্রথম এস্টেট রাজার জন্য প্রার্থনা করবে।
দ্বিতীয় এস্টেট রাজার জন্য যুদ্ধ করবে।
তৃতীয় এস্টেট রাজার জন্য কাজ করবে।

শুনতে বেশ গালভরা লাগলেও এটি ছিল শোষণের চমৎকার একটি প্রক্রিয়া। বিস্তারিত বললে আরেকটু স্পষ্ট হবে।

প্রথম এস্টেট ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে কম, মাত্র আধা থেকে এক শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এরাই ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান। এই এস্টেটের আওতাধীন ছিল বিশপ, যাজক, মঠবাসী সন্ন্যাসী। যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা হোক না কেন, প্রার্থনার কাজ উৎপাদনমূলক নয় মোটেই। কিন্তু প্রচুর জমি ছিল এদেরই মালিকানায়। উপরন্তু এরা ট্যাক্স দিত না।

দ্বিতীয় এস্টেটের অংশ ছিল রাজপরিবারের সদস্য, অভিজাত পরিবার, ডিউক, কাউন্ট, ভূস্বামী প্রমুখ। সরকার আর সামরিক বাহিনীর উঁচু পদগুলো এদের দখলে থাকত। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমি ছিল এদের কব্জায়। কিন্তু এরা সংখ্যায় ছিল মাত্র দেড় বা দুই শতাংশ। এদেরও ট্যাক্স রাষ্ট্রের তরফ থেকে মওকুফ করা ছিল।

তাহলে গেল মাত্র দুই বা তিন শতাংশ জনগোষ্ঠী। বাকি থাকে প্রায় আটানব্বই শতাংশ তৃতীয় এস্টেটের মানুষ, যেখানে আক্ষরিক অর্থে সকলেই ছিল—বণিক, আইনজীবী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে কৃষক-শ্রমজীবী ইত্যাদি। যেহেতু প্রথম দুই দল দিত না, এজন্য জানা-অজানা, সম্ভব-অসম্ভব যতপ্রকার ট্যাক্স আছে সবই এদের দিতে হত। আর সেই টাকাতেই প্রথমোক্ত দুই এস্টেট স্ফূর্তি করত, আয়েশ করত, যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলত। দীর্ঘকাল সাধারণ মানুষ এদের অনাচার সয়েছে। কিন্তু বেহিসাবি যুদ্ধ আর অপব্যয়ের ফলে অর্থনীতির অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। দুরবস্থা সামাল দিতে রাজা আরও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম দুই এস্টেটের প্ররোচনায় তিনি তৃতীয় এস্টেটের ওপরে কর বাড়ালেন এবং তা ক্রমশ বাড়িয়েই যাচ্ছিলেন। একটা পর্যায়ে অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু কর আরোপ করাও শুরু হলো। মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হলো ভোটের প্রহসন।

ভোটের বিষয়টা ব্যাখ্যা করা দরকার—কারণ ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ভোটাভুটি প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ থেকেই। ফ্রান্সের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এস্টেটের সাধারণ অধিবেশনের মাধ্যমে। সেখানে তিন এস্টেটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকত এবং ভোটাভুটি হতো। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধির সংখ্যা স্বভাবতই বেশি ছিল। কিন্তু তাতে লাভ কী? প্রত্যেক এস্টেটের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি করে ভোট। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা—আটানব্বই শতাংশ মানুষের জন্য একটি ভোট, আর দুই শতাংশ মানুষের জন্য দুটি ভোট! ফলে নিজেদের সুবিধা কমে যেতে পারে—এমন যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রথম আর দ্বিতীয় এস্টেট মিলেঝুলে একই ভোট দিত। স্বাভাবিকভাবেই তৃতীয় এস্টেটের ন্যায্য দাবিদাওয়া আর গ্রাহ্য হতো না। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই কথাটা তো আর এমনি-এমনি আসেনি! এই যেমন ধরুন:

ক) ধনীদের সুযোগসুবিধা কমাতে হবে।—বিপক্ষে দুই ভোট, পক্ষে এক ভোট!
খ) ধনীদের ট্যাক্স মওকুফ করতে হবে।—পক্ষে দুই ভোট, বিপক্ষে এক ভোট!

অর্থাৎ এই ভোটাভুটির কোনো প্রায়োগিক গুরুত্বই ছিল না। এজন্য থার্ড এস্টেট দাবি তুললো যে, ভোটের ক্ষেত্রে এই এস্টেট পদ্ধতিটাই বাতিল করতে হবে, আর প্রত্যেক প্রতিনিধিকে একটি করে ভোটের অধিকার দিতে হবে। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাকি দুই এস্টেট প্রমাদ গুনলো। আরে, ভিখিরির বাচ্চারা স্বাধীন হতে চাইছে যে! তাহলে ওদের শোষণ করব কী করে? সুতরাং বলাই বাহুল্য, প্রথম দুই এস্টেট কিছুতেই এই প্রস্তাবে সম্মত হলো না। এভাবে মোটামুটি স্থিরাবস্থায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। ঐক্যমত সুদূরপরাহত।

১৭ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেট বুঝে গেল যে, এই স্থিরাবস্থা আদৌ কাটবে না। তারা তখন সাহসী অবস্থান নিলো। বললো, ‘আমরা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ, সুতরাং আমরাই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি।’ অর্থাৎ ঘোষিত হলো সেই চিরন্তন সত্যি—রাজা নন, জনগণই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

প্রশ্ন উঠতে পারে—এই সঙ্কটপূর্ণ সময়ে তৎকালীন ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই কোথায় ছিলেন? নিরোর মতো মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন না অবশ্য। তবে তিনি রাজধানী প্যারিসের বাইরে অবস্থান করছিলেন। আগের মাসেই তাঁর বড়ো ছেলে দোঁফা লুই জোসেফের মৃত্যু হয়েছিল, সেই শোকে অনেকটা মুহ্যমান ছিলেন। উপস্থিত থাকলেও অবশ্য খুব লাভ হতো না। একে তো এই বিপুল জলতরঙ্গ বালির বাঁধ দিয়ে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত ও শিক্ষিত মানুষ হলেও রাজার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব ছিল। বিক্ষোভ কীভাবে দমন করতে হয় সেই বাস্তববুদ্ধি তাঁর ছিল না।

তৃতীয় এস্টেটের বিদ্রোহ যাতে অতিসত্ত্বর দমন করা হয় সেজন্য প্রথম দুই এস্টেট রাজাকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। রাজা স্বভাবতই তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বিক্ষোভকে পাত্তাই দেননি শুরুতে, ভেবেছিলেন সহজেই এই বেয়াড়াপনা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবেন। যুগে যুগে শাসকদের এক দোষ। ক্ষমতার মোহে আর ফাঁপা আত্মবিশ্বাসে অন্ধ হয়ে থাকেন।

২০ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেটের লোকজন (যারা ইতোমধ্যেই নিজেদেরকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্বোধন করতে শুরু করেছে) নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিতে ভার্সাইতে অবস্থিত মিটিং হলে উপস্থিত হলো। কিন্তু দেখা গেল সেটা তালাবদ্ধ করে রাখা। শুধু তাই নয়, চারিদিকে রাজপ্রহরীদের কড়া পাহারা। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হলো—কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য হল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা আছে। খোঁড়া যুক্তি শুনে মানুষজন আরও ক্ষিপ্ত হলো। তারা বিষয়টাকে এভাবে দেখল—‘তোদের তো ঢুকতেই দেব না, দেখি তোরা কীভাবে তোদের অ্যাসেম্বলি চালাস!’ উপস্থিতিদের ভেতরে অন্য একটা ভয়ও কাজ করছিল। বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয়রা আশঙ্কা করছিলেন—রাজা তাঁদেরকে চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। এই ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কেউ আর বাড়ি ফিরতে চাইল না। ভীতি ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লো সবার মাঝে। অচলাবস্থা আর উত্তেজনা সামাল দিতে তৃতীয় এস্টেট থেকে এগিয়ে এলেন এক প্রতিনিধি। পেশায় তিনি চিকিৎসক, নাম জোসেফ গিলোটিন। নামটা নিশ্চয়ই চেনা ঠেকছে? কুখ্যাত হত্যাযন্ত্র ‘গিলোটিন’ মূলত তাঁর নাম থেকেই এসেছে। যদিও যন্ত্রটির আবিষ্কারক তিনি নন, তিনি কেবল মৃত্যুদণ্ডের জন্য তুলনামূলক কম যন্ত্রণাদায়ক একটি পদ্ধতির প্রস্তাব করেছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, অদ্ভুত সেই প্রস্তাবের কারণে ইতিহাসের অন্যতম এক ভয়াবহ যন্ত্রের সঙ্গে তাঁর নামটা চিরতরে সেঁটে গেছে! সেদিন এই ডাক্তার গিলোটিনের পরামর্শেই বিদ্রোহীরা সবাই পাশের রয়্যাল টেনিস কোর্টে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে উপস্থিত ৫৭৬ জন মিলে আওড়ালেন:

“যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তম ও ন্যায্য সংবিধান প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছে না, আমরা কেউ কারোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হব না। পরিস্থিতি যা-ই হোক, তা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত থাকব।”

বিখ্যাত ঘটনাটি ‘টেনিস কোর্টের শপথ’ নামে পরিচিত। প্রকাশ্যভাবে রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে অস্বীকার করার সবচেয়ে বড়ো ঘটনা এটাই ছিল। বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনাও বলা চলে একে।

রাজা দেখা দিলেন আরও তিনদিন পরে, ২৩ জুনে, রয়্যাল সেশনে। সেখানে তিনি উপস্থিত তিনটি এস্টেটের উদ্দেশ্যে ক্রুদ্ধভাবে বললেন—তথাকথিত নবগঠিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্পূর্ণ অবৈধ। সবাইকে আগের তিন এস্টেট-ব্যবস্থাতেই ফেরত যেতে হবে—এরকম নির্দেশ দিয়ে তিনি সবাইকে চলে যেতে বললেন এবং নিজেও অন্তর্হিত হলেন। তিনি ভেবেছিলেন ভয়টয় দেখালেই কাজ হয়ে যাবে। তাঁর যেটা জানা ছিল না—ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বেড়াল মারতে হতো আরও আগে।

অভিজাত আর যাজক, এই দুই এস্টেট রাজার নির্দেশ মেনে সুবোধ বালকের মতো বেরিয়ে গেল। কিন্তু নিজেদের আসনেই চুপচাপ গ্যাঁট হয়ে বসে রইল বিদ্রোহীরা। বেশ খানিকক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা। বাধ্য হয়ে রাজার প্রতিনিধি এসে তাদের বললেন চলে যেতে।

সলতে পাকানো ছিল। সামান্য আগুনের প্রয়োজন ছিল। তারও ব্যবস্থা হয়ে গেল। সকলের মধ্য থেকে বিপ্লবের অন্যতম নেতা মিরাবো উঠে দাঁড়ালেন। গলা উঁচিয়ে করলেন তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি—

“তোর মালিককে গিয়ে বল্‌—আমরা এখানে জনগণের ইচ্ছেয় সমবেত হয়েছি। বেয়োনেট মেরে বের করে দিতে পারলে দে। আমরা এখান থেকে সরছি না।”

উপস্থিতরা চনমনে হয়ে উঠলো। সকলে মিলে টেনিস কোর্টের শপথ পুনর্ব্যক্ত করল। রাজার লোকজন যাতে কাউকে বিদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার করতে না পারে, সেজন্য ডিক্রি জারির প্রস্তাব দিলেন মিরাবো। চূড়ান্ত হলো—যে বা যারা বিদ্রোহীদের গ্রেপ্তার করতে চাইবে, তাদের জাতির শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপরের কয়েকটা দিন কাটলো বেশ বিশৃঙ্খলায়। হাওয়া বদলের আভাস বুঝতে পেরে অভিজাত আর যাজকদের কেউ কেউ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এসে যোগ দিলেন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজা বুঝলেন, সামরিক আর রাজনৈতিকভাবেও তিনি ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে তিনিও এই নতুন অ্যাসেম্বলিকে মেনে নিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য মতলব আঁটছিলেন। প্যারিসকে ঘিরে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছিল রাজার আজ্ঞাবাহী জার্মান আর সুইস সৈন্যদল। প্যারিসে গুঞ্জন ছড়াল—এই সেনাদের ব্যবহার করে সদ্যগঠিত অ্যাসেম্বলিকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়াই রাজার অভিপ্রায়। তার মধ্যে রাজা তাঁর অর্থমন্ত্রী জ্যাক নেকারকে বরখাস্ত করে বসলেন এগারো জুলাইতে। নেকার সাধারণ মানুষকে রাজাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন এই ছিল তাঁর অপরাধ। রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবিহীন রাজার অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল এটি, কারণ জনবান্ধব বলে খ্যাত নেকার সাধারণ মানুষের চোখের মণি ছিলেন। ক্ষিপ্ত মানুষের ধৈর্যের সর্বশেষ বাঁধটি ভেঙ্গে পড়লো এই ঘটনায়। সৃষ্টি হলো ভয়াবহ নৈরাজ্যের। মারামারি, লুটপাট কিছুই বাদ রইলো না। মারমুখী জনতার চোখে তখন উন্মাদনা। অস্ত্রের সন্ধানে তারা গেল ওতেল দেজ আঁভালিদ-এ। জায়গাটা এখন মিউজিয়াম হিসেবেই পরিচিত, তবে সে-সময় সেটা ছিল একটা বিশাল হাসপাতাল আর যুদ্ধাহত সৈন্যদের আশ্রম। তবে জনতা সেখানে যাওয়ার কারণ হলো—অস্ত্রের একটা বড়োসড়ো মজুদ সেখানে রাখা ছিল। আঁভালিদ থেকে জনতা সংগ্রহ করল কয়েকটি কামান, সঙ্গে প্রায় ত্রিশ হাজার মাস্কেট। মাস্কেট একপ্রকার বন্দুকের নাম। তখনকার সময়ে একে পদাতিক বাহিনীর অন্যতম আধুনিক অস্ত্র বিবেচনা করা হতো। আলেক্সঁদ্র দ্যুমার লেখা ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’-এর মাস্কেটিয়ার্স কথাটা এই মাস্কেট থেকেই এসেছে। আঁভালিদের খুব কাছেই রয়্যাল আর্মির ক্যাম্প ছিল, কিন্তু সেনারা নিষ্ক্রিয় ছিল, ইচ্ছে করেই; জনতাকে বাধা দেওয়াটা তখন বুদ্ধিমানের কাজ হতো না।

অস্ত্র তো হলো। গোলাবারুদ কোথায়?

নিরাপত্তাজনিত কারণে গোলাবারুদের মজুদ থাকত বাস্তিল দুর্গের ভেতরে। বাস্তিলের ওপরে মানুষ আগে থেকেই প্রসন্ন ছিল না। মধ্যযুগের এই দুর্গটিকে ফরাসি রাজা তাঁর কুখ্যাত কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেখানে রাজবন্দিদের আটকে রেখে অত্যাচার করা হতো। উন্মত্ত জনতা বাস্তিলের দিকে ধেয়ে গেল। তবে এখানে কাজটা সহজ হলো না। জনতার সঙ্গে বাস্তিলের প্রহরীদের ভালোই রক্তারক্তি হলো। বেশকিছু লাশও পড়ল। শেষমেষ অবশ্য বাস্তিল পরাস্ত হলো। মানুষজন সেখানকার গভর্নরকে ধরে ফেলল। তবে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময়েই খুঁচিয়ে-পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো তাকে—বিচারের বালাই রাখল না। পরবর্তী একদিনের ভেতরেই লোকজন বাস্তিলকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। অত্যাচারের প্রতীক বলেই জনমানসে এত আক্রোশ জমে ছিল।

