ম্প্রতি ‘টেকিং চ্যান্স’ (২০০৯) দেখলাম। ইরাকে একজন আমেরিকান মেরিন, ল্যান্স কর্পোরাল ফেল্পস চ্যান্স মারা পড়েন (কিল্ড ইন অ্যাকশন)। এরপর ফেল্পসের মৃতদেহ আমেরিকায় পৌঁছায়, ডেলাওয়ারে। সেখান থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ও মর্যাদায় তাঁর পরিবারের কাছে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। নিয়ে যেতে হবে ওয়াইয়োমিং-এ। দীর্ঘ পথ, সরাসরি কোনো ফ্লাইটও নেই। কফিন এসকর্ট করতে নিজ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইক স্ট্রবল্‌। উঁচু র‍্যাঙ্কের কর্মকর্তারা সাধারণত এ-ধরনের দায়িত্ব নেন না, কিন্তু মাইক নিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত আর যাত্রাপথ ঘিরেই পুরো চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে।

মাইকের চরিত্রে কেভিন বেকন চমৎকার অভিনয় করেছেন। কিন্তু একটি চলচ্চিত্রের গল্পের ভেতরে আরও অনেকগুলো গল্প লুকিয়ে থাকে। চিত্রনাট্যকারের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, আদর্শ, চিন্তাভাবনা ইত্যাদি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রোথিত করবার চেষ্টা থাকে। এই যেমন কিছুদিন আগে ‘মাইগ্রেশন’ নামে একটা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র দেখলাম। দেখার পরে আমার ঘোর সন্দেহ হলো, এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ কেউ সম্ভবত ভিগান। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সন্দেহ মিথ্যে নয়। স্বয়ং স্ক্রিপ্টরাইটারই ভিগান এবং তিনি সক্রিয়ভাবে ভিগানিজম প্রমোট করেন।

ভিগানিজম খারাপ কিছু নয়। আমিও বারকয়েক হয়ে যাব ভেবেছিলাম, তবে গরুর মাংস-সংক্রান্ত দুর্বলতা কাটাতে পারিনি বলে আর হয়ে ওঠেনি। যাক সে-কথা। নিজের মতাদর্শ প্রচারের অধিকার সকলেরই রয়েছে, যদি সেটি নিতান্তই অপরাধমূলক কিংবা মানবতাবিরোধী না হয়। তবে গল্পের আবরণে তঞ্চকতাপূর্ণ ন্যারেটিভ সৃষ্টি করাটাকে আমার কাছে কিছুটা অসৎ বলেই মনে হয়। কারণ সাধারণ মানুষ এই চালাকি ধরতে পারে না। গল্পকার খুব সন্তর্পণে দর্শক কিংবা পাঠকের মনে কাঙ্ক্ষিত আবেগিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেন।

‘টেকিং চ্যান্স’-এর মতো মুভিগুলোতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ঠিক এই কাজটাই করে। বিষণ্ণ, শোকার্ত, বিচ্ছেদময় সুর আমাদের মগজকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কখনোসখনো এই সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলোই ঠিক করে দেয় আমরা কার জন্য কাঁদব, কার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করব আর কাকে চরমভাবে অমানুষ বা ডিহিউম্যানাইজ করব। সুরের মূর্ছনায় বিশ বছরের তরুণ ফেল্পসের জন্য আপনার বুক টনটন করবে। করতেই পারে। আমারও করেছে। কিন্তু ওয়াইওমিংয়ের এক শান্ত র‍্যাঞ্চ থেকে বেড়ে ওঠা সদ্য-তরুণ বাগদাদের রাস্তায় কেন গুলি খেয়ে মরতে গেল, সেই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর আমরা আর খুঁজব না। পৃথিবীর সব মৃত্যুই তো সমান শোকের। কিন্তু আমরা কেবল তাদের জন্যই কাঁদি, যাদের গল্প আমাদের শোনানো হয়। যাদের গল্প আমাদের শোনানো হয় না, তাদের মৃত্যুগুলো স্রেফ পরিসংখ্যান হয়ে পড়ে থাকে।

