প্যা

প্যারিসে আমার সামাজিক জীবন বলতে গেলে বেশ সীমিতই ছিল। আমি একা ঘুরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মাঝেমধ্যে অন্য তিন-চারজন ইন্টার্নের সঙ্গে ঘোরাফেরা হতো, আড্ডা হতো, কখনো সেন নদীর পাড়ে, কখনো রাস্তার পাশের ক্যাফেতে। তবে প্যারিসের অলিগলি, জাদুঘর আর পার্কগুলোতে আমি একা-একাই চষে বেড়িয়েছি। পরিকল্পিত ঘোরাঘুরির বাইরেও প্যারিসের দৈনন্দিন জীবন থেকে অম্লমধুর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেইসব ছোটোখাটো স্মৃতি নিয়ে এই লেখা। সিরিজের এটিই শেষ পর্ব।

প্যারিসে দিনযাপনের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ছিল আমার পেশাগত জীবন। ইউনেস্কো সদর দপ্তরে কাজ করার সুযোগটা আমার জন্য ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা। শুরুতেই জুলাইয়ের ১০-১১ তারিখে ‘১৯৭৪ সালের সুপারিশমালার সংশোধন’ বিষয়ক একটি আন্তঃসরকারি বিশেষ কমিটির মিটিংয়ে আমাকে অনুলিখনকারী (Note-taker) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা কীভাবে একটি বৈশ্বিক টেবিলে বসে আলাপ করেন, প্রস্তাব দেন, কোনো বিষয়ে সমাধানে পৌঁছান, আবার মতানৈক্যও ঘটে—তা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সবচেয়ে অবাক লেগেছিল লাইভ ট্রান্সলেশন ব্যবস্থা দেখে। ফরাসি, রুশ, আরবি বা স্প্যানিশ ভাষায় যিনিই কথা বলুন না কেন, হেডফোনে প্রায় সাথে সাথেই তার নিখুঁত ইংরেজি অনুবাদ শোনা যাচ্ছিল। ব্যাপারটা আমার কাছে নতুন।

কিছুদিন পর কিসোয়াহিলি ভাষার ওপর একটি বিশেষ আয়োজনে উপস্থিত ছিলাম। কিসোয়াহিলি হলো প্রথম আফ্রিকান ভাষা যার নিজস্ব একটি আন্তর্জাতিক দিবস ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। এটি মূলত বিউপনিবেশিকীকরণের একটি অংশ। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ফলে অনেকগুলো আফ্রিকান দেশে নিজস্ব ভাষা প্রতিস্থাপিত হয়ে পড়েছে ইউরোপীয় ভাষা দিয়ে। প্রধানত ফরাসি। কিন্তু আফ্রিকার অনেক দেশ এখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ফরাসি বা ইউরোপীয় ভাষার প্রভাব থেকে মুক্ত করে নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে পুনর্গঠন করতে চাইছে। নিজেদের ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চাকে নিজেদের ভাষায় তুলে ধরার এই চেষ্টা আমাকে অভিভূত করেছিল। গবেষণার ক্ষেত্রে হিসেবে আমার আগ্রহের জায়গা বিউপনিবেশায়ন—সেটাও একটা কারণ।

ইউনেস্কোর ভেতরের কর্মযজ্ঞ বিশাল। একই ছাদের নিচে এত দেশের মানুষের আনাগোনা সত্যিই রোমাঞ্চকর। সুপারভাইজরের কল্যাণে পুরো অফিস ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। অফিসের ভেতরে লবিতে পাবলো পিকাসোর একটি আসল চিত্রকর্মও রয়েছে—দ্য ফল অব ইকারাস। ত্রিশ ফিট উঁচু বিশাল ক্যানভাসে আঁকা।

আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল আমাদের অফিসরুমের বারান্দা। সেখান থেকে আইফেল টাওয়ারের চমৎকার ভিউ পাওয়া যেত। সব রুমে এই সুবিধা ছিল না বলে অনেকেই তাদের অতিথিদের নিয়ে আমাদের বারান্দায় আসতেন ছবি তোলার জন্য। ব্যাপারটা আমাদের জন্য বেশ নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাঝে মাঝে বাসা থেকে আনা লাঞ্চ আমরা ওই বারান্দায় বসেই আইফেল দেখতে দেখতে সেরে নিতাম। আমরা মানে আমি এবং আমার আরও তিনজন সহ-ইন্টার্ন। এদের সঙ্গে সময়টা আমার চমৎকার কেটেছে। ছোটোখাট বিভিন্ন উপলক্ষ তো ছিলই।

প্যারিসে আমার আরেকটা প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছিল পোঁপিদু সেন্টারের লাইব্রেরি। প্রায় প্রতি উইকেন্ডেই অন্তত একবার করে যাওয়া হতো। লাইব্রেরির বাইরে রাখা বিশাল লাল রঙের গণ্ডারের ভাস্কর্যটি বেশ নজরকাড়া। এটি ফরাসি ভাস্কর হাভিয়ের ভেইয়াঁর তৈরি। লাইব্রেরিতে ঢুকতে কোনো মেম্বারশিপ লাগে না। ভেতরের পরিবেশ একদম শান্ত। পড়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। বইয়ের বিশাল সংগ্রহ থাকলেও বেশিরভাগই ফরাসি ভাষায়, অর্থাৎ আমার বোধগম্যতার বাইরে। তাই আমি মূলত নিজের ল্যাপটপ আর ট্যাবেই কাজ করতাম বা পড়তাম। ভেতরে একটা ভালো ক্যাফে আছে—সেখানে কফি আর স্ন্যাকস পাওয়া যায়। খাবার গরম করার জন্য মাইক্রোওয়েভ ওভেন আর হাই-স্পিড ইন্টারনেটের সুবিধাও আছে। আর কী চাই!

একদিন গিয়েছিলাম প্লাস দে ভজ (Place des Vosges) চত্বরে, ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত বাড়িটিতে। তবে বন্ধ থাকায় নিকটবর্তী পার্কের বেঞ্চে বসে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলাম। চারপাশের পুরোনো লাল ইটের দালান আর অজস্র পাখির কোলাহলে জায়গাটা বেশ মায়াময় লেগেছিল। পরে অবশ্য আরেকদিন গিয়ে ভেতরটা দেখে এসেছি। তাঁর থাকার ঘরগুলো, ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর তাঁকে নিয়ে তৈরি অজস্র ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো মিউজিয়ামটি বেশ গোছান। এই বাড়িতে হুগো প্রায় ষোল বছর কাটিয়েছেন, ১৮৩২ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত। দোতলার এই অ্যাপার্টমেন্টেই তাঁর জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি রূপ পেয়েছে। বিখ্যাত ‘লে মিজারেবল’-এর একটি বড় অংশ তিনি এখানেই বসে লিখেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই শান্ত-সৃজনশীল জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভাইপো লুই-নেপোলিয়ন যখন ক্ষমতায় এলেন, হুগো শুরুতে তাঁকে সমর্থনই দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে প্রবল বিরোধী হয়ে ওঠেন। ১৮৫১ সালে লুই-নেপোলিয়ন যখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ‘সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন’ হিসেবে ঘোষণা করলেন, প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাসী হুগো সেটা মেনে নিতে পারেননি। তীব্র ক্ষোভে তিনি তাঁকে ‘ছোটো নেপোলিয়ন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। খোঁচাটা অবশ্য কেবল হাইট নিয়ে নয়, যদিও লুই-নেপোলিয়নের হাইট কমই ছিল, পাঁচ ফিট দুই ইঞ্চি। তবে মন্তব্যটা শারীরিক উচ্চতার পাশাপাশি তাঁর চিন্তার দৈন্যতা এবং ছোটোলোকপনা নিয়েও। নেপোলিয়নের ইগোতে ব্যাপারটা লেগেছিল ভালভাবেই। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে হুগোকে গ্রেপ্তার করার আদেশ দিলেন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে লেখককে ছদ্মবেশ নিয়ে প্যারিস ছেড়ে পালাতে হয়। শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ নির্বাসন জীবন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ফ্রান্সে যতদিন স্বাধীনতা ফিরে না আসবে, ততদিন তিনি স্বদেশে পা রাখবেন না। নির্বাসিত অবস্থায় তিনি প্রায় ১৯ বছর কাটিয়ে দেন। তবে লেখালিখি থামাননি, বরং ওই সময়েই তাঁর সেরা সাহিত্যকর্মগুলো প্রকাশিত হয়। অবশেষে ১৮৭০ সালে যখন ‘ছোটো নেপোলিয়ন-এর পতন ঘটে, কেবল তখনই ভিক্টর হুগো তাঁর প্রিয় প্যারিসে ফিরে এসেছিলেন।

