
নিখরচায় ঘোরাযোগ (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ২)
শিবরাম চক্রবর্তী একটা গল্প আছে, ‘নিখরচায় জলযোগ’। সেখানে কথক আর তার মামা, মানে নকুড়মামার বেজায় খিদে পেয়েছিল। কিন্তু কারোর পকেটে পয়সাকড়ি নেই। মামা তখন পরের পয়সায় খেতে সাংঘাতিক একটা বুদ্ধি আঁটলেন। কুবুদ্ধি কিংবা দুর্বুদ্ধি বলাই শ্রেয়, কারণ ব্যাপারটা নীতিসিদ্ধ নয়। তবে লোকঠকানো বরাবরই ভাল ব্যবসা। এই বুদ্ধিও শুরু থেকে ভালোই কাজে দিচ্ছিল। কিন্তু তারপরও তো গেরস্তের একদিন বলে একটা কথা আছে… নাহ, তারচেয়ে গল্পটাই পড়ে ফেলুন নাহয়। শিবরামের গল্প তো, খারাপ লাগবার জো নেই।
পরের পয়সায় ওরকম ভোজের অভিসন্ধি অবশ্য আমার নেই। তবে প্যারিসের মতো ব্যয়বহুল শহরে পয়সা বাঁচাতে পারলে মন্দ কী? কম খরচে কিংবা বিনেপয়সায় ঘোরাঘুরি করতে পারলেই হয়, অর্থাৎ চাইছিলাম যাতে আমার ‘ঘটে’ আরেকটু ‘ঘোরাযোগ’ ঘটে। একটু ব্যঞ্জনবিকৃতি ঘটিয়ে কথাটাকে ঘোড়াযোগ বানালেও হয়। একটা ঘোড়া পেলে বর্তে যেতাম বৈকি। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের পাস বাবদ প্রতিমাসে খরচা করা চুরাশিটা ইউরো বাঁচত। শুনেছি বিশ শতকের গোড়ার দিকেও নাকি প্যারিসে প্রায় আশিহাজারের মতো ঘোড়া ছিল। বলাবাহুল্য সে-সময় ঘোড়াই ছিলো সবচেয়ে জনপ্রিয় যান। কিন্তু তা-বলে কি আজকের দিনেও পথেঘাটে ওভাবে ঘোড়া দাবড়াতে দেবে? মনে হয় না। তার ওপর ঘোড়ার খাইখরচা আছে, পালার বায়নাক্কা কম নয়, চালাতেও জানি না। তাছাড়া ঘোড়া আমাকে দিচ্ছেই বা কে!
সে-যাত্রায় প্যারিসে ঘোড়াযোগ না হলেও ঘোরাযোগ আমার হয়েছিল বেশ ভালোই। খরচ বাঁচানোর মোক্ষম উপায় দেখিয়েছিল এডুকেশন সেক্টরে আমাদের টিমের একজন কোরীয় সদস্য, সি-হু। তার প্যারিসবাস ততদিনে বছরখানিকেরও বেশি হয়ে গেছে। অর্থাৎ এলাকার বড়ভাই। আমাদের মতো টাকাপয়সা চেপেচুপে খরচ করার বালাই তার নেই, কারণ সে ইন্টার্ন নয়। কোরীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে সে ইউনেস্কোতে স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছিল। ওর সঙ্গে আমার খাতির জমে গেল একটা অদ্ভুত কারণে। আমি আসার আগ পর্যন্ত আমাদের সেকশনে পুরুষ সদস্য বলতে ছিল সে একাই। কয়েকজন পুরুষ কনসালটেন্ট ছিলেন অবশ্য, তবে তাঁরা হেডকোয়ার্টারে বসতেন না। এজন্য সি-হু বোধহয় কিছুটা কোণঠাসা হয়েই ছিল। এজন্যই বোধহয় খানিকটা ব্রোমান্স জন্ম নিলো আমাদের মধ্যে। বড়ভাই হিসেবে সে কিছু ঘাঁতঘোতেরও সন্ধানে দিল। জানা গেল, প্রতি মাসের প্রথম রোববার প্যারিসের অনেকগুলো দর্শনীয় জায়গায় বিনেপয়সায় ঢুকতে দেয়। শুনে আমার চক্ষু ছানাবড়া। তথ্যটা আগেভাগে না জানা থাকায় আসার পরপর জুলাইয়ের যে-প্রথম রোববার পেয়েছিলাম সেটা ইতোমধ্যেই ফস্কে গেছে। ভেবে ভীষণ আফসোস হতে লাগল। সামনে অবশ্য আরেকটা রোববার আসছে, আগস্টে। সেটাকে কাজে লাগানো যেতেই পারে।
প্রবেশমূল্য নেই বলে পুরোটা একেবারে বিনা মেহনতে নয়। স্লট অনলাইনে বুক করতে হয়। নয়ত ঢুকতে দেবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব স্লট অনেক আগে থেকেই বুক্ড হয়ে থাকে। আমার উইশলিস্টে ওপরের দিকে থাকা লুভ্র, পিকাসো কিংবা রোদাঁ মিউজিয়ামে স্লট বুক করা গেল না। পরে জেনেছিলাম এসব স্লটের জন্য রীতিমত তক্কে তক্কে থাকতে হয়, বিশেষ করে সামারে, কারণ এ-সময়টায় প্যারিসে পর্যটকের ঢল নামে। অগত্যা কিছুটা পেছনের দিকে থাকা মিউজিয়ামগুলোতে স্লট খোঁজা শুরু করলাম। শেষমেষ তিনটিতে স্থির হয়েছিল।
কিছু জাদুঘরে সবসময়ই কিংবা সপ্তাহের বিশেষ কিছু দিনে বিনামূল্যে ঢুকতে দিত। সেসবেরও বেশকিছু ঝোলায় পুরেছিলাম দুমাসে।
কিন্তু তাতেও যেন হচ্ছে না। এখনো প্রচুর জাদুঘর রয়ে গেছে, যেগুলো পয়সা খরচ না করে দেখার জো নেই। কিন্তু অতগুলো টাকা! সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় সহজ কাজ নয়। এদিকে সময়ও ফুরিয়ে আসছে। কী করা যায়? কাজে গিয়ে মাথায় এই চিন্তা ঘুরপাক খায়। প্যারিসে এভাবে আরও কবে আসা হবে কে জানে।
‘তুমি কি ব্যস্ত?’
