
প্যারিসের জাদুঘরনামা (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৫)
একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি জাদুঘর কোথায় আছে বলুন তো? আন্দাজ করা একটু শক্ত। দেশটা যুক্তরাষ্ট্র—আর সেখানে জাদুঘরের সংখ্যা ত্রিশ হাজারেরও বেশি! শুরুতে আমারও তথ্যটা জেনে অবাক লেগেছে, সংখ্যাটাকেও অবাস্তব মনে হয়েছে। এ-কথা ঠিক যে আমেরিকা এখন বিনোদন জগতের সর্বেসর্বা। কিন্তু সেই যে জার্মান ব্যান্ড রামশ্টাইন গেয়েছে—‘উই আর অল লিভিং ইন আমেরিকা’—মানে আগ্রাসী আমেরিকান সংস্কৃতি পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে, এসব ঘটেছে বেশিদিন হয়নি। তার আগে? সাংস্কৃতিক ইতিহাস আমেরিকানদের সপক্ষে নয়। আদিবাসীদের অংশটুকু যদি বাদ দিই, তাহলে বিশেষ কিছুই থাকে না। হলিউড যেভাবে তথাকথিত ওয়াইল্ড ওয়েস্টকে দেখায়, তাতে আদিবাসীদের ব্যাপারে ইতিবাচক কিছু কমই দেখা যায়। আর জাতিগত নিধনের কথা তো ইদানিং এসে বলছে, আগে তা-ও স্বীকার করত না। ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসী সংস্কৃতিকে ধারণ করার বদলে শ্বেতাঙ্গ সেটলাররা সেসব মুছে ফেলতেই তৎপর ছিল বেশি। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রকস্টার গেমসের ‘রেড ডেড রিডেম্পশন টু’। যাঁরা খেলেছেন তাঁরা জানেন, ঐতিহাসিক অন্যায় স্বীকারের চমৎকার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে গেমটি। যদিও তাতে আর কিছু যায়-আসে না।
আধুনিক আমেরিকা গড়ে উঠেছিল ইউরোপের অপভ্রংশ হিসেবে। ফ্রঁৎস ফানো তাঁর ‘লে দামনে দ্য লা তের’ বইয়ের শেষদিকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, “দুশো বছর আগে ইউরোপের একটি কলোনি ইউরোপের মতো হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা অবশ্য দিনশেষে ইউরোপের দোষগুলো বেছে বেছে নিয়ে আস্ত দানবে পরিণত হয়েছে।” কথাটা বেশ রুক্ষ, তবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেদিক থেকে দেখলেও আমেরিকানদের জাতি হিসেবে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য থাকার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো, সলিড ঐতিহ্য ছাড়া আমেরিকায় এত জাদুঘর গড়ে উঠল কী করে? সংক্ষিপ্ত উত্তর: পুঁজিবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ জাদুঘর মূলত ধনীদের সংগ্রহশালা। টাকাপয়সার মালিক হওয়া একটা নতুন ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার মতো, যার উপাসনা হলো বিভিন্ন ধরনের শৌখিনতা করা। ধনীদের ভেতরে কেউ কেউ আবার দুর্লভ কিংবা দুর্মূল্য বস্তু সংগ্রহের চেষ্টা করেন—হতে পারে নিজেকে আলাদা দেখানোর ইচ্ছা থেকে, কিংবা অনন্য কিছু কুক্ষিগত রেখে গর্ববোধ করতে। এক্ষেত্রে শিল্পকর্ম ভালো চয়েজ। দামি শিল্পকর্মের মালিক হতে হলে অঢেল টাকা থাকলেই চলে; শিল্পকলা বোঝার কিংবা কদর করতে পারার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ধনীমাত্রই আর্টের ব্যাপারে ক-অক্ষর গোমাংস হবেন এমনটাও ধরে নিতে নেই। অর্থবানদের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে দ্য ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো বা ক্লদ মোনের মতো শিল্পীদেরও ক্যারিয়ার হোঁচট খেত, অনেক মহান কাজ আলোর মুখ দেখত না। সেই অর্থে আর্টের সঙ্গে পয়সার বিরোধ নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। শিল্পকর্ম যত মহানই হোক না কেন, ক্রিটিকরা তাকে যেভাবেই শ্রেষ্ঠত্ব দিক না কেন, দিনশেষে তারও একটা বিনিময়মূল্য আছে, টাকাতেই তার দর নির্ধারিত হয়। সুতরাং ওয়েলকাম টু ক্যাপিটালিজম।
দেশের কথা তো গেল। শহর হিসেবে সবচেয়ে বেশি জাদুঘরের কৃতিত্ব লন্ডনের। এর পেছনের কারণ আবার ঔপনিবেশিক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাড়বাড়ন্তের ফলেই তাদের পক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এতকিছু লুণ্ঠন… মানে… সংগ্রহ করে আনা সহজ হয়েছে। অবশ্য কলোনাইজাররা নিজেদেরকে উপনিবেশের ত্রাণকর্তা ভাবত। ফলে তাদের চোখে এগুলো ঠিক চুরি নয়, একরকম ‘রক্ষা’ করা। রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘দ্য হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’ কবিতাটা ভুলে গেলে চলবে? কে জানে প্রত্নসম্পদগুলো ‘রক্ষা’ করে তাঁরা হয়তো আমাদের উপকারই করেছেন, আমরা ধরতে পারিনি!
ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও একই দোষ দেওয়া চলে। নেপোলিয়নের আমলে তারা বিশ্বময় দেদার লুটপাট করেছে। একটা রিপোর্ট বলছে, আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের ৯০-৯৫ শতাংশই নাকি আজ আফ্রিকার বাইরে। এর অনেকগুলো জমা হয়েছে প্যারিসের ব্রঁলি জাদুঘরে। তবে এই মুদ্রার আরেকটা পিঠ আছে। শিল্পে-সাহিত্যে ফরাসিদের নিজস্ব সম্পদও কম নয়। সংস্কৃতির অলিখিত রাজধানী হিসেবে প্যারিস বরাবরই নামজাদা শিল্পীদের আকৃষ্ট করেছে, ফরাসি সংগ্রহশালাগুলোকেও সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা। যাঁরা জাদুঘর ভালোবাসেন, আজকের দিনে তাঁদের অবধারিত গন্তব্য প্যারিস।
এই পর্বে আমার দেখা প্যারিসিয়ান জাদুঘরগুলো নিয়ে লিখব।
আজি এ প্রভাতে রবির ধাম, কেমনে পশিল মিউজিয়াম
টাকা নিয়ে শুরুতে প্রচুর বিষোদ্গার করেছি। ওসব হলো রাগের কথা। লজ্জায় অধোবদন হয়ে আমিও নিত্যদিন এরই দাসবৃত্তি করি। এজন্য নিজের ভ্রমণের গল্প শুরু করছি মঁনে দ্য পারি, অর্থাৎ প্যারিসের পয়সার জাদুঘর দিয়ে। এটাকে একরকমের প্রায়শ্চিত্তও ধরে নিতে পারেন।
প্রথমে জাদুঘরটা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিই। পঞ্চম শতকে রোমানদের পতন হলে প্যারিস চলে যায় ফ্রাঙ্কদের হাতে। বলে রাখা ভালো, ফ্রাঙ্ক কোনো একক জাতিগোষ্ঠী নয়। একাধিক জার্মানিক গোত্র সুসংঘবদ্ধ হয়ে ফ্রাঙ্ক নামে পরিচিত হয়েছিল। গোত্রগুলো ইউরোপের বিভিন্ন অংশ থেকে এসেছিল, তবে বেশিরভাগের উদ্ভব রাইন নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে। এরাই মধ্যযুগে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম গড়ে তুলেছে। ফ্রাঙ্কদের নামানুসারে শাসিত রাজ্যের নাম রাখা হয় ফ্রান্সিয়া, যেখান থেকে ফ্রান্স কথাটা এসেছে। ক্ষমতার পালাবদলে নবম শতকে এসে পশ্চিম ফ্রান্সিয়ার সিংহাসনে আসীন হলেন টেকো চার্লস।
পাঠক হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, টেকো মানে কি নামটাই টেকো, নাকি…?
খোলাসা করি। যেটা ভাবছেন, সেখান থেকেই এই নামের উৎপত্তি। তবে চার্লসের মাথায় টাক ছিল, এ কথা ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু প্রমাণিত নয়। অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, মজা করার ছলেই নামটা ছড়িয়েছে।
টেকোদের নাকি অনেক টাকা হয়। সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে টেকো চার্লসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল টাকাকে ঘিরেই। প্রেক্ষাপট হলো, তাঁর শাসনের সময়টাতে ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ভাইকিংরা। আর তাদের লুটপাটের খুব পছন্দের জায়গা ছিল ফ্রান্স। যাঁরা হিস্ট্রি চ্যানেলের ‘ভাইকিংস’ সিরিজটা দেখেছেন, তাঁদের হয়তো রোলো চরিত্রটার কথা মনে আছে। সিরিজের সঙ্গে ইতিহাসের অবশ্য বিস্তর ফারাক রয়েছে। যেমন রোলো নামে পরিচিত একজন বিখ্যাত ভাইকিং নেতা ছিল বটে, এমনকি সে একাধিকবার ফ্রান্স আক্রমণও করেছে, তবে সে ভুবনবিখ্যাত রাগনার লথব্রোকের ভাই ছিল না মোটেও। তবে ভাইকিংদের পুনঃপুন আক্রমণে ফ্রান্স সত্যিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আর্থিক দিক থেকে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। কিন্তু তাতেও অনেক খরচা। আমি যখনকার কথা বলছি, কাগুজে নোট তখনও সেভাবে প্রচলিত হয়নি। ফ্রান্সে প্রচলিত ছিল রুপোর কয়েন। সেই পয়সা যে যার মতো করে বানাত, কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল না। চার্লস ব্যাপারটায় লাগাম টানতে চাইলেন। পয়সা বানাবে কেবল সম্রাটের কারখানা, আর সেই পয়সাকে হতে হবে মানসম্পন্ন। অর্থাৎ কোয়ালিটি কন্ট্রোলের চেষ্টা, একইসঙ্গে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণেরও অভিপ্রায়। ঠিক এই উদ্দেশ্যেই ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে সেন নদীর তীরে স্থাপিত হলো ‘প্যারিস টাঁকশাল’। এরপর প্রায় এক হাজার বছর ধরে এখানে কয়েন তৈরি হয়েছে। কাগুজে টাকার কারবার এখানে নেই। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, কারিগরি সেটআপ বদলেছে। ফরাসি বিপ্লবের পর জায়গাটাকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। তবে মূল কাজটা একই রয়ে গেছে আজও। ফরাসি সরকারের পক্ষে ইউরোর কয়েন বানায় এরাই। কারখানাটা সরানো হয়েছে কেবল, কারণ এখানে জায়গা কম। তবে এখানকার ওয়ার্কশপ কিন্তু বন্ধ হয়নি, সচল আছে। সেখানে এখন কালেক্টরস কয়েন বা আইটেম বানানো হয়।
মিউজিয়ামটাকে কেবল টাকাকড়ির প্রদর্শনী ভাবলে একটু ভুল হবে। রীতিমতো ইতিহাসের পাঠশালা। টাকার উৎপত্তি, ইতিহাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগের রংবেরঙের পয়সাকড়ি। সোনা, রুপো, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, দস্তা, পিতল, নিকেল, জিঙ্ক, লোহা—সবকিছুরই আলাদা আলাদা আর্টিফ্যাক্ট আছে, ইতিহাস আছে। শুরুতে মন দিয়ে পড়ছিলাম, তবে একসময়ে হাল ছেড়ে দিলাম। এত অল্প সময়ের ভেতরে সবকিছু দেখে কিংবা বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। শেষদিকে অবশ্য একটা মজা হলো। দেখলাম, দর্শনার্থীরা কয়েন তৈরির একটা হস্তচালিত যন্ত্রের সামনে ভিড় জমিয়েছে। কী করছে? পয়সা বানাচ্ছে! তখন মনে পড়ল, আরে, ঢোকার সময় আমাকেও তো একটা পয়সা দিয়েছিল। সেটা অবশ্য একেবারে নিরেট, গায়ে কিছু খোদাই করা ছিল না। কেন দিয়েছে, তখন মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি। ফরাসিতে বলেছে কি না! সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পাওয়া গেল। পয়সাটাকে এই যন্ত্রের ছাঁচে ফেলতে হবে, তারপর যন্ত্রে চাপ দিয়ে তাতে নকশা বসাতে হবে নিজেকেই। বাহ, বেশ ভালো তো! তবে লোকের ভিড় লেগে আছে যন্ত্রটার আশপাশে। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর সুযোগ মিলল। তারপর আর কী, নিজেই নিজের পয়সা তৈরি করে ফেললাম। এভাবে সত্যি সত্যি পয়সা বানাতে পারলে কাজটাজ ছেড়ে দিতাম!
ওদের জাদুঘরের এই দিকটা খুব মজার। কিছু কিছু ইন্টারঅ্যাকটিভ অংশ রাখার চেষ্টা করে। তাতে কী হয়, বড়রা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি শিশুরাও পায়। যেমন ওই জাদুঘরেরই আরেকটা জায়গায় একটা যন্ত্রের পাশে রাখা ছিল কিছু প্রমাণ আকৃতির প্রতীকী পয়সা, হাতের তালুর মতো বড় সেগুলো। ওগুলো একে একে তুলে যন্ত্রটার নির্দিষ্ট খোপে ফেলে দিলে টাচস্ক্রিনে সেই পয়সার উৎপত্তি, সময়কাল, উপাদান ইত্যাদির ইতিহাস দেখা যায়। শিশুরা দেখলাম মজা নিয়ে দেখছে, শিখছে। শিখনকে সহজলভ্য ও সহজবোধ্য করে তোলার কী চমৎকার ব্যবস্থা!
