প্যারিসের জাদুঘরনামা (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৫)

কক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি জাদুঘর কোথায় আছে বলুন তো? জানা না থাকলে আন্দাজ করা শক্ত আছে। দেশটা যুক্তরাষ্ট্র; আর সেখানে জাদুঘরের সংখ্যা ত্রিশ হাজারেরও বেশি! এই তথ্য জেনে আমার যেমন খটকা লেগেছে, তেমনি সংখ্যাটাকেও অবাস্তব বলে মনে হয়েছে। পরে ঘেঁটে দেখি ব্যাপারটা সত্যি-সত্যিই। কিন্তু আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এই ফ্যাক্ট কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমি এখনকার কথা ধরছি না। জার্মান ব্যান্ড রামশ্টাইন (Rammstein) বিদ্রুপ করে গেয়েছিল—We’re all living in Amerika—এটাই বোঝাতে যে, আগ্রাসী আমেরিকান সংস্কৃতি পুরো পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে ফেলেছে, দম নেওয়ার ফুরসৎ দিচ্ছে না। তবে এগুলো তো সাম্প্রতিক ব্যাপার। এমনিতে সাংস্কৃতিক ইতিহাস আমেরিকানদের সপক্ষে নয়। মানে, আদিবাসীদের অংশটুকু যদি বাদ দিই, তাহলে এখনকার আমেরিকানদের ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই থাকে না। একদিকে আদিবাসী সংস্কৃতিকে ধারণ করার বদলে শ্বেতাঙ্গ সেটলাররা সেসব মুছে ফেলতেই তৎপর ছিল বেশি, অন্যদিকে আধুনিক আমেরিকা গড়ে উঠেছিল ইউরোপের অপভ্রংশ হিসেবে। যেমন ফ্রাঞ্জ ফানো ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “দুশো বছর আগে ইউরোপের একটি কলোনি ইউরোপের মতো হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা অবশ্য দিনশেষে ইউরোপের দোষগুলো বেছে বেছে নিয়ে আস্ত দানবে পরিণত হয়েছে।” কথাটা বেশ রুক্ষ, তবে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রশ্ন হলো, আমেরিকায় তাহলে এত জাদুঘর গড়ে উঠল কী করে? উত্তর: পুঁজিবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ জাদুঘর মূলত ধনীদের সংগ্রহশালা। টাকাপয়সার মালিক হওয়া একটা নতুন ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার মতো, যার উপাসনা হলো বিভিন্ন ধরনের শৌখিনতা করা। ধনীদের ভেতরে কেউ কেউ আবার দুর্লভ কিংবা দুর্মূল্য বস্তু সংগ্রহের চেষ্টা করেন—হতে পারে নিজেকে আলাদা দেখানোর ইচ্ছা থেকে, কিংবা অনন্য কিছু কুক্ষিগত রেখে গর্ববোধ করতে। এক্ষেত্রে শিল্পকর্ম ভালো চয়েজ। দামি শিল্পকর্মের মালিক হতে হলে অঢেল টাকা থাকলেই চলে; শিল্পকলা বোঝার কিংবা কদর করতে পারার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ধনীমাত্রই আর্টের ব্যাপারে ক-অক্ষর গোমাংস হবেন এমনটাও ধরে নিতে নেই। অর্থবানদের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে দ্য ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো বা ক্লদ মোনের মতো শিল্পীদেরও ক্যারিয়ার হোঁচট খেত, অনেক মহান কাজ আলোর মুখ দেখত না। সেই অর্থে আর্টের সঙ্গে পয়সার বিরোধ নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। শিল্পকর্ম যত মহানই হোক না কেন, ক্রিটিকরা তাকে যেভাবেই শ্রেষ্ঠত্ব দিক না কেন, দিনশেষে তারও একটা বিনিময়মূল্য আছে, টাকাতেই তাঁর দর নির্ধারিত হয়। সুতরাং পুঁজিবাদের জগতে স্বাগত।

দেশের কথা তো গেল। শহর হিসেবে সবচেয়ে বেশি জাদুঘরের কৃতিত্ব লন্ডনের। এর পেছনের কারণ আবার ঔপনিবেশিক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাড়বাড়ন্তের ফলেই তাদের পক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এতকিছু লুণ্ঠন… মানে… সংগ্রহ করে আনা সহজ হয়েছে। অবশ্য কলোনাইজাররা নিজেদেরকে উপনিবেশের ত্রাণকর্তা ভাবত। ফলে তাদের চোখে এগুলো ঠিক চুরি নয়, একরকম ‘রক্ষা’ করা। রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘The White Man’s Burden’ কবিতাটা ভুলে গেলে চলবে? কে জানে প্রত্নসম্পদগুলো ‘রক্ষা’ করে তাঁরা হয়ত আমাদের উপকারই করেছেন, আমরা ধরতে পারিনি!

ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও একই দোষ দেওয়া চলে। নেপোলিয়নের আমলে তারা বিশ্বময় দেদার লুটপাট করেছে। একটা রিপোর্ট বলছে, আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের ৯০-৯৫ শতাংশই নাকি আজ আফ্রিকার বাইরে। এর অনেকগুলো জমা হয়েছে প্যারিসের ব্রাঁলি জাদুঘরে। তবে এই মুদ্রার আরেকটা পিঠ আছে। শিল্পে-সাহিত্যে ফরাসিদের নিজস্ব সম্পদও কম নয়। সংস্কৃতির অলিখিত রাজধানী হিসেবে প্যারিস বরাবরই নামজাদা শিল্পীদের আকৃষ্ট করেছে, ফরাসি সংগ্রহশালাগুলোকেও সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা। যাঁরা জাদুঘর ভালোবাসে, আজকের দিনে তাদের অবধারিত গন্তব্য প্যারিস।

এই পর্বে আমার দেখা প্যারিসিয়ান জাদুঘরগুলো নিয়ে লিখব। হিসেব করে দেখছি, নাহ, একেবারে কম দেখিনি দু’মাসে। এর বেশি দেখতে গেলে বাড়াবাড়ি হয়ে যেত!

আজি এ প্রভাতে রবির ধাম, কেমনে পশিল মিউজিয়াম

টাকা নিয়ে শুরুতে প্রচুর বিষেদাগার করেছি। ওসব হলো রাগের কথা। লজ্জায় অধোবদন হয়ে আমিও নিত্যদিন এরই দাসবৃত্তি করি। এজন্য নিজের ভ্রমণের গল্প শুরু করছি মঁনে দ্য পারি (Monnaie de Paris), অর্থাৎ প্যারিসের পয়সার জাদুঘর দিয়ে। এটাকে একরকমের প্রায়শ্চিত্তও ধরে নিতে পারেন।

প্রথমে জাদুঘরটা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিই।

পঞ্চম শতকে রোমানদের পতন হলে প্যারিস চলে যায় ফ্রাঙ্কদের হাতে। বলে রাখা ভালো, ফ্রাঙ্ক কোনো একক জাতিগোষ্ঠী নয়। একাধিক জার্মানিক গোত্র সুসংঘবদ্ধ হয়ে ফ্রাঙ্ক নামে পরিচিত হয়েছিল। এই গোত্রগুলো ইউরোপের বিভিন্ন অংশ থেকে এসেছিল, তবে বেশিরভাগের উৎপত্তি রাইন নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে। এরাই মধ্যযুগের ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়ামের অগ্রদূত ছিলো। ফ্রাংকদের নামানুসারে শাসিত রাজ্যের নাম রাখা হয় ফ্রান্সিয়া, যেখান থেকে ফ্রান্স কথাটা এসেছে। ক্ষমতার পালাবদলে নবম শতকে এসে সিংহাসনে আসীন হলেন ফ্রাঙ্ক সম্রাট টেকো চার্লস (Charles the Bald)।

পাঠক হয়ত ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, টেকো মানে কি নামটাই টেকো, নাকি…?

খোলাসা করি। যেটা ভাবছেন, সেখান থেকেই এই নামের উৎপত্তি। তবে চার্লসের মাথায় টাক ছিল, এ-কথা ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু প্রমাণিত নয়। অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, মজা করার ছলেই নামটা ছড়িয়েছে।

টেকোদের নাকি অনেক টাকা হয়। সত্যমিথা জানি না। তবে টেকো চার্লসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল টাকাকে ঘিরেই। প্রেক্ষাপট হলো, তাঁর শাসনের সময়টাতে ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ভাইকিংরা। আর তাদের লুটপাটের খুব পছন্দের জায়গা ছিল ফ্রান্স। যারা হিস্ট্রি চ্যানেলের ‘ভাইকিংস’ সিরিজটা দেখেছেন, তাঁদের হয়ত রোলো চরিত্রটার কথা মনে আছে। সিরিজের সঙ্গে বাস্তবের ইতিহাসের অবশ্য বিস্তর ফারাক আছে। যেমন রোলো নামে পরিচিত একজন বিখ্যাত ভাইকিং নেতা ছিল বটে, এমনকি সে একাধিকবার ফ্রান্স আক্রমণও করেছে, তবে সে ভুবনবিখ্যাত র‍্যাগনার লথব্রোকের ভাই ছিল না মোটেও। তবে ভাইকিংদের পুনঃপুন আক্রমণে ফ্রান্স সত্যিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আর্থিক দিক থেকে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। কিন্তু তাতেও অনেক খরচা। আমি যখনকার কথা বলছি, কাগুজে নোট তখনও সেভাবে প্রচলিত হয়নি। ফ্রান্সে প্রচলিত ছিল রূপোর কয়েন। সেই পয়সা যে যার মতো করে বানাত, কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল না। চার্লস ব্যাপারটায় লাগাম টানতে চাইলেন। পয়সা বানাবে কেবল সম্রাটের কারখানা, আর সেই পয়সাকে হতে হবে মানসম্পন্ন। অর্থাৎ কোয়ালিটি কন্ট্রোলের চেষ্টা, একইসাথে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণেরও অভিপ্রায়। ঠিক এই উদ্দেশ্যেই ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে সেন নদীর তীরে স্থাপিত হলো প্যারিস টাঁকশাল (Les ateliers de Paris)। এরপর প্রায় একহাজার বছর ধরে এখানে কয়েন তৈরি হয়েছে। কাগুজে টাকার কারবার এখানে নেই। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, কারিগরি সেটআপ বদলেছে। ফরাসি বিপ্লবের পর জায়গাটাকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। তবে মূল কাজটা একই রয়ে গেছে আজও। ফরাসি সরকারের পক্ষে ইউরোর কয়েন বানায় এরাই। কারখানাটা সরানো হয়েছে কেবল, কারণ এখানে জায়গা কম। তবে এখানকার ওয়ার্কশপ কিন্তু বন্ধ হয়নি, সচল আছে, যেখানে এখন কালেক্টরস কয়েন বা আইটেম বানানো হয়।

