
প্যারিসের ইতিহাস, ইতিহাসের প্যারিস (প্যারিস পরিক্রমা: পর্ব ৪)
শিরোনাম পড়ে কেউ কেউ হয়ত ভাবছে—এই রে, এবার শুরু হবে সাল-তারিখের কচকচানি!
ইতিহাস অবশ্য অতটা খারাপ কিছুও নয়। প্রথাগত অ্যাকাডেমিক ধারার বাইরে ইতিহাসচর্চা করা যেতেই পারে। তাছাড়া ইতিহাস কেবল হিজিবিজি তথ্যের সমারোহ নয়। এক হিসেবে ইতিহাস আমাদের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে, প্রতিমুহূর্তেই নতুন ইতিহাস তৈরি করছি আমরা। সেগুলো লিখে রাখা হয় না, এই যা। অতীতেও যথাযথ সংরক্ষণ না করায় অনেক ঘটনাই কালগর্ভে হারিয়ে গেছে। এখন অবশ্য সেই সীমাবদ্ধতা নেই। তথ্য সংরক্ষণ এখন অসম্ভব সহজ। কেবল মেটার (Meta) কাছেই বোধহয় আমাদের পাহাড়সমান ডেটা জমা হয়ে আছে। ভবিষ্যত ইতিহাস-চর্চাকারীরা হয়ত এসব নিয়েই নাড়াঘাঁটা করবে।
ইতিহাস কেন প্রয়োজন? গৎবাঁধা উত্তর সকলেই জানে। ইতিহাস মানুষের অতীতের ভুল ধরিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে টেকসই করে, সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে ইত্যাদি। এসব হচ্ছে কেজো কথা। এর বাইরেও ইতিহাসের আলাদা গুরুত্ব আছে। ইতিহাস আমাদের নিজস্ব পরিচিতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে, চিন্তার উৎপত্তি বুঝতে সাহায্য করে, আর অতীত থেকে শক্ত প্রমাণের জোগান দিয়ে বর্তমানের যুক্তিতর্ককে পোক্ত করে। তাছাড়া ইতিহাসের আরেকটা গৌণ তাৎপর্য হলো—আমাদের ভ্রমণকে অর্থবহ করে তোলে। কীভাবে?
ইংল্যান্ডের সারের রানিমিড জায়গাটার কথা ধরা যাক। স্বাভাবিকভাবে সেখান দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হবে—এ-তো মামুলি জায়গা। ঘাস, লতাপাতা আর কাদামাটি ছাড়া বিশেষ কিছুই চোখে পড়ছে না। বড়জোর একটা ভালো পিকনিকের জায়গা হতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি জানবেন, ঠিক এই কাদামাটির ওপরে দাঁড়িয়েই ১২১৫ সালে বিদ্রোহী ব্যারনদের চাপে রাজা জন ‘ম্যাগনা কার্টা’-তে (Magna Carta) সিলমোহর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন? ওই সাধারণ ঘাসজমি নিমেষে হয়ে উঠবে আধুনিক গণতন্ত্রের তীর্থভূমি। আজকের দুনিয়ায় যে-ব্যক্তিস্বাধীনতা বা আইনের শাসন নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, তার সূচনা কিন্তু ওই সাদামাটা জায়গাটিতেই।
ইতিহাস এমনই। জানা থাকলে আর সংযোগ ঘটাতে পারলে খুব সাধারণ বস্তু, ঘটনা কিংবা স্থানও অসাধারণ হয়ে ওঠে। তাছাড়া অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাই টেক্কা দিতে পারে আধুনিককালের জনপ্রিয় থ্রিলারকেও। তাছাড়া ইতিহাস নিরপেক্ষ কিছু নয়। অনেক ইতিহাসই অসম্পূর্ণ, একপেশে আর অনির্ভরযোগ্য। সেখান থেকে সারবস্তুটা বুঝে নেওয়া চাই। সে-ও একরকম থ্রিলিং ব্যাপার। অর্থাৎ ইতিহাস একেবারে নিরস ব্যাপার নয়।
ইউরোপকে ইতিহাসের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না। আধুনিক জীবনে প্রবেশ করেও ইউরোপীয়রা ঐতিহাসিক চিহ্নগুলোকে সযত্নে রক্ষা করেছে। ফলে ইউরোপকে ভালোভাবে বুঝতে হলে ইতিহাসের পথ খানিকটা মাড়াতেই হয়। এদিক থেকে ফ্রান্স কল্পনাতীত সমৃদ্ধ। প্যারিসের অলিগলিতে আক্ষরিক অর্থেই অজস্র ইতিহাসের ছড়াছড়ি। কখনো প্রকট, কখনো প্রচ্ছন্ন।
