মি জন্মানোর সময়ে মায়ের বয়স নেহাত কম নয়। অমন বয়সে বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল—তার ওপরে মা বরাবরই হাঁপানির রোগী; দেহ এমনই শুকনো যেন হাড়ের ওপর দিয়ে যত্ন করে চামড়া সেঁটে বসানো, মাংসের কোনো বালাই নেই। ছোটোখাটো রোগ তো সারাবছরই লেগে থাকতো।

তো এই অবস্থায় আমি এলাম। নিয়মরক্ষার তাগিদে চতুর্দশ সন্তানের জন্ম দিয়ে মা আবার শয্যাগত হলেন। যমে-মানুষে কদিন বেশ টানাটানি চললো। মায়ের বুক থেকে দুধ পাওয়ার আশা নেই। আমার মেজোভাই, যিনি আমার দেড়কুড়ি বছরের বড়ো—অত্যন্ত ধুরন্ধর লোক—সুলুকসন্ধান করে কোত্থেকে আমার এক সদ্যপ্রসূতা দুঃসম্পর্কীয় খালার খোঁজ আনলেন। তাঁর তেইশদিন বয়সী বাচ্চার একচ্ছত্র আধিপত্য ক্ষুণ্ণ করে একটি দুগ্ধপূর্ণ স্তন দখলে নিয়ে নিলাম আমি। মাসান্তে কিছু টাকার বিনিময়ে আমার এই অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হলো। তা-ই সই। বাচ্চার জীবন আগে।

দিনবিশেক এভাবে চলার পর আমার জীবনদাত্রী খালাটিকে নিয়ে হুট করে মেজোভাই গায়েব হয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় চিঠি রেখে গেছেন—নিজের বাড়ি, সংসার, এসব নাকি তার কোনোকালেই ভালো লাগতো না। এখন তিনি প্রকৃত সুখ খুঁজে পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আগে থেকেই তিনি প্রায়ই ওই খালার বাড়ি গিয়ে পড়ে থাকতেন। দুগ্ধপানের কাজে তাঁকে আনাটা কাকতালীয় ছিলো না। তারচেয়েও কেলেঙ্কারির ব্যাপার হচ্ছে, ওই খালার সন্তানটিও সম্ভবত মেজোভাইয়ের ঔরসজাত। খালাটি এতটাই দুঃসম্পর্কীয় যে অজাচারের দোষ বর্তায় না, তবুও ছিছিক্কারের অন্ত রইলো না। নিজের এত ভালো একটা বৌ, আর ফুটফুটে দুটো ছেলেমেয়েকে ছেড়ে এভাবে, অ্যাঁ!

একদিকে শোয়ার ঘরের বিছানা থেকে মা’র চিঁচিঁ ধ্বনি, ভেজা কাঁথায় শোয়া আমার পিপাসার্ত তারস্বর চিৎকার, অন্যদিকে মেজোভাবির একঘেয়ে প্রলাপ আর তার বাচ্চাদের নিরন্তর কান্না মিলেমিশে বাড়িটায় এক অদ্ভুত সুরলহরী খেলে যেতে লাগলো। মেজোভাইর ইলোপ করা মহিলাটির স্বামী এসে ক’দিন বেশ ঝামেলা করলো। বাবা প্রথমদিকে বলেছিলেন—‘ছাগলটা কী বলে বলুক, কেউ পাত্তা দিবি না। সব টাকা খাওয়ার ধান্দা। আমাদের শত্রুর অভাব নেই, বুঝলি? ধৈর্য ধরে সিচুয়েশন ট্যাকল করতে হবে।’ কিছুদিন পর অবশ্য বাবা নিজেই ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন, কারণ লোকটি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাচ্চার পিতৃপরিচয় নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল কথাবার্তা বলতে শুরু করলো—পাড়াপড়শির কাছে মান রাখাই দায়। বাবার একটা চমৎকার ব্যাপার আছে। ঘরের ভেতরে যা-ই ঘটুক, বাইরের লোক যাতে না জানতে পারে, তাঁর সেই মর্যাদাজ্ঞান টনটনে। ফলে কিছুদিন পর থেকে লোকটিকে আর কখনো বাসার আশপাশে দেখা গেল না—বাবা ম্যানেজ করে ফেলেছেন। বাচ্চাটাকে একটা সরকারি শিশুকেন্দ্রের গেটের সামনে রেখে সে কোথায় যেন কেটে পড়েছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। এসব অবশ্য আমার তখন বোঝার কথা নয় মোটেও। পরে শুনেছি মেজোআপার কাছে।