আজকের দিনে বাস্তিলের জায়গায় একটি উন্মুক্ত চত্ত্বর হয়েছে। সেখানে এখন একটি স্তম্ভ রয়েছে—জুলাই স্তম্ভ। তবে সেটা ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের জন্য নয়, ১৮৩০ সালের বিপ্লবের স্মরণে। সেটাও অবশ্য জুলাইতে হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে জুলাইতে ফরাসিদের বিপ্লবের বিশেষ প্রবণতা রয়েছে।

বাস্তিল চত্ত্বর জায়গাটা বেশ জমজমাট। বারতিনেক গিয়েছিলাম। প্রথমবার গিয়েছিলাম বাস্তিল দিবসেই, অর্থাৎ ১৪ জুলাইতে। সেখানে গেলে দেখা যায় অনেক মানুষজন গানটান গাইছে, কিছু স্ট্রিট পারফর্মার আছে, কেউ কেউ স্কেটবোর্ডিং করছে, প্রচুর রিলস-মেকারও নিজের কাজে ব্যস্ত। অলস বিকেল কাটানোর জন্য জায়গাটা চমৎকার।

বাস্তিলের বিভিন্ন চূর্ণবিচূর্ণ অংশ ফেলা হয়েছিল বিভিন্নদিকে। কিছু কিছু আজও ট্রেস করা যায়। বাস্তিল থেকে খানিকটা দূরের ‘স্কয়ার অঁরি গালি’ নামের একটি পার্কে গিয়েছিলাম আমি। সেখানে বাস্তিলের অল্পকিছু খণ্ডিতাংশ অবহেলাভরে পড়ে আছে আজও। তাও পার্কের এমন অংশে যেখানে কেউ সহজে যায় না। সামনে একটা সাইনবোর্ড আছে, না থাকার মতোই। সবমিলিয়ে পতিত বাস্তিল নিয়ে ফরাসিদের বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই বলেই মনে হলো। সেটাই স্বাভাবিক।

বাস্তিল পতনের পর ক্ষমতা মোটামুটিভাবে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির হাতেই রইল। তারা রাজতন্ত্রকে তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি উৎখাত করল না ঠিকই, তবে ‘রাজা’ পদটাকে একেবারে গৌণ করে ফেলল।

রাজা হিসেবে ষোড়শ লুই মানুষটা কেমন ছিলেন, তা এখানে একটু বলা দরকার। তিনি আসলে সেই অর্থে খুব নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক ছিলেন না। দুর্বলচিত্তের মানুষ ছিলেন, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন, লোকজন তাঁকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারত। অন্যদিকে রানি মারি অঁতোয়ানেতকে নিয়েও সে-সময় মিথ্যে গালগল্পের শেষ ছিল না। ফরাসি জনগণ যখন খাদ্যাভাবে ধুঁকছে, তখন রানি নাকি বলেছিলেন, “রুটি নেই তো কী হয়েছে, তারা কেক খাক!” বহুলপ্রচলিত এই উক্তিটি সর্বৈব মিথ্যে এবং বিদ্রোহীদের ছড়ানো রাজনৈতিক গুজব, যাতে সাধারণ মানুষ রাজপরিবারকে আরও ঘৃণা করে।

গুজব অবশ্য সত্যের চেয়েও শক্তিশালী। ফ্রান্সে তখন খাবারের তীব্র অনটন। ১৭৮৯ সালের অক্টোবরে একদল ক্ষুব্ধ ফরাসি নারী রুটির দাবিতে ভার্সাই প্রাসাদে গিয়ে হাজির হলো। জনরোষের মুখে রাজা ও রানিকে বাধ্য করা হলো তাঁদের প্রিয় জাঁকজমকপূর্ণ ভার্সাই প্রাসাদ ছাড়তে। তাঁদের ধরে আনা হলো প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্যালে দে টুইলরি-তে। সেখানে তাঁরা কার্যত গৃহবন্দি বা হাউজ অ্যারেস্ট অবস্থায় দিন কাটাতে লাগলেন। ব্যাপারটা তাঁদের জন্য ছিল চরম অপমানজনক। পরিস্থিতি বুঝে রাজা বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বন্দিদশা থেকে বেরোনোর উপায় খুঁজছিলেন।

২০ জুন ১৭৯১ তারিখে, মানে বিপ্লবের প্রায় দুই বছর পরে ঘটল সেই পালানোর ঘটনা। রাজা তাঁর স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে সাধারণ চাকরবাকরের ছদ্মবেশ নিলেন, তারপর রাতের আঁধারে প্যারিস থেকে পালানোর চেষ্টা করলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছে মঁমেদি দুর্গে পৌঁছানো, যেখানে রাজার অনুগত ফরাসি সেনাবাহিনী অবস্থান করছিল। রাজা চেয়েছিলেন প্যারিসের জনতার নাগাল থেকে দূরে গিয়ে অনুগত সামরিক বাহিনীর সুরক্ষা নিতে এবং সেখান থেকে শক্তি সঞ্চয় করে হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে। একইসঙ্গে দরকার পড়লে রানির বাপের বাড়ি অর্থাৎ অস্ট্রিয়ান রাজপরিবারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার আশাও তাঁদের ছিল। কিন্তু বিধিবাম। সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি ভারেন শহরে গিয়ে এক পোস্টমাস্টারের হাতে তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন। শোনা যায়, পয়সায় খোদাই করা রাজার ছবির সঙ্গে ছদ্মবেশী এক উটকো চাকরের চেহারায় অদ্ভুত মিল দেখে ওই পোস্টমাস্টারের সন্দেহ হয়েছিল। এরপরই আসল পরিচয় জানাজানি হয়ে যায়। এ থেকে শিক্ষণীয় হলো—সুযোগ থাকলেই সর্বত্র নিজের ছবি খোদাই করে বেড়াবেন না।

ধৃত রাজাকে প্যারিসে ফেরত পাঠানো হলো। এবার কিন্তু বিপ্লবীরা তাঁর প্রতি আর সদয় রইল না। পালানোর চেষ্টা করে তিনি বিপ্লবের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে ফেলেছেন, নিজেকে করে তুলেছেন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। ফ্রান্স এবার রাজতন্ত্র ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরি রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। রাজপরিবারকে টেম্পল টাওয়ারে বেশ কিছুদিন বন্দি করে রাখা হলো। অবশেষে ২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ তারিখে রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো। অর্থাৎ ঠিক ওই দিনটা থেকেই রাজা ষোড়শ লুই পরিণত হলেন কেবলই সাধারণ একজন ‘লুই’-তে।

তবে লুইয়ের দুর্ভাগ্য তখনও শেষ হয়নি। কিছুদিন পর সাবেক এই রাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তিনি গোপনে বিদেশি রাজাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং তাঁদের সহায়তা নিয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজখবর করে কিছু অকাট্য প্রমাণও পাওয়া গেল। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদেশি রাজারা কেন লুইকে সাহায্য করতে যাবেন? আসলে আঘাতটা এককভাবে কেবল ফরাসি রাজতন্ত্রের ওপরে ছিল না, ছিল পুরো ব্যবস্থাটার বিরুদ্ধেই। ইউরোপের অন্যান্য রাজারা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলেন, ফরাসি বিপ্লব সফল হলে তাদের দেশের মানুষও অধিকার ফিরে পেতে চাইবে, রাজতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলবে। ফলে তাঁরা আসলে লুইয়ের নয়, নিজেদের স্বার্থই দেখছিলেন।

চক্রান্ত ধরা পড়ে যাওয়ায় লুইয়ের অবশ্য আর রাজত্ব ফিরে পাওয়া হলো না। ২১ জানুয়ারি ১৭৯৩। ক্রোধোন্মত্ত জনতা ‘দেশদ্রোহের’ দায়ে অভিযুক্ত সাবেক রাজাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এল ‘বিপ্লব চত্বর’-এ, ফরাসিতে যাকে বলে ‘প্লাস দ্য লা রেভোলিউসিয়ঁ’। জায়গাটার নাম মনে রাখবেন। এই নামকরণ অবশ্য বিপ্লবের পরে হয়েছে। জায়গাটা যখন তৈরি হয়, তখন এর নাম ছিল ‘পঞ্চদশ লুই চত্বর’। এই পঞ্চদশ লুই ছিলেন সে-সময়ে ফ্রান্সের শাসক এবং সদ্য-রাজ্যহারা ষোড়শ লুইয়ের আপন দাদু।

সেই বিপ্লব চত্বরে গিলোটিনের সামনে দাঁড়িয়ে বিপর্যস্ত রাজা আত্মপক্ষ সমর্থন করে জনতার উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ড্রামের তীব্র আওয়াজ আর মানুষের তুমুল হৈচৈয়ে সেসব কথা আর শোনা গেল না। চরম ডামাডোলের ভেতরেই ছিন্ন হলো একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফরাসি রাজার মস্তক।

লুইকে হত্যার ফল হলো সুদূরপ্রসারী। বিপ্লব শুরুর পরপরই তৎকালীন প্রুশিয়া (পরবর্তীতে যা ভেঙেচুরে রাশিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড ইত্যাদির অংশে পরিণত হয়েছে) এবং অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এবার সেই বিপ্লববিরোধী জোটে যোগ দিল গ্রেট ব্রিটেন, ডাচ রিপাবলিক, স্পেন এবং পর্তুগাল। নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে কথা। কিংবা বলা যায়, সব শেয়ালের এক রা!

