জুল ভার্নের সঙ্গে একদিন (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৩)

জুলাই মাসের শেষদিক। ইউনেস্কোতে ইন্টার্নশিপ করতে আসার প্রায় মাসখানিক হয়ে গেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে প্যারিসের পথেঘাটে ইতস্তত ঘুরে বেড়াই। একা-একাই। করার মতো বিশেষ কিছু নেই। তবু প্যারিস ভালো লাগে। মাসকাবারি টিকিটের সুবাদের শহরের আশপাশেও খানিকটা ঘুরে ফেলেছি। তবে শহরের বাইরে তখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

প্যারিসের কোন জায়গাগুলোতে যেতে চাই, সেই তালিকা করার সময়ই জুল ভার্নের কথা ভেবেছিলাম। জানতাম, তিনি ফরাসি—আর কে-না জানে, বিখ্যাত আর সৃজনশীল ফরাসিদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল প্যারিসই। কিন্তু ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, ভার্ন দীর্ঘসময় প্যারিসে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্মৃতিচিহ্ন বলতে যা বোঝায়, সেসব প্যারিসের বাইরে। কতটা বাইরে? দেখলাম—খুব দূরে নয়। প্যারিস থেকে শ’দেড়েক কিলোমিটার দূরের ছোট্ট শহর আমিয়েঁ, যেখানে তাঁর শেষজীবন কেটেছে। সমাহিতও হয়েছেন সেখানকার সিমেট্রিতে, আর বাসভবনকে পরিণত করা হয়েছে জাদুঘরে।

জাদুঘরে ঢোকার টিকিটটা রিজার্ভ করতে হবে কিনা, সেটা দেখতে ওদের ওয়েবসাইটে গেলাম। আগেই বলেছি ফ্রান্সের অনেক দর্শনীয় স্থাপনায় আগেভাগে রিজার্ভ করে যেতে হয়। তারিখ তো বটেই, ক্ষেত্রবিশেষে সময়ের স্লট পর্যন্ত বুক করতে হয়—বিশেষ করে যেগুলোর জনপ্রিয়তা বেশি। অতিরিক্ত ভিড় কমানোর কৌশল আরকি। এখানে দেখলাম রিজার্ভ করার ঝামেলা নেই। প্যারিসের বাইরে বলেই হয়ত লোকসমাগম কম। অনলাইনে টিকিট করার সুযোগ আছে, তবে না করলেও ক্ষতি নেই। স্ক্রল করতে করতে একদম নিচের দিকে একটা টইটুম্বুর রসগোল্লাকে ঘাপটি মেরে থাকতে দেখলাম। প্রতি শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার পরে সকল দর্শনার্থীর জন্য জাদুঘরে প্রবেশ সম্পূর্ণ ফ্রি। এমনিতে টিকিটের দাম সাত ইউরো, অর্থাৎ খুব বেশি নয়—কিন্তু বাঁচাতে পারলে ক্ষতি কী? মুশকিল হচ্ছে দিনটা ওয়ার্কিং ডে। একদিন ছুটি নিতে হবে। সুপারভাইজর মানা করবে না এটুকু জানতাম, কাজেই সবার আগে বাসের রাউন্ড ট্রিপের টিকিটটা করে ফেললাম। প্যারিস থেকে বাস ছাড়বে সকাল ৯টায়, আর ফেরার বাস রাত ৯টায়। যাতায়াতের সময়টা বাদ দিলে ৯ ঘন্টার মতো হাতে থাকবে। যথেষ্টই। আসা-যাওয়ার টিকেটও সস্তা, মাত্র বারো ইউরো।

যেহেতু যাচ্ছিই, খুঁজে খুঁজে বের করলাম আরও কিছু জায়গা। ৯ ঘন্টা দীর্ঘ সময়, সদ্ব্যবহার তো করতে হবে! দেখা গেলো, শহরটা ছোটো হলেও একেবারে ফেলনা নয়।