জন্মাবধি বাবা আমাকে কয়বার দেখেছেন, গোনার মতো জ্ঞান থাকলে হয়তো বলে দিতে পারতাম। পরে অবশ্য জেনেছি, সন্তান উৎপাদনে তাঁর যতোখানি উদ্যম, প্রতিপালনে ততোটাই অনীহা। পছন্দের কয়েকজন ছাড়া সবার নামও জানেন না। কিন্তু দায় তো এড়ানো যায় না, বিশেষ করে বাচ্চারা একটু বড়ো হয়ে গেলে, স্কুলে-কলেজে উঠলে খরচ বেড়ে যায়। তখন তিনি কৌশলে ক্রমশ হাত গুটিয়ে ফেলতে থাকেন। সেজোভাইয়ের এসএসসি পরীক্ষার ফিস সময়মতো জমা না হওয়ায় সে ফর্ম ফিলাপ করতে পারেনি। রেগেমেগে বাবার শখের সাইকেলটাকে সে রড দিয়ে পিটিয়ে গুঁড়িয়েছিলো। বাবা তখন যা করেছেন তা আরো ভয়াবহ—তিনি পুলিশ ডেকে এনে সেজোভাইকে ধরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ অবশ্য পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছিলো, হাস্যকর জিনিসটা নিয়ে বেশি নাড়াঘাঁটা করেনি। সেজোভাইকে হাজতে একরাত রেখেই ছেড়ে দিয়েছিলো। জেল থেকে বেরিয়ে সে চলে গেল দুবাইতে, আর কোনোদিন বাড়িতে যোগাযোগ করেনি।

এমনই মানুষ আমার বাবা।

তবে শুধু সেজোভাইয়ের ঘটনা দিয়ে বাবাকে বিচার করা ভুল হবে। মেজোভাই, মেজোআপা, টুনুআপা, পিলুভাইদের সঙ্গে বাবার অসামান্য খাতির। ওদের কাছে বাবা একজন পীরের মতো। পুরো বাড়িতেও ওদেরই দাপট। আর্থিক দিক থেকে শুরু করে সব সিদ্ধান্ত ওরাই নেয়। বাকিরা হচ্ছি মাইনরিটি—কিনুদা, সিতুআপা, তিনু, আমি—আমরা—যারা ওদের ভয়ে সবসময় কেঁচো হয়ে থাকি।

তবে এই বাড়িতে সবচেয়ে বড়ো মাইনরিটি বোধহয় মা। যদিও সংসারের কেন্দ্রস্থল তিনি, তবুও তাঁকেই সবচেয়ে অপাংক্তেয় বলে মনে হয়। বিষয়টা আরো ভালো বোঝা যায় তাঁর জন্মদিনে। হ্যাঁ, মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিবছরই বাড়িতে সবচেয়ে ঘটা করে মা’র জন্মদিনটাই পালন করা হয়। বেলুনে বাড়ি ভরে যায়, রঙিন আলো লাগানো হয়, নতুন পাঞ্জাবি পরে আর আতর মেখে বাড়িময় ঘোরাঘুরি করেন বাবা, এমনকি মাঝে মাঝে ঘরোয়া গানের আসরও বসে। কিন্তু দিনশেষে যেই-কে-সেই—মা মাইনরিটি থেকে যান। ঘরোয়া বৈঠকে মায়ের চিকিৎসার জন্য আলোচনা করা হয়, বাবা চিকিৎসার জন্য অর্থবরাদ্দ করেন, কিন্তু জেনেবুঝেও বারবার সেটা তুলে দেন মেজোভাই আর টুনুআপার হাতে। ওরা ওই টাকা দিয়ে ঠিক কী ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তা আর জানা যায় না, কিন্তু মা’র অসুখও কিছুতেই ভালো হতে চায় না।