প্যারিসের পার্কগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রথম যেদিন যাই পার্ক দে ব্যুত-শমঁ-এ, মনে হয়েছে—আহ্‌, কী যে চমৎকার একটা জায়গা! বিশাল সবুজের মাঝে একটা লেক, সেখানে হাঁসের দল নির্ভয়ে সাঁতার কাটছে। লেকের মাঝখানে একটা ছোট দ্বীপ, তাতে ওঠার জন্য ঝুলন্ত সেতু। সংস্কারের জন্য দ্বীপের ওপরকার ছোট রোমান টেম্পলটি তখন বন্ধ ছিল, ফলে সেতুটিও আটকানো ছিল। পার্কের সবুজ ধরে উঁচু ঢাল বেয়ে ওপরে উঠেছিলাম। সেখান থেকে প্যারিস শহরের অন্যরকম একটা রূপ চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে যেতাম পার্ক রাসপেল-এ। বাসা থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। শহরতলির এই পার্কটি ছায়াঘেরা আর শান্ত। বড়ো বড়ো প্রাচীন গাছের কারণে শহরের কোনো শোরগোল সেখানে পৌঁছায় না। প্যারিস নিয়ে কিছু কিছু লেখা সেখানে বসেও লিখেছি আমি।

আরেঁস দ্য লুতেস নামে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম একদিন। এটি মূলত প্রথম শতকের একটি রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার, যেখানে সে-সময় গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই হতো। জায়গাটা এখন উন্মুক্ত এবং বেশ অবহেলিতই মনে হলো। ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা নিদর্শন এভাবে পড়ে আছে দেখে একটু অবাক হয়েছি।

একদিন হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিলাম সাঁ-জেরমাঁ-দে-প্রে এলাকায়, বিখ্যাত ক্যাফেন ক্যাফে দ্য ফ্লোর এবং লে দ্যু মাগোর সামনে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই ক্যাফেগুলো ছিল জাঁ-পল সার্ত্র্ এবং সিমন দ্য বোভোয়ারের আড্ডার মূল কেন্দ্র। কাছাকাছি একটা সাইনবোর্ডে তাঁদের স্মৃতিকে স্মরণ করা হয়েছে দেখলাম।

মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম দেখে ফেরার পথে দেখেছিলাম ‘ফ্লেম অফ লিবার্টি’। পরিকল্পিত কিছু ছিল না। এরকমও হয় অবশ্য। চারিদিকে এতকিছু থাকলে সবসময় পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়ে না। এটি মূলত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির শিখার একটি পূর্ণাঙ্গ রেপ্লিকা। তবে ১৯৯৭ সালে এর ঠিক নিচের টানেলেই গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়ানা মারা যান, ফলে তারপর থেকে মানুষ জায়গাটাকে ডায়ানার অঘোষিত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।