মিউজিয়ামটাকে কেবল টাকাকড়ির প্রদর্শনী ভাবলে একটু ভুল হবে। রীতিমত ইতিহাসের পাঠশালা। টাকার উৎপত্তি, ইতিহাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগের রঙবেরঙের পয়সাকড়ি। সোনা, রূপা, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, দস্তা, পিতল, নিকেল, জিঙ্ক, লোহা সবকিছুরই আলাদা আলাদা আর্টিফ্যাক্ট আছে, ইতিহাস আছে। শুরুতে মন দিয়ে পড়ছিলাম, তবে একসময়ে হাল ছেড়ে দিলাম। এত অল্পসময়ের ভেতরে সবকিছু দেখে কিংবা বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। শেষদিকে অবশ্য একটা মজা হলো। দেখলাম, দর্শনার্থীরা কয়েন তৈরির একটা হস্তচালিত যন্ত্রের সামনে ভিড় জমিয়েছে। কী করছে? পয়সা বানাচ্ছে! তখন মনে পড়ল, আরে, ঢোকার সময় আমাকেও তো একটা পয়সা দিয়েছিল। সেটা অবশ্য একেবারে নিরেট, গায়ে কিছু খোদাই করা ছিল না। কেন দিয়েছে, তখন মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি। ফরাসিতে বলেছে কিনা! সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পাওয়া গেল। পয়সাটাকে এই যন্ত্রের ছাঁচে ফেলতে হবে, তারপর যন্ত্রে চাপ দিয়ে তাতে নকশা বসাতে হবে নিজেকেই। বাহ, বেশ ভালো তো! তবে লোকের ভিড় লেগে আছে যন্ত্রটার আশপাশে। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর সুযোগ মিলল। তারপর আর কী, নিজেই নিজের পয়সা তৈরি করে ফেললাম! কাজটা নিয়মিত করতে পারলে কী যে ভালো হতো!

তবে ওদের জাদুঘরের এই দিকটা খুব মজার। কিছু কিছু ইন্টারঅ্যাকটিভ অংশ রাখার চেষ্টা করে। তাতে কী হয়, বড়রা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি শিশুরাও পায়। যেমন ওই জাদুঘরেরই আরেকটা জায়গায় একটা যন্ত্রের পাশে রাখা ছিল কিছু প্রমাণ আকৃতির প্রতীকী পয়সা, হাতের তালুর মতো বড়ো সেগুলো। ওগুলো একে একে তুলে যন্ত্রটার নির্দিষ্ট খোপে ফেলে দিলে টাচস্ক্রিনে সেই পয়সার উৎপত্তি, সময়কাল, উপাদান ইত্যাদির ইতিহাস দেখা যায়। শিশুরা দেখলাম মজা নিয়ে দেখছে, শিখছে। শিখনকে সহজলভ্য ও সহজবোধ্য করে তোলার কী চমৎকার ব্যবস্থা!

একদিনে অনেক বেশি টাকাপয়সা দেখে ফেলে খানিকটা অনুশোচনা হচ্ছিল। ফলে প্রায়শ্চিত্তের অভিপ্রায়ে সেদিনই রওনা দিলাম বার্সি‌ পার্কের দিকে। গন্তব্যস্থল পার্কের পাশে অবস্থিত মেলিয়েস জাদুঘর। হ্যাঁ, প্রখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রনির্মাতা ও অভিনেতা জর্জ মেলিয়েসের নামেই এটি, এবং হ্যাঁ, এটি চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত জাদুঘর। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস আর বিকাশ নিয়ে জানার জন্য চমৎকার একটা জায়গা, এমনটা জেনেই গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে একটা বড়সড় ধোঁকা খেলাম। কারণটা বলি। এই জাদুঘরে স্লট বুক করতে হয় না, এমনটাই দেখেছিলাম ওদের ওয়েবসাইটে। কিন্তু সেখানে অন্য একটা দরকারি কথা আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। প্রতিবছরের আগস্ট মাসে নাকি এই জাদুঘর পুরোপুরি বন্ধ থাকে। হা হতোস্মি! এজন্যই তো বলি, পুরো ভবনটাকে এতবার প্রদক্ষিণ করেও একটা খোলা দরজা খুঁজে পাচ্ছি না কেন! ওরে বোকারাম, খোলা থাকলে তবে না খোলা পাবি তুই!