মা’র জন্মদিন উপলক্ষে আজ সকাল থেকে বাড়ি সাজছে। মেজোভাই ওই কেলেঙ্কারির পর ফিরে এসেছিলেন ক’মাস বাদেই। এখনো অবশ্য পরনারীর প্রতি তার আসক্তি যায়নি, কিন্তু সবার গা-সওয়া হয়ে গেছে—এমনকি ভাবিরও, বোধহয়। আমি তখন সদ্যসদ্য স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি, বিনাযত্নে বেড়ে ওঠা শিখছি। বেরোনোর অসময়ে মাকে দেখতে পাই, উঠোনে পাতা চেয়ারে বসে আছেন, চারিদিক দেখছেন কিংবা দেখছেন না। মুখের, হাতের চামড়াগুলো কুঁচকে আছে। আমার কেমন গা ঘিনঘিন করে। এমন অদ্ভুত বয়স্ক মা আমি আমার সমবয়সী কারোর দেখিনি। ওদিকে মেজোভাই হাঁকডাক করছেন—‘অ্যাই, এদিকটা কে সাজাচ্ছে রে? লাল বেলুনের পরে সাদা বেলুন দিবি, কতোবার করে বললাম? মা-র জন্মদিন, কারো যদি একটুও হুঁশ থাকে।’

সিতুআপা ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘দাদা, আমি সাজাচ্ছিলাম। আর ভুল হবে না।’

মেজোভাই গম্ভীর হয়ে বলে, ‘এরকম ভুল কেন হয়? জানিস না, মা’র জন্মদিন কোনো ছেলেখেলা নয়? এতে মিশে আছে কতো আবেগ, কতো ঐতিহ্য, কতো গর্ব, কতো প্রেরণা!’ বলতে বলতে দাদার গলা ধরে আসে। সিতুআপা মরমে মরে যায়।

মা এসব শুনতে পান কিংবা পান না—কিন্তু খুকখুক করে কাশেন। বয়সভারে কুব্জদেহ—একজন নিরুত্তাপ স্বার্থপর স্বামী—ছানিটা কাটাতে হত—হিনু বিদেশ গিয়ে আর খোঁজ নিলো না—চিনু বৌ-বাচ্চা ছেড়ে কী কী সব করে বেড়ায়—কাশিটা বেড়ে যাচ্ছে—টুনু পানি দিতে চেয়ে পানি দিলো না—

হঠাৎ দেখতে পাই, মা আমায় ইশারায় কাছে ডাকেন। আমাকে? আমার বিশ্বাস হয় না। ভদ্রমহিলা আমার মা, তা-ই জানতাম না অনেকদিন। আপারা চিনিয়েছে। বিস্ময়াভিভূত মুখাবয়ব নিয়ে আমি মায়ের কাছে যাই। আশ্চর্য, আমার নিজের মা! মা ধীরে ধীরে লোলচর্ম হাত বোলান আমার মুখে, ঠোঁটে, চুলে। তাঁর চোখ ভেজা। আরো অনেকবছর পর এই ভেজা চোখের রহস্য আমি বুঝবো। অস্ফুটভাবে মা হয়তো তখন এমনটাই বলছিলেন—স্নেহভরে সন্তানকে বড়ো করতে না পারা একজন অথর্ব মানুষকে কেন তোমরা জোর করে প্রতিবছর মা বানাচ্ছো?

মাস্টারদা সূর্য সেন হল
১ জুলাই ২০১৭