একদিনে অনেক বেশি টাকাপয়সা দেখে ফেলে খানিকটা অনুশোচনা হচ্ছিল। ফলে প্রায়শ্চিত্তের অভিপ্রায়ে সেদিনই রওনা দিলাম বার্সি পার্কের দিকে। গন্তব্যস্থল পার্কের পাশে অবস্থিত মেলিয়েস জাদুঘর। প্রখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা জর্জ মেলিয়েসের নামে করা চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত জাদুঘর এটি। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস আর বিকাশ নিয়ে জানার জন্য চমৎকার জায়গা—এমনটা জেনেই গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে একটা বড়সড় ধোঁকা খেলাম। কারণটা বলি। এই জাদুঘরে স্লট বুক করতে হয় না, এমনটাই দেখেছিলাম ওদের ওয়েবসাইটে। কিন্তু সেখানে অন্য একটা দরকারি কথা আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। প্রতিবছরের আগস্ট মাসে নাকি এই জাদুঘর পুরোপুরি বন্ধ থাকে। হা হতোস্মি! এজন্যই তো বলি, পুরো ভবনটাকে এতবার প্রদক্ষিণ করেও একটা খোলা দরজা খুঁজে পাচ্ছি না কেন! ওরে বোকারাম, খোলা থাকলে তবে না খোলা পাবি তুই!
ফসকে যাওয়ার গল্প থাকুক। এবার বলি উপভোগ্য একটা জাদুঘর নিয়ে—‘ম্যুজে দে-জার এ মেত্যে’। বাংলায় বলা যেতে পারে চারু ও কারুশিল্প জাদুঘর। নামটা একটু বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এখানে আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট বলতে মূলত প্রযুক্তি আর প্রকৌশলকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগ্রহকে বুঝিয়েছে। ১৭৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাদুঘরটি। প্রায় আশি হাজার দর্শনীয় জিনিস আছে এখানে। বলাই বাহুল্য সবগুলো খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব নয়, সেই উচ্চাভিলাষও আমার ছিল না। তাছাড়া বিজ্ঞানের ছাত্র না হওয়াতে সবকিছু পরিপূর্ণভাবে বুঝিওনি, সেটা অবশ্য আমার সীমাবদ্ধতা। সংক্ষেপে যদি বলি—মানুষ প্রযুক্তিগত দিক থেকে কীভাবে আজকের অবস্থানে এল, তার ইতিহাস পরিক্রমণের সুযোগ করে দেয় এই জাদুঘর।
এখানকার বিশেষ কয়েকটা আকর্ষণের কথা বলি। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, একইসঙ্গে নিজের অক্ষেও ঘুরপাক খায়—এই তথ্য আজকালকার শিশুরাও জানে। কিন্তু আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে বোঝা শক্ত যে, এসব উচ্চারণ করাও একসময় গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হয়েছে। চার্চের চিন্তাভাবনার বিপরীতে ভাবতে চাওয়ার অপরাধে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ১৬০০ সালে, অর্থাৎ মাত্র চারশো বছর আগে। অথচ আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়েছে আনুমানিক তিন লাখ বছর আগে। অর্থাৎ বুঝতে না পারা নানা বিষয়আশয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটা সুদীর্ঘ সময় ধরে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে প্রচলিত ধারণার আর গালগল্পের। আমরা স্বভাবতই প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে বেরোতে অনিচ্ছুক থাকি, বিশেষ করে যখন চাক্ষুষভাবে কিছু প্রমাণ করতে পারা যাচ্ছে না। অন্তত সেই মুহূর্তে নয়। অবশ্য ওই অবস্থাতেও সঠিক জ্ঞানটিকে বাছাই করতে পারেন এবং তাতে দৃঢ় আস্থা রাখতে পারেন—এমন মানুষ খুব বেশি জন্মায় না। সেরকম মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশেও ছিলেন একজন। আর্যভট্ট।
সেই খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের দিক থেকেই অজস্র বিতর্ক হয়েছে—পৃথিবী কি তার নিজ অক্ষের ওপরে ঘোরে, নাকি স্থির—তাই নিয়ে। পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হয়েছে। তবে বিরলপ্রজ গণিতবিদ-জ্যোতির্বিদ আর্যভট্টই ছিলেন প্রথম, যিনি সবচেয়ে নির্ভুল গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে সেই ৪৯৯ সালে জানিয়েছিলেন যে, পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপরে ঘোরে। তারপরও প্রযুক্তিগত অপ্রস্তুতির কারণে এটি নিয়ে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হবার উপায় সে-সময় ছিল না। এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। আল-সিজজি, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার আর নিউটনদের পথে হেঁটে অবশেষে ১৮৫১ সালে ফরাসি পদার্থবিদ লিওঁ ফুকো প্রথমবারের মতো পৃথিবীর ঘূর্ণনের সবচেয়ে সরল, গ্রহণযোগ্য ও দৃশ্যমান ব্যাখ্যাটি দেন তাঁর প্রখ্যাত পেন্ডুলাম এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। একটা দীর্ঘ আর ভারী দোলক উঁচু থেকে ঝুলিয়ে দিয়ে লম্বা সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, দোলনের তল ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিষয়টা আপাতভাবে খুবই সরল। পৃথিবী যেহেতু তার নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে, তাই দোলকের স্থির তলটিও পৃথিবীর সাপেক্ষে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফুকোর গবেষণার সেই মূল পেন্ডুলামের কাঠামোটিই এখানে সংরক্ষিত আছে। কী চমৎকার একটা ব্যাপার!
এখানে আরও আছে আধুনিক রসায়নের জনক অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ের ল্যাবরেটরি। আসল গবেষণাগারটি ধ্বংস হয়ে গেলেও জাদুঘরে এটিকে সাজানো হয়েছে তাঁরই ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দিয়ে, এবং তাঁর গবেষণাগারের অনুকরণেই। অর্থাৎ মূলটির সঙ্গে এর খুব তফাত নেই। এই ল্যাবে কাজ করেই লাভোয়াজিয়ে দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেনের অস্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন নামদুটোও তাঁরই দেওয়া। এছাড়া আধুনিক রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটলেও পদার্থগুলোর মোট ভর একই থাকে—সেই তত্ত্বটিও তাঁর।
প্রতিভাবান এই বিজ্ঞানীর শেষটা অবশ্য করুণ। ফরাসি বিপ্লবের ঠিক পরের কথা, যখন ফরাসি দেশে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। চলছে Reign of Terror বা সন্ত্রাসের রাজত্বকাল। সে গল্প আগেই বলেছি। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে জ্যাকোবিন ক্লাব নামে পরিচিত একটি দলের হাতে, যারা নতুন ফ্রেঞ্চ রিপাবলিককে রক্ষা করার নামে এবং বিপ্লবের শত্রুদের খতম করার অজুহাতে প্রায় প্রতিদিনই একে-ওকে ধরে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করছে। লাভোয়াজিয়ে ছিলেন এরকমই অবিচারের শিকার। তাঁর নামে আনা রাষ্ট্রদ্রোহ আর জোচ্চুরির অভিযোগগুলো ছিল একেবারেই বানোয়াট। কিন্তু রক্তোন্মাদদের সেসব দেখার সময় কোথায়? প্রায় বিনা বিচারেই লাভোয়াজিয়েকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়, আর সমস্ত সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। এর ঠিক দেড় বছর পর অবশ্য বিজ্ঞানীর বিধবা স্ত্রী মেরি-অ্যানকে সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সবকিছুর সঙ্গে একটা ছোট চিরকুটও পাঠানো হয়, যাতে লেখা—লাভোয়াজিয়ের বিধবা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে, যাঁকে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
ব্যস, হয়ে গেল ক্ষমা চাওয়া।
মেরি-অ্যানের সেদিন কেমন লেগেছিল ভাবুন একবার। তবে কষ্ট পেলেও বেচারি দমে যাননি। তিনি লাভোয়াজিয়ের অপ্রকাশিত সমস্ত গবেষণাপত্র সংকলন করে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া মৃত স্বামীর নাম থেকে মিথ্যে অভিযোগের কালিমা দূর করার জন্য ক্যাম্পেইন চালিয়ে গেছেন। একসময় লাভোয়াজিয়ের বিরুদ্ধে থাকা মিথ্যে অভিযোগ নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা দূর হয়েছে। লোকে বুঝেছে—অস্থির উন্মাদনার স্রোতে কী মহামূল্যবান রত্ন তারা হারিয়েছে।
জাদুঘরটিতে আরও রাখা আছে স্ট্যাচু অব লিবার্টির সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ মডেল। বার্থোল্ডি ১৮৭৮ সালে এটি তৈরি করেন, যার অনুকরণেই পরে আমেরিকানদের উপহার দেওয়া ভাস্কর্যটি গড়া হয়। এছাড়া রয়েছে টমাস আলভা এডিসন আবিষ্কৃত ক্যামেরায় তোলা আসল ছবি। বিশ্বের সর্বপ্রথম সেলফ-প্রোপেলড গাড়িটিও এখানেই রয়েছে, যা মূলত একটি স্টিম ওয়াগন। এছাড়া অ্যাভিয়েশন, শব্দ, যোগাযোগ সংক্রান্ত অজস্র ঐতিহাসিক আর্টিফ্যাক্ট রয়েছে। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের পথে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে বিবর্তনের এই ধারা যে বিস্ময়কর—তাতে সন্দেহ কী?
আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট জাদুঘরে দেখা ফুকোর দোলকের সূত্র ধরে বলি প্যারিসের আরেক ঐতিহাসিক স্থাপনায় ভ্রমণের গল্প—পঁতেয়োঁ। পঁতেয়োঁ তৈরি করা হয়েছিল রোমের বিখ্যাত প্যান্থিয়নের আদলে। ভালো কথা—একবার পঁতেয়োঁ, আরেকবার প্যান্থিয়ন লিখেছি দেখে পাঠক বিভ্রান্ত হবেন না। এটা ইচ্ছাকৃত। প্যারিসের ব্লগগুলো লিখতে গিয়ে ইংরেজি, ফরাসি, বাংলা ইত্যাদি উচ্চারণ আর বানানের চোটে আমার জেরবার দশা হয়েছে।
রোমের প্যান্থিয়ন তৈরি করা হয়েছিল দ্বিতীয় শতকে, একটি সুদৃশ্য মন্দির হিসেবে। গ্রিক Pan অর্থ সকল, আর Theos মানে দেবতা। অর্থাৎ সর্বদেবতা মন্দির—মানে জিউস, অ্যাপোলো, ভিনাস, মিনার্ভা ইত্যাদি। তবে রোমানদের পতনের পর সপ্তম শতকে শুরু হয় ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন। স্বভাবতই প্যাগানদের মন্দিরটিকে চার্চে পরিণত করা হয়। তারপর সেখানে বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধিস্থ করা শুরু হয়। স্থাপত্যশিল্পের অনবদ্য প্রতীকটি বিশ্বব্যাপী অনেককেই আকৃষ্ট করে। করে ফরাসিদেরও। একই আদলে একটা চার্চ বানাতে আগ্রহী হয় তারা। তবে একেবারে হুবহু একইরকম নয়। এভাবেই আঠারো শতকে প্যারিসে পঁতেয়োঁ স্থাপিত হলো। আর সেই শতাব্দীর শেষদিকে এসে হলো ফরাসি বিপ্লব। ব্যাপারটা বুঝে দেখুন এবার। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ক্যাথলিক চার্চের আধিপত্য আর দখলদারিত্ব চূর্ণবিচূর্ণ করা। স্বভাবতই সেক্যুলারিজমের প্রবল ধাক্কা আছড়ে পড়ল ফ্রান্সে। ফলে বিপ্লবের পর সিদ্ধান্ত হলো, চার্চ চলবে না। পঁতেয়োঁ সেক্যুলার টেম্পল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সেখানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সমাহিত করা হবে। বেশ ভালো। কারা সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান? এই ধরুন ভলতেয়ার, রুসো, জঁ-পল মারা…
দাঁড়ান দাঁড়ান। এর মাঝে আবার মারা কোথা থেকে আসছেন?
মারা-র কথা আমি প্যারিসের ইতিহাসের অংশে বলেছি। ফরাসি বিপ্লবের অস্থির সময়টায় উসকানিমূলক লেখা লিখে বাথটাবে ছুরিকাঘাতে যিনি খুন হলেন। তবে মনে করে দেখুন, মারা কিন্তু মারা যাওয়ার আগে সাময়িকভাবে বীরে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে ভলতেয়ারের পাশে জায়গা জুটে গেল এই দুর্বৃত্তেরও। শুধু ইনি নন, ‘বিপ্লবী’ আরও বেশ কয়েকজনকে এখানে স্থান দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য এদের দেহাবশেষ আবার বের করে ফেলা হয়। দিনশেষে গায়ের জোরে কোনোকিছুই বেশিদিন চলে না, কী বলেন?