ফসকে যাওয়ার গল্প থাকুক। এবার বলি উপভোগ্য একটা জাদুঘর নিয়ে, Musée des Arts et Métiers, বাংলায় বলা যেতে পারে চারু ও কারুশিল্প জাদুঘর। নামটা একটু বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এখানে আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট বলতে মূলত প্রযুক্তি আর প্রকৌশলকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগ্রহকে বুঝিয়েছে। ১৭৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাদুঘরটি। প্রায় আশিহাজার দর্শনীয় জিনিস আছে এখানে। বলাই বাহুল্য সবগুলো খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব নয়, সেই উচ্চাভিলাষও আমার ছিল না। তাছাড়া বিজ্ঞানের ছাত্র না হওয়াতে সবকিছু পরিপূর্ণভাবে বুঝিওনি, সেটা অবশ্য আমার সীমাবদ্ধতা। সংক্ষেপে যদি বলি—মানুষ প্রযুক্তিগত দিক থেকে কীভাবে আজকের অবস্থানে এলো, তার ইতিহাস পরিক্রমণের সুযোগ করে দেয় এই জাদুঘর।

এখানকার বিশেষ কয়েকটা আকর্ষণের কথা বলি।

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, একইসঙ্গে নিজের অক্ষেও ঘুরপাক খায়—এই তথ্য আজকালকার শিশুরাও জানে। কিন্তু আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে বোঝা শক্ত যে, এসব উচ্চারণ করাও একসময় গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হয়েছে। চার্চের চিন্তাভাবনার বিপরীতে ভাবতে চাওয়ার অপরাধে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ১৬০০ সালে, অর্থাৎ মাত্র চারশো বছর আগে। অথচ আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়েছে আনুমানিক তিনলক্ষ বছর আগে। অর্থাৎ বুঝতে না পারা নানা বিষয়আশয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটা সুদীর্ঘ সময় ধরে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে প্রচলিত ধারণার আর গালগল্পের। আমরা স্বভাবতই প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে বেরোতে অনিচ্ছুক থাকি, বিশেষ করে যখন চাক্ষুষভাবে কিছু প্রমাণ করতে পারা যাচ্ছে না। অন্তত সেই মুহূর্তে নয়। অবশ্য ওই অবস্থাতেও সঠিক জ্ঞানটিকে বাছাই করতে পারেন এবং তাতে দৃঢ় আস্থা রাখতে পারেন—এমন মানুষ খুব বেশি জন্মায় না। সেরকম মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশেও ছিলেন একজন। আর্যভট্ট।

সেই খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের দিক থেকেই অজস্র বিতর্ক হয়েছে—পৃথিবী কি তার নিজ অক্ষের ওপরে ঘোরে, নাকি স্থির—তাই নিয়ে। পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হয়েছে। তবে বিরলপ্রজ গণিতবিদ-জ্যোতির্বিদ আর্যভট্টই ছিলেন প্রথম, যিনি সবচেয়ে নির্ভুল গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে সেই ৪৯৯ সালে জানিয়েছিলেন যে, পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপরে ঘোরে। তারপরও প্রযুক্তিগত অপ্রস্তুতির কারণে এটি নিয়ে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হবার উপায় সে-সময় ছিল না। এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। আল-সিজজি, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার আর নিউটনদের পথে হেঁটে অবশেষে ১৮৫১ সালে ফরাসি পদার্থবিদ লিওঁ ফুকো প্রথমবারের মত পৃথিবীর ঘূর্ণনের সবচেয়ে সরল, গ্রহণযোগ্য ও দৃশ্যমান ব্যাখ্যাটি দেন তাঁর প্রখ্যাত পেন্ডুলাম এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। একটা দীর্ঘ আর ভারি দোলক উঁচু থেকে ঝুলিয়ে দিয়ে লম্বা সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, দোলনের তল ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিষয়টা আপাতভাবে খুবই সরল। পৃথিবী যেহেতু তার নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে, তাই দোলকের স্থির তলটিও পৃথিবীর সাপেক্ষে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফুকোর গবেষণার সেই মূল পেন্ডুলামের কাঠামোটিই এখানে সংরক্ষিত আছে। কী চমৎকার একটা ব্যাপার!