প্রশ্ন শুনে আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। প্রশ্নকর্তা মেয়েটি আমার পাশের টেবিলে বসে। সেও আমার মতোই ইন্টার্ন।
‘নাহ, তেমন কিছু করছি না। কী ব্যাপার?’ আমি বলি।
‘তাই? দেখে তো মনে হচ্ছে খুব জরুরি কিছু করছ!’ সে হেসে আমার ডেস্কটপের পর্দার দিকে ইঙ্গিত করে।
কিছুটা বিব্রতভাবে মাথা চুলকে বলি—‘বিষয়টা একটু জটিল।’
সত্যিই তো, আমি আসলে কী করছিলাম?
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, decisions, decisions! অর্থাৎ দ্বিধার চূড়ান্ত। বাংলায় আরও সহজভাবে বলা যেতে পারে—বাপরে, কোনটা রেখে কোনটা!
মানুষ তার স্বভাবসিদ্ধ কারণেই প্রচুর দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। গিন্নি হয়তো ভেবে পাচ্ছেন না নতুন জামদানীর সঙ্গে কোন জুতোজোড়া ভালো মানাবে। কিংবা কুখ্যাত ওয়ারলর্ড ভাবছে পরের বোমাটা কোন অঞ্চলে ফেললে ভালো হয়! পরিস্থিতি ছোট বা বড় যা-ই হোক, একাধিক বিকল্প থাকলে আমরা চট করে একটা বেছে নিই না। কালক্ষেপণ করি, কষে চিন্তাভাবনা করি, অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া উপদেশকেও সেই প্রক্রিয়ার শামিল করি, তারপর বিকল্পগুলোর ভেতরে যুদ্ধ লাগিয়ে দিই, সচেতন বা অবচেতনভাবে প্রচুর যুক্তিতর্ক সাজাই। সবশেষে নিজের পক্ষপাত আছে এমন বিকল্পটিকেই বেছে নিই। হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি এর ব্যত্যয় হয় না। তাহলে এতকিছুর দরকার কী? আছে, এই প্রসেসটার প্রয়োজন আছে। এর ফলে একধরনের নিশ্চিন্তিভাব আসে। ‘অনেককিছু থেকে সেরাটা বেছে নিয়েছি’ এরকম অনুভূতি তৈরি হয়। ঠকে যাওয়ার ভয়টাও কমে আসে। আমরা ঠকতে ভালোবাসি না।
প্যারিসে ঘোরাঘুরির কিছু মিতব্যয়ী নিদান আছে। যেমন খুব স্বল্পমূল্যে ইচ্ছেমত ঘোরাঘুরির একটা বিশেষ পাস পাওয়া যায়—Paris Museum Pass। প্যারিস এবং এর আশপাশের বেশকিছু জাদুঘর আর দর্শনীয় স্থানের কর্তৃপক্ষ একজোট হয়ে ১৯৮৮ সালে প্রথম এটি চালু করেছিল। এই পাস থাকলে নির্দিষ্ট মেয়াদের ভেতরে প্রায় সবগুলো জায়গায় বিনামূল্যে ঢুকতে দেবে। দুই, চার বা ছয়দিনের জন্য পাস নেওয়া যায়। প্রথমবার ব্যবহার করার মুহূর্ত থেকে পাসের মেয়াদগণনা শুরু হয়। বিভিন্ন স্থানের প্রবেশমুখে লাইনে দাঁড়ালেও প্রায়োরিটি পাওয়া যায়। শর্ত একটাই, একটা জায়গায় একবারের বেশি ঢোকা যাবে না। অনেক ভেবেচিন্তে আমি চারদিনেরটা কিনেছিলাম। উইকএন্ডের সঙ্গে নিজের দুদিন ছুটি যোগ করে মোট চারদিন। অনলাইনে পাসের দাম সত্তর ইউরো। আমার অবশ্য বাহাত্তর লেগেছিল, কারণ আমি ট্যুরিজম অফিস থেকে কাগুজে পাস সংগ্রহ করেছিলাম। স্মারক হিসেবে রেখে দেওয়া আরকি। ঘোরাঘুরি শেষে হিসেব করে দেখেছিলাম—পাসটা ব্যবহার করে ওই চারদিনে আমি যত জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছি, আলাদাভাবে টিকিট কাটলে তাতে আমার প্রায় তিনশো ইউরো খরচ হতো। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটা সাশ্রয়ী ছিল।
পাস পেলেই হয়ে গেল? এরপর ইচ্ছেমতো যেখানে যখন ইচ্ছে চলে যাওয়া আর ঢুকে পড়া? উঁহু, এত সোজাও নয়।
আগেই বলেছি প্যারিসের বেশিরভাগ দর্শনীয় জায়গা দেখার ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা রিজার্ভেশন বা অগ্রিম বুকিং। বিশেষ করে জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে স্লট রিজার্ভ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। সহজেই অনুমেয় যে উইকএন্ডে ভিড় বেশি থাকে। লুভ্রে সুবিধাজনক স্লট বুক করতে পারিনি বলে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা আমাকে দুবার বদলে ফেলতে হয়েছে। সমস্যাটা বুঝিয়ে বলছি। ধরুন আপনি অনলাইনে লুভ্রের টিকিট করেছেন, কিন্তু রিজার্ভেশন করেননি। টিকিট নিয়ে চলে গেলেন মিউজিয়ামে। আপনাকে ঢুকতে দেবে অতি অবশ্যই। কিন্তু অপেক্ষমান লাইনে দাঁড়াতে হবে। ভিড় বেশি থাকলে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েকঘণ্টাও দাঁড়াতে হতে পারে। তবে স্লট থাকলে আপনি দাঁড়াবেন একটা ভিন্ন লাইনে, যেখানে তেমন ভিড় নেই, কয়েক মিনিটের বেশি লাগে না। কেবল স্লট অনুযায়ী সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে স্লট ছাড়া যাওয়া মানে অনর্থক একটা জায়গায় কালক্ষেপণ করা, দিনের বাকি প্ল্যান কেঁচে যাওয়া। মেয়াদযুক্ত পাসের উপযুক্ত ব্যবহার করতে চাইলে এই অপেক্ষা অত্যন্ত ক্ষতিকর তাতে সন্দেহ কী!