পঁতেয়োঁর বিশাল কাঠামোর ভেতরে ঢুকলেই একধরনের স্যাক্রেড বা পবিত্র অনুভূতি কাজ করে, যদিও আমার ঈশ্বরচিন্তা খুব সুসংবদ্ধ নয়। ভলতেয়ার ছাড়াও রুসো, ভিক্টর হুগো এবং মেরি কুরির মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের সমাধি রয়েছে এখানকার ক্রিপ্টে। আর ওপরের স্তরে আছে সিনোটাফ। মাথার ওপরের ছাদটা অস্বাভাবিক উঁচু। মেঝে থেকে গম্বুজ পর্যন্ত মাপলে আশি মিটারেরও বেশি। ছাদ উঁচু হলে এমনিতেই অনুভূতি পাল্টে যায়, নিজেকে ক্ষুদ্র লাগে; নিত্যদিন আমরা তো এত উঁচু ছাদ দেখে অভ্যস্ত নই। সেটা অবশ্য খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালেও হওয়ার কথা, কিন্তু সেভাবে আমরা আদৌ আকাশ দেখি না, লক্ষও করি না। চারপাশের গাম্ভীর্য আর নৈঃশব্দ্য মিলে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানকার একটা বিশেষ আকর্ষণ ফুকোর পেন্ডুলামের রেপ্লিকা, যা এখানকার বিশাল গম্বুজের নিচ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা আছে। এই বস্তুটি জায়গাটার সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়েছে।
ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে আমি ভলতেয়ার আর জঁ-জাক রুসোর কথা আনিনি। তবে এখানে তাঁদের প্রসঙ্গ না টানলেই নয়। ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরির পেছনে দুজনেরই অবদান অসামান্য। মজার ব্যাপার হলো, বাস্তিল দুর্গের পতনের এগারো বছর আগেই, ১৭৭৮ সালে এই দুই মহারথী মারা যান। অর্থাৎ বিপ্লবের চাক্ষুষ যেসব কারণ ছিল, অর্থাৎ চরম খাদ্যাভাব, অতিরিক্ত করারোপ কিংবা রাজকোষ শূন্য হয়ে যাওয়া, এসবের কিছুই তাঁরা দেখে যাননি। অর্থাৎ সময়ের আগেই তাঁরা সময়োপযোগী চিন্তা রেখে যান।
অথচ এই দুজন মানুষ একে অপরকে দুচোখে দেখতে পারতেন না। তাঁদের মতাদর্শ ছিল সম্পূর্ণ দুই মেরুর। ভলতেয়ার যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন, ধর্মে আস্থা ছিল না, আর মানুষের বাকস্বাধীনতা আর নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস রাখতেন। তাঁর মূল বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটা ছিল ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামি আর অজ্ঞতার বিরুদ্ধে। দোষের মধ্যে তিনি ছিলেন অভিজাততন্ত্রে বিশ্বাসী। ‘অশিক্ষিত’ সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাঁর উচ্চাশা ছিল না। তাঁর চূড়ান্ত প্রত্যাশা এরকম ছিল যে, ফ্রান্সে ব্রিটিশদের মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তন আসা সম্ভব কেবল শিক্ষিত আর প্রগতিশীলদের হাত ধ
অন্যদিকে রুসো ছিলেন একেবারে ভিন্নধারার। তিনি বিশ্বাস করতেন, আদিম মানুষ নিষ্কলুষ ছিল। কিন্তু সম্পত্তির মালিকানা মানুষকে নীতিভ্রষ্ট করেছে। তাঁর বিখ্যাত ‘সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট’ গ্রন্থে তিনি ‘জেনারেল উইল’ বা জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছার ধারণা দেন। রুসোর মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাজা নন, বরং সাধারণ মানুষ। তিনি সরাসরি গণতন্ত্র আর নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সমতার পক্ষপাতী ছিলেন।
ভলতেয়ার আর রুসোর এই দার্শনিক বৈপরীত্য কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নিয়েছিল। রুসোর লেখা পড়ে ভলতেয়ার তাঁকে ব্যঙ্গ করে চিঠি লিখেছিলেন—রুসোর লেখা পড়লে নাকি তাঁর চার পায়ে ভর করে হাঁটতে ইচ্ছে করে! উল্টোদিকে রুসোর চোখে ভলতেয়ার ছিলেন এমন একজন অভিজাত ব্যক্তি, যিনি অত্যন্ত অহংকারী আর ঈশ্বরের সঙ্গে যাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। সোজাকথায় ধনীদের তোষামোদকারী।
প্রশ্ন হলো, এমন দা-কুমড়ো সম্পর্ক থাকা দুজন মানুষের দুজনই কীভাবে ফরাসি বিপ্লবের অনুপ্রেরণা হলেন? এক্ষেত্রে বুঝতে হবে, ফরাসি বিপ্লব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। কয়েকটি ধাপে দীর্ঘ পালাবদল ঘটেছে এখানে। বিপ্লবের প্রথম ধাপ (১৭৮৯ থেকে ১৭৯১) ছিল ভলতেয়ারের দর্শনে প্রভাবিত। সে-সময় বুর্জোয়া আর উদারপন্থী অভিজাতরা চেয়েছিল এমন একটি সংবিধান, যা চার্চের ক্ষমতা খর্ব করবে এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। অর্থাৎ ভলতেয়ারের চিন্তারই প্রতিফলন।
কিন্তু বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপে (১৭৯২ থেকে ১৭৯৪) পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, দৃশ্যপটে হাজির হলো জ্যাকোবিনরা, যাঁরা অভিজাতদের আলাদাভাবে দেখতে রাজি ছিল না। তারা চেয়েছে পরিপূর্ণ সমতা। জ্যাকোবিন নেতা মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের ছিলেন রুসোর অন্ধভক্ত। কিন্তু ভক্তি জিনিসটা সবসময় ভালো নয়। ‘জেনারেল উইল’ তত্ত্বকে অত্যন্ত বাজেভাবে অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যা করে রবেস্পিয়ের শুরু করলেন তাঁর সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসের রাজত্ব। যারাই কথিত ‘সামষ্টিক ইচ্ছা’-র সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে, তাদেরই গিলোটিনে চড়ানো হয়েছে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, রাজতন্ত্র আর চার্চের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফরাসিদের প্রয়োজন ছিল একজন ভলতেয়ারকে। আর সেই পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে দরকার ছিল রুসোকে। অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব কৃতজ্ঞ দুজনের কাছেই। এজন্য বিপ্লব শুরু হওয়ার পর ১৭৯১ সালে প্রথমে ভলতেয়ারের দেহাবশেষ তুলে পঁতেয়োঁতে আনা হয়, আর পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্থাপিত হয় সেখানে। রুসোর দেহাবশেষ আসে আরেকটু পরে, ১৭৯৪ সালে।
পঁতেয়োঁর বিশাল গম্বুজের নিচে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দার্শনিকের সমাধি রাখা হয়েছে কীভাবে জানেন? একদম একে-অন্যের বিপরীতে! একটা সূক্ষ্ম রসিকতার আভাস পাওয়া যায় বৈকি। মাঝামাঝি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে হেসে বলি—শেষ? নাকি এখনো চলছে?
তবে পঁতেয়োঁতে রুসোর সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিপ্লবের চেয়েও অন্য আরেকটি বিষয়ের কথা বেশি মনে পড়ছিল। আমি যেহেতু শিক্ষার ছাত্র, তাই রুসো আমার কাছে কেবল একজন রাজনৈতিক দার্শনিক নন, বরং আধুনিক শিক্ষাদর্শনের অন্যতম পথিকৃৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর করার সময় শিক্ষা দার্শনিক ভিত্তি কোর্সে রুসোর কথা এসেছিল। পড়িয়েছিলেন শ্রদ্ধার্হ অধ্যাপক শ্যামলী আকবর।
শিক্ষাবিজ্ঞানে যাঁদের আনাগোনা আছে, তাঁদের কাছে রুসোর ‘এমিল’ বইটি অবশ্যপাঠ্য ক্লাসিক। এখানে তিনি শিক্ষায় ‘প্রকৃতিবাদ’-এর ধারণা দিয়েছিলেন। রুসো বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি শিশু জন্মগতভাবে পবিত্র এবং নিষ্পাপ। নষ্ট সমাজ আর তার চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম নিয়মকানুনই মূলত মানুষকে কলুষিত করে। এজন্য চারদেয়ালের বদ্ধ শ্রেণিকক্ষে কঠোর শাসনে শৃঙ্খলাবদ্ধ না রেখে শিশুকে প্রকৃতির কাছাকাছি স্বাধীনভাবে শিখতে দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন। চাইতেন যাতে অভিজ্ঞতা, খেলাধুলা আর কৌতূহলই শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠুক। অর্থাৎ আজকের দিনে আমরা যে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার কথা বলি, তার আদিবীজ বপন করে গিয়েছিলেন রুসোই। সমাজ, রাজনীতি আর শিক্ষা; সবকিছু মিলিয়ে রুসোর প্রভাব এতটাই বিশাল যে, পঁতেয়োঁর এই রাজকীয় সম্মান তাঁর একদম প্রাপ্যই ছিল। পঁতেয়োঁর চত্বরেও রুসোর একটি আপাদমস্তক ভাস্কর্য রয়েছে, যেখানে তিনি দৃপ্তভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে।
পঁতেয়োঁর ক্রিপ্টে হাঁটতে হাঁটতে একটি যৌথ সমাধির সামনে এসে থমকে দাঁড়াতে হয়। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বরেণ্য বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরি এবং মাদাম মেরি কুরি। জন্মসূত্রে মেরি কুরি অবশ্য ফরাসি ছিলেন না, ছিলেন পোলিশ। সে-সময় পোল্যান্ডে নারীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার ছিল না বলে বাধ্য হয়েই ১৮৯১ সালে তাঁকে ফ্রান্সে আসতে হয়। পরবর্তীতে ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরিকে বিয়ের পর তিনি এখানেই থিতু হন। অনেক পরে ফরাসি সরকার এই বিজ্ঞানী দম্পতির দেহাবশেষ পঁতেয়োঁতে স্থানান্তরিত করে। নিজের যোগ্যতায় এখানে স্থান পাওয়া প্রথম নারী মেরিই। অবশ্য বিজ্ঞান আর মানবতার জন্য তিনি যা করে গেছেন, তার তুলনায় এই সম্মানটুকুকেও নিতান্তই সামান্য বলে মনে হয়।
বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, তবে মেরির কফিনটি আর দশটা সাধারণ কাঠের কফিনের মতো নয়। এর ভেতরে রয়েছে আড়াই মিলিমিটার পুরু সিসার আস্তরণ। ১৯৯৫ সালে পঁতেয়োঁতে স্থানান্তরের জন্য যখন মেরির পুরোনো কবর খোঁড়া হয়, তখন দেখা যায়—ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঠেকাতে মৃত্যুর সময়ই তাঁকে এই সিসার বাক্সে সিল করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাঁর মৃতদেহই নয়, তাঁর ল্যাব নোটবুকগুলো পর্যন্ত আজও ভয়াবহ মাত্রায় তেজস্ক্রিয়। প্যারিসের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে সেগুলো সিসা-মোড়ানো বিশেষ বাক্সে রাখা আছে। অনুমান করা হয়—আরও অন্তত দেড় হাজার বছর সেগুলো মানুষের সংস্পর্শে আসার মতো নিরাপদ নয়। মেরি মারাও গেছেন এই তেজস্ক্রিয়তাতেই, বিশেষ করে রেডিয়াম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ক্রমাগত বিকিরণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু নিজেকে আক্ষরিক অর্থেই নিঃশেষে উৎসর্গ করে তিনি ক্যানসার চিকিৎসার বা রেডিয়েশন থেরাপির সূচনা করে গেছেন।
পঁতেয়োঁ যেমন ফরাসি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি সযত্নে আগলে রেখেছে, তেমনি ফরাসি নির্মাণশৈলী আর স্থাপত্যের ইতিহাস ধরে রাখার জন্যও চমৎকার ব্যবস্থা আছে। আইফেল টাওয়ারের ঠিক উল্টোদিকেই অবস্থিত সিতে দেলার্কিতেকচুর বা স্থাপত্য জাদুঘর। ফরাসি স্থাপত্যের এক বিশাল সংগ্রহশালা এটি। ভেতরে ঢুকে বিশাল আকারের সব খিলান আর স্থাপত্যের মডেল দেখে আক্ষরিক অর্থেই মুগ্ধ হতে হয়। তবে সবচেয়ে অভূতপূর্ব লেগেছে নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালের অংশগুলো দেখে। ২০১৯ সালের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া ক্যাথেড্রালের উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু অংশ এবং সংস্কার কাজের মডেল সেখানে রাখা ছিল। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফরাসিরা কীভাবে নিজেদের ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করছে, তা দেখলাম, জানলাম। তবে সত্যি বলতে এখানে খুব ইন্টারেস্ট পাইনি। স্থাপত্যের ইতিহাস আর কারিগরি ব্যাপারগুলো নিয়ে আমার জানাশোনা খুব কম, সেটাও কারণ হতে পারে।
ঐতিহাসিক নিদর্শন কুক্ষিগত করা প্রসঙ্গে মিউজে দ্যু কে ব্রঁলি – জাঁক শিরাক জাদুঘরের কথা তো শুরুতেই বলেছি। জায়গাটা আইফেল টাওয়ারের খুব কাছে, মানে অফিসেরও কাছে। খোলাও থাকে সন্ধ্যা অবধি। একদিন অফিস শেষে চলে গেলাম সেখানে। শুরুতেই চোখে পড়বে জাদুঘরের স্থাপত্যশৈলী। সবুজ লতাপাতা-তৃণে দেয়ালগুলো প্রায় পুরোপুরি ঢেকে ফেলা হয়েছে—যাকে বলে লিভিং ওয়াল। মিউজিয়ামের সঙ্গে বেশ খানিকটা উন্মুক্ত বাগানও রয়েছে। ছেঁটে বামন বানিয়ে ফেলা কৃত্রিম ধাঁচের বাগান নয়, বুনো একটা ভাব আছে। পরে জেনেছি বিশেষভাবে এই বাগানের নকশা করেছেন বিখ্যাত ফরাসি নিসর্গবিদ জিল ক্লমঁ।
জাদুঘরের ভেতরে আফ্রিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া ও আমেরিকার আদিবাসী সংস্কৃতির সুবিশাল সংগ্রহশালা। আর যাই বলি ফরাসিরা জাদুঘরের ইন্টেরিয়র করতে জানে। ভেতরে ঢুকে জঙ্গল-সদৃশ আবছা-আবছা অন্ধকার পরিবেশটা বড় ভালো লাগল। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত বিভিন্ন দেবমূর্তি, মুখোশ আর ধর্মীয় আচারের জিনিসগুলো অন্যরকম সুন্দর। সবমিলিয়ে বেশ অভিনব কালেকশন। কিছু কিছু আইটেম অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান। কিছু কিছু জিনিস দেখতে একটু ক্রিপিও লাগে বোধহয়। তবে কদর্থে বলছি না, অনভ্যস্ত চোখের সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো। এসব চিরন্তন বা আদিবাসী শিল্প একসময় পাবলো পিকাসোর মতো আধুনিক শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। সে কথায় পরে আসব।