এখানে আরো আছে আধুনিক রসায়নের জনক অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ের ল্যাবরেটরি। আসল গবেষণাগারটি ধ্বংস হয়ে গেলেও জাদুঘরে এটিকে সাজানো হয়েছে তাঁরই ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দিয়ে, এবং তাঁর গবেষণাগারের অনুকরণেই। অর্থাৎ মূলটির সঙ্গে এর খুব তফাত নেই। এই ল্যাবে কাজ করেই ল্যাভোয়াজিয়ে দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেনের অস্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন নামদুটোও তাঁরই দেওয়া। এছাড়া আধুনিক রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটলেও পদার্থগুলোর মোট ভর একই থাকে—সেই তত্ত্বটিও তাঁর।

প্রতিভাবান এই বিজ্ঞানীর শেষটা অবশ্য করুণ। ফরাসি বিপ্লবের ঠিক পরের কথা, যখন ফরাসিদেশে তখন আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। চলছে Reign of Terror বা সন্ত্রাসের রাজত্বকাল। সে গল্প আগেই বলেছি। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে জ্যাকোবিন ক্লাব নামে পরিচিত একটি দলের হাতে, যারা নতুন ফ্রেঞ্চ রিপাবলিককে রক্ষা করার নামে এবং বিপ্লবের শত্রুদের খতম করার অজুহাতে প্রায় প্রতিদিনই একে-ওকে ধরে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করছে। ল্যাভোয়াজিয়ে ছিলেন এরকমই অবিচারের শিকার। তাঁর নামে আনা রাষ্ট্রদ্রোহ আর জোচ্চুরির অভিযোগগুলো ছিল একেবারেই বানোয়াট। কিন্তু রক্তোন্মাদদের সেসব দেখার সময় কোথায়? প্রায় বিনা বিচারেই ল্যাভোয়াজিয়েকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়, আর সমস্ত সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। এর ঠিক দেড়বছর পর অবশ্য বিজ্ঞানীর বিধবা স্ত্রী মেরি-অ্যানকে সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সবকিছুর সঙ্গে একটা ছোট চিরকুটও পাঠানো হয়, যাতে লেখা—ল্যাভোয়াজিয়ের বিধবা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে, যাঁকে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

ব্যস, হয়ে গেল ক্ষমা চাওয়া।

মেরি-অ্যানের সেদিন কেমন লেগেছিল ভাবুন একবার। তবে কষ্ট পেলেও বেচারি দমে যাননি। তিনি ল্যাভোয়াজিয়ের অপ্রকাশিত সমস্ত গবেষণাপত্র সঙ্কলন করেন, তারপর প্রকাশনার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া মৃত স্বামীর নাম থেকে মিথ্যে অভিযোগের কালিমা দূর করার জন্য ক্যাম্পেইন চালিয়ে গেছেন। ক্রমশ ল্যাভোয়াজিয়ের বিরুদ্ধে থাকা মিথ্যে অভিযোগসমূহ নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা দূর হয়েছে। লোকে বুঝেছে—অস্থির উন্মাদনার স্রোতে কী মহামূল্যবান রত্ন তারা হারিয়েছে।

জাদুঘরটিতে আরও রাখা আছে স্ট্যাচু অব লিবার্টির সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ মডেল। বার্থোল্ডি ১৮৭৮ সালে এটি তৈরি করেন, যার অনুকরণেই পরে আমেরিকানদের উপহার দেওয়া ভাস্কর্যটি গড়া হয়। এছাড়া রয়েছে টমাস আলভা এডিসন আবিষ্কৃত ক্যামেরায় তোলা আসল ছবি। বিশ্বের সর্বপ্রথম সেল্ফ-প্রোপেলড গাড়িটিও এখানেই রয়েছে, যা মূলত একটি স্টিম ওয়াগন। এছাড়া অ্যাভিয়েশন, শব্দ, যোগাযোগ সংক্রান্ত অজস্র ঐতিহাসিক আর্টিফ্যাক্ট রয়েছে। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের পথে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে বিবর্তনের এই ধারা যে বিস্ময়কর—তাতে সন্দেহ কী?

আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট জাদুঘরে দেখা ফুকোর দোলকের সূত্র ধরে বলি প্যারিসের আরেক ঐতিহাসিক স্থাপনায় ভ্রমণের গল্প—পঁতেয়োঁ (Panthéon)। পঁতেয়োঁ তৈরি করা হয়েছিল রোমের বিখ্যাত প্যান্থিয়নের আদলে। ভালো কথা—একবার পঁতেয়োঁ, আরেকবার প্যান্থিয়ন লিখেছি দেখে পাঠক বিভ্রান্ত হবেন না। এটা ইচ্ছাকৃত। প্যারিসের ব্লগগুলো লিখতে গিয়ে ইংরেজি, ফরাসি, বাংলা ইত্যাদি উচ্চারণ আর বানানের চোটে আমার জেরবার দশা হয়েছে।