ছোটবড় যেকোনো কাজের পরিকল্পনাই আমি গুছিয়ে করতে ভালোবাসি। শুরুতে বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত এক জায়গায় করলাম। আমার বাকেট লিস্টের জায়গাগুলো বিভিন্নদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে, সুতরাং কাছাকাছি দুটি জায়গা থাকলে সে-দুটিকে পরপর দেখে ফেলাই যুক্তিযুক্ত। এজন্য সবার আগে গুগল ম্যাপে জায়গাগুলো চিহ্নিত করলাম। এছাড়া আরও কিছু আনুষঙ্গিক ব্যাপার আছে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে আনুমানিক কেমন সময় লাগবে, মিউজিয়াম কখন খুলবে আর বন্ধ হবে, কবে একেবারেই বন্ধ থাকবে ইত্যাদি। বেশিরভাগ জায়গা সাধারণত পাঁচটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশেষ বিশেষ দিনে কিছু জায়গা রাত আটটা কিংবা নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অর্থাৎ এরকম কিছু জায়গাকে তালিকায় ঢোকাতে পারলে এমনকি রাতেও মিউজিয়াম পাস কাজে লাগানো যাচ্ছে। আরেকটা ফ্যাক্টর হচ্ছে কোনো দর্শনীয় স্থান মোটামুটিভাবে দেখতে গড়ে কত সময় লাগা উচিত। বিভিন্ন ব্লগ আর গুগল ম্যাপের রিভিউ থেকে পাওয়া এই তথ্য অবশ্য ততটা নির্ভরযোগ্য নয়। কার কোন্ জায়গা দেখতে কত সময় লাগবে, সে-জায়গা তার কাছে কতক্ষণই বা উপভোগ্য থাকবে—এসব আপেক্ষিক ব্যাপার। যেহেতু সময় সংক্ষিপ্ত, কোনোকিছুই খুঁটিয়ে দেখা অসম্ভব। অর্থাৎ বেছে বেছে বিশেষ বস্তুগুলোকেই দেখতে হবে। বাকিগুলোকে বড়জোর ছুঁয়ে যাওয়া যেতে পারে। সেজন্যও একটা তালিকা প্রয়োজন। সবমিলিয়ে এই যে এত-এত হিসেব, এসব করতে হলে এক্সেল ছাড়া আর উপায় কী?
সেদিনটায় কাজের চাপ কম থাকায় ডেস্কটপে এক্সেল আর গুগল ক্যালেন্ডার খুলে আমি ঠিক এসবই করছিলাম। এখন অল্পকথায় এতকিছু কীভাবে আমার দক্ষিণ কোরীয় সহকর্মীকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব—যার পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী একটি পাসপোর্ট আছে এবং বিবাহসূত্রে শেনজেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিও আছে? সুতরাং ওকে যে বলেছি—বিষয়টা জটিল—মিথ্যে তো বলিনি!
সবগুলো রিজার্ভেশন নিশ্চিত করে, পরিকল্পনা অনুযায়ী গুগল ক্যালেন্ডারে সবগুলো ভ্রমণের এন্ট্রি দিয়ে এরপর সুপারভাইজরের কাছে দুদিনের ছুটি চাইলাম। ততদিনে সহকর্মীদের প্রায় সবাই আমার এই মহাপরিকল্পনার কথা জেনে গেছে। ছুটি কবুল করাতে বেগ পেতে হলো না। ১৬ আগস্ট রাতে ঘুমোতে গেলাম প্রায় ঈদের আগের রাতের মতো চিত্তচাঞ্চল্য নিয়ে।
প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে ১৭ থেকে ২০ আগস্ট, এই চারদিনে মোট ১৭টি স্থাপনা ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল থিমভিত্তিক জাদুঘর, চিত্রশালা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভার্সাই প্রাসাদ আর লুভ্র জাদুঘর।
<p>
বইয়ের যে-পাতায় আমরা বেঁচে থাকি
লোকে বলে প্যারিসের নাকি সবই দেখার মতো। অত্যুক্তি নয় মোটেই। এমনকি প্যারিসের সমাধিস্থলগুলোও একপ্রকার দর্শনীয় জায়গা। শিল্পের শহর প্যারিস, কাজেই সেখানে শিল্পীদের সমাধি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। খোঁজখবর করে জানা গেল—সিমেট্রিগুলোর ভেতরে সবচেয়ে বিখ্যাতটির নাম পের লাশেজ (Père-Lachaise)। অন্য আরেকটি সিমেট্রি—সেটিও বেশ প্রসিদ্ধ—নাম মঁপারনাস (Montparnasse)। এছাড়া রয়েছে পঁতেয়োঁ (Panthéon), যার বাংলা অর্থ সর্বদেবতার মন্দির। বিখ্যাত কিছু মানুষের অন্তিমশয্যা রয়েছে সেখানে। পের লাশেজ এবং মঁপারনাস সমাধিক্ষেত্র সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত, তবে পঁতেয়োঁ ভ্রমণে প্রবেশমূল্য লাগে। সেটায় প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে ঢুকেছিলাম।
যেহেতু নিখরচায় ঘোরাঘুরিই আমার প্রধান লক্ষ্য, প্রথমে পরিকল্পনা করলাম মঁপারনাস ঘুরে আসার।
১৮২৪ সালে চালু হওয়া মঁপারনাস সিমেট্রির আকার প্রায় ৪৭ একর। অবস্থান রাসপাইল মেট্রো স্টেশনের একদম পাশে। এই স্টেশনটা আমাকে প্রায়শই ব্যবহার করতে হয়েছে, কারণ এখানে লাইন বদলে আমি ইউনেস্কো অভিমুখের মেট্রো ধরতাম। প্যারিসের বেশিরভাগ মেট্রো স্টেশন ভূগর্ভস্থ, ফলে যাতায়াতের সময়ে বাইরের পৃথিবীকে বিশেষ অনুভব করা যায় না। তবে প্রাসঙ্গিক স্থাপত্যশৈলী আর কারুকার্যের বদৌলতে প্রায় প্রতিটি স্টেশনই অনন্য এবং দর্শনীয় জায়গা। যেমন লুভ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি মেট্রো স্টেশনের নাম লুভ্র-রিভলি। সেখানে লুভ্র জাদুঘরে প্রদর্শিত কিছু বিখ্যাত সামগ্রীর রেপ্লিকা রাখা আছে। আবার আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট জাদুঘরের পাশের স্টেশনটি সাবমেরিনের আদলে নকশা করা, যার অনুপ্রেরণা জুল ভার্নের টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি।