প্যারিসে সেন নদীর পাড়ে বেরসি পার্কের অবস্থান। পার্কের পাশেই বাস টার্মিনাল, যেখানে থেকে দূরপাল্লার বাসগুলো ছাড়ে। চমৎকার বাস, রাস্তাও খাসা। ঘণ্টায় প্রায় একশো কিলোমিটার গতিতে যেতে যেতে আমি জুল ভার্নে‌র কথাই ভাবতে থাকি, একলাফে শৈশবে চলে যাই নিমেষে।

আমার বয়স তখন নয় কী দশ। এক বাল্যবন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে আবিষ্কার করি একটা হার্ডকভার বই। নাম সাগরতলে। লেখকের নাম জুল ভার্ন। বইপত্র পড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে ততদিনে। তবে এই বইয়ের নাম আগে কখনো শুনিনি। তখন বইপত্র বেছে পড়ার বয়স নয়—স্বভাবের কারণে যা পাই পড়ে ফেলি। তবে আমাকে বিশেষভাবে টানলো এই বইটার প্রচ্ছদ। গাঢ় নীলজলের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে তিমির মতো দেখতে একটা ডুবোযান, আর ডুবুরির জবড়জং পোশাকে জলের বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে কেউ একজন। লেখকের নাম জুল ভার্ন, অনুবাদক শামসুদ্দিন নাওয়াব (অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেন। নাকি তাঁর গোস্ট রাইটার? থাক, এসব কাসুন্দি না ঘাঁটাই মঙ্গল)।

ওইদিন আক্ষরিক অর্থেই গোগ্রাসে গিলেছিলাম বইটা, একটানা, আমার বন্ধুর বাড়িতে বসেই। লেখাটা আমার মনে রোমাঞ্চের একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়। সেবা প্রকাশনীর বইয়ের একটা সমস্যা হলো, এরা মূল লেখাকে বিস্তর ছেঁটে ফেলে—সেটা অবশ্য বুঝেছি পরে। অনেক পরে সম্পূর্ণ সংস্করণটিও পড়েছিলাম। ততদিনে আমি পাঠক হিসেবে অনেকটা পরিণত—তারপরও পড়তে গিয়ে শৈশবের সেই দুর্দান্ত অনুভূতিই যেন ফিরে আসে আবারও। সেবার অনুবাদে যেসব খুঁটিনাটি বাদ পড়েছিল, সেগুলো পড়ে মুগ্ধতা বাড়ে শতগুণ। বিস্ময়কর ডুবোযান নটিলাসের বুকে চেপে রহস্যমানব ক্যাপ্টেন নিমো, তিমিশিকারী নেড আর প্রভুভক্ত কনসিলকে সঙ্গে নিয়ে সাগরের গূঢ় অন্ধকারে নিজেই যেন ঝাঁপ দিই বারবার। একজন মানুষ কতখানি কল্পনাশক্তির অধিকারী হতে পারে তা ভেবে আজও বিস্ময়ের থই থাকে না আমার। অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ, জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ, ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন, দ্য মিস্ট্রিয়াস আইল্যান্ড। ভার্ন আমাকে মুগ্ধ আর বিস্মিত করেছেন প্রতিবারই। জুল ভার্ন তাই আমার কাছে স্রেফ একজন শিশুসাহিত্যিক নন, একটা স্বপ্নমাখানো অনুভূতির নাম।

পৃথিবীজুড়ে সবচেয়ে বেশি অনূদিত হওয়া লেখকের তালিকায় জুল ভার্ন আছেন দ্বিতীয় স্থানে। অর্থাৎ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের চেয়েও তাঁর লেখা বেশি ভাষায় ও সংখ্যায় অনুবাদ করা হয়েছে। এক নম্বরে আছেন কুইন অব ক্রাইম আগাথা ক্রিস্টি।