ফ্রান্সের পরিস্থিতি তখন বেশ ঘোলাটে। ভেতরে-বাইরে সর্বত্রই শত্রু গিজগিজ করছে। বৈপ্লবিক সরকারের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে। আর এই জটিল পরিস্থিতিই ডেকে নিয়ে এল ইতিহাসের এক ভয়াবহ সময়কে, যা ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror) নামে পরিচিত।

১৭৯৩ সালের এপ্রিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘জনসুরক্ষা কমিটি’ নামে একটি বিশেষ কমিটি বানানো হলো। এর নেতৃত্বে ছিলেন জ্যাকোবিনদের নেতা মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের। এখানে বলে রাখা ভালো, ফরাসি বিপ্লবের ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে রাজনৈতিক সংগঠনটি তৈরি হয়েছিল, তাকে জ্যাকোবিন ক্লাব নামে ডাকা হতো। এই নামের উৎপত্তি অবশ্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ কোনো ঘটনা থেকে হয়নি।

এই রবেস্পিয়ের ছিলেন একটি অদ্ভুত চরিত্র। আইন নিয়ে পড়েছিলেন। গণতন্ত্রের সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবসময়ই। মানবাধিকারের ব্যাপারেও অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বিচারকের কাজ করেছেন। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন, কারণ এরকম শাস্তিকে তিনি মানবতাবিরোধী বলে মনে করতেন। একবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে, একজন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড না দিলেই নয়। কিন্তু তাতে নিজের নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে হয়, স্রেফ এই কারণে রবেস্পিয়ের বিচারকের পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। দৃঢ়চিত্ত নীতিবান মানুষটিকে সংগত কারণেই ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাঁকে ডাকা হতো ‘The Incorruptible’ নামে, অর্থাৎ যাঁকে দিয়ে কখনো অন্যায় কিছু করানো সম্ভব নয়। বিপ্লবের পর অবশ্য সবকিছু আমূল বদলে গেল। নৈতিকতার ধ্বজাধারী রবেস্পিয়েরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জনসুরক্ষা কমিটি বিনাবিচারে ধরপাকড় করতে শুরু করল। স্রেফ সন্দেহের বশে অজস্র মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড ছিল ডালভাত। কাউকে ফাঁসাতে হলে কেবল বলতে হতো সে বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ব্যাস! বিচারব্যবস্থা বলতে কিছু নেই, কমিটির কথাই আইন। বিপ্লব চত্বরের গিলোটিনে নির্বিচারে অভিযুক্তদের মুণ্ডুচ্ছেদ হতে থাকল। মাত্র দশ-এগারো মাসে এভাবে খুন হলেন অন্তত সতেরো হাজার মানুষ। বলা বাহুল্য এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন নিরপরাধ এবং ছাপোষা মানুষ।

এইসব সময়ে মানুষকে উসকে দিতে এমন কিছু মানুষ ফ্রন্টলাইনে চলে আসেন, বিপ্লবের আগে যাদের কোনো গুরুত্বই ছিল না। এরকমই উল্লেখযোগ্য একজন জঁ-পল মারা। মারা-কে ইতিহাসবিদ কলিন জোন্স বর্ণনা করেছেন—“একজন ব্যর্থ আর সস্তাদরের বুদ্ধিজীবী, যাকে বিপ্লব নতুনভাবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দেয়।”

মারা মানুষ হিসেবে নিকৃষ্ট হলেও সুলেখক ছিলেন। উত্তেজনা জাগাতে তাঁর জুড়ি ছিল না। একের পর এক আক্রমণাত্মক আর উসকানিমূলক লেখা দিয়ে তিনি বিপ্লবের অন্যতম সারথি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন। সকল বিরোধীমত ধুয়েমুছে সাফ করে দেওয়া নিয়ে পুনঃপুন রক্ত-গরম-করা লেখা প্রসব করতে লাগলেন। তাঁর উগ্রবাদী পত্রিকার নামটাও ছিল গালভরা, ‘জনগণের বন্ধু’ (Ami du peuple)।

মারা-র উত্থান ও পতন দুটোই বেশ দ্রুত। ১৭৯৩ সালের জুলাই মাসে শার্লত নামের এক তরুণীর ছুরিকাঘাতে মারা মারা যান। যমকটা সুন্দর না?

বাথটাবে শুয়ে থাকা মৃত মারা-র ছবিটি বেশ বিখ্যাত। তিনি সে-সময় কিছু জটিল চর্মরোগে ভুগছিলেন বলে জ্বালাযন্ত্রণা কমাতে বেশিরভাগ সময় পানিতে শুয়ে থাকতেন। শার্লত কিছু ভয়ংকর শত্রুর নাম জানাবেন বলে মারাকে লোভ দেখিয়েছিলেন, আর এভাবেই বাথরুমে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন। এ-থেকে সাব্যস্ত হয়—অপরিচিত কাউকে ফট করে নিজের বাথরুমে ঢুকতে দেবেন না।

মারা মরে গিয়ে অবশ্য উল্টো বীরের সম্মান পেতে শুরু করেন। অন্তত ওই কয়টা বছরের জন্য। আর হন্তারক শার্লতকে গিলোটিনে চড়ানো হয়েছিল। শার্লত অবশ্য এরকম পরিণতির সম্ভাবনা জানতেন। জেনেবুঝেই ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন। ‘একটা দানবকে যেভাবেই হোক থামাতে হবে’—এমন মোটিভেশনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ ছিল তাঁর কাছে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪।

সন্ত্রাসের এই রাজত্ব চলাকালীনই করুণ পরিণতি বরণ করতে হয় জীবিত রানিকেও। রাজাকে হত্যার পর বিধবা মারি অঁতোয়ানেতকে আরও মাসছয়েক টেম্পল টাওয়ারে বন্দি করে রাখা হয়। আগেই বলেছি, সময়টা গোলমেলে। যার যা ইচ্ছা তাই করছে। একপর্যায়ে তাঁর দিকেও অভিযোগের তির ধেয়ে এল। তিনি নাকি নিজেও এখন বিদেশি রাজ্যে গোপন খবরবার্তা পাঠাচ্ছেন। এই তথ্যের কিছুটা সত্যতা ছিল অবশ্য। আগেই বলেছি রানি নিজে অস্ট্রিয়ান রাজপরিবারের রাজকন্যা ছিলেন। এই দুর্দিনে তিনি বাপের বাড়িতে স্রেফ ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্যের খবর পাঠাবেন আর ভাইঝির পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চাইবেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক তথ্যেরও আদান-প্রদান হয়েছে। তবে সেসব অত গুরুতর কিছু ছিল না। সমস্যা হলো, অত্যুৎসাহী বিপ্লবীর তো আর অভাব নেই। তারা রানিকেও দেশদ্রোহের দায়ে সরিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠল। আগস্ট মাসে তাঁকে টেম্পল টাওয়ার থেকে জোর করে স্থানান্তর করা হলো কঁসিয়ের্জেরিতে (Conciergerie)। সেখানে কিছুদিন নির্যাতন চালিয়ে অবশেষে ১৬ অক্টোবর ১৭৯৩ তারিখে গিলোটিনে হত্যা করা হলো তাঁকে।