মঁপারনাসে গিয়েছিলাম জুলাইয়ের ২৯ তারিখে, শনিবারে। আকাশজুড়ে সেদিন ঘোলাটে মেঘ। সিমেট্রিতে ঢুকে ফোনে অফলাইন ম্যাপ বের করি। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে আগেভাগেই নোট্সে লিখে রেখেছিলাম বিভিন্ন বিখ্যাত কবরের অবস্থান (ব্লক, নম্বর)। পুরো সমাধিক্ষেত্রটিই বেশ গোছান, ফলে নির্দিষ্ট সমাধি খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না। সুশৃঙ্খল হলেও বোঝা যায় যে সময়ের সঙ্গে খানিকটা ঘিঞ্জি হয়েছে। মঁপারনাসে বর্তমানে সমাধিক্ষেত্রের সংখ্যা ৩৫,০০০, যদিও এতে শায়িত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক তিন লক্ষেরও বেশি। কবরের পুনর্ব্যবহার তো করতেই হয়। কিন্তু তাতেও কুলিয়ে ওঠা যায় না, কারণ প্রতিবছর প্রায় হাজারখানিক মানুষের নাম তালিকায় যুক্ত হচ্ছে প্যারিসের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সিমেট্রিতে।
এটা ছিল পশ্চিমা কোনো সমাধিক্ষেত্রে আমার প্রথম প্রবেশ। ঢুকে মন ভালো হয়ে গেল নিমেষে। শুরুতেই চোখে পড়ে প্রচুর গাছপালা, যাদের উঁচু শরীর আর ছড়ানো ডালপালায় চারিদিকে ছায়া-ছায়া স্যাঁতস্যাঁতে একটা ভাব আছে। অল্প-অল্প হাওয়া দিচ্ছে। শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ। প্রচণ্ড ব্যস্ত শহরটার ভেতরেও যেন একচিলতে স্থবির পৃথিবী—যেখানে সকল প্রতিযোগিতার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। পরে জেনেছি মঁপারনাসে চল্লিশ প্রজাতির প্রায় বারোশো বড় গাছ আছে। তবে আসল আকর্ষণ কারুকার্যমণ্ডিত ভাস্কর্য-সম্বলিত সমাধিগুলো। যেন সমাধিক্ষেত্র নয়, রীতিমত শিল্প-প্রদর্শনী! বেশিরভাগ নকশাই মুগ্ধতা ছড়ায়, কিছু কিছু আবার মনে খানিকটা দুর্বোধ্য অনুভূতিরও সঞ্চার করে। ভীতি? রোমাঞ্চ? আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তবে সেটাও একপ্রকার অভিজ্ঞতা।
ঢুকে শুরুতেই দেখা মিলল জঁ-পল সার্ত্র এবং সিমন দ্য বোভোয়ারের। অভিন্ন কবরে শায়িত দুজনে। সার্ত্র মারা গিয়েছিলেন বোভোয়ারের ছ’বছর আগে। তার আগ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রথাগত নিয়মের সম্পূর্ণ বাইরে এক রোমান্টিক যুগল ছিলেন তাঁরা। ভালোবাসার সবচেয়ে বড়ো শত্রু সম্ভবত অহং ও ঈর্ষা, সম্পর্কের ধরনের কারণে যা তাঁরা অনেকটাই অগ্রাহ্য করতে পেরেছেন বলে অনুমান করা হয়। দেখলাম, কবরের ওপরে কিছু তাজা ফুল রাখা। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ে সমাধিফলকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র লিপস্টিকের দাগ। দেখে খানিকটা কৌতূহল জন্মাল। মেয়েরা নাহয় তুলনামূলক সহজ এই প্রক্রিয়ায় তাদের ভালোবাসা দেগে রাখে। সহজ বলছি কারণ ঠোঁটে না হলেও তাদের ব্যাগে একটা লিপস্টিক থাকেই সাধারণত (জেনারেলাইজেশন না, এ-হলো সাধারণ জ্ঞান)। কিন্তু ছেলেদের অমন ভাবাবেশ এলে তারা কী করে? খুব বেশি ছেলেকে আমি পকেটে মার্কার নিয়ে ঘুরতে দেখিনি।
আরেকটু এগোতে পাওয়া গেল এমিল ডুর্খেইমের সমাধি। ‘সুইসাইড’ বইয়ের কল্যাণে যাঁকে আমি বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখি। আত্মহত্যার যুগান্তকারী সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন ভদ্রলোক। আত্মহত্যাকে আজও অনেকে মানসিক বিকার আর দুর্বলতা হিসেবে সাব্যাস্ত করার চেষ্টা করেন, যেন বিষয়টি পুরোপুরি জৈবিক ও ব্যক্তিগত ব্যাপার। অথচ ডুর্খেইম রীতিমত তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন—মানুষের জেন্ডার, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষা ইত্যাদি কীভাবে আত্মহত্যার ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। আত্মহত্যার যে শ্রেণিবিন্যাস তিনি করে গেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করা হয়। ডুর্খেইমের কবরের ওপরেও কিছু টাটকা ফুল রাখা। সেখানে আবার নুড়িপাথর দিয়ে কে-যেন হৃদয়ের একটা আকৃতি বানিয়ে রেখে গেছে। অ্যাকাডেমিশিয়ানদেরও এসব ভালোবাসা-টাসা মন্দ জোটে না তাহলে।
খানিকটা এগিয়ে শার্ল বোদলেয়ারের সমাধি। এটি অবশ্য কবির নিজস্ব কবর নয়, তাঁর সৎবাবার পারিবারিক কবর। সুনীল তাঁর ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’-তে বোদলেয়ারকে নিয়ে যা লিখেছেন, সেটিকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো রসদ আমার নেই। সেই চেষ্টাও করছি না। তবে বোদলেয়ারের নামের ওপরে এবং আশপাশে আবারও নারীভক্তদের ঠোঁটের আক্রমণ দেখা গেল। আর্থিক অনটন আর সম্পর্কের জটিলতার চাপে অতিষ্ঠ মানবজীবন আজ দুর্নিবার ভালোবাসায় ভেসে যায়। যে-জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের। যে-জীবন ব্যাখ্যাতীত।
বোদলেয়ারের মূল কবরটি একক নয় বলে তাঁর স্মরণার্থে এই সমাধিক্ষেত্রেই একটি কবরবিহীন ভাস্কর্য করা হয়েছে—ইংরেজিতে যাকে বলে সেনোটাফ (Cenotaph)। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেটারও দেখা পাওয়া গেল। একটা সাধারণ সমাধির আকৃতিতেই তৈরি, যার ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে একটি কংক্রিটের দেহ। মাথার দিকের প্রান্তে সোজা উঠে গেছে একটা সরু স্তম্ভ, আর তার চূড়ায় চিবুকে দুহাত দিয়ে সামনের দিকে চেয়ে আছেন বোদলেয়ার। ভাস্করের তারিফ করতেই হয়। বোদলেয়ারের চোখের জায়গাটায় আদতে কিছু নেই, তবু স্পষ্টতই মনে হয় যেন তীক্ষ্ণচোখ আর ধারালো চেহারায় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন কবি।