জুল ভার্ন জন্মেছিলেন ১৮২৮ সালে, প্যারিস থেকে চারশ কিলোমিটার দূরের নঁত শহরে। শুরুর জীবন সেখানেই কেটেছে। এরপর বাবার সিদ্ধান্তে আইন পড়ার জন্য প্যারিসে যান। ভেবে দেখুন, পড়ছিলেন আইন, কিন্তু মনেপ্রাণে পুরোদস্তুর লেখক। ওদিকে প্যারিসে থাকাকালে লেখক-শিল্পীদের আড্ডা বা সালোঁতে যাতায়াত করছেন, সাহিত্যিকদের সংস্পর্শেও আসছেন, যাঁদের ভেতরে অন্যতম আলেকজান্দার দ্যুমা। এসব করে করে লেখালিখির ভূত আরও জেঁকে বসে। শেষে আইনজীবী হবার ইচ্ছে চিরতরে বিসর্জন দিয়ে তিনি পেশাদার লেখক হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তাঁর বাবা এই সিদ্ধান্তে মোটেও খুশি হননি। দুজনের ভেতরে এটা নিয়ে বেশ মনোমালিন্যও হয়েছে।

এর মাঝে ঘটলো এক অদ্ভুত যোগাযোগ।

বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে ২৮ বছর বয়সী জুল ভার্ন আমিয়েঁ শহরে এসেছিলেন ১৮৫৬ সালে। সেখানে কনের বিধবা বোনকে মনে ধরে যায়। তারপর আর কী, ভাববিনিময়, বিয়ে। প্যারিসে সংসারও করলেন কিছুদিন। স্ত্রী চাইছিলেন বাপের বাড়ির কাছাকাছি থাকতে। ভার্নও ভাবলেন, মন্দ কী, লেখালিখির জন্য আবশ্যকীয় নির্জনতা তো জুটবে। ফলে ১৮৭১ সালে জনাকীর্ণ প্যারিস ছেড়ে তাঁরা পাকাপাকি চলে এলেন আমিয়েঁতে। তখন ভার্নের বয়স ৪৩। এরপর জীবনের বাকি চৌত্রিশটি বছর এই শহরেই কেটেছে। এখানে এসে দু-তিনটে ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন। তার ভেতরে যেটায় ছিলেন সবচেয়ে বেশি সময় ধরে—সেটাই এখন জাদুঘর হিসেব সংরক্ষিত। আর ওটাই আমার গন্তব্যস্থল।

১১ আগস্ট, ২০২৩। আমিয়েঁতে নামলাম বেলা বারোটার দিকে। আকাশ কিছুটা গোমড়া। জাদুঘরে যাব সাড়ে চারটায়, অর্থাৎ তখনও অঢেল সময় হাতে। প্রথমে সিমেট্রিটা ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ সেটা মূল শহর থেকে কিছুটা বাইরে। বাসে যেতে আধঘন্টার মতো লাগলো। গুগল ম্যাপ দেখে খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু ভেতরে ঢুকে কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। ইতোমধ্যে আমি প্যারিসের সিমেট্রি ঘুরেছি। এটা যেন একটু অন্যরকম। কেমন একটা গা-ছমছমে ভূতুড়ে ভাব। আঠারো হেক্টরের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা সিমেট্রিটা প্রায় দুশো বছরের পুরনো। সবুজ গাছপালা ঝোপঝাড় চিরে গভীরের দিকে ঢুকে গেছে গোটাকতক অপরিসর পিচঢালা পথ। দর্শনার্থী তেমন নেই বললেই চলে। সুপ্রাচীন-সুউচ্চ গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে অল্প অল্প আকাশ দেখা যায় কেবল, দিনের বেলাতেও জমাট হয়ে আছে চাপ চাপ অন্ধকার, সঙ্গে ঘন ঝোপঝাড়, হঠাৎ যেন কোথাও একটা সাপ ফনা তুলে দাঁড়াবে, কিংবা কে জানে শুয়ে থাকতে থাকতে তিতিবিরক্ত হয়ে হয়ত কফিন ভেঙ্গেই বেরিয়ে আসবে স্যুট-হ্যাট পরা একজন ফরাসি সাহেব। উফ্‌, এমন গোরস্থানও হতে হয় বুঝি! রাস্তাঘাট অবশ্য ভালো। তবে পঞ্চাশ কী একশ কী দুশো বছরের পুরনো ভাঙ্গাচোরা শ্যাওলাধরা সমাধিগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটতে বেশ অস্বস্তিই হচ্ছিল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ-সময় আমার খুব করে মনে পড়ছিল ফেলুদার ‘গোরস্থানে সাবধানে’-র কথা। সিমেট্রিতে হাঁটতে হাঁটতে জটায়ু যেভাবে বলছিলেন—