আরো বেশ কয়েকমাস চললো এই খুনোখুনির খেলা। সন্ত্রাসের রাজত্বের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছিল কিছুটা প্রহসনের ভেতর দিয়েই। সেদিন ছিল ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই। মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের সেদিন আবিষ্কার করলেন—তাঁর কমিটির লোকজন তাঁকেই গিলোটিনে চড়াতে নিয়ে এসেছে। হা হতোস্মি! কিন্তু কেন? আসলে লোকজন সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছিল। তারা অনুভব করছিল, ক্ষমতার মোহে রবেস্পিয়ের অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন এবং নিজেই একনায়কে পরিণত হচ্ছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! তবে রবেস্পিয়ের মারা যাওয়ার পর ফ্রান্সে কিছুটা হলেও স্থিরতা ফিরে আসে।

বিপ্লবের এই দীর্ঘ ডামাডোলে অজস্র নামজাদা ও নামহীন মানুষকে এভাবেই গিলোটিনে জীবন দিতে হয়েছে। কপালে অন্তিম সৎকারটাও জোটেনি। বেশিরভাগকেই ঠেসেঠুসে গণকবর দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সিমেট্রিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সিমেট্রির নাম মাদেলিন, যেখানে ফরাসি রাজা ও রানিকেও ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। গিলোটিনে মৃতদের সে-সময় অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই যেনতেনভাবে পুঁতে ফেলা হতো, যাতে এসবকে ঘিরে পরে সমাধিসৌধ-জাতীয় কিছু গড়ে না ওঠে। ১৭৯৪ সালে মাদেলিন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়, কারণ এর পরিবেশ ততদিনে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পচা লাশের গন্ধে আশপাশের মানুষ টিকতে পারছিল না। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে (কীভাবে, সেই আলাপে আপাতত যাচ্ছি না) জায়গাটা সংস্কার করে মৃতদের, বিশেষ করে রাজা আর রানির স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে ‘শাপেল এক্সপিয়াতোয়ার’। কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শাপেলের প্রতিটি ইটের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের স্মৃতি।

কথা হচ্ছে, এত ইতিহাস কেন টানলাম? জায়গাটার তাৎপর্য বোঝাতে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া এই বস্তু একটা পুরোনো গম্বুজওয়ালা কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে গৌরবময় ফরাসি রাজতন্ত্রের পতনের প্রতীকও বলা যায় একে। কাজেই ইতিহাসই এর প্রাণ।

আমি যেদিন শাপেল ভ্রমণে যাই, জায়গাটা একেবারেই চুপচাপ ছিল। দর্শনার্থীদের ভিড় যৎসামান্য। শাপেল মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। আর খুবই ছোটো কাঠামো, দশ মিনিটে দেখে ফেলা যায়। রাজতন্ত্র নিয়ে আমার কোনো মোহ নেই, রাজপরিবারের জন্য শোক করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে ভেতরের পরিবেশটা কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা তৈরি করে। ভেতরে সংরক্ষিত রাজা ষোড়শ লুই এবং রানি মারি অঁতোয়ানেতের মার্বেল পাথরের মূর্তিগুলো দৃষ্টিনন্দন। নির্জন ও শান্ত পরিবেশে এই মূর্তিগুলোর সামনে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত খারাপ লাগা কাজ করে। কেন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।

শাপেলের কিউরেটরের কাছ থেকে জানলাম, মাদেলিন সিমেট্রির দেহাবশেষগুলো সরিয়ে প্যারিসের বিখ্যাত ক্যাটাকম্বে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এখন সেগুলো ওখানেই আছে। ক্যাটাকম্ব মানে ভূগর্ভস্থ গণকবর, যেখানে সারে সারে মৃতদের হাড়গোড় সাজানো থাকে। অনুমান করা হয় প্যারিস ক্যাটাকম্বে প্রায় ষাট লাখ মানুষের কঙ্কাল রয়েছে। শহরের নিচে এক বিশাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে এই সুড়ঙ্গপথ। প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে ক্যাটাকম্ব আর আইফেল টাওয়ারে যাওয়া যায় না। পরিকল্পনা থাকলেও আমার শেষ পর্যন্ত ক্যাটাকম্বে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

বিপ্লব চত্বরে (প্লাস দ্য লা রেভোলিউসিয়ঁ) গিয়েছিলাম একাধিকবার। জায়গাটার নাম এখন অবশ্য প্লাস দ্য লা কঁকর্দ, বাংলায় বলা যেতে পারে সম্প্রীতি চত্বর। বেশ বুদ্ধি করে নিরপেক্ষ নাম রেখে দিয়েছে! জায়গাটা উন্মুক্ত চত্বর, যখন ইচ্ছা যাওয়া যায়। খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলাম যখন দেখি যে সেখানে ফরাসি বিপ্লব-সংক্রান্ত বিশেষ কিছুই নেই। একটা চমৎকার মিশরীয় ওবেলিস্ক আছে অবশ্য, তবে তার সঙ্গে বিপ্লবের সুদূরতম সম্পর্কও নেই। তাছাড়া অবহেলার ছাপও স্পষ্ট। এখানে-ওখানে দীর্ঘ কনটেইনার রাখা, এলোমেলো কাঠামো। কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলাম, ভুল ইতিহাস জেনে আসিনি তো!

পরে ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম যে জায়গাটিতে কনটেইনার বা অস্থায়ী কাঠামোগুলো মূলত বিভিন্ন ইভেন্টের প্রস্তুতি হিসেবে থাকে। তবে এটি সত্যি যে, ১৭৯৫ সালেই জায়গাটার নাম রেভোলিউসিয়ঁ থেকে কঁকর্দ করা হয় এবং একইসঙ্গে একে যথাসম্ভব অদর্শনীয় বা স্মৃতিচিহ্নহীন করে তোলা হয়। আসলে সন্ত্রাসের রাজত্বের স্মৃতি তখনও দগদগে হয়ে ছিল। এতগুলো মানুষের মৃত্যু সোজা ব্যাপার নয়। নামকরণ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে সদ্য সামাল দেওয়া বিপ্লবের পাগলা ঘোড়াটাকে আবার খেপানোর ইচ্ছে কারোরই ছিল না। অনেক পরে রাজা ষোড়শ লুইকে হত্যার জায়গাটা চিহ্নিত করে একটা ছোট্ট তাম্রফলক লাগানো হয়েছিল। খুব আহামরি কিছু নয় সেটা। ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানটি মোটের ওপরে ঠিক ততটা গুরুত্ব পায় না বলেই মনে হয়েছে। এটাও বোধহয় ইচ্ছাকৃতই। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

প্যারিসের আরও দুটি ঐতিহাসিক স্থান আমি পরপর দেখেছি; কঁসিয়ের্জেরি এবং সাঁত শাপেল। প্রথমে গিয়েছিলাম কঁসিয়ের্জেরিতে (Conciergerie)। ফরাসি বিপ্লবের সময় এটি ছিল কুখ্যাত কারাগার, যেখানে বিচারের অপেক্ষায় থাকা বন্দিদের রাখা হতো। এর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দি মারি অঁতোয়ানেতকেও এখানেই রাখা হয়েছিল। সে-কথা আগেই বলেছি। জায়গাটা ঘোরার জন্য ট্যাবলেটনির্ভর ‘হিস্টোপ্যাড’ বা অডিওগাইডের চমৎকার একটা ব্যবস্থা আছে। এটা দিয়ে পুরোনো দিনের পরিবেশটাকে চোখের সামনে প্রায় জীবন্ত করে তোলা যায়। তাছাড়া ভেতরকার অন্ধকারাচ্ছন্ন আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশও কারাগারের আদিম আর খাঁটি একটা অনুভূতি দেয়। রানিকে আটকে রাখা সেলটা দেখে আধুনিক মনে হলেও ওই সময়ের পরিস্থিতি চিন্তা করে আমার রীতিমতো দমবন্ধ লাগছিল। সবচেয়ে অমানবিক ব্যাপারটি ছিল, রানিকে প্রহরীদের সামনেই পোশাক বদলাতে বাধ্য করা হতো। সত্যি বলতে এরকম নিষ্ঠুরতা কারোরই প্রাপ্য নয়। ব্যাপারগুলো হজম করা যায় না সহজে।