সভ্যতার প্রাচীন রূপ দেখার পর একদিন গিয়েছিলাম অসভ্যতার গল্প জানতে, প্যারিসের হলোকাস্ট মিউজিয়ামে। তারপর সেখান থেকে গিয়েছিলাম হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত জ্যুডাইজম জাদুঘরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ইহুদি সম্প্রদায়ের ইতিহাস হলোকাস্ট মিউজিয়ামে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই জাদুঘরে প্রবেশ করতে হয় দুটি উঁচু দেয়ালের মাঝখান দিয়ে। দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে প্রথমে বোঝা যায় না, তবে ভালোভাবে তাকালে দেখা যায় সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে খোদাই করা আছে অজস্র নাম। প্রায় ছিয়াত্তর হাজার মানুষের নাম। এরা সবাই ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত হওয়া ইহুদি নারী, পুরুষ আর শিশু। যুদ্ধ শেষে এদের মধ্যে জীবিত ফিরতে পেরেছিল মাত্র হাজার তিনেক মানুষ। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা বলে লাভ নেই। কেবলই দীর্ঘশ্বাস।
তবে হলোকাস্টের নির্মম ইতিহাসকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কেবল মৃত্যুর পরিসংখ্যানে আটকে রাখেনি। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন দিককেও এর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ওই সময়ে সেখানে একটি বিশেষ প্রদর্শনী চলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলজিয়াম প্রায় চার বছরের জন্য জার্মানদের অধীনে অবরুদ্ধ ছিল। ওই সময়ে স্পিরু বা টিনটিনের মতো বিখ্যাত ফ্রাঙ্কো-বেলজিয়ান কমিকস চরিত্রগুলো কীভাবে সেই জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেটিই সেখানে দেখানো হয়েছে। পপুলার কালচারের সঙ্গে এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঐতিহাসিক যোগসূত্র বিস্ময় তৈরি করে।
জাদুঘরের বেজমেন্টে রয়েছে হলোকাস্টের শিকার ষাট লাখ ইহুদির স্মরণে একটি প্রতীকী সমাধি বা ক্রিপ্ট। ইসরায়েলের জাতীয় প্রতীকের আদলে, অর্থাৎ ‘স্টার অব ডেভিড’-এর অনুকরণে তৈরি এই সমাধির মাঝখানে একটি চিরঞ্জীব অগ্নিশিখা জ্বলছে। আর চারপাশের মাটিতে মিশে আছে আউশভিৎজসহ অন্যান্য এক্সটারমিনেশন ক্যাম্প থেকে আনা ভুক্তভোগীদের ছাই এবং ইসরায়েলের মাটি। যাদের ভাগ্যে মৃত্যুর পর কোনো কবর জোটেনি, যাদের দেহ মৃত্যুর পর কেউ শনাক্ত করতে পারেনি, যাদের নশ্বর শরীর কোথায় পচে-গলে পড়ে ছিল কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি—এই সমাধি তাদেরই অনন্ত বিশ্রামের প্রতীক।
হলোকাস্ট মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম জ্যুডাইজম মিউজিয়ামের দিকে। এটি প্যারিসের ঐতিহাসিক ল্য মারে এলাকায় অবস্থিত, যা একসময় ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ আগের জাদুঘরের দেয়ালে যাদের নাম দেখে এসেছি, তাদের বেশিরভাগের ঘরবাড়ি ছিল এই অঞ্চলে। এখন সেসব অতীত।
জ্যুডাইজম জাদুঘরে ঢোকার মুখে ভগ্ন তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে থাকা একটা বিকৃত আর ভাঙাচোরা ভাস্কর্য চোখে পড়ে। ভাস্কর্যটি ফরাসি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আলফ্রেদ দ্রেফ্যুসের, আর তাঁর এই একটি রূপের ঐতিহাসিক প্রতীকি অর্থ আছে।
উনিশ শতকের শেষদিকে দ্রেফ্যুসের নামে ফরাসি সামরিক ইন্টেলিজেন্স রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে, যার প্রেক্ষিতে তাঁর জীবনে অমানিশা নেমে আসে। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয় দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত ফ্রেঞ্চ গায়ানার নিকটবর্তী দ্বীপ ডেভিল’স আইল্যান্ডে। নামটা এমনি এমনি আসেনি। জায়গাটাকে বন্দিদের জন্য নরক বিবেচনা করা হতো। রুক্ষ ভূপ্রকৃতি, তীব্র গরম, পোকামাকড়, রোগবালাই। দীর্ঘ চার বছর ধরে সেখানকার বন্দিশালায় তিনি ছিলেন একমাত্র বন্দি। এমনকি গার্ডদের ওপরেও নিষেধাজ্ঞা ছিল যাতে কোনোক্রমেই তাঁর সঙ্গে কেউ কথা না বলে। ভেবে দেখুন, চারটি বছর, কারোর সঙ্গে একটিও বাক্যালাপ নেই। অসুস্থতা, একাকীত্ব, শারীরিক অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন সয়ে তিনি অবশেষে ফ্রান্সে ফিরলেন। ক্ষমাও পেলেন, কিন্তু দোষী সাব্যস্ত হয়েই। আপত্তি করেননি, কারণ আর পারছিলেন না। কয়েক বছর পর অবশ্য তাঁর নামে আনা সমস্ত অভিযোগ মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়। তিনি মুক্তি পান, সত্যিকার মুক্তি। কারাবাস চার বছরের কিছু হলেও সবমিলিয়ে প্রায় বারোটি বছর ধরে তাঁকে মানুষের ঘৃণা কুড়োতে হয়েছে। কুখ্যাত ঘটনাটি ‘দ্রেফ্যুস অ্যাফেয়ার’ নামে পরিচিত। দ্রেফ্যুসের ভাস্কর্যটি এখানে স্থাপনের কারণ হলো, ফ্রান্সের ইতিহাসে অ্যান্টি-সেমিটিজম বা ইহুদিবিদ্বেষের চরম দৃষ্টান্ত ছিল এটি। ক্ষতবিক্ষত ভাস্কর্যটি তাই তাঁর ওপরে হওয়া সেই অবিচার এবং পরবর্তীকালে তাঁর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাদুঘরটি ইহুদিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা। ঘরবাড়ি, পোশাক, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে পুরোনো গ্রন্থাদি প্রদর্শিত হচ্ছে সেখানে। সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য নিদর্শনগুলোর একটি হলো পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতালীয় একটি ‘হলি আর্ক’ বা পবিত্র সিন্দুক, যেখানে তাদের ধর্মগ্রন্থ তোরাহ রাখা হতো। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী বিয়ের চুক্তিপত্র বা ‘কেতুবাহ’ ইত্যাদি রয়েছে। রয়েছে পূর্ব ইউরোপের কিছু ভূতপূর্ব সিনাগগের মডেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এরকম হাজারও সিনাগগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মার্ক শাগালের বেশ কিছু দুর্লভ পেইন্টিংও এখানকার অমূল্য সংগ্রহ।
ইহুদিদের জাদুঘর দেখতে দেখতে অবধারিতভাবেই আমার মাথায় ফিলিস্তিনের কথা এসেছে। অনেকবার।
দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপরে যে অত্যাচার চলেছে, সে কথা স্মরণ করে ভ্রমণের সময়েই দুটো বিষয় নিয়ে অনেক ভেবেছি। প্রথমত, ইহুদিরা তাদের নিজেদের ওপরে হওয়া ঐতিহাসিক অত্যাচার এবং নিজেদের সংস্কৃতি—দুটোই প্রচারে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছে। সেটা তারা করতেই পারে। কারণ গণহত্যা আর ইহুদিবিদ্বেষ অসত্য কিছু নয়, আর সমর্থনযোগ্যও নয়, বরং ঘৃণার্হ; কিন্তু নিজেদের ভিক্টিম পরিচয়কে বেশি বেশি সামনে এনে অপকর্মকে চাপা দেওয়া অন্যায়। জায়নবাদী দখলদার ইসরায়েল যেরকম নির্বিকারভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর বছরের পর বছর ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে, দস্যুর মতো একটু একটু করে অন্যের সমস্ত ভূখণ্ড গিলে খেয়ে ফেলছে—সেসবের প্রচারণা কোথায়? নেই। বিশ্ব যেন দেখেও না-দেখার ভান করে চলেছে। অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে হলোকাস্ট আর ইহুদি ধর্ম সংক্রান্ত জাদুঘরের সংখ্যা দেড়শরও বেশি। আর সাংস্কৃতিক জগতে তাদের আধিপত্যের কথা তো সর্বজনবিদিত। সেটিকেও তাদের অনেকে পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিন-শোষণের কাজে প্রয়োগ করেছে।
দ্বিতীয় যে জিনিসটি আমাকে পীড়া দেয় তা হলো—এত এত অত্যাচার সহ্য করেছে যারা, তারা কোন যুক্তিতে অন্যদের এভাবে নিপীড়ন করে? বিবেকে বাধে না? ভূমিপুত্রদের অন্যায়ভাবে উৎখাত করে টিকে থাকার অপচেষ্টাকে ‘লড়াই’ বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। আর মানুষ যদি এরকম বিবেকহীন জন্তুর মতোই টিকে থাকতে চায়, তবে সেই টিকে থাকারও কোনো মানে হয় না।
পুনশ্চ: আমার এই ভ্রমণের সময়কাল ২০২৩ সালের আগস্ট। অর্থাৎ তখনো ৭ অক্টোবর ঘটেনি, এবং ফিলিস্তিনি জাতির ওপরে চলা তৎপরবর্তী নারকীয় গণহত্যা এবং জাতিগত নিধন শুরু হয়নি। আমার এই পর্যবেক্ষণ আগের। ৭ অক্টোবর পরবর্তী ঘটনাপঞ্জির কারণে এই অংশটা আমি আবার পড়েছি। ভেবেছি। তবে সংশোধনের বা পরিবর্তনের প্রয়োজনবোধ করছি না। ইহুদিদের জন্য যা লিখেছি সেটি যেমন সত্য, তেমনি ফিলিস্তিনিদের জন্য যা লিখেছি—তা-ও। অন্ধ সমর্থন কিংবা অন্ধ বিদ্বেষ উভয়েই আমাদের মানবিক বোধকে কলুষিত করে।
লুভ্র: অসমাপ্ত তীর্থযাত্রা
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর আগমন ঘটে লুভ্রে। সংখ্যাটা বছরে সত্তর লক্ষ থেকে এক কোটি পর্যন্ত হয় অনেক সময়। সংগ্রহশালার প্রাচুর্যের কথা তো বলেছি আগেই। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার ঐতিহাসিক নিদর্শন, ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম এখানকার গ্যালারিগুলোতে প্রদর্শিত হয়। ধরুন আপনি লুভ্রের চারশর বেশি কক্ষে ছড়িয়ে থাকা এই সবগুলো বস্তুর প্রতিটির দিকে একবার করে তাকাতে চান, অন্তত ত্রিশ সেকেন্ড ধরে। সেক্ষেত্রে ঘুম-খাওয়া-বিশ্রাম বাদে চব্বিশ ঘণ্টা একটানা দেখে গেলেও একজন মানুষের বারো দিন লাগবে। এখানেই শেষ নয়। জাদুঘরের প্রকৃত সংগ্রহশালা এই পঁয়ত্রিশ হাজারে সীমাবদ্ধ নয়, আরও অনেক, পাঁচ লক্ষেরও বেশি। লুভ্র থেকে দুশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুরক্ষিত কনজারভেশন সেন্টারে সেগুলোর বেশিরভাগই সযত্নে রাখা হয়েছে। সেখানে সকলের প্রবেশাধিকার নেই। সেখান থেকে বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্ট কখনোসখনো লুভ্রে আনা হয়, বিভিন্ন প্রদর্শনীতে পাঠানো হয়, অনেক জাদুঘরকে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে ধার হিসেবেও দেওয়া হয়।
লুভ্র কীভাবে সৃষ্টি হলো?
দ্বাদশ শতকের শেষদিকের কথা। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম জয় করে নিয়েছেন। স্বভাবতই ইউরোপ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। পোপ তখন তৃতীয় ক্রুসেডের আহ্বান জানালেন। অবশ্য কথাটা ‘আহ্বান’ হলেও সে-সময়কার বাস্তবতা বিবেচনায় একরকম নির্দেশই। আর এই ক্রুসেডের সাফল্য বিশেষভাবে নির্ভর করছিল ফরাসি আর ইংরেজ রাজার ওপরে। ফরাসিদের রাজা তখন ফিলিপ ওগুস্ত্। তিনি জানতেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে ক্রুসেডে যোগ দিতেই হবে। কিন্তু প্যারিসের বাইরে দীর্ঘকাল অবস্থান করায় ঝুঁকি ছিল। খুব জোরালো সম্ভাবনা ছিল যে তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে ইংরেজ রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট প্যারিস আক্রমণ করতে পারেন। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে তিনি লুভ্র দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন, তারপর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কার সঙ্গে জানেন? ওই রিচার্ডের সঙ্গেই। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ শত্রুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে হবে, কারণ দুয়ারে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর শত্রু। সাধে কি আর বলেছি—ইতিহাস জিনিসটা থ্রিলারের চেয়েও চমকপ্রদ!
লুভ্রকে পরবর্তীতে কিছুকাল প্রাসাদ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের পর যেহেতু আর রাজার কারবারই রইল না, সাধারণ মানুষের জন্য একে জাদুঘরে রূপান্তর করা হলো। আজকের দিনে লুভ্র জাদুঘরের বেজমেন্টের অংশে গেলে সেই দুর্গের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যায়। মসৃণ পায়ে-হাঁটা পথ, ওপরে মোলায়েম আধুনিক বিজলি বাতি, কিন্তু চারদিকে মধ্যযুগের মোটা দেয়াল, দুর্গের মজবুত ভিত্তি। একসময় রেলিং দেওয়া কাঠের রাস্তা পাবেন, হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে দুপাশে বেশ উঁচু একটা কাঠামো। ঠিক উঁচু নয়, বরং গভীর হবে কথাটা। জায়গাটা একসময় জলপূর্ণ পরিখা ছিল, যা লুভ্র দুর্গকে নিরাপত্তা দিত। রিস্টোরেশনের এ-এক অন্যরকম মাত্রা—তাতে সন্দেহ কী?