সবশেষে গি দ্য মোপাসঁর সমাধি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি অনেকেই পড়ে থাকবেন—কণ্ঠহার (ফরাসি La Parure, ইংরেজিতে The Necklace)। আমারও এটা দিয়েই শুরু। তবে শখের বশে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে পড়েছিলাম। বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির বাংলা বইতেও গল্পটি সংযোজিত হয়েছে, যদিও আমাদের সময়ে ছিল না। গল্পটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে।
মোপাসঁকে প্রায়শই আধুনিক ছোটোগল্পের জনক বলা হয়। রিয়েলিজম ও ন্যাচারালিজম তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যুদ্ধক্ষেত্রকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের সময়ে, যেটি তাঁর পরবর্তী অনেক লেখাকে প্রভাবিত করেছে। যেকোনো সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই আমার আগ্রহের জায়গা থাকে তাঁর অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার উৎস নিয়ে। ফিকশন—হোক চরম রিয়েলিজম কিংবা চরম ফ্যান্টাসিঘেঁষা—এর অনুপ্রেরণা বাস্তব পৃথিবী থেকেই আসতে হবে। মোটাদাগে যদি পার্থক্য করি—প্রতিটি মানুষের জীবনেই অজস্র বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়, সেগুলো মানুষকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঋদ্ধও করে। কিন্তু একজন শিল্পীর অভিজ্ঞতা অজস্র মানুষকে সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। অনেকটা অ্যামপ্লিফিকেশনের মতো ব্যাপারটা। একটা ছোটো ঘটনা হয়তো আরো অনেকেই দেখবে, সেটা নিয়ে ভাববে, খানিকটা কল্পনাও করবে, কিন্তু এসব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থেকে যাবে স্রেফ নিজের ভেতরে। যিনি ভালো লেখক নন, তাঁর খসখসে বর্ণনা কিংবা অতিরিক্ত রঙ চড়ানোর ফলে অপরিশোধিত (raw) রূপটি বিকৃত হয়ে পড়বে কিংবা অবোধ্য হয়ে উঠবে, এমন আশঙ্কা সবসময়ই থেকে যায়। কিন্তু একজন সুলেখক যখন নিজের কল্পবিশ্বকে সুচারুভাবে গড়বেন, সূক্ষ্মভাবে সম্পূর্ণ করবেন, তারপর সুকৌশলে ছড়িয়ে দেবেন—সেটিকে অপরিশোধিত অনুভূতির অবিকৃত প্রকাশ বলেই মনে হবে। এটাই শৈল্পিক স্পর্শের (artistic touch) শক্তি।
মোপাসঁর সমাধিকে অন্য অনেক সমাধির চেয়ে সাদামাটাই বলা চলে। ওপরে কংক্রিটের ঢালাই বা ভাস্কর্য নেই, তার বদলে মাটি আর ফুলগাছ। একটা সমাধিফলক আছে অবশ্য, তাতে বড়ো বড়ো করে নাম লেখা। এই সমাধি পরিদর্শনের মধ্য দিয়েই মঁপারনাস ভ্রমণের ইতি টানলাম।
সমাধিক্ষেত্রে হাঁটতে গিয়ে অবশ্য আরো অজস্র কৌতূহলোদ্দীপক ও দৃষ্টিনন্দন সমাধির দেখা পেয়েছি। ফরাসি রাজনীতিবিদ, অভিজাত পরিবার থেকে শুরু করে স্বল্পখ্যাত ও অখ্যাত অনেকেরই জায়গা হয়েছে এখানে। এঁদের সকলেই যুগান্তকারী কাজ করে যাননি, ফলে শতক পেরিয়ে অনেক মানুষের কাছে স্মরণার্হ থাকার উপায় তাঁদের নেই।
তবু মানুষ স্মরণ করে। অন্তত যতদিন বেঁচে থাকে কাছের মানুষেরা। সেরকমই একটি কবর চোখে পড়েছিল। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে জীবনাবসান হওয়া মিষ্টি চেহারার ফরাসি নারীটির একটা রঙিন ছবি কবরের ওপরে খোদাই করা। নামটা পরিচিত নয়, ইন্টারনেট ঘেঁটেও কিছু পাওয়া গেল না। অর্থাৎ বিখ্যাত কেউ ছিলেন না। কিন্তু তেরো বছরের পুরনো সমাধিটির ওপরে অজস্র তাজা আর শুকনো ফুল ছড়ানো। অর্থাৎ কেউ নিয়মিত ভালোবাসা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফুলের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আলফোঁস দ্য লামার্তিনের একটা ছোট্ট কবিতাংশ। অনুবাদ করলে দাঁড়ায়―
সর্বশ্রেষ্ঠ বই হচ্ছে জীবনের বই—
যথেচ্ছভাবে যা বন্ধ করা যায় না, খোলাও যায় না;
এবং কখনো পছন্দের পাতাগুলোকে আবার পড়তে চাইলে
সেখানে ফিরে যাওয়া যায় না। কিন্তু নিয়তির পৃষ্ঠাগুলো অবশ্য
উল্টে চলে নিজ থেকেই। যদিও একজন মানুষ কেবলই ফিরে যেতে চায়
প্রেমপূর্ণ পাতাগুলোতে, কিন্তু তার আঙ্গুলের ঠিক নিচেই
চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকে
মহাপ্রয়াণের পৃষ্ঠাটি।
পৃথিবীর সেরা সমাধিক্ষেত্রে
সপ্তাহদুয়েক পর দেখতে গেলাম পের লাশেজ (Père-Lachaise)। শব্দটা আদতে ফরাসি, তবে আমি বাঙালি বলেই কি শ্লেষটা চোখে লাগছে? অনেকগুলো লাশ আছে বলেই জায়গাটাকে লাশেজ ডাকতে হবে? এহ্।
শিরোনামেই বলেছি যে পের লাশেজ কেবল প্যারিসের নয়, ফ্রান্সের নয়, এমনকি ইউরোপেরও নয়—পুরো পৃথিবীরই সবচেয়ে বিখ্যাত সিমেট্রি। প্রায় সোয়া দুশো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত (১৮০৪) এই সমাধিক্ষেত্র আকারে মঁপারনাসের চেয়ে বেশ বড়ো—প্রায় তিনগুণ। সমাধির সংখ্যা সত্তর হাজারের কাছাকাছি। জায়গাটাকে প্যারিসের অন্যতম ভ্রমণ-গন্তব্য বিবেচনা করা হয়। প্রতিবছর গড়ে পঁয়ত্রিশ লক্ষের বেশি দর্শনার্থী ঘুরতে আসে এখানে, যা অন্য যেকোনো সিমেট্রির দর্শনার্থী-সংখ্যার চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বিখ্যাত বলার এটা অন্যতম কারণ। আরেকটা কারণ এতে সমাহিত বিখ্যাত মানুষদের তালিকা—যা আসলেই বেশ দীর্ঘ!