প্যারিসে কেবল গুরুগম্ভীর মিউজিয়াম দেখেই সময় কাটেনি। স্ট্যান্ডআপ কমেডিও দেখতে গিয়েছিলাম। আন্ডারগ্রাউন্ড একটা পাবে সেই কমেডি শোয়ের আয়োজন করেছিল এক গ্রিক মেয়ে, যার হিউমার ছিল অসাধারণ। কমেডিয়ানদের কারোর কোনোপ্রকার ফিল্টার নেই, তার দরকারও নেই। অথচ উপমহাদেশে কত ভেবেচিন্তে লোক হাসাতে হয়! এদিকে ধর্মগুরুরা চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায় তো ওদিকে রাজনীতিবিদের আস্ফালনে টিকে থাকা দায় হয়। হাসিখুশি-ভরা সেই সন্ধ্যাটা প্যারিস ভ্রমণের অন্যতম ভাল স্মৃতি।

আগস্টের পিএসজির স্টেডিয়াম ‘পার্ক দে প্রাঁস’-এর কাছাকাছি গিয়েছিলাম। ওদের ভক্ত-টক্ত নই, তাই টাকা খরচ করে ভেতরে ঢোকার দরকার মনে হয়নি। বার্নাব্যু হলে আলাদা ব্যাপার ছিল! তবে ওদের অফিশিয়াল গিফটশপে ঢুকেছিলাম। ওই মাসেই নেইমার পিএসজি ছেড়ে চলে গেছে। তারপরও দোকানের বিভিন্ন জায়গায় তার আর এমবাপ্পের ছবি। স্মৃতি হিসেবে একটা-দুটো জিনিস কেনার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু প্রাইস ট্যাগ দেখার পর সেগুলোতে আর হাত দেওয়ার সাহস পাইনি।

আগস্টের এক বিকেলে অফিস শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম বোয়া দ্য বুলোন পার্ক ঘুরে আসার। গুগল ম্যাপে এতখানি সবুজ দেখে কৌতূহল হয়েছিল। একে নাকি প্যারিসের ফুসফুস বলা হয়। জায়গাটা সম্পর্কে আগে থেকে খুব বেশি জেনেশুনে যাইনি। কাজটা ভুল ছিল। কেন, বলছি।

শেষ বিকেলে যখন সেখানে পৌঁছাই, খেয়াল করলাম লোকজন দলবেঁধে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসছে, আর আমি একা উল্টোদিকে ঢুকছি। তখনই একটা বিপৎসংকেত পাওয়া উচিত ছিল। ভেতরে ঢুকে অবশ্য মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একেবারে নিখাদ সবুজ, বড়ো বড়ো গাছ আর ঝোপঝাড় নিয়ে আস্ত একটা বন। বনের মাঝখান দিয়ে পাকা রাস্তাও চলে গেছে। আমি বনের পাড় ধরে মূল পথের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। পরিকল্পনা ছিল লম্বাটে এই বনের এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হবো।

খানিকটা যাওয়ার পর চারপাশের পরিবেশটা কেমন সন্দেহজনক লাগতে শুরু করল। দেখলাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যান বা প্রাইভেট কারের পাশে স্বল্পবসনা কিছু নারী দাঁড়িয়ে আছেন। শুরুতে বুঝতে পারিনি। আরেকটু এগোতে দেখি আবার একই দৃশ্য। এবার আমার মাথায় বিপদের ঘণ্টা বেজে উঠল। বুঝতে পারলাম আমি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় এসে পড়েছি। পা চালিয়ে দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু মুশকিল হলো, আমি তখন বনের ঠিক মাঝামাঝি। যেদিক দিয়েই বের হতে চাই না কেন অন্তত দুই-তিন কিলোমিটার হাঁটতে হবে। চারপাশে আলো কমে আসছে, আর আমার হৃৎস্পন্দন বাড়ছে। ভাগ্য ভালো যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়েই ভালোয় ভালোয় লোকালয়ে আসতে পেরেছিলাম। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, এই বিশাল পার্কটি রাতের বেলা যৌনকর্মী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের আখড়ায় পরিণত হয়। ফরাসি আইনে প্রকাশ্য যৌনবৃত্তি অবৈধ, এজন্য ভ্যানগুলোকে তারা ভ্রাম্যমাণ ব্রথেল হিসেবে ব্যবহার করে। জায়গাটা রাতের বেলায় সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য একেবারেই অনিরাপদ।

নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টির কথা তো সবাই জানে, কিন্তু প্যারিসেও যে একটা আছে, সে খবর হয়তো অনেকেরই অজানা। সেন নদীর বুকে ‘ইল ও সিন’ নামের একটা সরু কৃত্রিম দ্বীপে এর অবস্থান। গিয়েছিলাম। খুব বেশি জাঁকজমক নেই, সাধারণ আর সাদামাটা একটা জায়গা। তবে এর অবস্থানটা বেশ সুন্দর। স্ট্যাচুর ঠিক পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ব্রিজটাও দেখতে দারুণ। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, মূল স্ট্যাচু অব লিবার্টি ফরাসিরাই আমেরিকানদের উপহার দিয়েছিল। পরে ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে প্যারিসে বসবাসরত আমেরিকানরা এই ছোট রেপ্লিকাটি ফ্রান্সকে উপহার হিসেবে ফেরত দেয়। মূল ভাস্কর্যের দিকে মুখ করেই এটি দাঁড় করানো। নদীর শান্ত পরিবেশ আর চারপাশের ছিমছাম দৃশ্যপট জায়গাটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

জুলাইয়ের পড়ন্ত বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে ইচ্ছে হলো একটা বিশেষ জায়গায় যাওয়ার; লুই পাস্তুরের গবেষণাগারে। পাস্তুরের মৃত্যুর পর সরকারের তরফ থেকে তাঁর স্ত্রীকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো যাতে পাস্তুরকে পঁতেয়োঁ-তে সমাহিত করা যায়। পাস্তুরের স্ত্রী অবশ্য প্রস্তাবে রাজি হননি। পাস্তুর চিরশায়িত হয়েছেন তাঁর গবেষণাগারেই। ঠিকই তো, এমন একজন বিজ্ঞানীর জন্য নিজের গবেষণাগারের চেয়ে বড়ো মন্দির আর কিইবা হতে পারে?

পাস্তুরের গবেষণাগারের নিকটস্থ মেট্রো স্টেশনের নামও পাস্তুর। সেখানে যখন নামি, বিকেল ফুরোচ্ছে, অন্ধকার নামছে অল্প-অল্প। গবেষণাগারটি এখন জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে একটি অত্যাধুনিক অণুজীব গবেষণাগার। জাদুঘরটি ভ্রমণযোগ্য হলেও অনুজীব গবেষণাগারটি সর্বজনের জন্য উন্মুক্ত নয়, সেটা একান্তই অ্যাকাডেমিক জায়গা। মুশকিল হলো, সংস্কারকাজের জন্য জাদুঘরটিও সে-সময় বন্ধ ছিলো। অর্থাৎ বাইরে থেকেই খানিকটা দেখা হবে শুধু। তবু তাই হোক। শৈশবে পড়া এক নাতিদীর্ঘ গল্পের সুবাদে পাস্তুর আজীবন আমার কাছে একজন অতিমানব, একজন সুপারহিরো।

জোজেফ মেস্ত্যারের বয়স তখন নয় বা দশ। অন্যসব শিশুর মতোই সে খেলাধুলা করতে ভালোবাসতো। এই খেলতে গিয়েই একদিন বাধলো বিপত্তি। ১৮৮৫ সালে গ্রীষ্মের এক চমৎকার সকালে আচমকা প্রতিবেশীর পোষা কুকুরটা এসে আক্রমণ করে বসলো জোজেফকে। লোকজন এসে উদ্ধার করার আগেই সে জোজেফের হাতে-পায়ে-ঊরুতে কামড়ে দিলো অন্তত চোদ্দবার।