দোহাই পামার সাহেব, দোহাই হ্যামিলটন সাহেব, দোহাই স্মিথ মেমসাহেব—ঘাড়টি মটকিও না বাবা, কাজে ব্যাগড়া দিয়ো না! তোমরা অনেক দিয়েচ, অনেক নিয়েচ, অনেক শিখিয়েচ, অনেক ঠেঙিয়েচ…ক্যাম্বেল সাহেব, অ্যাডাম সাহেব, আর—হুঁ হুঁ—তোমার নামের তো বাবা উচ্চারণ জানি না!— দোহাই বাবা, তোমরা ধুলো, ধুলো হয়েই থাকো বাবা, ধুলো…ধুলো…।

ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমি হেসে ফেলি সশব্দে, পরক্ষণে নিজের হাসির শব্দে নিজেই চমকে যাই। বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার।

পাখির ডাক আর নিজের পায়ের শব্দের বাইরে আর কিচ্ছু নেই, কেউ নেই। এই শিরশিরে অনুভূতির ভেতর দিয়ে পায়ে-পায়ে জুল ভার্নের সমাধিতে পৌঁছলাম। খুঁজে পেতে খুব কসরত করতে হয়নি অবশ্য, কারণ এটাই এই সমাধিক্ষেত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত সমাধি—ফলে কিছুদূর পরপরই দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। তবে ঢোকার গেট থেকে খানিকটা ভেতরে হওয়াতে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে হয়। সিমেট্রিটা আবার সমতলও নয়, উঁচুনিচু, ফলে হাঁটার খাটুনি একেবারে কম নয়।

সমাধির সামনে আমি চুপচাপ স্থির হয়ে থাকি অনেকক্ষণ। কী ভাবছিলাম? নশ্বর মানবজীবনে একজন মানুষ কতো বিচিত্র-বর্ণিল কাজ করে যেতে পারে, সেটাই হয়ত। সম্বিৎ ফেরে কয়েকজনের গলার স্বরে, সম্ভবত আমেরিকান। ওরাও এটা দেখতেই এসেছে।

জুল ভার্নের সমাধির নকশাকার আলবার্ট রোজ। ভাস্কর্যটা দেখে মনে হয় যেনো ভার্ন কবর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। প্রতীকী অর্থটা নিমেষে আমার জন্য অনেক তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। জুল ভার্ন তো বেঁচে আছেনই, পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ শেলফে, কোটি কোটি পৃষ্ঠায়, আর অজস্র মানুষের স্মৃতিতে। এই আমাকেও যেমন সুদূর আমিয়েঁতে টেনে আনলেন সেই কোন বাংলাদেশ থেকে। এই যোগাযোগ অপার্থিব।