ভেতরে প্রবেশ করে বোঝা গেল পের লাশেজ তার খ্যাতির কারণে নগর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে খানিকটা বেশি যত্নআত্তি পায়। অবশ্য রোজগেরে সন্তানরা যেখানে মা-বাবারই চোখের মণি হয়ে থাকে—সেখানে মিউনিসিপ্যালিটির নিরপেক্ষ থাকতে বয়েই গেছে। পের লাশেজের হাঁটার রাস্তাগুলো তুলনামূলক চওড়া, পরিবেশ মঁপারনাসের চেয়ে পরিচ্ছন্ন, আর কবরগুলোর অবস্থান কিছুটা ফাঁকা-ফাঁকা।
খুঁজে খুঁজে প্রথম যে-কবরটা দেখলাম—সেটা অস্কার ওয়াইল্ডের। ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই আইরিশ সাহিত্যিকের শেষশয্যা প্যারিসে হওয়ার পেছনে খানিকটা ইতিহাস আছে। মূল কারণ ছিল যৌনতা। যৌবনের শুরুতে অস্কার একজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন, সন্তানের বাবাও হয়েছিলেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে বুঝতে পারেন যে তিনি সমকামিতায় আকৃষ্ট হচ্ছেন। বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থাতেই সমলিঙ্গের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। এই সময়কালে আবার সন্তানের বাবাও হন। সবমিলিয়ে বিষয়টা জটিল—এজন্য তাঁকে চট করে উভকামী বা সমকামী কোনোটা বলে ফেলা শক্ত। যাইহোক, অস্কার যখন আরেক সাহিত্যিক লর্ড আলফ্রেড ডগলাসের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান, তখন পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিকূল হতে থাকে। আলফ্রেডের বাবা ছিলেন রাগী মানুষ। ব্যাপারটা তিনি মেনে নেননি। সেটা ১৮৯৫ সালের কথা। তৎকালীন গ্রেট ব্রিটেনে সমকামিতাকে সামাজিকভাবে আর আইনগতভাবে মারাত্মক অপরাধ বিবেচনা করা হতো। অস্কারের বিরুদ্ধে আলফ্রেডের বাবা অভিযোগ দায়ের করেন। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ব্যক্তিগত অবস্থানের জের ধরে অস্কারের লেখালিখি নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। সাহিত্যমূর্খরা সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণ করতে গেলে যেমনটা হয় আরকি। পরিস্থিতি দেখে কাছের মানুষজন তাঁকে পরামর্শ দেয় ফ্রান্সে পালিয়ে যেতে। অস্কার রাজি হননি। অবধারিতভাবে গ্রেপ্তার হলেন। বিচারকার্য চলাকালে তাঁকে বিশেষভাবে আলফ্রেডের লেখা ‘Two Lovers’ কবিতাকে কেন্দ্র করে আক্রমণ করা হলো। প্রতিপক্ষ যুক্তি দিলো, কবিতার “The love that dare not speak its name” বাক্যে ‘চরম অশালীনতা’ প্রকাশ পেয়েছে। জুরিদের সামনে অস্কার অবশ্য দুর্দান্তভাবে ব্যাখ্যা করলেন, এতে আসলে সকাম নয়, বরং প্লেটোনিক ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। জুরিরা দ্বিধায় ভুগলেন, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে অস্কার সাজা এড়াতে পারলেন না। কায়িক শ্রমসহ দু’বছর কারাভোগের সিদ্ধান্ত এলো। তখনকার হিসেবে এই ‘অপরাধে’ এটাই সর্বোচ্চ।
কারাগারে অস্কার ধারণাতীত কষ্ট করেছেন। তবে লেখালিখি অব্যাহত রেখেছিলেন। সাজাভোগের মেয়াদ শেষ হলো ১৮৯৮ সালে। এবার আর দ্বিধান্বিত হননি, ইংল্যান্ডে থাকার প্রয়োজনবোধও করেননি। কপর্দকশূন্য অবস্থাতেই চলে এলেন প্যারিসে। উদ্দেশ্য ছিল আবার পুরোদমে লেখালিখি শুরু করবেন, নতুন করে সবকিছু গড়বেন। পারেননি, কারণ এরপর বেঁচেইছিলেন আর মাত্র দুবছর। আসলে সাজা খাটার সময়েই তাঁর শরীর ভেঙ্গে পড়েছিল, যা আর কখনো সেরে ওঠেনি। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে প্রয়াত হওয়া সাহিত্যিকের স্থায়ী জায়গা হলো পের লাশেজে।
এই গল্পের একটা সমাপ্তি আছে। ‘দ্য ইমিটেশন গেইম’ চলচ্চিত্রের সুবাদের অ্যালান টুরিং-এর নাম অনেকেই জানেন। সমকামিতা-সংক্রান্ত অন্যায় বিচার আর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন এই তুখোড় গণিতবিদও। মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিগৃহন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তিনি আত্মহনন করেছিলেন। ব্রিটেন অবশেষে এই ঐতিহাসিক অন্যায়টি স্বীকার করে নেয়। ২০১৭ সালে পাশ হওয়া আইনে সমকামে জন্য ইতিপূর্বে অপরাধী সাব্যাস্ত করা সকলকে নিরপরাধ ঘোষণা করা হয়। এই তালিকায় ছিলেন অস্কার ওয়াইল্ডও।
আরেকটা তথ্য দিই। পের লাশেজের সকল কবরের ভেতরে এককভাবে সবচেয়ে বেশি চুম্বন পড়ে অস্কার ওয়াইল্ডের কবরের ওপরে। পৃথিবী বোধহয় তাদের পরে খুব করে ভালোবাসে যাদেরকে সঠিক সময়ে ঠিকঠাক ভালোবাসতে পারেনি। ভবিতব্য।
খানিকটা এগোতে ফরাসি রসায়নবিদ জোসেফ লুই গে-লুসাকের সমাধি পাওয়া গেল, গ্যাস-আয়তন সূত্রের জন্য যিনি বিখ্যাত। এর খানিকটা পাশেই স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের কবর। জার্মানির লাইপ্ৎসিশ (Leipzig) বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন নিয়ে পড়লেও হ্যানিম্যান পরবর্তীতে একটা সময় হোমিওপ্যাথি আবিষ্কার করেন এবং অ্যালোপ্যাথির ঘোর বিরোধিতা শুরু করেন। উত্তরসূরিদের ভেতরে এই বিরোধ আজও চলমান, যদিও একটা সময় ধরে হোমিওপ্যাথির বেশ বাড়বাড়ন্ত থাকলেও এখন সেই সুদিন আর নেই। একে আর নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাপদ্ধতি বলে বিবেচনা করা হয় না। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, যুক্তরাজ্যের এনএইচএস, এমনকি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও হোমিওপ্যাথির শরণাপন্ন হতে নিরুৎসাহিত করে।
