মনকি রুমুর বাড়ির বেড়ালগুলোও আমাকে দেখতে পারে না। এমনিতে বেশ শান্ত ওরা, কিন্তু আমাকে দেখামাত্রই অদ্ভুতভাবে খেঁকিয়ে ওঠে। শুধু ওদেরই বা দোষ কী, আমি বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখামাত্র পুরো বাড়ির পরিবেশটাই কেমন থমথমে হয়ে যায়। ওর মা বারান্দা থেকে উঠে চলে যান, ওর বাবা পত্রিকাটা গুটিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন—আর বলেন, ‘যাই, গোসলের সময় হয়ে গেল। তুমি বসো, কেমন?—আবার চলে যেও না। চা দিতে বলছি।’

কাজের মেয়ের হাতে সেই চা আসে আধঘণ্টা পর। সরভাসা বিস্বাদ ঠাণ্ডা চা। কখনো তাও আসে না। কিন্তু রুমুর বাবা আর আসতেন না।

আজ ভেতরবাড়ি থেকে রুমুর মায়ের ত্যক্তবিরক্ত গলা শুনতে পাই—‘কাজকর্ম করতেও দেবে না নাকি? প্রতিদিন আসার কী আছে, অ্যাঁ?’

আরেকটা নারীকণ্ঠ শোনা যায়—‘ছি ছি মা, আস্তে বলো! শুনবে তো।’ কুমুর গলা বলেই তো মনে হয়। বাড়ি এসেছে নাকি? কুমু গতবছর পাশের জেলার একটা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। এখনো বাইরের জীবনে তেমন অভ্যস্ত হতে পারেনি, মাসে দুবার করে বাড়ি আসে।

কুমুর কথা শুনে যেন রুমুর মায়ের গলা আরো চিড়বিড়িয়ে ওঠে—‘শুনলে শুনুক। মেয়ে মরে গেছে ছয় বছর হলো, কিন্তু মরা মেয়ের প্রেমিক এসে প্রতিদিন জ্বালাচ্ছে। এখানে ওর কাজটা কী? আমার আরেকটা মেয়ে আছে না? তার বিয়ে দিতে হবে না? লোকে কতোরকম কথা কানাকানি করে!’

আজ চা হাতে কাজের মেয়েটির বদলে আসে কুমু। বোধহয় কিছুটা অধোবদন হয়েই আমার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নিজের নখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর ইতস্ততভাবে বলে, ‘কেমন আছেন, ভাইয়া?’

‘ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?’

‘হ্যাঁ। শানুআপা দেশে এসেছেন?’

‘না, এখনো আসেনি। সামারে বাচ্চাদের স্কুল ছুটি, তখন আসবে।’

‘ওরা সবাই ভালো আছে? দুলাভাই, গল্প, স্পর্শ?

‘হুঁ, ভালো। তোমার সেমিস্টার শেষ হয়েছে, না?’

‘জি, গতমাসে ফাইনাল দিলাম।’

আমি আর কথা খুঁজে না পেয়ে বারান্দার কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকি। পুরোনো দিনের লম্বা টানা বারান্দা। রুমু বলেছিলো, এই বারান্দায় ওরা দুইবোন মিলে পড়তো। রুমুর পড়ার শব্দ নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর ছিলো। চমৎকার গলা ছিলো রুমুর। গানটান শেখেনি কখনো, কিন্তু খালি গলায় একটু গুনগুণ করলেও মুগ্ধ হয়ে শুনতে ভালো লাগতো। এই গাছপালা, দেয়াল, সবুজ ঘাস, ফুলবাগান সবকিছু রুমুকে প্রগাঢ় মমতায় ধরে রাখে। আমি অনুভব করতে পারি।

কুমু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর মৃদু গলায় বলে, ‘আপনার না আমেরিকায় যাওয়ার কথা, ভাইয়া?’

‘আমেরিকা? হ্যাঁ, তা যাওয়া যায় অবশ্য—আপা তো যেতেই বলে।’

‘যাওয়া যায়, কিন্তু যাবেন না—তাই তো?’

‘আরে না, তা কেন হবে। দেশে কিছু কাজ আছে, বুঝলে? কাজগুলি হয়ে গেলেই—’

‘কেন শুধু শুধু এত মিথ্যা বলা? দেশে আপনার কোনো কাজ নেই। আপনি যাচ্ছেন না, কারণ আমেরিকায় গেলে আপনি আমাদের আর বিরক্ত করতে পারবেন না।’

‘তোমাদের—ইয়ে—তা অবশ্য ঠিকই। তোমাদের তো বিরক্ত হওয়ারই কথা।’

‘রুমুপু মারা গেছে, ভাইয়া। এটা রিয়েলিটি। আপনি তো এটা চেঞ্জ করতে পারবেন না। পারবেন?’