লুভ্র দেখার জন্য আমি মোটামুটি পাঁচ-ছয় ঘণ্টা হাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। জানি, যথেষ্ট নয়। কিন্তু খুব বেশি বরাদ্দ রাখা বাস্তবসম্মত হতো না। দরকারে পায়ের ওপর অত্যাচার করা চলে, তবে তারও তো সীমা আছে।
লুভ্রে ঢোকার আগেই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে সেই বিখ্যাত কাচের পিরামিড। সামনের চত্বরটাও অনেক প্রশস্ত। আমার মিউজিয়াম পাস ছিল, স্লটও বুক করা ছিল। তবুও ঢুকতে প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল। তাহলে যাদের স্লট নেই তাদের কথা একবারটি ভেবে দেখুন। তাদের লাইন দেখে মনে হচ্ছিল যেন নকিয়া এগারশ ফোনের সাপ; বিভিন্নভাবে পেঁচিয়ে পেঁচিয়েও লোকের জায়গা হচ্ছিল না জাদুঘর-প্রাঙ্গণে। তার ওপর মাথার ওপর গনগনে রোদ। বাতাসে জলীয়বাষ্প অবশ্য অত বেশি নয়, মানে ঘেমে-নেয়ে উঠতে হয় না। তারপরও রোদ তো!
ভেতরে ঢুকে স্বস্তি পেলাম। মূল গ্যালারিতে ঢোকার আগে ব্রোশিওর সংগ্রহের জায়গা আছে। বেশ কয়েকটি ভাষায় পাওয়া যায়। বাংলা নেই, সন্দেহাতীতভাবেই। সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেই যে সব জায়গায় কল্কে পাওয়া যায় না, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সম্ভবত বাংলা ভাষা। নয়তো আট কোটি নেটিভ স্পিকারের কোরিয়ান ভাষায় ব্রোশিওর থাকলে ত্রিশ কোটি ব্যবহারকারীর বাংলায় কেন থাকবে না, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতাম। যাহোক, ইংরেজিই ভরসা। জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘাবড়ে গেলাম। বেশ বড়সড়। শুধু সেটা দেখতেও অনেক সময় লাগার কথা। এই জিনিস ধরে ধরে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে চাওয়া শক্ত হবে। বরং ফোনে আগে থেকে নোট করে রাখা তথ্যগুলোর ওপরে আস্থা রাখাই শ্রেয়।
লুভ্রে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে প্রাচীন মিশরের অংশটা। প্রথমবারের মতো স্বচক্ষে দেখলাম সত্যিকারের মমি। আরও চোখে পড়ল মমি রাখার অনেকগুলো কফিন (যাকে বলে সার্কোফাগাস)। দেখলাম বিখ্যাত সিটেড স্ক্রাইব, যার বয়স সাড়ে চার হাজার বছরেরও বেশি। ভাস্কর্যটিকে অভিনব বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি কোনো দেবতা কিংবা রাজপরিবারের কারোর নয়, নিতান্তই একজন মানুষের। অবশ্য তখনকার হিসেবে যথেষ্ট সম্মাননীয় মানুষ বলতে হবে, কারণ ভাস্কর্যের লোকটি একজন কলমচী (Scribe), অর্থাৎ যাঁর পেশা ছিল লেখালিখি করা। অনেকের ধারণা তখনকার মিশরের ভাষাই ছিল হায়ারোগ্লিফিক, যেটা সঠিক নয়। হায়ারোগ্লিফিক ব্যবহৃত হতো ধর্মীয় স্থাপনা কিংবা সমাধির মতো গুরুগম্ভীর জায়গায়। দাপ্তরিক লেখালিখির জন্য হায়ারেটিক ভাষা ব্যবহৃত হতো। সেটাও সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যবহারের ভাষা ছিল না। আসলে প্রাচীন মিশরে শিক্ষিত মানুষের হার খুব কম ছিল, ফলে মানুষজনকে এরকম স্ক্রাইবের শরণাপন্ন হতে হতো। আর রাজকীয় দায়িত্ব পালন তো আছেই। যাবতীয় লেখালিখির কাজ ছিল স্ক্রাইবের। তারা মোটামুটি সবধরনের ভাষাই জানত, এমনকি কূটনীতির স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের ভাষাও জানা থাকতে হতো অনেক সময়। সমাজে তাকে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির মানুষ হিসেবেই দেখা হতো।
এই ভাস্কর্যের অভিনব দিক হলো এর গড়ন। তখন যেরকম খুঁতহীন আইডিয়ালাইজড মূর্তি গড়া হতো এটা সেরকম নয়। খালি গা, ভুঁড়ি, বুক ঝুলে পড়েছে। তবে এসবই আভিজাত্যের প্রতীক। আসলে রাজারাজড়ার মূর্তি গড়তে গেলে মাথায় রাখতে হতো যে খুঁত রাখা যাবে না, পেশিগুলোকে টানটান রাখতে হবে। স্ক্রাইবের ক্ষেত্রে সেরকম কড়াকড়ি না থাকায় শিল্পী স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। অর্থাৎ অত্যন্ত রিয়েলিস্ট কাজ বলা যায় একে।
এছাড়া লুভ্রে আছে অতিকায় আকৃতির মিশরীয় স্ফিংক্স! স্ফিংক্সকে প্রাচীন মিশরে রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখা হতো। লুভ্রের স্ফিংক্সগুলোর ভেতরে সবচেয়ে বড়ো আকারেরটি হলো তানিসের স্ফিংক্স। পনেরো ফিট লম্বা, ওজন চব্বিশ টনেরও বেশি। আনুমানিক নির্মাণকাল খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ অব্দ। তানিস মন্দিরে খননকার্য চলাকালে ১৮২৫ সালে মূর্তিটি উদ্ধার হয়। জিনিসটা মিশরের কাছ থেকে বৈধভাবেই কিনে আনা হয়েছিল সে-সময়, যদিও বিউপনিবেশায়নের লেন্সে এবং তৎকালীন বাস্তবতায় এ-ধরনের বিনিময় কতটা নীতিসিদ্ধ তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। নিজেদের এরকম মহামূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করার নৈতিক অধিকারই বা কোনো শাসকের আদৌ আছে কিনা সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ, কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ আর দশটা সম্পদের চেয়ে আলাদা। বলাই বাহুল্য, এ-ধরনের ক্ষতি একপ্রকার স্থায়ী ক্ষতি, যার ক্ষতিপূরণ নেই।
মিশরীয় অংশে আমার কিছুটা আবেগাপ্লুত লেগেছে শেয়াল-দেবতা আনুবিসকে দেখে। সেই আনুবিস, যার কথা প্রথম জেনেছিলাম কৈশোরে সত্যজিতের ‘শেয়াল দেবতা রহস্য’ পড়ে। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের দেবতা আনুবিস, যার মাথাটা শেয়ালের, আর শরীরটা মানুষের। একই ধরনের অন্যান্য দেবতারও ছোট-বড় প্রচুর মূর্তি লুভ্রে আছে—যেমন সূর্যদেবতা রা (মাথা বাজপাখির), উর্বরতার দেবতা সোবেক (মাথা কুমিরের), যুদ্ধদেবী সেখমেত (মাথা সিংহীর), মাতৃত্ব ও ভালবাসার দেবী হাথোর (মাথা বা শুধু কানজোড়া গাভীর) ইত্যাদি।
মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মিশরের এত অমূল্য প্রত্নসম্পদ প্যারিসে এলো কীভাবে? এর পেছনে বড় অবদান কিংবা দোষ নেপোলিয়ন বোনাপার্টের। তিনি যখন মিশর অভিযানে গিয়েছিলেন (১৭৯৮-১৮০১), তখন সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একদল বিজ্ঞানী এবং গবেষককে। তাঁরাই মিশরের বিভিন্ন জায়গা খুঁড়ে এসব নিদর্শন ফ্রান্সে নিয়ে আসেন। কয়েকবছর পরে জাঁ-ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়ঁ প্রথমবারের মতো হায়ারোগ্লিফিক্স পাঠোদ্ধারে সক্ষম হয়ে মিশরীয় নিদর্শনগুলোকে আরও বোধগম্য আর অর্থপূর্ণ করে তোলেন।
মিশরের পাশাপাশি প্রাচ্য এবং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার শিল্পকলা নিয়েও অনেকখানি অংশ আছে লুভ্রে। তার ভেতরে সেরা হলো ইরানের অংশটা, বিশেষ করে পারস্য সাম্রাজ্যের কারুকার্যময় ফুলদানি, অপূর্ব সুন্দর গালিচা এবং অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের ডানাযুক্ত ষাঁড়ের (লামাসু) বিশাল মূর্তি ইত্যাদি।
মনে হতে পারে—লুভ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত জিনিসগুলো অর্থাৎ এর বিশ্বজয়ী ভাস্কর্য আর চিত্রকর্মগুলোর কথা তো কিছুই বললাম না। সেসবও দেখেছি, আর বলবোও। তবে বলতে দ্বিধা নেই লুভ্রের সাথে আমি অন্যায় করেছি। প্যারিসে আর সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু লুভ্রেই আসতে হতো দুমাস ধরে। কীভাবে যে পাঁচটা ঘণ্টা কেটে গেল টেরই পাইনি। এতকিছু দেখেছি, তাও সব অংশে যেতেই পারিনি। লুভ্রের বিশালতা আসলে এক দিনে বা কয়েক ঘণ্টায় ধারণ করার মতো নয়।
কিছু তীর্থযাত্রা বোধহয় এমনই হয়। কিছুটা অপূর্ণতা, কিছুটা অতৃপ্তি।
অশিল্পীর শিল্পদর্শন
আমি নিজে শিল্পবোদ্ধা নই, আঁকিয়ে তো নই-ই। অনেকে শিল্পী না হলেও শখ করে আঁকে, আর ভালোই আঁকে। আমার সেরকম বিদ্যা কিংবা প্রতিভাও নেই। তবে শিল্পকর্ম ভালোবাসি। অশিল্পীদের শিল্পদর্শনে বিশেষ বিধিনিষেধও নেই। অতএব।
লুভ্রের বিশালতার কাছে নিজের অসহায়ত্ব আর অপূর্ণ তীর্থযাত্রার আক্ষেপের কথা বলেছিলাম। তবে লুভ্রের বিশ্বজয়ী ভাস্কর্য আর চিত্রকর্মগুলোর কথা এখনো বলা হয়নি। এজন্য শুরুতে লুভ্রের কথাই বলি।
লুভ্রে যেকোনো শিল্পানুরাগীর মাথা খানিকটা এলোমেলো হয়ে যাবে। আর্টওয়ার্ক আর ভাস্কর্যগুলো নির্দিষ্ট কোথাও সীমাবদ্ধ নেই, বিভিন্ন দিকে ছড়ানো। তবে প্যাটার্ন আছে। শিল্পকলার ইতিহাস জানা থাকলে বুঝতে সহজ হয়। পেইন্টিংগুলো আর্টের বিভিন্ন স্কুল অনুযায়ী সজ্জিত, যেমন—ফরাসি, ইতালীয়, স্প্যানিশ, জার্মান, ডাচ ইত্যাদি।
বিখ্যাত দুটি গ্রিক ভাস্কর্যের ছবি দেখেছি আগে। লুভ্রে সামনাসামনি দেখে রোমাঞ্চ জাগল। ভেনাস দ্য মিলো এবং সামোথ্রেসের বিজয়ের দেবী। দুটিই খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে সৃষ্ট, অর্থাৎ হেলেনীয় যুগের ভাস্কর্য। ওই যুগের শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য হলো আবেগের তীব্র প্রকাশ—হোক তা হর্ষ কিংবা ক্লেশ। ভাস্কর্যগুলোর চেহারায়, চোখে, শারীরিক ভঙ্গিতে সেই তীব্রতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ভাস্কর্যগুলো অবিকৃতভাবে উদ্ধার করা যায়নি। ভেনাসের ভাস্কর্যে হাতজোড়া নেই, আর বিজয়ের দেবীতে নেই মাথাটাই। যেহেতু ওভাবেই পাওয়া গিয়েছিল, কাজেই আফসোস করে লাভ নেই।
তবে ভাস্কর্য দুটিকে জাদুঘরে রাখার জায়গাদুটো বেছেছে যারা, তাদের অভিবাদন। দেবীকে রেখেছে সিঁড়ির মাথায়, দেখে মনে হয় যেন এখুনি উড়াল দিয়ে চলে যাবে দূরে কোথাও। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো ভাস্কর্যের নিচে থাকা জাহাজের আকৃতিটি, যেটা একে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। ভাস্কর্যটি প্রথম যখন পাওয়া যায়, মানে মাটি খুঁড়ে বের করা হয়, তখন নিচের অংশটা নাকি অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। আরও প্রায় বছর দশেক পর দেখা গেল যে দুটো অংশ একেবারে মাপমতো মিলে যাচ্ছে। অর্থাৎ অতীতেও এভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বিজয়-দেবী।
অন্যদিকে জাদুঘরে বেশিরভাগ ভাস্কর্যকে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রাখা হলেও ভেনাসকে রাখা হয়েছে কক্ষের একদম মাঝখানে, যেন সমস্ত স্পটলাইট তার ওপরে, সঙ্গে মৃদু আলো-ছায়ার খেলা। ভেনাসের হারিয়ে যাওয়া দুহাতে কী ছিল, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। তবে এই ‘বিকৃতি’ দেবীকে আরও সুন্দর আর রহস্যময় করেছে তাতে সন্দেহ নেই।