ওগ্যুস্ত কোঁৎ-এর সমাধির দেখা মিলল এরপর। কিছুদিন আগে তাঁর মিউজিয়াম দেখার চেষ্টা করে বিফল হয়েছি। কোঁৎ তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অনেকটাই শহরের কেন্দ্রের দিকের একটা অ্যাপার্টমেন্টে কাটিয়েছিলেন। সেখানে বসেই তিনি লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘Système de politique positive’ বইয়ের চারটি খণ্ড। বাসভবনটাকে এখন জাদুঘর করা হয়েছে। তবে গুগল ম্যাপের রিভিউতে দেখেছি যে সেটা বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে, সময়সূচি দেয়া থাকলেও তা বিশেষ কাজের নয়। তবু আশায়-আশায় গিয়েছিলাম। বন্ধই পেলাম। পরে আরেকবার চেষ্টা করে দেখব ভেবেছিলাম, হয়ে ওঠেনি।
সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় ওগ্যুস্ত কোঁৎ একপ্রকার অপরিহার্য। তাঁকে বলা হয় জ্ঞানের এই যুগান্তকারী শাখার জনক। তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন ফরাসি sociologie শব্দটি, যেটি ইংরেজিতে হয়ে ওঠে Sociology। সমাজের প্রগতির রূপরেখা ব্যাখার জন্য তাঁর থিওরি অব পজিটিভিটি-কে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে মনে করা হয়। এমিল ডুর্খেইম, হার্বার্ট স্পেন্সার, জর্জ এলিয়টরা কোঁতের কাজ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
খানিকটা ঘুরপথ হেঁটে পাওয়া গেল আরেকজন সমাজবিজ্ঞানীর সমাধি। তিনি অবশ্য অত পুরনো নন, গত হয়েছেন ২০০২ সালে, তবে ইতোমধ্যেই অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। পিয়ার বোর্দিউ। যেহেতু আমি শিক্ষা-গবেষণার মানুষ, নামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে একাধিকবার—বিশেষভাবে কালচারাল ক্যাপিটাল আর হ্যাবিটাস তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সামাজিক কাঠামোতে বিদ্যমান বৈষম্য-সংক্রান্ত গবেষণায় বোর্দিউর তত্ত্ব অতুলনীয়।
হাঁটতে হাঁটতে এ-পর্যায়ে খানিকটা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হলো। আগেই বলেছি জায়গাটা বড়। কিন্তু পুরোটা যে সমতল নয় সেই তথ্য আমার জানা ছিল না। অনেক জায়গাই উঁচুনিচু টিলার মতো। কয়েক জায়গায় দীর্ঘ সিঁড়ি ভাঙতে হলো। রণেভঙ্গ দিয়ে সেদিন ফিরে যাব কিনা সেই ভাবনাও মাথায় এসেছে। পরে ভাবলাম, অল্প কয়েকটা দিনই আছে হাতে। আর কি হে হবে দেখা! সিমেট্রিতে বসার জায়গার অভাব নেই। খাবার জলের উৎসও অফুরান, বিনামূল্যে যতো ইচ্ছে বোতলে ভরে নেওয়া যায়। কাছে অল্পকিছু স্ন্যাকসও আছে। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। একা ঘোরাঘুরিতে যেমন সুবিধা অনেক, আবার অসুবিধাও কম নয়। একেকসময় একেকটা প্রকট হয়ে ওঠে আরকি।
খানিকক্ষণ জিরোনোর পর প্রখ্যাত সুরকার ফ্রেদেরিক শোপাঁর কবরের দিকে অগ্রসর হলাম, পিয়ানোতে যিনি তুলেছিলেন হৃদয়-নিংড়ানো গভীর আবেগ-মথিত প্রাণবন্ত সুর, যে-কারণে আদর করে যাঁকে পিয়ানোর কবি (Poet of the Piano) বলে ডাকা হয়। যদিও প্যারিসের এই কবরে শুয়ে থাকা শোপাঁর কোনো হৃদয় নেই। কথাটা শুনতে হেঁয়ালি মনে হলেও সত্যভাষণ। ব্যাখ্যা করার আগে তাঁর জীবন নিয়ে বলি।
শোপাঁর বাবা জাতে ফরাসি ছিলেন, কাজের সূত্রে পোল্যান্ড-অভিবাসী হয়েছিলেন। সেখানেই শোপাঁর জন্ম আর বেড়ে ওঠা। তিনি ছিলেন অতিপ্রতিভাবান শিশু (Child Prodigy)। ওয়ারশতে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হলেও নিজেকে সেখানে বন্দি রাখতে চাননি। মা-বাবার আর্থিক সঙ্গতি খুব বেশি ছিল না, কিন্তু প্রতিভাবান সন্তানের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কদর করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের সহায়তায় শোঁপা সঙ্গীত নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করতে অস্ট্রিয়া যান। পরে জার্মানি আর ইতালি ঘুরে অবশেষে প্যারিসে। সেখানে সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু বছর অতিবাহিত হয়। এরপর দুর্ভাগ্যবশত যক্ষায় আক্রান্ত হন, দীর্ঘদিন ভোগেন। শেষমেষ যক্ষাতেই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটে।
মৃত্যুশয্যায় শোপাঁ বোনকে তাঁর শেষ ইচ্ছে জানান—মারা যাওয়ার পর দেহ থেকে হৃৎপিণ্ড ছিন্ন করে সেটিকে পোল্যান্ডে সমাহিত করতে হবে। এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমটা অনুমেয়, স্বদেশে ফেরার করুণ আকুতি। দ্বিতীয়টি কিছুটা অদ্ভুত। উনিশ শতকে জনমানসে একটা বিশেষ ভয় খুব বেশি ছড়িয়ে গিয়েছিল। অনেকের মনে ধারণা জন্মেছিল যে, মৃত্যু ঠিকঠাক হয়েছে কিনা তা ভালোভাবে নিশ্চিত না হয়েই বাকিরা তাড়াহুড়ো করে তাকে কফিনবন্দি করে ফেলবে। এই ভীতিকে বলা হয় ট্যাফোফোবিয়া। শোপাঁর মনে এটা বেশ প্রকট ছিল। একবার হৃৎপিণ্ড বের করে ফেললে আর কিছু না-হোক জ্যান্ত অবস্থায় কবর হওয়ার ভয় তো নেই! যাইহোক, ভাইয়ের অন্তিম আকুতি বোন উপেক্ষা করতে পারেননি। জারে সংরক্ষণ করে হৃৎপিণ্ডটি তিনি নিজেই বহন করে নিয়ে যান। রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত পোল্যান্ডে তাঁকে এটা একপ্রকার চোরাচালান করে নিয়ে যেতে হয়।