এরপর গেলাম সাঁত শাপেলে (Sainte-Chapelle)। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাজা নবম লুই এটি নির্মাণ করেছিলেন যিশুখ্রিস্টের কাঁটার মুকুটসহ অন্যান্য পবিত্র নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য। কঁসিয়ের্জেরির বিষণ্ণ অন্ধকারের ঠিক বিপরীত চিত্র এখানে। ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো যেন একরাশ আলোর রাজ্যে এসেছি। জায়গাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর জগৎবিখ্যাত রঙিন কাচ। জানালাগুলো দিয়ে যখন দুপুরের রোদ ঠিকরে ভেতরে আসছিল, চারপাশটা এক অপার্থিব সৌন্দর্যে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। পর্যটকদের অনেক ভিড় থাকায় খুব বেশি সময় ভেতরে থাকা সম্ভব হয়নি।

ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে খোলা বাতাসে এসে দাঁড়ালাম। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি স্থাপনার দিকে চোখ গেল আবারও। একদিকে সাঁত শাপেলের চোখ-ধাঁধানো আলো, অন্যদিকে কয়েক পা দূরেই কঁসিয়ের্জেরির দমবন্ধ করা অন্ধকার। এই আলো-আঁধারির খেলা কেবল ইট-পাথরের দেয়ালে আটকে নেই, মানুষের ভেতরেও আছে। পরিস্থিতি আর ক্ষমতার মোহেই আমাদের এই রূপান্তর ঘটে, কারণ আমরা কেউ দেবতা বা শয়তান হয়ে জন্মাই না। মানুষের ভেতরের এই দ্বৈতরূপ গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্যই বোধহয় আমাদের বারবার ইতিহাসের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়।

সেনাপতি থেকে সম্রাট

ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে ফ্রান্সে প্রথম রিপাবলিকের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এরপর ফ্রান্সের অবস্থা হয়ে দাঁড়াল হালভাঙা নৌকোর মতো। গিলোটিনের রক্তপিপাসা থেমেছে, কিন্তু দেশে শান্তি নেই। ‘ডিরেক্টরি’ নামে কমিটিভিত্তিক যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে তারা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষ হতাশ। এত রক্তক্ষয় করে রাজতন্ত্র উৎপাটিত হলো বটে, কিন্তু কিছুই যে বদলাল না! ঠিক তখনই রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলেন কর্সিকা দ্বীপের একজন তরুণ আর্টিলারি অফিসার। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

শুরুতে অবশ্য নেপোলিয়নকে কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। ফরাসি অভিজাতদের মতো বংশমর্যাদা তাঁর ছিল না। কিন্তু জাতে ওঠার সুযোগ এল। ১৭৯৩ সালে ফরাসিদের তুলোঁ বন্দর ব্রিটিশদের দখলে চলে গিয়েছিল। তরুণ নেপোলিয়ন তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশদের হটিয়ে দিলেন। রাতারাতি তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। এরপর তাঁকে পাঠানো হলো ইতালিতে। সেখানে ফরাসি বাহিনীর অবস্থা তখন শোচনীয়। সৈন্যদের পায়ে জুতো নেই, আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে। নেপোলিয়ন আক্ষরিক অর্থেই গেলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। অসাধারণ রণকৌশল আর অনুপ্রেরণার জোরে সেই শতচ্ছিন্ন বাহিনীই একের পর এক যুদ্ধে জিততে শুরু করল। নেপোলিয়ন বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি আর দশজন সেনাপতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে এলেন। মানুষ তখন ডিরেক্টরি সরকারের ওপর তিতিবিরক্ত। এই সুযোগটাই নিলেন তিনি। প্রায় রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ‘ফার্স্ট কনসাল’ ঘোষণা করলেন। মানুষ তাঁকে সানন্দেই মেনে নিল, কারণ তারা মনেপ্রাণে চাইছিল নির্ভরযোগ্য কেউ দেশের শাসনভার তুলে নিক। নেপোলিয়ন তাঁর কাজ দিয়ে ইতোমধ্যেই সেই নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছিলেন।

ক্ষমতায় এসে নেপোলিয়ন কাজেকর্মে বুঝিয়ে দিলেন, যুদ্ধে জেতা আর দেশ চালানো যে এক ব্যাপার নয়, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। দেশজুড়ে রাস্তাঘাট, স্কুল, ব্যাংক তৈরি করলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা করলেন তা হলো নতুন আইনব্যবস্থা চালু করা। যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার সমান অধিকারও নিশ্চিত করলেন তিনি। এই একটি কাজ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে রীতিমতো দেবতার আসনে বসিয়ে দিলো।

১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন নিজে নিজেই সম্রাটের মুকুট পরে নিলেন। ফরাসিরা এটাকেও সানন্দে মেনে নিল। ভেবে দেখুন, সেই ফরাসিরাই, যারা মাত্র কয়েক বছর আগেও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়েছে!

সম্রাট হওয়ার পরের বছরই ঘটল নেপোলিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। অস্টারলিৎজের যুদ্ধে তিনি রাশিয়া আর অস্ট্রিয়ার সম্মিলিত সুবৃহৎ বাহিনীকে এমন এক কৌশলগত ফাঁদে ফেলে হারালেন, যা আজও বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক একাডেমিতে পড়ানো হয়।

তবে নেপোলিয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত সামরিক কৌশল নয়। তিনি জানতেন কীভাবে মানুষের মন জয় করতে হয়। শোনা যায় তিনি নাকি একজন সাধারণ পদাতিক সৈন্যের নামও মনে রাখতেন, অবসরে সৈন্যদের সঙ্গে ক্যাম্পফায়ারে বসে গল্প করতেন। তাঁর জন্য সৈন্যরা যে হাসিমুখে প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল, তা তো কেবল এমনি এমনি নয়।

একজন সাধারণ অফিসার থেকে ফ্রান্সের একক নায়ক হয়ে ওঠার এই অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে অসামান্য। তবে এই উত্থান সবার ভালো লাগেনি, বিশেষত ইউরোপের অন্যান্য রাজপরিবারের কাছে নেপোলিয়ন ছিলেন সাক্ষাৎ খলনায়ক। একে তো তিনি ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, তার ওপর তিনি সচেতনভাবে ইউরোপজুড়ে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। ফলে এই পর্যায়ে অনেক দেশই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সদলবলে দাঁড়িয়ে যায়। এর ভেতরে অন্যতম রাশিয়া, প্রুশিয়া, ব্রিটেন এবং অস্ট্রিয়া। ১৮১৪ সালের যুদ্ধে সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে নেপোলিয়ন আর পেরে উঠলেন না। জয়ীরা মিলে তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠাল। কিন্তু ওই ছোট্ট দ্বীপে তাঁকে বেশিদিন আটকে রাখা যায়নি। মাসদশেক পরেই প্রহরীদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে এসে তিনি আবারও ক্ষমতা দখল করেন। তবে তা অল্পদিনের জন্যই। ইতিহাসে তাঁর এই দ্বিতীয় দফার শাসনকাল ‘একশো দিন’ নামে পরিচিত।

অবশেষে ১৮১৫ সালে বিখ্যাত ওয়াটারলু যুদ্ধে ব্রিটিশ এবং প্রুশিয়ান বাহিনীর কাছে তিনি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। এবার আর ব্রিটিশরা কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। মেরে ফেললেও হতো, তবে তাতে নেপোলিয়নকে শহিদের মর্যাদা দেওয়া হতো এবং ফরাসিদের খেপিয়ে তোলারও একটা প্রবল সম্ভাবনা ছিল। এজন্য এবারও নির্বাসনের সিদ্ধান্তই এল। কিন্তু এমন কোথাও পাঠাতে হবে, যেখান থেকে পালানোর কোনো উপায় আর থাকবে না।