রোমের প্যান্থিয়ন তৈরি করা হয়েছিল দ্বিতীয় শতকে, একটি সুদৃশ্য মন্দির হিসেবে। গ্রিক Pan অর্থ সকল, আর Theos মানে দেবতা। অর্থাৎ সর্বদেবতা মন্দির—মানে জিউস, অ্যাপোলো, ভিনাস, মিনার্ভা ইত্যাদি। তবে রোমানদের পতনের পর সপ্তম শতকে শুরু হয় ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন। স্বভাবতই প্যাগানদের মন্দিরটিকে চার্চে পরিণত করা হয়। তারপর সেখানে বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধিস্থ করা শুরু হয়। স্থাপত্যশিল্পের অনবদ্য প্রতীকটি বিশ্বব্যাপী অনেককেই আকৃষ্ট করে। করে ফরাসিদেরও। একই আদলে একটা চার্চ বানাতে আগ্রহী হয় তারা। তবে একেবারে হুবহু একইরকম নয়। এভাবেই আঠার শতকে প্যারিসে পঁতোয়োঁ স্থাপিত হলো। আর সেই শতাব্দীর শেষদিকে এসে হলো ফরাসি বিপ্লব। ব্যাপারটা বুঝে দেখুন এবার। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো ক্যাথলিক চার্চের আধিপত্য আর দখলদারিত্ব চূর্ণবিচূর্ণ করা। স্বভাবতই সেক্যুলারিজমের প্রবল ধাক্কা আছড়ে পড়ল ফ্রান্সে। ফলে বিপ্লবের পর সিদ্ধান্ত হলো, চার্চ চলবে না। পঁতেয়োঁ সেক্যুলার টেম্পল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সেখানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সমহিত করা হবে।

বেশ ভাল। কারা সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান? এই ধরুন ভলতেয়ার, রুসো, জঁ-পল মারা…

দাঁড়ান দাঁড়ান। এর মাঝে আবার মারা কোথা থেকে আসছেন?

মারা-র কথা আমি প্যারিসের ইতিহাসের অংশে বলেছি। ফরাসি বিপ্লবের অস্থির সময়টায় উস্কানিমূলক লেখা লিখে বাথটাবে ছুরিকাঘাতে যিনি খুন হলেন। তবে মনে করে দেখুন, মারা কিন্তু মারা যাওয়ার আগে সাময়িকভাবে বীরে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে ভলতেয়ারের পাশে জায়গা জুটে গেল এই দুর্বৃত্তেরও। শুধু ইনি নন, ‘বিপ্লবী’ আরও বেশ কয়েকজনকে এখানে স্থান দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য এদের দেহাবশেষ আবার বের করে ফেলা হয়। দিনশেষে গায়ের জোরে কোনোকিছুই বেশিদিন চলে না, কী বলেন?

পঁতোয়োঁর বিশাল কাঠামোর ভেতরে ঢুকলেই একধরনের স্যাক্রেড বা পবিত্র অনুভূতি কাজ করে, যদিও আমার ঈশ্বরচিন্তা খুব সুসংবদ্ধ নয়। ভলতেয়ার ছাড়াও রুসো, ভিক্টর হুগো এবং মেরি কুরির মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের সমাধি রয়েছে এখানে। ওপরের ছাদটা অস্বাভাবিক উঁচু। মেঝে থেকে গম্বুজ পর্যন্ত মাপলে আশি মিটারেরও বেশি। ছাদ উঁচু হলে এমনিতেই অনুভূতি পাল্টে যায়, নিজেকে ক্ষুদ্র লাগে; নিত্যদিন আমরা তো এত উঁচু ছাদ দেখে অভ্যস্ত নই। সেটা অবশ্য খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালেও হওয়ার কথা, কিন্তু সেভাবে আমরা আদৌ আকাশ দেখি না, লক্ষও করি না। চারপাশের গাম্ভীর্য আর নৈঃশব্দ্য মিলে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানকার একটা বিশেষ আকর্ষণ ফুকোর পেন্ডুলামের রেপ্লিকা, যা এখানকার বিশাল গম্বুজের নিচ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা আছে। এই বস্তুটি জায়গাটার সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়েছে।

ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে আমি ভলতেয়ার আর জঁ-জাক রুসোর কথা আনিনি। তবে এখানে তাঁদের প্রসঙ্গ না টানলেই নয়। ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরির পেছনে দুজনেরই অবদান অসামান্য। মজার ব্যাপার হলো, বাস্তিল দুর্গের পতনের এগারো বছর আগেই, ১৭৭৮ সালে এই দুই মহারথী মারা যান। অর্থাৎ বিপ্লবের চাক্ষুষ যেসব কারণ ছিল, অর্থাৎ চরম খাদ্যাভাব, অতিরিক্ত করারোপ কিংবা রাজকোষ শূন্য হয়ে যাওয়া, এসবের কিছুই তাঁরা দেখে যাননি। অর্থাৎ সময়ের আগেই তাঁরা সময়োপযোগী চিন্তা রেখে যান।