এবারে অবধারিতভাবেই মোনালিসার কথা। লিওনার্দোর এই ছোট্ট পেইন্টিংটিকে ঘিরে কী যে ভিড়, কত স্তরের নিরাপত্তা আর বাধা! অন্য সব নিদর্শনের মতো এর কাছাকাছি যাওয়ার কোনো উপায় নেই। দূর থেকে দেখেই আশ মেটাতে হয়। সেখানে একদণ্ড দাঁড়িয়ে দেখব সেই জো-ও নেই, পেছন থেকে ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে যায়। বিরক্ত হয়ে জায়গা ছেড়ে পিছিয়ে যেতে হয়েছে। পরে সুনীলের ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’-তে দেখি তাঁরও একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। উন্মাদনা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে বৈ কমেনি।
লুভ্রে আমার দেখা সেরা কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম থিওডোর জেরিকোর ‘র্যাফট অব দ্য মেডুসা’। জাহাজডুবির পর বাঁচার জন্য মানুষের করুণ আর বীভৎস লড়াই এত নিখুঁতভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে চোখ সরানো যায় না। পাশাপাশি দেখেছি জাক-লুই দাভিদের আঁকা সুবিশাল ক্যানভাসের ‘করোনেশন অব নেপোলিয়ন’, যেখানে নেপোলিয়ন নিজে তাঁর স্ত্রী রানি জোজেফিন দ্য বোয়ার্নের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিচ্ছেন।
জোজেফিন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। এর আগে বলেছি যে, নেপোলিয়ন অভিজাত পরিবার থেকে আসেননি। কিন্তু যখন তিনি উঁচু পদে আসীন হলেন, খানিকটা আভিজাত্য অর্জনের প্রয়োজন পড়ল। এখন জন্ম-ইতিহাস তো বদলাবার উপায় নেই। আরেকটা উপায় অবশ্য আছে, অভিজাত পরিবারের কাউকে বিয়ে করা। সেরকম একজনকে পাওয়াও গেল। ভদ্রমহিলা দেখতে-শুনতে ভালো। বিধবা। প্রথম স্বামী ফরাসি বিপ্লবের সময় ‘সন্ত্রাসের রাজত্বে’ গিলোটিনে প্রাণ হারিয়েছিলেন। জোজেফিন কোনোমতে গিলোটিনের হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন।
নেপোলিয়নের চেয়ে জোজেফিন ছিলেন ছয় বছরের বড় এবং দুই সন্তানের জননী। তবে প্যারিসের অভিজাত সমাজে তাঁর দারুণ ওঠাবসা ছিল। নেপোলিয়নের দরকার ছিল সেই সামাজিক মর্যাদা। আর জোজেফিনের দরকার ছিল আর্থিক নিরাপত্তা। অর্থাৎ দুজনের পক্ষেই লাভজনক। সুতরাং ১৭৯৬ সালে দুজনের বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের মাত্র দুদিন পরই নেপোলিয়নকে তাঁর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে ইতালিতে চলে যেতে হয়। নতুন স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে, আর জোজেফিন প্যারিসে একা। এই সুযোগে তিনি ইপোলিত শার্ল নামের এক সুদর্শন ফরাসি সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লেন। আসলে তিনি শুরুতে নেপোলিয়নকে মন থেকে ভালোবাসেননি, সেই সুযোগও হয়নি। ওদিকে নেপোলিয়ন তখন সদ্য ছেড়ে আসা নববধূর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ইতালির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি প্রায় প্রতিদিনই জোজেফিনকে দীর্ঘ, আবেগঘন চিঠি লিখতেন। সেই চিঠিগুলোতে তাঁর ব্যাকুলতা, ভালোবাসা আর জোজেফিনের উত্তরের জন্য তীব্র অপেক্ষার কথা ফুটে উঠত। কিন্তু জোজেফিন খুব একটা জবাব দিতেন না, দিলেও নিতান্তই দায়সারা। একপর্যায়ে নেপোলিয়ন যখন জোজেফিনের পরকীয়ার কথা জানতে পারলেন, তাঁর হৃদয় ভেঙে গেল, চিঠিগুলোর সুরও বদলে গেল নিমেষে। পুরো ব্যপারটায় নেপোলিয়ন অত্যন্ত হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
ইতিহাস অদ্ভুত। সময়ের সঙ্গে পাশার দানও উল্টে গিয়েছিল। জোজেফিন একসময় স্বামী নেপোলিয়নের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়লেন, মানে ভালোবেসে ফেললেন। কিন্তু নেপোলিয়ন ততদিনে মোহমুক্ত হয়েছেন। জোজেফিনের সঙ্গে ১৮০৯ সালে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। কারণটা অবশ্য পরকীয়া ছিল না, ছিল মা হতে না পারা। তাঁর আগের বিয়ে থেকে দুটি সন্তান থাকলে তিনি নেপোলিয়নের সন্তানধারণে সক্ষম হননি।
কিন্তু দাভিদের এই সুবিশাল ক্যানভাসে জোজেফিনকে সম্রাজ্ঞীর মর্যাদায় ঠিকই অমর করে রাখা হয়েছে। নেপোলিয়েনের অভিষেক ঘটেছিল ১৮০৪ সালে, অর্থাৎ তখনো তাঁরা দুজন স্বামী-স্ত্রী। ছবিতে নেপোলিয়ন নিজে দাঁড়িয়ে মুকুট পরাচ্ছেন, আর জোজেফিন নতজানু হয়ে তা গ্রহণ করছেন। ক্যানভাসের এই দৃশ্যটি যেন ইতিহাসের সেই অদ্ভুত আর জটিল সম্পর্কেরই রাজকীয় প্রতিভাস।
লুভ্রে আরও দেখেছি ওজেন দ্যলাক্রোয়ার সেই বিখ্যাত ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’। অবধারিতভাবেই এর পেছনেও আছে ইতিহাস। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতনের পর ফ্রান্সে আবারও রাজতন্ত্র ফিরে আসে। ক্ষমতায় বসেন দশম চার্লস। ইনি সেই গিলোটিনে মারা যাওয়া সম্রাট ষোড়শ লুইয়েরই ছোটো ভাই। অর্থাৎ ক্ষমতা আবারও সেই একই পরিবারের কাছে ফিরে এলো। স্বভাবতই ফরাসি বিপ্লব নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস থাকার কথা নয়। কিন্তু ইনি ছিলেন দরকারের চেয়েও বেশিরকমের উগ্র। আবারও সেই পুরোনো স্বৈরাচারী জমানায় ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি এমন সব কাজ করলেন যে ১৮৩০ সালে সাধারণ মানুষ ত্যক্তবিরক্ত হয়ে আবারও প্যারিসের রাজপথে নামতে বাধ্য হলো। শুরু হলো তিন দিনের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান—যাকে বলা হয় ‘জুলাই বিপ্লব’। এই সেই জুলাই বিপ্লব, যার স্মরণে বাস্তিলে জুলাই-স্তম্ভ গড়া হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই বেসামাল হয়ে পড়ল যে ক্ষমতা-টমতা ছেড়ে দশম চার্লস সপরিবারে ইংল্যান্ডে পালিয়ে বাঁচলেন।
দ্যলাক্রোয়া দেশের জন্য নিবেদিত শিল্পী ছিলেন, মানুষের অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। সেই আবেগ আর দেশপ্রেমের মিশেলেই বিপ্লব-স্মরণে তিনি আঁকলেন তাঁর কালজয়ী চিত্রকর্ম—‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’।
ছবিতে তেরঙা ফরাসি পতাকা হাতে যে নারীকে আমরা দেখি, তিনি কোনো ব্যক্তিবিশেষ নন। তিনি ফরাসি প্রজাতন্ত্র আর স্বাধীনতার প্রতীক। তাঁকে ঘিরে আছে সমাজের নানা স্তরের মানুষ—ধনাঢ্য বুর্জোয়া থেকে সাধারণ শ্রমিক, এমনকি দুহাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরা এক কিশোরও। অর্থাৎ এ লড়াই কারোর একার নয়, সকলের। ওই কিশোর চরিত্রটিই পরে ভিক্টর হুগোকে তাঁর ‘লে মিজারেবল’ উপন্যাসের বিখ্যাত গাভ্রোশ চরিত্রটি তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
অনেকে কৌতূহলী হয় এ কথা ভেবে যে—নারীটির স্তনযুগল উন্মুক্ত কেন? স্তন এখানে কামজর্জর কিছু নয়। নারীটি এখানে দেশমাতৃকা, যিনি শত প্রতিকূলতাতেও তাঁর সব সন্তানকে পরম মমতায় আগলে রাখেন, খাবার জোগান।
পের লাশেজ সিমেট্রি প্রসঙ্গে দ্যলাক্রোয়ার সমাধির কথা বলেছিলাম। এই প্রসঙ্গ ধরে বলি, গিয়েছিলাম প্যারিসে তাঁর জন্য নিবেদিত একটি আলাদা মিউজিয়ামেও। জায়গাটা দ্যলাক্রোয়ার বসবাস করা সর্বশেষ অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। ফরাসিরা আধুনিকতার নামে বাড়িঘরের বেখাপ্পা সংস্কার করে না, প্যারিসে সেরকম করার অনুমতিও নেই। ফলে বাড়িটায় এখনো আঠারো শতকের ছাপ। ছোট হলেও চমৎকার সাজানো-গোছানো মিউজিয়াম। ইংরেজি-বলিয়ে গাইড নিতে পারলে অবশ্য আরো ভালো হতো, তবে তাতে কিছুটা অতিরিক্ত খরচা পড়ে যায়। যাইহোক, নিজে নিজেই সময় নিয়ে সবগুলো কাজ দেখলাম। দোতলা ভবন। সবমিলিয়ে তিনটা কক্ষকে গ্যালারি বানানো হয়েছে, অর্থাৎ খুব বেশি বড়ো নয়। তাছাড়া এখানে তাঁর সব কাজও নেই, ছড়িয়েছিটিয়ে আছে সারা বিশ্বজুড়ে। এক লুভ্রেই আছে পঞ্চাশটিরও বেশি চিত্রকর্ম। অল্প কিছু আছে প্যারিসেরই আরেক বিখ্যাত জাদুঘর দর্সে-তে।
দ্যলাক্রোয়া জাদুঘরের প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের পাশাপাশি শিল্পীর নিজস্ব সংগ্রহশালা এবং আঁকার কাজে ব্যবহার্য জিনিসপত্রও রাখা ছিল। আমার সবচেয়ে পছন্দ হলো দ্যলাক্রোয়ার স্টুডিওটা। মূল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কয়েক ফিট দূরত্বে অবস্থিত একটা আলাদা ভবনে। মূল বাসভবনের সঙ্গে সেটাকে সিঁড়িযুক্ত প্যাসেজ দিয়ে যুক্ত করা, সহজে যাতায়াত করা যায়। এই ধারণাটাকে আমি সমর্থন করি বলে বিশেষ ভালো লাগল। সৃজনশীল কাজের সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীরই বিস্তর সম্পর্ক আছে, তবে একজন সৃজনশীল মানুষকে স্রেফ বাস্তবতাই সর্বক্ষণ পীড়িত করবে—সেটাও ভীষণ অন্যায়। যেকোনো সৃষ্টির কাজ একধরনের ধ্যানমগ্নতার দাবি রাখে; নৈমিত্তিক সাংসারিক পরিবেশে সেটা সম্ভব হয় না। খানিকটা বিচ্ছিন্নতার প্রয়োজন পড়ে।
দ্যলাক্রোয়ার কাজে রোমান্টিসিজমের প্রভাব বেশি, ফলে অনুভূতির প্রকাশও অনেক বেশি শক্তিশালী। ব্যবহৃত রং আর স্ট্রোকে এই তীব্রতা চোখে পড়ে। ইম্প্রেশনিজমের মতো রোমান্টিসিজমও প্রথাগত অ্যাকাডেমিক আর্টকে চ্যালেঞ্জ করে। শিল্পকে স্রেফ সৌন্দর্যময় অবজেক্ট করে না তুলে সাবজেক্টিভিটিকে প্রাধান্য দেয়। বলাই বাহুল্য, ফরাসি শিল্প-সমালোচকরা তখনো এসবের জন্য পুরোপুরি তৈরি নন, ফলে ওই সময়ে তাঁর কাজের এই শৈলী রীতিমতো বৈপ্লবিক।
আমি নিয়মিত যে লাইব্রেরিতে যেতাম, সেটাতেই একটি বিখ্যাত মডার্ন আর্টের জাদুঘর আছে। পোঁপিদু জাদুঘর। নামকরণ হয়েছে সাবেক ফরাসি রাষ্ট্রপতি জর্জ পোঁপিদুর নামে। এতে জাদুঘর, গ্রন্থাগার, সংগীত গবেষণাগার ইত্যাদি রয়েছে। জাদুঘরে ঢুকেছি একবারই।
পোঁপিদু সেন্টারের বিশেষত্ব হলো এর স্থাপত্যশৈলী, যা inside-out বা ভেতর-বাহির উল্টো করা। অর্থাৎ একটা বহুতল ভবনে যেসব জিনিস ভেতরে থাকার কথা, সেগুলো এই ভবনে বাইরের দিকে—যেমন বায়ুনিষ্কাশনের নল, পানির পাইপ, চলন্ত সিঁড়ি ইত্যাদি। মজার বিষয় হলো এগুলো আবার রং অনুযায়ী আলাদা করা। বায়ু চলাচলের টিউবগুলো নীল রঙের, বিদ্যুতেরগুলো হলুদ, পানিরগুলো সবুজ আর এসকেলেটরেরগুলো লাল। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য ভবনটিকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
সেন্টার পোঁপিদু-তে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর সৃষ্টিকাল ১৯০৫ সাল থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত। অর্থাৎ কেবল সমসাময়িক নয়, যুগসন্ধিক্ষণের বিভিন্ন কাজও এতে রয়েছে। রয়েছে পাবলো পিকাসো, অঁরি মাতিস, যোয়ান মিরোর মতো শিল্পীদের কাজ। আমার খুব আফসোস হয়েছিল যখন জেনেছি যে আমার প্রিয় শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর একটা এক্সিবিশন কিছুদিন আগে এখানে হয়ে গেছে।