কামড় খাওয়া বড়ো কথা নয়। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, কুকুরটির চেহারা বা আচরণ মোটেও স্বাভাবিক ছিলো না; ছিলো র‍্যাবিড কুকুরের সকল লক্ষণ। তখনকার দিনে এরকম কামড় খেয়ে দৈবক্রমে বেঁচে না গেলে জলাতঙ্ক নিশ্চিত। আর জলাতঙ্কে একবার আক্রান্ত হয়ে পড়ার অর্থ হলো, ভাইরাস ততক্ষণে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে পৌঁছে গেছে। কেউ একবার এই অবস্থায় চলে গেলে সকল চিকিৎসা দিয়েও রোগীকে বাঁচানোর আর উপায় থাকে না। এমনকি আজকের দিনেও এর কোনো প্রতিকার নেই। তবে হ্যাঁ, এখন আমরা কামড় খাওয়ার পরপরপই প্রতিষেধক দিয়ে জলাতঙ্ক রোধ করতে পারি, যেটা তখন সম্ভব ছিলো না। চোখের সামনে প্রাণোচ্ছল দেবশিশুটি অমানুষিক কষ্ট পেয়ে মরে যাবে, এটা কেউই মেনে নিতে পারছিল না।

ওদিকে ১৮৮০ সাল থেকে একজন বিজ্ঞানী র‍্যাবিস নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন। তাঁর নাম লুই পাস্তুর। মুশকিল হলো, জলাতঙ্ক ভাইরাসজনিত রোগ। এজন্য পাস্তুর তাঁর অনুসন্ধানে বেশ সমস্যায় পড়ছিলেন। আসলে সেই সময়কার মাইক্রোস্কোপ অতটা ভালো ছিলো না, অন্তত ভাইরাস দেখতে পাওয়ার মতো নয়। র‍্যাবিসকে প্রথম দেখতে পাওয়া যায় আরো প্রায় একশো বছর পরে, ১৯৬২ সালের দিকে। কিন্তু ওই সীমাবদ্ধতাতেই পাস্তুর নিজের কাজে অনেকটা এগিয়েছিলেন। জোজেফ যখন কুকুরের কামড় খায়, ততোদিনে র‍্যাবিসে আক্রান্ত কুকুরের ওপরে নিজের পরীক্ষাধীন প্রতিষেধক প্রয়োগ করে পাস্তুর চমৎকার ফলও পেয়েছিলেন। তবে তখনো তিনি মানুষের দেহে এই প্রতিষেধক ব্যবহারের ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কারণ হিউম্যান ট্রায়াল তখনো হয়নি।

ঠিক এই সময়ে জোজেফকে কুকুরে কামড়ালো। বেচারার পরিবার থাকতো প্যারিস থেকে খানিকটা দূরের একটা শহরে। কোনো আশা দেখতে না পেয়ে তারা ওকে প্যারিসে নিয়ে এলো, পাস্তুরের ল্যাবরেটরিতে। তবু যদি ছেলেটা বাঁচে!

অপরীক্ষিত প্রতিষেধক মানবদেহে ব্যবহারের ব্যাপারে পাস্তুর যথেষ্ট দ্বিধান্বিত ছিলেন। গবেষক হিসেবে নৈতিকতার কিছু দায়বদ্ধতা সবসময়ই থাকে। কিন্তু বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিষেধক না দিলেও শেষপর্যন্ত ছেলেটা মারাই যাবে। প্রতিষেধক দিলে বরং বাঁচার সামান্য সম্ভাবনা থাকতে পারে। পাস্তুরকে তাঁর দোদুল্যমান অবস্থা থেকে উদ্ধারে এগিয়ে এলেন তাঁরই গবেষণা-সহযোগী এবং চিকিৎসক জাক জোজেফ গ্রঁশে। গ্রঁশে ছিলেন শিশুরোগ-বিশেষজ্ঞ। তিনি পাস্তুরকে অভয় দিয়ে ভ্যাকসিনেশনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে চাইলেন। পাস্তুর রাজি হলেন। নিবিড় পর্যবেক্ষণে টানা দশদিন ধরে গ্রঁশে জোজেফের শরীরে ফুঁড়ে দিলেন বারো ডোজ প্রতিষেধক।