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত দুর্গম আর পাথুরে ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট হেলেনা। মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের দ্বীপটির চারদিকে স্রেফ অথৈ সমুদ্র। সেইসঙ্গে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কড়া পাহারা। সেখান থেকে পালিয়ে আসা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব ছিল। সম্ভবও হয়নি। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতিকে জীবনের শেষ ছয়টি বছর সেখানেই ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে। ধুঁকে ধুঁকে বলছি, কারণ পরবর্তীতে পোস্টমর্টেমে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বেরিয়েছিল পাকস্থলীর ক্যানসার।

নেপোলিয়ন খুব করে চেয়েছিলেন যাতে তাঁকে ফ্রান্সে সমাহিত করা হয়। অনুমেয় কারণেই ব্রিটিশরা তখন সম্মত হয়নি। সেন্ট হেলেনাতেই একটা অজ্ঞাতনামা জায়গায় তাঁকে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর উনিশ বছর পর ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি সরকার নেপোলিয়নের দেহাবশেষ ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনে। রীতিমতো রাজকীয় সম্মানে ফ্রান্স তার শ্রেষ্ঠ বীরকে সমাহিত করে ওতেল দেজ আঁভালিদে। নামটা পরিচিত লাগছে? হ্যাঁ, এখান থেকেই বিপ্লবের সময়ে ফরাসি জনতা অস্ত্র লুট করেছিল। ঠিক এখানেই একটি বিশাল গম্বুজের নিচে আজ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নেপোলিয়ন।

ওতেল দেজ আঁভালিদ জায়গাটা বেশ বড়সড় একটি কমপ্লেক্স। নেপোলিয়নের সমাধি এখানকার একটা ছোট্ট অংশে। অন্যদিকে একটা বিশাল অংশজুড়ে আছে মিউজে দ্য লার্মে বা সামরিক জাদুঘর। এখানকার সংগ্রহ আক্ষরিক অর্থেই বিশাল, প্রায় পাঁচ লক্ষেরও বেশি! মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সামরিক পোশাক, নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের টাইমলাইন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেডিও রিলে পর্যন্ত সব নিখুঁতভাবে সাজানো।

বিশাল এই সংগ্রহশালায় হাঁটতে হাঁটতে একসময় পায়ে রীতিমতো ব্যথা ধরে গিয়েছিল। যুদ্ধ জিনিসটা আদতেই কোনো আনন্দদায়ক ব্যাপার নয়, ব্যক্তিগতভাবে আমি তা পছন্দও করি না। কিন্তু ওতেল দেজ আঁভালিদ দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য নিয়ে। যে জায়গাটি তৈরি হয়েছিল যুদ্ধাহত অসহায় সেনাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য, সেখানেই ঘুমিয়ে আছেন এমন এক সম্রাট, যাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ সেনা হাসিমুখে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আবার তাঁকে ঘিরে সাজানো আছে হাজার বছরের ধ্বংস আর মৃত্যুর সব আধুনিক সরঞ্জাম। যুদ্ধ বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার।

রাজাগজার ব্যাপারস্যাপার

গল্পের খেই ধরে রাখতে আমি একলাফে ফরাসি রাজতন্ত্র পতনের ইতিহাসে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু পতনের আগে সেইসব রাজপরিবার কেমন জীবনযাপন করে গেছে, সে সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করা যেতে পারে। বিশেষ করে যখন আমার ভ্রমণতালিকায় ভার্সাইয়ের সেই প্রখ্যাত প্রাসাদ রয়েছে।

ভার্সাই প্রাসাদের অবস্থান মূল প্যারিস থেকে খানিকটা দূরে। এর খুব কাছেই অবস্থিত ত্রিয়ানঁ এস্টেট। জায়গাগুলো আক্ষরিক অর্থেই অস্বাভাবিক বড়। পুরোটা ভালোভাবে দেখতে অন্তত একদিন সময় ব্যয় করা উচিত। দুই জায়গাতেই প্যারিস মিউজিয়াম পাস গ্রহণ করে। এ কারণে পাস দিয়ে ঘোরার চারদিনের ভেতরে একটি সম্পূর্ণ দিন কেবল এদিকটায় আসার জন্যই রেখেছিলাম।

ভার্সাই প্রাসাদের জাঁকজমক এককথায় বর্ণনাতীত। বিশেষ করে এর সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা ‘হল অব মিররস’, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এক অর্থে সেই ভার্সাই চুক্তিই জার্মানিকে উসকেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে। জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর হলেও প্রাসাদের ভেতরে মানুষের এতটাই চাপ ছিল যে কোথাও একদণ্ড শান্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার জো ছিল না। কোনোরকমে কক্ষগুলো দেখে আমি বেরিয়ে ত্রিয়ানঁ এস্টেটের দিকে হাঁটা দিলাম। এখানে রাজা আর রানির জন্য আলাদা ছোটো ছোটো প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা মূল প্রাসাদের রাজকীয় কড়াকড়ি থেকে কিছুটা দূরে নিরিবিলিতে সময় কাটাতে পারেন। দূরে মানে অবশ্য অতটা দূরেও নয়, হেঁটে বড়জোর দেড় থেকে দুই কিলোমিটার।

ত্রিয়ানঁর মূল গেট দিয়ে ঢুকে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আদিগন্ত ফাঁকা মাঠ, সেখানে মুক্তভাবে বেশকিছু মহীনের ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। সদর থেকে প্রাসাদের দূরত্ব অনেকখানি। সত্যিই এরকম পরিবেশ আশা করিনি—যাকে বলে একেবারে ধারণার চেয়েও সুন্দর! ভার্সাইয়ের মূল প্রাসাদের চেয়ে এই জায়গাটাই আমার মনে ধরল বেশি। এখানে প্রাসাদ রয়েছে অল্প অংশজুড়ে, আর বেশিরভাগই ফাঁকা জায়গা। নিখুঁতভাবে ছাঁটা হেজ আর সবুজে ঘেরা সুবিশাল বাগান। সেখানকার একটি বেঞ্চে শুয়ে অনন্ত আকাশ আর চারপাশের সবুজ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি।

বিশেষভাবে মনে দাগ কাটল সেখানকার ‘কুইন্স হ্যামলেট’ নামের অংশটা, যেখানে রানি মারি অঁতোয়ানেতের জন্য একটা আস্ত কৃত্রিম গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছিল। ছাগল, হাঁস, ঘোড়ার খামার আর চেরি, আপেল ও আঙুর বাগানগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে মনে হলো, ফরাসিরা সংরক্ষণের মাধ্যমে সেই পুরোনো সময়টাকেই যেন নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছে।

মুগ্ধতার এই রেশের মাঝেও খানিকটা বিশ্রী এবং তেতো চিন্তাভাবনা আমাকে বারবার খোঁচা দিচ্ছিল। এই এক সমস্যা—কোনোকিছু সহজভাবে দেখতে পারি না। কিন্তু চোখের সামনেই যে এই রাজকীয় প্রশান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর অমানবিক ইতিহাস! হাজার হোক রাজপরিবারের এই অবিশ্বাস্য ভোগবিলাস তো সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষকে নির্বিচার শোষণ করেই সম্ভব হয়েছিল। রানির জন্য সাজানো কৃত্রিম গ্রামের সৌন্দর্য গড়ে তুলতে প্রাসাদের বাইরে সত্যিকারের গ্রামবাসী কৃষকদের যে নিজেদের রক্তজল করতে হয়েছে, সেই রূঢ় বাস্তবতা অস্বীকার করিই বা কী করে!

বারান্দা থেকে ছাদে: অন্য এক প্যারিস

প্লাস দ্য লা কঁকর্দ সংলগ্ন ‘ওতেল দ্য লা মারিন’ অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। বিশাল এই ভবনটি শুরুতে রাজকীয় আসবাবপত্র আর মুকুট সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে দীর্ঘকাল এটি ফরাসি নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর। এখানকার সবগুলো কক্ষেই দৃষ্টিনন্দন রাজকীয় আসবাব আর সাজসজ্জার ছড়াছড়ি। তবে এখানকার সবচেয়ে মুগ্ধকর দিক হলো থ্রিডি অডিওগাইড সিস্টেম। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার সাথে সাথে হেডফোনের অডিও নিজে থেকেই বদলে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন অদৃশ্য কেউ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে সেই সময়কার রাজকীয় গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা!