মডার্ন আর্ট নিয়ে আমার জানাশোনা কম। তবে পোঁপিদুতে এর পরিধির ব্যাপকতা দেখে বিস্মিত হই। অনুভব করতে পারি যে শিল্পের আক্ষরিক অর্থেই কোনো সীমারেখা নেই। কেবল বিমূর্ত চিত্রকর্মেই নয়, নানা আকৃতির ভাস্কর্যেও এই দ্রোহের দেখা মেলে—যেগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে প্রথাগত সংজ্ঞা কিংবা ধারণাকে ভেঙেচুরে ফেলার সুতীব্র ইচ্ছে। তারপরও অবশ্য আধুনিক শিল্পকলাকে অনেক মানুষ উঁচুদরের কাজ বলে বিবেচনা করেন না। তাঁদেরকে গণহারে বেরসিক বলাটাও আবার ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এই তালিকায় বড় বড় নাম আছে। সহজ উদাহরণ হিসেবে এই মুহূর্তে সত্যজিৎ রায়ের কথা মনে পড়ছে। তাঁর ‘শিল্পী’ শিরোনামের ছোটগল্পটা পড়লে বোঝা যায় যে—তিনি বিমূর্ত শিল্পকে শিল্পের কাতারেই ধরতেন না। এসব ক্ষেত্রে সমালোচকদের অত্যন্ত কর্কশ কিন্তু খুবই জনপ্রিয় একটি তত্ত্ব হচ্ছে—কনটেম্পোরারি আর্ট হলো এমন অলস ও অদক্ষ লোকেদের শিল্পী সাজার চেষ্টা যারা প্রথাগত শিল্পে বিশেষ পারদর্শী নয়। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, অনর্থক বিরোধের সূত্রপাতও ঠিক এই জায়গাটা থেকেই হয়। শিল্প জিনিসটা নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ীই বড় বেপরোয়া ও গতিশীল। একে কিছু নির্দিষ্ট ছাঁচে বন্দি করে রাখার চেষ্টাটাই বরং সমস্যাজনক। আধুনিক শিল্পকর্মকে বরং আমি আধুনিক মানবজীবনের জটিলতার প্রতিচ্ছবি হিসেবেই দেখি। কিছু কিছু কাজ দেখলে যেমন প্রবল শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়, তেমনি কিছু কাজ অস্বস্তিতে ফেলে। আর আঙ্গিকের বৈচিত্র্যের কথা তো আগেই বলছি। পোঁপিদুতে এমনও দেখেছি—আস্ত ঘরটাই একটা শিল্পকর্ম, যেমন জার্মান শিল্পী ইওজেফ বয়েসের ‘প্লাইট’। এই কাজটিতে পুরো একটি ঘরের দেয়াল ভারী পশমি কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে, আর মাঝখানে রাখা হয়েছে একটি নীরব পিয়ানো এবং একটি ব্ল্যাকবোর্ড; বন্দিদশা আর স্তব্ধতার অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে জায়গাটা। বলা হয় নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে কাজটার সম্পর্ক রয়েছে, যদিও ইউজেফ সেরকম সরাসরি বলেননি কখনো। অন্যদিকে অপটিক্যাল ইল্যুশন বা দৃষ্টিবিভ্রমও কিছু আর্টের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যেমন ইয়াকভ আগামের ‘সালোঁ আগাম’। এই ঘরটিতে হাঁটাহাঁটি করলে দেয়ালের জ্যামিতিক নকশা এবং রং প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে, দর্শকের চোখে ঘোর লাগায়।
একইভাবে পোঁপিদুর কিছুদিন পর আরেকটি জাদুঘরে গিয়েছিলাম, প্যারিস মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম। এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর বিশালত্ব। বেশিরভাগ কাজই অস্বাভাবিক বড় আকারের, মাথা ঘুরিয়ে দেয় বলতে গেলে। উদাহরণস্বরূপ রাউল দুফির ‘দ্য ফে ইলেক্ট্রিসিটি’ নামের অতিকায় ক্যানভাসটির কথা বলতেই হয়। আড়াইশো প্যানেলজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল কাজটির সামনে দাঁড়ালে নিজেকে ভীষণ ক্ষুদ্র মনে হয়, যেখানে এমনিতেই আমি ছোটখাটো মানুষ!
ওখানে বিশেষ করে অঁরি মাতিসের কাজগুলো আমার মনে ধরেছে। তাঁর বিখ্যাত দেয়ালচিত্র ‘দ্য ড্যান্স’-এর বিশালত্ব আর সাবলীল রেখার কাজ চোখে কেমন আরাম এনে দেয়। এই জাদুঘরে শিল্প-আন্দোলনের প্রভাবও দেখা যায়, যেমন ‘ফভিজম’। ফরাসি ভাষায় ‘ফভ’ মানে বন্যজন্তু। ফভিজমের শিল্পীরা বাস্তব রঙের তোয়াক্কা না করে উগ্র আর যথেচ্ছ রঙের ব্যবহার করতেন। ফলে সমালোচকরা বিরক্ত হয়ে তাঁদেরকে ‘বন্যজন্তু’ উপাধি দিয়েছিলেন, বিশৃঙ্খল অর্থে আরকি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেই গালিই পরে বিখ্যাত আর্ট মুভমেন্টের নামে পরিণত হয়। অনেকটা ক্লদ মোনের সেই ঘটনার মতো, যেখানে সমালোচকদের ব্যবহার করা শব্দ থেকে ইম্প্রেশনিজম কথাটা চালু হয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে সমালোচকরা কিছু কিছু ভালো কাজও করে!
মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে পরাবাস্তববাদ বা সারিয়ালিজমেরও চমৎকার কিছু কাজ দেখেছি আমি। বাস্তব আর কল্পনার ভেতরকার সূক্ষ্ম সুতোটাকে সরিয়ে, চেনা রূপকে দুমড়েমুচড়ে ফেলতে দেখলে মন্দ লাগে না। যেমন ভিক্টর ব্রাউনারের ‘দ্য সারিয়ালিস্ট’ পেইন্টিংটির কথাই ধরা যাক, যেখানে চেনা পৃথিবীর বস্তুগুলোকে স্বপ্নের মতো অবাস্তব এবং রহস্যময় এক সমীকরণে দাঁড় করানো হয়েছে।
পিকাসো মিউজিয়ামের অবস্থানও প্যারিসে। সপ্তদশ শতাব্দীতে তৈরি একটি প্যারিসিয়ান বিলাসবহুল ভবন এখন পৃথিবীতেই পিকাসো-সংক্রান্ত সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালা। পিকাসো প্যারিসে প্রথম এসেছিলেন ১৯০০ সালে। আরও কয়েক বছর পর তিনি পাকাপাকিভাবে এখানেই থিতু হন। অবশ্য প্যারিসে আসার পর তিনি মমার্ত্রে এলাকায় এমন একটা জরাজীর্ণ ভবনে থাকতেন, যেখানে থাকাটা আক্ষরিক অর্থেই শাস্তির মতো ছিল। কিন্তু সেখানে বসেই কিউবিজম-সংক্রান্ত কালজয়ী কাজগুলো করেন তিনি। কিউবিজম আর্টের এমন একটা ফর্ম—যেখানে একটা বড়ো জিনিসকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে জ্যামিতিক বিভিন্ন আকার দেওয়া হয় এবং বিভিন্নভাবে ক্যানভাসে বসানো হয়। মজার ব্যাপার হলো, এর প্রেরণা কিন্তু পিকাসো পেয়েছিলেন ওই ব্রঁলি জাদুঘরে দেখা আদিবাসী আফ্রিকান মুখোশগুলো থেকে। আফ্রিকান লোকশিল্পে অতি সরল কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী জ্যামিতিক প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট। পিকাসোর দেখার চোখই বদলে দিয়েছিল সেগুলো, যা পরবর্তীতে আধুনিক শিল্পের মাইলফলক তৈরি করে।
আমি আগে পিকাসোর কয়েকটির বেশি পেইন্টিং দেখিনি। ভালো লেগেছে আমার। জাদুঘরটি এমনভাবে সাজানো যাতে পিকাসোর রিয়ালিজম থেকে কিউবিজমে উত্তরণের ইতিহাস বোঝা যায়। গ্যালারিগুলো ধারাবাহিক, মানে সময়ের সঙ্গে কীভাবে পিকাসো তাঁর কাজের ধরন বদলেছেন সেটির ধারণা দেয়। এই জাদুঘরে পিকাসোর নিজের কাজই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীর কিছু কাজও রাখা আছে। আছে ব্যক্তিগত সংগ্রহের বিভিন্ন ভাস্কর্য, মুখোশ ইত্যাদিও।
পরদিন গিয়েছিলাম ম্যুজে দ্য লরাঁজেরি দেখতে। দর্সে বা লুভ্রের মতো অতটা বিশাল না হলেও এই জাদুঘরটার ভেতরে খুব স্নিগ্ধ আর চমৎকার একটি অভিজাত বা ‘পশ’ ব্যাপার আছে। ক্লদ মোনের কাজ আমার ভীষণ ভালো লাগে, যদিও কিছু পরিকল্পনার গোলমালে প্যারিসে অবস্থিত তাঁর একক মিউজিয়ামটিতে যেতে পারিনি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা হয়নি ইম্প্রেশন, সানরাইজ-ও। লরাঁজেরি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত মোনের ‘ন্যাঁফেয়া’ বা জলপদ্মের সুবিশাল ক্যানভাসগুলোর জন্য। এখানে দুটি ডিম্বাকৃতির ঘর আছে। মোনের নির্দেশনাতেই এগুলো নকশা করা হয়েছিল। দীর্ঘ বাঁকানো দেয়ালজুড়ে থাকা এই ক্যানভাসগুলোর সামনে দাঁড়ালে চারপাশের কোলাহল থেকে সহসা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। মনে হয় সত্যিই বুঝি জলপদ্মে ভরা পুকুরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। মোনের উদ্দেশ্যও ছিল এরকমই।
জীবনের শেষভাগে মোনের চোখে ছানি পড়েছিল। বলা যায় প্রায় অন্ধই হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ক্রমশ ছানির পুরুত্ব বেড়ে যায়, দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হতে থাকে। হলদে একটা ফিল্টারের মতো কাজ করতে থাকে সেই ছানি, মানে ইয়েলো ভিশন। ফলে তাঁর রঙের প্যালেটেও প্রভাব পড়ে। আগে যাঁর ক্যানভাসে নীল আর সবুজের আধিক্য ছিল, সেখানে স্থান করে নেয় লাল, মেটে, কমলার মতো তীব্র রং। শল্যচিকিৎসা করাতে পারতেন, কিন্তু তখন সেটা আজকের মতো এত নিরাপদ ছিল না। মোনে ভয়ও পেতেন। ভালো করতে গিয়ে যদি চোখজোড়াই চলে যায়, তবে তাঁর আর থাকবে কী! তবু একপর্যায়ে বাধ্য হলেন সার্জারি করাতে। ঠিকঠাক হলোও। কিন্তু তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ব্লু ভিশন। মোনে তখন তাঁর ছানি-পড়া অবস্থায় আঁকা ছবিগুলো দেখে নিজেই আঁতকে উঠতে লাগলেন। এত লাল ব্যবহার করেছি কেন! অনেকগুলো ছবি নিজহাতে নষ্টই করে ফেলেছেন। যেগুলো রেখেছিলেন, সেসবের ওপর নতুন করে ব্রাশ চালালেন। তবে ভাগ্যিস দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন, নয়তো এই জলপদ্মের ক্যানভাস তৈরি হতো না।
এবার পৃথিবীতে ইম্প্রেশনিজমের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালার কথা বলব। প্যারিসের বিখ্যাত দর্সে জাদুঘর।
ম্যুজে দর্সে গতানুগতিক জাদুঘর ভবন নয়। এটি ছিল রেলওয়ে স্টেশন। ১৯০০ সালে প্যারিস সমস্ত পৃথিবীর দর্শনার্থীদের জন্য একটা বিশাল মেলার আয়োজন করেছিল। সেই বিশ্বমেলার জন্যই দর্সে নামের এই জাঁকজমকপূর্ণ স্টেশনটি বানানো হয়েছিল। কিন্তু রেলের প্রযুক্তি উন্নত হয়ে পড়ায় এত ছোট প্ল্যাটফর্ম আর ব্যবহারযোগ্য ছিল না। তবে ভাঙা হয়নি, যদিও বিভিন্ন সময়ে ভাঙার কথা উঠেছে। ১৯৮৬ সালে এটি জাদুঘর হিসেবে চালু হয়। তবে স্টেশনের কাঠামো আর অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখনো স্পষ্ট।
একটা বড় সময় ধরে আর্টের জগৎ দাপিয়ে বেড়িয়েছে অ্যাকাডেমিক আর্ট। কাজ হতে হবে ছকে বাঁধা, ছবি হবে নিখুঁত, এতটাই নিখুঁত যে ব্রাশের দাগ অব্দি বোঝা যাবে না। সাবজেক্টের দিক থেকেও ধরাবাঁধা ব্যাপার ছিল। আইডিয়ালিজম আর এলিটিজমের বাইরে এগুলোর বেরোনোর সুযোগ ছিল না। মানে, পুরাণের দেবদেবীর ছবি, রাজারাজড়ার ছবি এইসব আরকি। এবং যা কিছু কুৎসিত, কঠোর বাস্তব সেসব অগ্রাহ্য করতে হবে। ধরুন একজন রাজার মুখে একটা আঁচিল আছে। বিচ্ছিরি দেখতে। ছবিতে এই বাজে জিনিসটা আনা চলবে না। এখন ফটোশপে যেমনটা করা হয় আরকি। এইসব আইডিয়ালাইজড আর্ট স্বভাবতই স্বাধীন শিল্পীসত্তাকে ক্লান্ত করতে থাকে। তাছাড়া সময় বদলাচ্ছিল। অ্যাকাডেমিক আর্ট সেই পরিবর্তিত সময়কে ঠিকঠাক ধারণ করতে পারছিল না। এসময় দৃশ্যপটে এলেন ক্লদ মোনে। ১৮৭৪ সালে তিনি একটি সূর্যোদয়ের ছবি এঁকেছিলেন। কিন্তু ছবিটা কেমন যেন অস্পষ্ট, তুলির আঁচড়গুলো কেমন ঘোলাটে, দ্রুত চালানো। তখনও সমালোচকদের চোখ থেকে অ্যাকাডেমিক আর্টের সেকেলে লেন্স নামেনি। ফলে তাঁরা এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “এগুলো ছবির পর্যায়েই পড়ে না। মামুলি ইম্প্রেশন বা অস্পষ্ট ছাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
তো ইম্প্রেশন নামটা এখান থেকেই এল। ইম্প্রেশনিজমও। ওই যে বলেছিলাম, সমালোচকরাও মাঝে মাঝে ভালো কাজ করে ফেলে!