সেখানে আরও কিছুক্ষণ থাকার পর আমিয়েঁ শহরে ফিরতে মনস্থির করি। কিন্তু সেখানেই বাধল গোল। শহরের বাইরের দিকে হওয়াতে খুব বেশি বাস এদিকটায় যাতায়াত করে না। পরের বাসটা অন্তত আরও ঘন্টাখানিক পর, এমনটাই দেখলাম অ্যাপে। তখন সামার চলছে। বাংলাদেশের মতো না হলেও মাথার ওপরে থাকা মাঝদুপুরের সূর্য মাঝে মাঝে বেশ চড়া হয়ে উঠছে। নয়তো এই পাঁচ কিলোমিটারের মতো রাস্তা কি হেঁটেই মেরে দেওয়া যেত না? খুব যেত। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না মনে হয়। অগত্যা বাসের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু সময় কাটানো যায় কী করে? ম্যাপে দেখলাম, কাছেই একটা সরু নদীমত আছে। অবশ্য খাল হলেই বা কে ঠেকাচ্ছে। বেশ তো, খালই সই। আমার তো আর কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না যে অখ্যাত খালেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছি কী করতে। অখ্যাত জায়গাগুলোই বরং ভালো, ভিড় থাকে না, নিজের মতো অনেককিছু কল্পনা করে নেওয়া যায়। খানিকটা একান্ত সময়ও কাটে।

সেদিন যদি ওদিকে হেঁটে হেঁটে না যেতাম, একটা অপূর্ব দৃশ্য আমার দেখা হতো না। দুপাশে দীর্ঘ গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে সরু পথ। আহা, পথ কখনো এত সুন্দর হতে আছে! মনে হয় যেন সবুজ ঝোপঝাড় দিয়ে সযত্নে পথটাকে কেউ সাজিয়েছে। ডানদিকে একটা ফার্ম‌হাউজ, সেটা কাঁটাতারের জালে ঘেরা। একটা ছোট্ট পরিবার সেই ফার্ম‌হাউজের দেখভাল করছে। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের দুই ছেলেমেয়ে, যাদের বয়স দশ-বারোর বেশি নয়। বাচ্চাগুলোর পেছন পেছন ছুটে বেড়াচ্ছে একটা বাদামী-সাদা হাস্কি। ছোট শহরের উপকণ্ঠের ওই ততধিক ছোট ফার্ম‌হাউজ আজও আমার চোখে ভাসে। জীবনের অন্যরকম মানে করতে ভালো লাগে।

ফার্মহাউজটার ছবি তোলা হয়নি, উচিতও হতো না। তবে পথ আর খালটার কিছু ছবি তুলেছিলাম।

কিছুক্ষণ পর বাসে করে শহরে ফিরলাম, মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। জাদুঘরে যেতে তখনও ঢের সময় বাকি। কাছাকাছিই ছিল নোত্র্‌ দা্ম (Notre Dame) ক্যাথেড্রাল। সেদিকে এগোলাম। এটা অবশ্য প্যারিসের নোত্র্‌ দামের মত অত বিখ্যাত নয়, যদিও দেখতে কাছাকাছি, আর আমিয়েঁর ক্যাথেড্রালটাই আকারে বড়ো, প্যারিসেরটার প্রায় দ্বিগুণ। প্যারিসের নোত্র্‌ দামে তখন সংস্কারকাজ চলছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই সেটা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ। অগত্যা দুধের স্বাদ ঘোলেই মিটুক। চমৎকার বাহারি কারুকাজ ক্যাথেড্রালের ভেতরে আর বাইরে। অনতিদূরে আছে একটা বেল টাওয়ার। আজ অবশ্য সেটা বন্ধ। বাইরে থেকেই যেটুকু দেখা গেল।

সময়ের একটু আগে জাদুঘরে পৌঁছে দেখি ইতোমধ্যেই বেশকিছু মানুষজন চলে এসেছে। তারাও সাড়ে চারটা বাজার অপেক্ষা করছে। বাইরে থাকতে থাকতেই বাড়ির কিছু ছবি নিলাম। কিছুটা ব্যতিক্রমী গড়ন। বাড়ির মূল নকশা সেরকম বদলানো হয়নি। ভেতরে ঢোকার পর বাড়ির সামনে জুল ভার্নের একটা ফটোগ্রাফ দেখে সেটা বুঝেছি পরে।