ভবনটির বারান্দা থেকে প্লাস দ্য লা কঁকর্দ চত্বরের রূপও দারুণ। ওপর থেকে পুরো চত্বরটা দেখতে দেখতে হঠাতই মনের পর্দায় ফরাসি বিপ্লবের সেই ভয়াবহ দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল। মনে হলো এই বুঝি গিলোটিনের ব্লেড উপরে উঠল, আর নিচে উল্লাসরত হাজার হাজার মানুষের সামনে কারও মাথা কাটা পড়ছে, যাদের চোখে কেবলই রক্তের নেশা। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে কেন জানি।

গিলোটিন আর ফরাসি বিপ্লবের এই রক্তাক্ত ইতিহাসের সঙ্গে বাংলারও একটি অদ্ভুত যোগসূত্র আছে। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে এই তথ্যটি আমাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। ফরাসি রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের সর্বশেষ ‘অফিশিয়াল’ রক্ষিতা ছিলেন মাদাম দ্যু বারি। রাজপরিবারের অন্যান্য অভিজাতদের মতো তিনি কিন্তু সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্ম নেননি। এক দরিদ্র দর্জির অবৈধ সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া এই নারী সমাজের একদম নিচুতলা থেকে উঠে এসেছিলেন। কেবল নিজের রূপ আর বুদ্ধির জোরে রাজদরবারের সর্বোচ্চ মহলে রাজার পাশে তাঁর জায়গা করে নেওয়াটা তৎকালীন ফরাসি সমাজে তীব্র আলোড়ন আর বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

তখনকার রেওয়াজ মেনে মাদাম দ্যু বারিকে একটি দাস উপহার দেওয়া হয়েছিল। নিতান্তই বালক-বয়সী এই দাসকে ব্রিটিশ দাস-ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম থেকে অপহরণ করে এনেছিল। ফরাসিরা ছেলেটির নাম দিয়েছিল লুই-বেনোয়া জামর।

জামরকে মাদাম দ্যু বারি কিন্তু বেশ আদরযত্নেই রেখেছিলেন। তার পড়াশোনা আর শিক্ষার সুযোগও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত এই শিক্ষাই একদিন মাদামের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে! জঁ-জাক রুসোর মতো দার্শনিকদের লেখা পড়ে জামরের চিন্তাভাবনায় প্রচুর পরিবর্তন আসে। 

পঞ্চদশ লুই মারা গেলে রাজা হলেন ষোড়শ লুই। ছেলের বদলে সরাসরি নাতি রাজা হলেন কেন? আসলে মাঝখানেরজন যক্ষায় মারা গেছেন আগেই। ষোড়শ লুই রাজা হলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন মারি অঁতোয়ানেত। এবং তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রৌঢ়া মাদাম দ্যু বারিকে ভার্সাই প্রাসাদ থেকে বিতাড়ন করলেন। রাজপরিবার থেকে উঠে আসা অভিজাত রানি মারি অঁতোয়ানেত মোটেই পছন্দ করতেন না একজন বংশমর্যাদাহীন রক্ষিতাকে। মাদাম দ্যু বারির জন্য ব্যাপারটা দাঁড়াল—চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।

জামরের কথায় ফিরি। ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে জামর যোগ দেন চরমপন্থী জ্যাকোবিনদের দলে। বিপ্লবীদের হাতে অভিজাতদের মৃত্যুর ঘনঘটা দেখে আতঙ্কিত মাদাম দ্যু বারি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান এই জামর। ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, মাদাম দ্যু বারি জামরের সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও এই দাসপ্রথা ব্যাপারটিই তার কাছে চরম অপমানজনক ছিল। শেষমেশ তিনি তাঁর পালক-কর্ত্রীর বিরুদ্ধেই বিপ্লবীদের কাছে সাক্ষ্য দেন। জামরের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই ১৭৯৩ সালে প্লাস দ্য লা কঁকর্দ চত্বরে মাদাম দ্যু বারিকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হয়। গিলোটিনে যাঁদের হত্যা করা হতো, তাঁদের বেশিরভাগই নিজেদের ভাগ্যকে নির্বিকারভাবে মেনে নিতেন। তাঁরা জানতেন যে চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই। কিন্তু মাদাম দ্যু বারি মৃত্যুভয়ে প্রচুর কেঁদেছিলেন, চিৎকার করেছিলেন এবং জল্লাদের কাছে অনুনয়ের স্বরে আর একমুহূর্ত প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন।

মাদাম দ্যু বারি কি সত্যিই নির্দোষ ছিলেন? সেই অর্থে তিনি হয়তো বিপ্লববিরোধী বড় কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন না। রাজপরিবার তো তাঁকে প্রাসাদ থেকে আগেই বের করে দিয়েছিল। দোষের মধ্যে বিপ্লব চলাকালীন তিনি বেশ কয়েকবার লন্ডন সফর করেছিলেন, আর বিপ্লববিরোধী কিছু নির্বাসিত ফরাসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ওই উত্তাল সময়ে এটুকুই অবশ্য তাঁকে বধ্যভূমি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তারপরও তাঁকে হত্যা না করলেও চলত, কিন্তু সময়টা কেমন ছিল তা তো আগেই বলেছি। হত্যা যখন বিনোদনের উৎস হয়ে ওঠে, তখন ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করা নিরর্থক।

মাদাম দ্যু বারির মৃত্যুর পর জামর ফ্রান্সে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই বাকি জীবন কাটিয়েছিলেন। যদিও তাঁর শেষ জীবন খুব একটা সুখের ছিল না।

এবারে প্যারিস ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ বিখ্যাত আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফের কথা বলি। ১৮০৬ সালে অস্টারলিৎজের যুদ্ধে বিজয়ের পর নেপোলিয়ন এই মনুমেন্ট নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পঞ্চাশ মিটার উঁচু আর্কের নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ত্রিশ বছর।

ত্রিয়োম্ফের ছাদে ওঠার অভিজ্ঞতাটা মনে রাখার মতো। সেখানে গিয়ে জানলাম যে লিফট একদম ওপর পর্যন্ত যায় না, বাকিটা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। বেশ উঁচুতে উঠতে হয় বলে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠেন, কেউ কেউ হালও ছেড়ে দেন। আমার চোখের সামনেই একজন উঠতে উঠতে ক্লান্ত হয়ে ধপ করে বসে পড়লেন। তবে কষ্ট করে একবার ছাদে পৌঁছতে পারলে সব ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে যেতে বাধ্য। আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফের ছাদে দাঁড়িয়ে পুরো প্যারিস শহরটাকে ৩৬০ ডিগ্রিতে দেখা যায়।

আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফের এই ছাদ থেকেই প্যারিসের প্রশস্ত রাস্তাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবল বাতাসের ঝাপটা সামলে যখন চারপাশটা দেখছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো প্যারিস শহরটাই যেন আস্ত একটা জ্যান্ত মিউজিয়াম। এই অপরূপ দৃশ্য আর অভিজ্ঞতাকে ক্যামেরায় পুরোপুরি বন্দি করা অসম্ভব। তবে নিজের চোখ আর স্মৃতিই তো সবচেয়ে বড় ক্যামেরা। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে দূরের আইফেল টাওয়ার আর ঐতিহাসিক ভবনগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে মনে হলো, ইতিহাস ছাড়া প্যারিস কেবলই ইট-পাথরের একটি সুন্দর শহর। কিন্তু ইতিহাসের আয়নায় দেখলে এই প্যারিসই মানবসভ্যতার উত্থান, পতন, নিষ্ঠুরতা আর সৌন্দর্যের জীবন্ত মহাকাব্য।

Leave A Comment

Share this with others