একদিন, দুইদিন করে দশদিন পেরোলো। না, জোজেফের জলাতঙ্ক হলো না। পাস্তুরের প্রতিষেধক ঠেকিয়ে দিয়েছে মরণঘাতী র‍্যাবিসকে। পরিশ্রম আর অধ্যবসায় পরাজিত করলো এক অপরাজেয় দানবকে।

পাস্তুর ইনস্টিটিটের সামনে দাঁড়িয়ে অনেককাল আগে শৈশবে পড়া গল্পটা মনে করে আবারও রোমাঞ্চ জাগে আমার। অদূরে, ইনস্টিটিউটের ভেতরে শায়িত আছেন প্রিয় পাস্তুর।

তোমারে নমস্কার:
যাহার উদয়-আশায় জাগিছে রাতের অন্ধকার।
বিহগ-কণ্ঠে জাগে অকারণ পুলক আশায় যার
স্তব্ধ পাখায় লাগে গতিবেগ চপল দুর্নিবার।
ঘুম ভেঙে যায় নয়নসীমায় লাগিয়া যার আভাস
কমলের বুকে অজানিতে জাগে মধুর গন্ধবাস।
জাগে সহস্র শিশির-মুকুরে সহস্র মুখ যার
না-আসা দিনের সূর্যট সে তুমি, তোমারে নমস্কার।

নমস্কার | কাজী নজরুল ইসলাম

[iee_empty_space type=”vertical” height=”20″ width=”10″ hide_on_mobile=”small-visibility,medium-visibility,large-visibility” class=”” id=””][/iee_empty_space]

বিদায়বেলায় আইফেল

আইফেল টাওয়ার কি আসলেই বিশেষ কিছু, নাকি সবাই বলে বলেই আমাদেরও বিশেষ মনে হয়? অর্থাৎ এটা কি শুধুই একটা হাইপ? খুব গভীরভাবে ভাবলে মনে হতে পারে, স্রেফ কিছু লোহার পাত জোড়া দিয়ে বানানো একটা কাঠামো এত বিখ্যাত হওয়ার কী আছে! তবে দিনের পর দিন দেখতে দেখতে গুরুত্বটা বুঝলাম। যেকোনো কসমোপলিটান বা আন্তর্জাতিক শহরের একটা নিজস্ব প্রতীক বা আইকন লাগে, যা দিয়ে শহরটাকে চেনা যায়। প্যারিসের প্রতীক যে আইফেল টাওয়ার, ফরাসিরা সেটা খুব শক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৮৮৯ সালের বিশ্বমেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে গুস্তাভ আইফেল যখন এটি তৈরি করেন, তখন প্যারিসের অনেক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁরা একে ‘লোহার দানব’ আখ্যা দিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী বিশ বছর পর এটি ভেঙে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু পরে এর চূড়ায় রেডিও আর টেলিগ্রাফ অ্যান্টেনা বসানোর কারণে জিনিসটা টিকে যায়। আর এখন তো এর প্রতীকী গুরুত্বই আকাশছোঁয়া। শহরের স্কাইলাইনে আইফেল টাওয়ারের রাজত্ব যেন কেউ ক্ষুণ্ণ করতে না পারে, সেজন্য প্যারিসের নগর পরিকল্পনায় কঠোর নিয়ম আছে। আইফেলের আশপাশে, এমনকি সেন্ট্রাল প্যারিসের বেশিরভাগ জায়গায় ভবনের উচ্চতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। চাইলেই কেউ আইফেলকে টেক্কা দেওয়ার মতো কোনো আকাশচুম্বী ভবন সেখানে তুলতে পারবে না।