অথচ এই দুজন মানুষ একে অপরকে দুচোখে দেখতে পারতেন না। তাঁদের মতাদর্শ ছিল সম্পূর্ণ দুই মেরুর। ভলতেয়ার ছিলেন অভিজাততন্ত্রে বিশ্বাসী এবং বাস্তববাদী। ‘অশিক্ষিত’ সাধারণ মানুষের ওপরে তাঁর বিশেষ আস্থা ছিল না। তাঁর মূল বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটা ছিল ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামি আর অজ্ঞতার বিরুদ্ধে। তিনি বাকস্বাধীনতা আর নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর চূড়ান্ত প্রত্যাশা এরকম যে, ফ্রান্সে ব্রিটিশদের মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, আর পরিবর্তন আসবে ওপর থেকে, শিক্ষিত আর প্রগতিশীলদের হাত ধরে।

অন্যদিকে রুসো ছিলেন একেবারে ভিন্নধারার। তিনি বিশ্বাস করতেন, আদিম মানুষ নিষ্কলুষ ছিল। কিন্তু আধুনিক সমাজ, সম্পত্তি আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোই মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর বিখ্যাত ‘সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট’ গ্রন্থে তিনি ‘জেনারেল উইল’ বা জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছার ধারণা দেন। রুসোর মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাজা নন, বরং সাধারণ মানুষ। তিনি সরাসরি গণতন্ত্র আর নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সমতার পক্ষপাতী ছিলেন।

ভলতেয়ার আর রুসোর এই দার্শনিক বৈপরীত্য কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নিয়েছিল। রুসোর লেখা পড়ে ভলতেয়ার তাঁকে ব্যঙ্গ করে চিঠি লিখেছিলেন—রুসোর লেখা পড়লে নাকি তাঁর চারপায়ে ভর করে হাঁটতে ইচ্ছে করে! উল্টোদিকে রুসোর চোখে ভলতেয়ার ছিলেন এমন একজন অভিজাত ব্যক্তি, যিনি অহংকারী আর ঈশ্বরের সঙ্গে যাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। সোজাকথায় ধনীদের তোষামোদকারী।

প্রশ্ন হলো, এমন দা-কুমড়া সম্পর্ক থাকা দুজন মানুষের দুজনই কীভাবে ফরাসি বিপ্লবের অনুপ্রেরণা হলেন?

এক্ষেত্রে বুঝতে হবে, ফরাসি বিপ্লব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। কয়েকটি ধাপে দীর্ঘ পালাবদল ঘটেছে এখানে। বিপ্লবের প্রথম ধাপ (১৭৮৯ থেকে ১৭৯১) ছিল ভলতেয়ারের দর্শনে প্রভাবিত। সে-সময় বুর্জোয়া আর উদারপন্থী অভিজাতরা চেয়েছিল এমন একটি সংবিধান যা চার্চের ক্ষমতা খর্ব করবে এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। অর্থাৎ ভলতেয়ারের চিন্তারই প্রতিফলন।

কিন্তু বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপে (১৭৯২ থেকে ১৭৯৪) পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, দৃশ্যপটে হাজির হলো জ্যাকোবিনরা, যাঁরা অভিজাতদের আলাদাভাবে দেখতে রাজি ছিল না। তারা চাইত পরিপূর্ণ সমতা। জ্যাকোবিন নেতা মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের ছিলেন রুসোর অন্ধভক্ত। ‘জেনারেল উইল’ তত্ত্বকে অত্যন্ত বাজেভাবে অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যা করে রবেস্পিয়ের শুরু করলেন তাঁর সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসের রাজত্ব। যারাই কথিত ‘সামষ্টিক ইচ্ছা’-র সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে, তাদেরই গিলোটিনে চড়ান হয়েছে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, রাজতন্ত্র আর চার্চের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফরাসিদের প্রয়োজন ছিল একজন ভলতেয়ারকে। আর সেই পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে দরকার ছিল রুসোকে। অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব কৃতজ্ঞ দুজনের কাছেই। এজন্য বিপ্লব শুরু হওয়ার পর ১৭৯১ সালে প্রথমে ভলতেয়ারের দেহাবশেষ তুলে পঁতোয়োঁতে আনা হয়, আর পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্থাপিত হয় সেখানে। রুশোর দেহাবশেষ আসে আরেকটু পরে, ১৭৯৪ সালে।

পঁতেয়োঁর বিশাল গম্বুজের নিচে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দার্শনিকের সমাধি রাখা হয়েছে কীভাবে জানেন? একদম একে-অন্যের বিপরীতে! একটা সুক্ষ্ম রসিকতার আভাস পাওয়া যায় বৈকি। মাঝামাঝি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে হেসে বলি—শেষ? নাকি এখনো চলছে?