বাড়িটা বেশ বড়। জুল ভার্ন সস্ত্রীক এই বাসায় ভাড়াটে হিসেবে ছিলেন প্রায় আঠার বছর। কক্ষগুলো বেশ বাহারি। খাওয়া, পড়াশোনা, আপ্যায়ন, ধূমপান সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা ঘর। সময়ের প্রয়োজনে সব ঘরই অল্পবিস্তর সংস্কার করতে হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ভার্নের ডাইনিং কক্ষ, যেটা প্রায় অবিকৃত রাখা সম্ভব হয়েছে। ছাদ থেকে শুরু করে আসবাবপত্র বা ফায়ারপ্লেস, এমনকি ব্যবহৃত তৈজসপত্রগুলো পর্যন্ত সযত্নে রক্ষিত আছে। আরো আছে ভার্নের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। এখানে নাকি হাজারের বেশি বই ছিল। লেখালিখির প্রয়োজনেই ভার্নকে প্রচুর পড়তে হত, ঘাঁটাঘাঁটি করতে হত, নোট নিতে হত। বেশিরভাগই অবশ্য পরে হারিয়ে গেছে।

জুল ভার্নের প্রথম উপন্যাস ‘ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন’ থেকে শুরু করে প্রায় সব বইয়েরই প্রকাশক পিয়েরে-জুল। তাঁর অফিসরুমও এই বাড়িতেই ছিল। লেখক-প্রকাশকের কেজো সম্পর্কের চেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ হৃদ্যতাই বেশি ছিল দুজনের ভেতরে।

বাড়িতে কাঠের একটা সিঁড়ি রয়েছে, আর সেটা একটা সরু টাওয়ারের ভেতর দিয়ে উঠে গেছে। সিঁড়িটা বেয়ে সরাসরি অ্যাটিকে চলে যাওয়া যায়। টাওয়ারের ওপরের একটা অংশে নটিলাসের মত করে সাবমেরিনের একটা প্রোটোটাইপ কন্ট্রোল প্যানেল বানানো হয়েছে। এই সংযোজন অবশ্য পরে করা, বলাই বাহুল্য। জুল ভার্ন‌ের এসব রদ্দি জিনিস বানাতে বয়েই গেছে। স্রেফ লিখেই কল্পনাকে তিনি এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক যেমন টলকিয়েন—কল্পনার চোখে যিনি একটা আস্ত ইউনিভার্সই বানিয়ে ফেলেছিলেন!

আমিয়েঁর মানুষের কাছে জুল ভার্নে‌র গুরুত্ব অসামান্য। ফলে শহরের অনেক জায়গাতেই ভার্নে‌র ভাস্কর্য কিংবা তাঁর চরিত্রদের ভাস্কর্য, বই-সংক্রান্ত বোর্ড ইত্যাদি চোখে পড়ে। বোঝা যায়, মানুষটাকে শহরবাসী আজও ভালোবাসে, তাঁর জন্য গর্ববোধ করে। আমিয়েঁবাসী তো তবু জুল ভার্ন‌কে সশরীরে পেয়েছে। স্পেনের উপকূলীয় শহর ভিগো-তে জুল ভার্নে‌র একটা ভাস্কর্য আছে, যদিও সেখানে তিনি কোনোদিনই যাননি। সেটা তৈরি হয়েছে কেবল এই কারণে যে—‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ বইতে জুল ভার্ন‌ ভিগোর প্রসঙ্গ এনেছিলেন। ভেবে দেখুন এবার।

সন্ধ্যা নামতে থাকে। প্যারিসে ফিরতে হবে। যাওয়ার আগে আমিয়েঁর দিকে ফিরে তাকাই। একজীবনে অনেককিছুই করা সম্ভব। আমাদের মানবজীবন কি আসলেই ক্ষুদ্র, নাকি আমরাই তাকে কেটেছিঁড়ে অকিঞ্চিৎকর বানিয়ে ফেলি—যেমনটা সেনেকা বলেছেন?

ধন্যবাদ, প্রিয় জুল ভার্ন‌, পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শিশুর রঙিন শৈশবের জন্য। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।

ছবিঘর

Gallery

ছবির উপর ক্লিক করে বড়ো আকারে দেখুন | Click on the image for a larger view

Share this with others

Leave A Comment