প্যারিসের সবচেয়ে বিখ্যাত এই স্থাপনাটিতে আমি উঠেছি সবার শেষে, প্যারিস ছাড়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে। এর আগে প্রায় প্রতিদিনই এর কাছাকাছি গিয়েছি। আইফেলের সামনের ফাঁকা জায়গায় এবং শাঁ দ্য মার্স-এ অনেকবার বসেছি। অফিস শেষে প্রায়ই চলে যেতাম। কখনো রোদঝলমলে দিনে, কখনো মেঘলা আকাশে এই বিশাল লোহার কাঠামোটিকে দেখেছি। বারবার দেখলে নাকি বিরক্তি আসে, কিন্তু আমার কেন যেন কখনোই আসেনি। আইফেলের আশেপাশের ছোট ছোট অনেক মনুমেন্টও আছে, যার মধ্যে মানবাধিকারের স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি সেনাবাহিনীর সেনাপতি মার্শাল জফ্‌রের ভাস্কর্য অন্যতম। পেছনের দিকের পঁ দিয়েনা ব্রিজ দিয়েও অনেকবার হেঁটেছি। নিচ দিয়ে পর্যটকবাহী ক্রুজ শিপ চলে যেত। ব্রিজের ওপরে সবসময় প্রচুর ভিড়, চারপাশে খাবারের গাড়ি আর স্যুভেনিয়ার বিক্রেতা, যাদের বেশিরভাগই অশ্বেতাঙ্গ এবং দরিদ্র। এই বৈপরীত্য আলো-ঝলমলে প্যারিসেরই খানিকটা অন্ধকার।

রাতের আইফেলের রূপ আবার একদম আলাদা। পোল্যান্ড থেকে আমার এক বন্ধু এসেছিল। ওর সাথে রাত দুটো পর্যন্ত আইফেলের সামনে বসে ছিলাম। তখন আর দিনের বেলার সেই কোলাহল নেই, রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। হালকা ঠান্ডা বাতাস আর আলোয় মোড়ানো আইফেল এক অন্যরকম মুগ্ধতা তৈরি করেছিল।

অবশেষে ২৬ আগস্ট যখন আইফেলের একদম ওপরের তলায় উঠলাম, বাতাসে তখন হালকা শীতের আমেজ। আমার মনটা কেন যেন অকারণেই বিষণ্ণ হয়ে ছিল। হয়তো প্যারিস ছেড়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল বলেই। সত্যি বলতে, একেবারে উঁচুতে উঠে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, “যাহ, এই তাহলে আইফেলের চূড়া! এর চেয়ে নিচ থেকে দেখাই তো অনেক বেশি সুন্দর ছিল!” চূড়ার চারপাশের কাঁচের জানালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উঁচু ভবনের সাথে আইফেলের উচ্চতার একটা তুলনামূলক নকশা আঁকা আছে। সেখানে ‘বাংলাদেশ’ নামটা দেখে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম।

সবকিছু চুকিয়ে ৩১ আগস্ট ভোরে শার্ল দ্যু গল এয়ারপোর্ট থেকে ফিনল্যান্ডের বিমান ধরলাম। পেছনে পড়ে রইল অজস্র স্মৃতি। ইতিহাস এখানে শ্বাপদের মতো জীবন্ত, শিল্প এখানে সমুদ্রের মতো বিস্তীর্ণ, জীবন এখানে বহুমাত্রিক। তার কতটাই বা দেখলাম! প্যারিসে হয়তো আসা হবে, কিন্তু এভাবে? মনে হয় না। অনেককিছুই বাকি থেকে গেল। সুযোগ পেলে হয়তো আবার ফিরব চেনা অলিগলিতে নতুন কোনো গল্প খুঁজতে।