তবে পঁতেয়োঁতে রুসোর সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে আমার বিপ্লবের চেয়েও অন্য আরেকটি বিষয়ের কথা বেশি মনে পড়ছিল। আমি যেহেতু শিক্ষার ছাত্র, তাই রুসো আমার কাছে কেবল একজন রাজনৈতিক দার্শনিক নন, বরং আধুনিক শিক্ষাদর্শনের অন্যতম পথিকৃৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর করার সময় শিক্ষা দার্শনিক ভিত্তি কোর্সে রুশোর কথা এসেছিল। পড়িয়েছিলেন শ্রদ্ধার্হ অধ্যাপক শ্যামলী আকবর।

শিক্ষাবিজ্ঞানে যাঁদের আনাগোনা আছে, তাঁদের কাছে রুসোর ‘এমিল’ (Emile) বইটি অবশ্যপাঠ্য ক্লাসিক। এখানে তিনি শিক্ষায় ‘প্রকৃতিবাদ’-এর (Natutralism) ধারণা দিয়েছিলেন। রুসো বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি শিশু জন্মগতভাবে পবিত্র এবং নিষ্পাপ। নষ্ট সমাজ আর তার চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম নিয়মকানুনই মূলত মানুষকে কলুষিত করে। এজন্য চারদেয়ালের বদ্ধ শ্রেণিকক্ষে কঠোর শাসনে শৃঙ্খলাবদ্ধ না রেখে শিশুকে প্রকৃতির কাছাকাছি স্বাধীনভাবে শিখতে দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন। চাইতেন যাতে অভিজ্ঞতা, খেলাধুলা আর কৌতূহলই শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠুক। অর্থাৎ আজকের দিনে আমরা যে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার কথা বলি, তার আদিবীজ বপন করে গিয়েছিলেন রুসোই। সমাজ, রাজনীতি আর শিক্ষা; সবকিছু মিলিয়ে রুসোর প্রভাব এতটাই বিশাল যে, পঁতেয়োঁর এই রাজকীয় সম্মান তাঁর একদম প্রাপ্যই ছিল। পঁতোয়াঁর চত্ত্বরেও রুশোর একটি আপাদমস্তক ভাস্কর্য দৃপ্তভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এবার চোখ ফেরানো যাক ফরাসিদের নির্মাণশৈলীর দিকে। আইফেল টাওয়ারের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত সিতে দেলার্কিতেকচুর (Cité de l’Architecture et du Patrimoine) বা স্থাপত্য জাদুঘর। ফরাসি স্থাপত্যের এক বিশাল সংগ্রহশালা। ভেতরে ঢুকে বিশাল আকারের সব খিলান আর স্থাপত্যের মডেল দেখে আক্ষরিক অর্থেই মুগ্ধ হতে হয়। তবে সবচেয়ে অভূতপূর্ব লেগেছে নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালের অংশগুলো দেখে। ২০১৯ সালের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া ক্যাথেড্রালের উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু অংশ এবং সংস্কার কাজের মডেল সেখানে রাখা ছিল। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফরাসিরা কীভাবে নিজেদের ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করছে তা দেখলাম, জানলাম। তবে সত্যি বলতে এখানে খুব ইন্টারেস্ট পাইনি। স্থাপত্যের ইতিহাস আর কারিগরি ব্যাপারগুলো নিয়ে আমার জানাশোনা খুব কম, সেটাও কারণ হতে পারে।

ঐতিহাসিক নিদর্শন কুক্ষিগত করা প্রসঙ্গে মুজে দু কাই ব্রাঁলি – জাক শিরাক (Musée du quai Branly – Jacques Chirac) জাদুঘরের কথা তো শুরুতেই বলেছি। আফ্রিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া এবং আমেরিকার আদিবাসী সংস্কৃতির বিশাল সংগ্রহশালা এখানে। তবে আর যাই বলি ফরাসিরা জাদুঘরের ইন্টেরিয়র করতে জানে। ভেতরে ঢুকে জঙ্গল-সদৃশ আবছা-আবছা অন্ধকার পরিবেশটা বেড়ে লাগল। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত বিভিন্ন দেবমূর্তি, মুখোশ আর ধর্মীয় আচারের জিনিসপত্রগুলো টানে। এরকম কিছুর বাইরে কোথাও কখনো দেখা মিলবে না, এতটাই অভিনব। ব্যতিক্রমী, অপূর্ব সুন্দর এবং কিছুটা ক্রিপিও বোধহয়। তবে এসব আদিবাসী বা ‘প্রিমিটিভ আর্ট’ একসময় পাবলো পিকাসোর মতো আধুনিক শিল্পীদের জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। সে কথায় পরে আসব।

(লেখাটি অসমাপ্ত)

ছবিঘর

Gallery

ছবির উপর ক্লিক করে বড়ো আকারে দেখুন | Click on the image for a larger view

Share this with others

Leave A Comment