দর্সের গ্যালারিতে দেখলাম এদুয়ার মানে-র বিখ্যাত ছবি ‘ল্য দেঝুনে সুর লের্ব’ বা ঘাসের ওপর মধ্যাহ্নভোজ। ওই সময়ে ছবিটা নিয়ে রীতিমতো ছিছি রব উঠেছিল। দুজন পুরোপুরি ভদ্রস্থ পোশাক পরা আধুনিক ফরাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে সম্পূর্ণ নগ্ন একজন নারী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে পিকনিক করছেন, আর সরাসরি সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। অ্যাকাডেমিক আর্টের যুগে দেবী বা পৌরাণিক চরিত্রে নগ্নতা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু তাই বলে রোজকার রক্তমাংসের সাধারণ নারীকে নগ্ন আঁকলে কীভাবে চলবে? রক্ষণশীলরা অনেক তোড়জোড় করে সরকারি প্রদর্শনী থেকে এটিকে বাতিলও করিয়েছিল। বলাই বাহুল্য, এসব বালখিল্য প্রতিবাদ বেশিদিন টেকে না।
দর্সেতে আমি নিচ থেকে ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠছিলাম। ভিনসেন্ট ভ্যান গগ গ্যালারির অবস্থান পাঁচতলায়। স্বভাবতই সেখানে যেতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। কক্ষে ঢোকার আগে লক্ষ করলাম—হাত-পা অল্প অল্প কাঁপছে।
ভ্যান গগের বেশিরভাগ কাজের অবস্থান নেদারল্যান্ডের দুটি জাদুঘরে। তবে দর্সের বিশেষত্ব অন্যখানে। এখানে মাত্র চব্বিশটি পেইন্টিং থাকলেও এগুলো ভ্যান গগের জীবনের একেবারে শেষদিকের কাজ। ভ্যান গগের অ্যাসাইলাম জীবন, আত্মহত্যা, সমাধি সবই ফ্রান্সে। এখানে যেসব পেইন্টিং আছে তার মধ্যে রয়েছে অ্যাসাইলামে থাকাকালে আঁকা সেল্ফ-পোর্ট্রেট, মৃত্যুর আগের শেষ সত্তর দিনে আঁকা দুটি প্রখ্যাত ছবি—ওভ্যারের গির্জা (মৃত্যুর আগে যেখানে থাকতেন তার কাছাকাছি ছিল এই চার্চের অবস্থান) এবং চিকিৎসক পল-ফার্দিনান্দ গাশের পোর্ট্রেট (ভ্যান গগের শেষ দিনগুলোতে যিনি তাঁর দেখভাল করেছেন)।
তবে এখানকার সবচেয়ে মূল্যবান স্টার—‘স্টারি নাইট ওভার দ্য রোন’। সামনে গিয়ে আমি হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম দীর্ঘক্ষণ। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ‘দ্য স্টারি নাইট’ আঁকার সময়ে তিনি অ্যাসাইলামে ছিলেন। এর ঠিক আগের বছরে, মানে ১৮৮৮ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সের আর্ল শহরে বসে তিনি ওভার দ্য রোন এঁকেছিলেন। রোন নদীর অবস্থান ওই শহরেই। ছবি দুটোতে তাঁর মানসিক অবস্থার প্রতিফলনও লক্ষ করা যায়। রোনে যেটা এঁকেছিলেন তা স্নিগ্ধ, কোমল, খানিকটা রিয়েলিস্টও। অন্যটায় প্রকাশ পেয়েছে সুতীব্র ঝঞ্ঝা, মনের বিক্ষিপ্ততা এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী আবেগ। অবশ্য রোনেও তিনি খুব সুস্থির ছিলেন বলা যাবে না। তীব্র মানসিক চাপে পড়ে নিজের কান কেটে ফেলার ঘটনাটি ওখানে থাকাকালেই ঘটে।
দ্য স্টারি নাইটের অবস্থান নিউ ইয়র্ক জাদুঘরে। আমার বাকেট লিস্টে আছে, বলাই বাহুল্য।
শেষ করি রদ্যাঁ মিউজিয়াম দিয়ে। নামটা প্রথম জানা প্রমথ চৌধুরীর ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের সুবাদে। তিনি লেখাটা শুরু করেছিলেন ঠিক এভাবে:
“জগৎ-বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁ, যিনি নিতান্ত জড় প্রস্তরের দেহ থেকে অসংখ্য জীবিতপ্রায় দেব-দানব কেটে বার করেছেন তিনিও, শুনতে পাই, যখন-তখন হাতে কাদা নিয়ে, আঙুলের টিপে মাটির পুতুল ত’য়ের করে থাকেন। এই পুতুল গড়া হচ্ছে তাঁর খেলা। শুধু রোদ্যাঁ কেন, পৃথিবীর শিল্পীমাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন।”
সেই জগৎবিখ্যাত ভাস্কর ওগ্যুস্ত রদ্যাঁর জাদুঘরে যাওয়ার আগে আমার জানা ছিল, এই জাদুঘরে সবচেয়ে সেরা নিদর্শন ‘দ্য থিঙ্কার’ বা চিন্তক (Le Penseur)। দর্শন ও শিল্পকলা, উভয় জগতে ভাস্কর্যটির আবেদন অসামান্য। দান্তের অমর সৃষ্টি ‘ডিভাইন কমেডি’-র কল্পবিশ্বকে অনুসরণ করে রদ্যাঁ গড়েছিলেন ‘নরকের দরজা’। এই থিঙ্কার মূলত সেই দান্তেরই প্রতিরূপ, যিনি নরকের দরজার ঠিক ওপরে বসে নিচের অভিশপ্ত আত্মাদের দেখছেন আর জীবনের পরিণতি নিয়ে ভাবছেন। পরে অবশ্য মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে ভাস্কর্যটি নিজেই কিংবদন্তি হয়ে ওঠে, যা কালক্রমে সমগ্র মানবজাতির চিন্তাশীলতার প্রতীক।
বাইসন শিকারের কিংবা ম্যামথের সমকালে, কিংবা তারও অনেক আগে কেউ একজন চিন্তা করতে শুরু করেছিল। শুরুটা সবসময় একজনই করে। আজকের বিস্ময়কর সভ্যতার স্ফুলিঙ্গ ছিল ওই চিন্তাটুকু। খুব সাধারণ, কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী এই ধারণা আজ পৃথিবীজুড়ে সমাদৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে দীর্ঘদিন এই ভাস্কর্যের ছবি আমার ফোনের ওয়ালপেপার ছিল। ভাস্কর্যটির একাধিক ব্রোঞ্জ ও প্লাস্টার কপি আছে, তার কিছু কিছু রদ্যাঁর তত্ত্বাবধানেই বানানো হয়েছিল। আমি অবশ্য দর্সে জাদুঘরেও থিঙ্কারের একটি ছোট কপি দেখেছি, এখানে আসার ঠিক আগের দিনে। তবে ব্রোঞ্জের যে বিশাল ভাস্কর্যটি রদ্যাঁ জাদুঘর প্রাঙ্গণের বাগানে বেদির ওপর রাখা আছে, সেটি সামনে থেকে দেখার অনুভূতি একদম অন্যরকম। মনে হলো, অবশেষে!
রদ্যাঁ জাদুঘরের বাইরের দিকে রাখা আছে তাঁর সেই মূল অবিস্মরণীয় কীর্তি ‘দ্য গেটস অব হেল’ বা নরকের দরজা। দান্তের ইনফার্নো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রদ্যাঁ তাঁর জীবনের প্রায় সাঁইত্রিশ বছর ব্রোঞ্জের দরজাটি বানানোর পেছনে ব্যয় করেছিলেন। বিস্ময়কর তথ্য হলো, তাঁর জীবদ্দশায় এই অতিকায় দরজাটি কখনোই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কেবল ‘দ্য থিংকার’ নয়, তাঁর আরেক বিখ্যাত কাজ ‘দ্য কিস’, এগুলোর সবই নরকের দরজার বিভিন্ন চরিত্র হিসেবে প্রাথমিকভাবে নকশা করা হয়েছিল।
‘দ্য কিস’ ভাস্কর্যটিতে দেখানো হয়েছে দান্তের ইনফার্নোর দুই অভিশপ্ত প্রেমিক-যুগল পাওলো এবং ফ্রান্সেস্কাকে। একটা ঈদসংখ্যায় ভাস্কর্যটি নিয়ে পড়েছিলাম। দূর থেকে দেখলে মনে হয় তারা দুজন গভীর চুম্বনে মগ্ন। কিন্তু খুব কাছ থেকে খেয়াল করলে দেখা যায়—তাদের ঠোঁট আসলে একে অপরকে স্পর্শই করেনি! রদ্যাঁ মূলত চুম্বন করতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটিকেই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, কারণ দান্তের গল্প অনুযায়ী ঠিক তখনই ফ্রান্সেস্কার স্বামীর হাতে এরা দুজন ধরা পড়ে আর খুন হয়। লেভেল অব ডিটেইল, ম্যান! ডিটেইল জিনিসটাই আসলে ভয়াবহ সেক্সি, হোক সেটা কথাসাহিত্যে কিংবা মিউজিকে কিংবা আর্টে।
রদ্যাঁর ওনরে দ্য বালজাকের ভাস্কর্যের কথা তো বলতেই হয়। সুবিশাল বালজাকের অবস্থান জাদুঘর চত্বরে, সবুজ ঘাসের মাঝখানে। ভেতরেও বালজাকের ছোটবড় প্রচুর খসড়া কাজ আর অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য আছে। বালজাকের একজন সুবিখ্যাত অনুরাগী ছিলেন রদ্যাঁ। অবসেসড ছিলেন বললেও হয়। ভাস্কর্যটি নিখুঁত করতে তিনি বালজাকের জন্মস্থানে গিয়ে তাঁর শরীরের মাপজোক সংগ্রহ করেছিলেন, এমনকি তাঁর পুরোনো দর্জির কাছ থেকে পোশাকের মাপও নিয়েছিলেন। ডিটেইল তো আর উড়ে উড়ে আসে না!
কিন্তু এত প্রস্তুতির পরও চূড়ান্ত ভাস্কর্যটির জন্য তিনি প্রচুর সমালোচনা শুনেছেন। ভাস্কর্যটি ঠিক প্রথাগত ছাঁচের না হওয়াতে সমালোচকরা একে ‘বিকৃত’, ‘বস্তায় ভরা কুনোব্যাঙ’ ইত্যাদি বিচিত্র অভিধা দেন। এমনকি ভাস্কর্যটি তৈরির কার্যাদেশ যারা দিয়েছিল, সেই ফরাসি লেখক সংস্থাও প্রথাবিরোধী ভাস্কর্যটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। রদ্যাঁ মূলত বালজাকের দৈহিক অবয়বের চেয়ে তাঁর ভেতরের অতিকায় বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাটিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁকে একটি ঢিলেঢালা গাউনে আবৃত করে কেবল মুখমণ্ডলটিকে প্রবলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীতে লোকে এর শক্তিশালী দিকগুলো বুঝতে সক্ষম হয়। বালজাক মানুষ হিসেবে যেমনটা ছিলেন, একজন শক্তিমান পুরুষ যিনি রীতিনীতির তোয়াক্কা করেন না, একগুঁয়ে, সাহসী; এই বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলাই ভাস্কর্যটির মূল উদ্দেশ্য ছিল।
এবারে ঠিক জাদুঘরের কথা বলব না। বলব পিগাল এলাকার কথা। প্যারিসের বিখ্যাত রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট বা নিষিদ্ধপল্লী। উনিশ শতকের শেষদিকে প্যারিস শহরের মূল সীমানার বাইরে ছিল এই এলাকা। ফলে এখানে মদ বা অন্যান্য জিনিসের ওপর রাক্ষুসে ট্যাক্স ছিল না। ঘরভাড়া ছিল জলের দরে। তাই কপর্দকশূন্য, আধপেটা বোহেমিয়ান শিল্পীদের জন্য এটা ছিল একেবারে আদর্শ জায়গা। সস্তা মদ, সস্তা ঘর, আর আঁকার মডেল হিসেবে হাতের কাছেই যৌনকর্মী। আর কী চাই!
শিল্পের ইতিহাস কেবল জাদুঘরের আলো-ঝলমলে দেয়ালেই আটকে নেই। লুকিয়ে আছে এই শহরের সস্তা পানশালা আর অন্ধকার গলিতেও। এই গলিগুলো থেকেই উঠে এসেছেন রেনোয়া, তুলুজ-লোত্রেক বা পিকাসোর মতো কিংবদন্তি, আর এখানেই প্যারিসের জাদুঘরনামা এক সম্পূর্ণ চক্রে এসে মেশে, যেখানে সৃষ্টির আলো আর জীবনের অন্ধকার একে-অপরকে আলিঙ্গন করে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।