আজও শোপাঁর হৃৎপিণ্ড ওয়ারশর হলি ক্রস চার্চের একটা স্তম্ভের ভেতরে সযত্নে রক্ষিত আছে। আর এখানে শায়িত আছেন হৃদয়বিহীন শোপাঁ।
প্রখ্যাত শিল্পী ওজেন দ্যলাক্রোয়ার কবরও পের লাশেজে, শোপাঁর কাছাকাছিই। তাঁর মিউজিয়ামে পরে গিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে পরবর্তীতে লিখব, সেজন্য এখানে আর পুনরাবৃত্তি করছি না। তবে জানিয়ে রাখি—দ্যলাক্রোয়া আর শোপাঁ আজীবন খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন, পরস্পরের কাজের অনুরাগীও ছিলেন। শোপাঁ মারা যাওয়ার পর তাঁর মৃতদেহের কফিন পের লাশেজে বয়ে আনার কাজেও কাঁধ দেন দ্যলাক্রোয়া।
অঁরে দ্য বালজাকের সমাধি এলো এরপর। স্তম্ভের ওপরে লেখকের একটি দৃষ্টিনন্দন আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে, ডেভিড অঁজরের তৈরি, যাতে প্রকাশ পেয়েছে সেই চিরাচরিত কুচ-পরোয়া-নেহি-মার্কা তীক্ষ্ম চেহারা, আর সেই ঢেউখেলানো বন্যধাঁচের চুল। তবে বালজাকের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্য এটি নয়, সেটি ওগ্যুস্ত রোদাঁর তৈরি, নাম ‘মনুমেন্ট টু বালজাক’, অবস্থান প্যারিসের রোদাঁ জাদুঘর।
সাহিত্যে বাস্তববাদের (realism) জনক বিবেচনা করা হয় বালজাককে। পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। কখনো-কখনো টানা ১৫-১৮ ঘন্টাও লিখেছেন। যেহেতু রাত জাগতে হতো, কফির নেশা ছিল মারাত্মক। দিনে এমনকি পঞ্চাশ কাপেরও বেশি কালো কফি খেয়েছেন শোনা যায়। খুঁতখুঁতেও ছিলেন, নিজের লেখা প্রচুর সম্পাদনা করতেন। মাঝে-মাঝে এজন্য অবশ্য বিপাকেই পড়তেন প্রকাশক, কারণ সময়মতো মুদ্রণ শুরু করা যেত না।
একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্যারিসে বালজাকের বাড়িতে দুটো দরজা ছিল। সামনেরটা সদর, আর পেছনের গুপ্ত দরজাটির উদ্দেশ্য ছিল ঋণদাতাদের তাগাদা থেকে পালানো। এছাড়া আজীবনই বিবাহিতা এবং তুলনামূলক বয়স্কা নারীদের ব্যাপারে বালজাকের ভয়ঙ্কর অবসেশন ছিল। তেইশ বছর বয়সে তিনি মাখামাখি প্রেমে পড়েছিলেন যে প্রতিবেশী নারীর—তিনি ছিলেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স্কা ও ৯ সন্তানের মা। শহুরে অপভাষায় তাঁকে মিল্ফ-লাভার বললেও বোধহয় খুব বাড়াবাড়ি হবে না!
এরপরের কবর রসিনির, যাঁকে ইতালির মোৎসার্ট নামে ডাকা হয়। দুর্দান্ত সব অপেরা কম্পোজ করেছেন। তাঁর বেশকিছু কম্পোজিশন পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে অভিযোজিত হয়েছে। রসিনির সমাধি দেখতে ছোটোখাটো ঘরের মতো। সামনে লালরঙা দরজা। তার ওপরে চমৎকার অক্ষরে বড়ো করে রসিনি লেখা।
পের লাশেজে সবচেয়ে বেশি ফুল পড়ে যে-সমাধিতে সেটি এদিত পিয়াফের। আমি গিয়ে দেখি—ফুলের ভারে নুইয়ে পড়বে এমন অবস্থা। মজার ব্যাপার হলো গাঢ় লালরঙা একটা বিশেষ হাইব্রিড গোলাপের নামকরণই করা হয়েছে এদিতের নামে। তাঁকে শ্রদ্ধানিবেদনেও আবার এই ফুলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়, তবে সেখানে অন্যান্য ফুলও রয়েছে।
এই লেখাটি যখন লিখছি তখন আমি কাকতালীয়ভাবে Non, je ne regrette rien শুনছি। এদিতের সবচেয়ে বিখ্যাত এই গানটা অনেকেরই পরিচিত, কারণ বিভিন্ন জনপ্রিয় মাধ্যমে এটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সবশেষে যে-সমাধির কথা বলব সেটি পের লাশেজের সবচেয়ে বড়ো তারকার—জিম মরিসন। সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসে এই সমাধি দেখতে। মাত্র সাতাশ বছর বয়সে প্যারিসে মারা যাওয়ার আগে জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রতিভাবান এই সঙ্গীতশিল্পীর মাদকের দোষ ছিল বাড়াবাড়ি রকমের। মৃত্যুর কারণও তাই, এমনটা অনুমান করা হয়। তবে একে ঘিরে কিছু অসমর্থিত ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের কথাও শোনা যায়। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো লাশের কোনো ময়নাতদন্ত হয়নি। ষড়যন্ত্রের সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই অবশ্য।
উদ্দাম ভক্তরা যাতে মরিসনের কবরের কাছাকাছি ঘেঁষতে না পারে সেজন্য পের লাশেজ কর্তৃপক্ষ একটা ধাতব বেড়া দিয়ে রেখেছে। এরকমটা আর কোনো সমাধিতে দেখিনি। বোঝাই যাচ্ছে কী পরিমাণ লোকসমাগম হয়। আমাকেও কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হলো, কারণ লোকের চাপে জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। বস্তুত অন্য কোনো সমাধিতেই এই অভিজ্ঞতা হয়নি আমার।
মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
আরো ভালো— আরো স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার
পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ
কতো দূর অগ্রসর হ’য়ে গেল জেনে নিতে আসে।
মানুষের মৃত্যু হ’লে | জীবনানন্দ দাশ
ছবিঘর
Gallery
ছবির উপর ক্লিক করে বড়ো আকারে দেখুন | Click on the image for a larger view