এই জায়গাতেই কাজ করে ইতালীয় তাত্ত্বিক অ্যান্তোনিও গ্রামসির ‘কালচারাল হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা। শাসকশ্রেণি নিজেদের মতাদর্শকে এমনভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেয় যে, সেটাই স্বাভাবিক এবং শাশ্বত সত্য বলে মনে হয়। গায় রিচির ‘দ্য কভনেন্ট’ কিংবা ক্লিন্ট ইস্টউডের ‘আমেরিকান স্নাইপার’ মুভিগুলোর কথাই ধরা যাক। গল্পগুলো কতটা তীব্রভাবে একপেশে! আমি তালিবানদের সমর্থন করার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখি না, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এসব গল্পে যেভাবে নিজেদের সবসময় মহৎ ত্রাতা আর বাকিদের বর্বর হিসেবে তুলে ধরে, তা রীতিমতো দৃষ্টিকটু। দার্শনিক এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ তত্ত্বে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য প্রাচ্যকে (বিশেষ করে আরব বা মুসলিম বিশ্বকে) সবসময় একটি ‘অপর’ বা অসভ্য সত্তা (The Other) হিসেবে নির্মাণ করে। কাজটা সামরিক ফ্রন্টে যেমন আছে, কালচারাল ফ্রন্টেও আছে। দ্বিতীয়টি সাধারণত আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

প্রাচীনকালে বিজয়ী রাজারা পয়সা দিয়ে ঐতিহাসিক পুষতেন নিজেদের মতো করে ইতিহাস লেখানোর জন্য। যুগ বদলেছে, পদ্ধতি পাল্টেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য একই রয়ে গেছে। এখন সেই রাজার ভূমিকা নিয়েছে হলিউড, আর তাদের হাতিয়ার হলো এই ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ। ফরাসি তাত্ত্বিক লুই আলথুসারের ভাষায় এগুলো হলো ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস’ বা মতাদর্শগত রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার, যা কোনো রকম শারীরিক জবরদস্তি ছাড়াই আমাদের মনস্তত্ত্বকে শাসন করে। সবচেয়ে করুণ ব্যাপার হলো, আমরা জেনেবুঝে স্বেচ্ছায় এই সেলুলয়েডের ফাঁদে পা দিই।

এই যে শোককে মহিমান্বিত করা এবং অন্যের মৃত্যুকে তাচ্ছিল্য করার রাজনীতি, এর সবচেয়ে নগ্ন রূপটি আমি উপলব্ধি করেছিলাম প্যারিসের মিউজিয়াম অব হলোকাস্টে গিয়ে। সময়টা ২০২৩ সালের আগস্ট। অর্থাৎ, ৭ অক্টোবরের ঘটনা তখনো ঘটেনি। মিউজিয়ামের ভেতরে ঢুকে এক তীব্র বিষণ্ণতা আর ক্লান্তি ভর করেছিল আমার ওপর। সেই অনুভূতি নিখাদ, আমি জানি। কিন্তু এরা তারপর ফিলিস্তিনে কী করেছে? নিজেদের হারানো স্বজনদের জন্য শোক প্রকাশ করা, মিউজিয়াম বানিয়ে সেই স্মৃতি সংরক্ষণ করা, আর একইসঙ্গে নিরাপত্তার খোঁড়া দোহাই দিয়ে অন্যের ওপর ঠিক একইরকম নিষ্ঠুরতায় গণহত্যা চালানো। কী অদ্ভুত এবং অমানবিক এক দ্বিচারিতা!

সমস্যা হলো, ওই দিকের গল্পটা যারা বলে, তারা সংখ্যায় ভারি। তাদের টাকা আছে, ইন্ডাস্ট্রি আছে। তাদের শোকের একটা বৈশ্বিক বাজারমূল্য আছে।

আর এদিকের গল্পগুলো? ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের নাম না-জানা ফেল্পসদের গল্পগুলো? সেগুলো স্রেফ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।