‘আরে না, ঠিক রুমুর জন্য না—ধরো—তোমাদেরই তো দেখতে আসি—এমনি একটু খোঁজখবর—’

‘আমরা আপুকে ভুলে যেতে চাচ্ছি, আপনি বুঝতে পারছেন না? আপনারও মুভ অন করা উচিত। কেন করছেন না?’

‘হ্যাঁ—তা ঠিক—আমিও তো প্রায় ভুলেই গেছি, বুঝলে—’

রুমু হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করে—‘আপনি ভুলে যান, মনে রাখুন, যা ইচ্ছা হয় করুন—প্লিজ আমাদের বাসায় আর আসবেন না। আপু মারা যাবার পর থেকে মা-র মেজাজটা এমনিতেই খারাপ থাকে।’

আমি মরা মাছের চোখে কুমুর দিকে তাকাই। বলি, ‘আচ্ছা।’

‘এমনি এমনি বললেন, নাকি ভেবে বললেন?’

‘ভেবেই বললাম। আচ্ছা কুমু, আমি যদি একটু কম কম আসি—যেমন ধরো মাসে একবার—তাতেও কি তোমাদের অসুবিধা হবে?’

‘আসতেই হবে কেন? আমরা যদি আপুর শোক সামলে উঠতে পারি, আপনি কেন পারেন না? এইসব ভড়ং ভালো না। বিয়ে করুন। আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখার কিছু তো নেই।’ কুমুর গলা রুক্ষ হয়ে ওঠে। আমি মাথা নিচু করে শুনি। কুমু রাগ করলে ওর গলা একদম রুমুর মতো শোনায়। দু’বোনের রাগী চেহারাও অনেকটা একরকম দেখায়। নাকি আমারই ধন্দ লাগে? অনেকদিন রুমুকে দেখিনি, ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দশটন লরির ধাক্কায় থেঁৎলে যাওয়া রুমুর চেহারাটা অবশ্য আমার মনে পড়ে না, সেদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনি। আমার বেশিরভাগ সময় মনে পড়ে লাল-সাদা জামা পরা আর ঠোঁটে বিদ্রুপ আর মুগ্ধতার মাঝামাঝি অদ্ভুত এক হাসি ঝুলিয়ে রাখা রুমুর টানটান চেহারাটাকে। কী আশ্চর্য ব্যাপার—মরে যাওয়ার দিনেও রুমুর পরনে ওই লাল-সাদা পোশাকটাই ছিলো।

আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হয় কুমুর কথায়— ‘আপনি রোজ এভাবে আসেন বলে মা আমাকে অনেক কথা শোনায়। ভয়ংকর সব কথা, নোংরা কথা। প্লিজ আপনি আর আসবেন না।’ কুমু অন্যদিকে ফিরে বলে।

‘আচ্ছা আচ্ছা, বেশ তো, আর আসব না। এ-আর এমন কী। ও কী, কান্নাকাটির তো কিছু নেই! আমি যাচ্ছি, কেমন? ভালো থেকো কুমু।’

আমি গেটের দিকে এগোই। পেছন থেকে কুমুর মা’র গলা শুনতে পাই—‘গেল?’

‘যাবে না আবার? যেমন জঘন্য ব্যবহার তোমার।’

‘ওর সাথে ভালো ব্যবহারের কী আছে? ও কি আমার জামাই? তুই আসতে নিষেধ করিসনি?’

‘করেছি। বলেছে—আর আসবে না।’

‘ওইসব এমনি বলে। আগেও বলেছে। দুইদিন আসবে না, তারপর আবার আসবে। আসতে নিষেধ করেও লাভ হয় নাকি?’

‘এলে আসবে। তুমি খবরদার ওনাকে কিছু বলবে না। তাহলে আমি আর কখনো বাড়ি আসব না।’

আমি রিকশায় উঠে দেখতে পাই, বাসার বারান্দায় দুটো অশ্রুসজল নারীশরীর পরস্পরকে সতৃষ্ণভাবে জড়িয়ে ধরে আছে। রুমুর মায়ের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে যায়। কী আশ্চর্য, এতদিনের পরিচিত তীব্র বিদ্বেষের ছিটেফোঁটাও সেখানে আজ নেই।

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬
মাস্টারদা সূর্য সেন হল