আমার লেখা ভ্রমণকেন্দ্রিক। ফ্রান্সের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য নয়, সেটি সম্ভবও নয়। প্রাসঙ্গিক যেটুকু, সেটাই বলবো কেবল। এখানে জানিয়ে রাখি, লেখার সময়ে আমি অজস্রবার তিনটি গ্রন্থের শরণ নিয়েছি। তবে বারবার তথ্যসূত্র উল্লেখ করে লেখাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। এজন্য শুরুতেই কৃতজ্ঞতাস্বীকার সেরে ফেলা যাক।
- France: A Short History (2021) by Jeremy Black
- The Cambridge Illustrated History of France (1999) by Colin Jones
- France: A History (2018) by John Julius Norwich
মাটিচাপা ইতিহাস
ইতিহাস সম্ভবত দুভাবে চাপা দেওয়া সম্ভব, ধামাচাপা আর মাটিচাপা। প্রথমটা আমরা হরহামেশাই দিচ্ছি। লোকে জানলে নিজের নাক কাটা যাবে এমন তথ্য আমরা বেমালুম গায়েব করে ফেলি। একইভাবে রাজকোষের টাকায় পালিত ভাড়াটে ইতিহাসবিদদের উৎপাতও বেশ লক্ষণীয়। স্পন্সরশিপের কারণে নিতান্ত পাপিষ্ঠকেও তারা অনেক সময় বিশ্ববিবেকের অবতার বানিয়ে ফেলে। তাছাড়া কে না জানে—ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের পক্ষে। এভাবে কত ইতিহাস যে বিদীর্ণ-বিকৃত-বিনষ্ট-বিপন্ন-বিবর্তিত হয়েছে তার গোনাগুনতি নেই। কিছু ইতিহাস সময়ের পরিক্রমাতেও ঢাকা পড়ে যায়, কিছু আবার আক্ষরিক অর্থেই এমন গভীরে চলে যায় যে আর্কিওলজিস্ট দিয়ে খুঁড়ে তুলতে হয়। সেটাকে বলছি মাটিচাপা ইতিহাস।
প্যারিসের মাটিচাপা ইতিহাস দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুখ্যাত দ্বীপ—ইল দে লা সিতে (Île de la Cité)। অপরিসর দ্বীপটির নামডাক জগদ্বিখ্যাত নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রাল (Notre-Dame Cathedral)-এর অবস্থানের কারণে। নোত্র্ দামের সামনে আমি অনেকবারই গিয়েছি। তবে ভেতরটা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর থেকে অদ্যাবধি সেটার সংস্কারকাজ চলছে। ২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের আগে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না, এমনটাই জেনেছি। বাইরে থেকে অবশ্য দেখা যায়, কিন্তু চারিদিকে ঘিরে থাকা দৈত্যাকার ক্রেন আর লোহালক্কড়ের ভিড়ে ব্যাপারটা ঠিক জমে না।
সিতে দ্বীপে একটি মেট্রো স্টেশন আছে, যার অবস্থান নদীরও নিচের স্তরে। কারণ মেট্রোর লাইন চলে গেছে সেন নদীর তলা দিয়ে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫ মিটার গভীরে।
প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে আমার প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল ক্যাথেড্রালের ঠিক সামনে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ ‘ক্রিপ্ত আর্কিওলজিক’ বা ‘Crypte Archéologique’। নামেই বোঝা যাওয়ার কথা যে জায়গাটা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে বিখ্যাত—অর্থাৎ এর সঙ্গে ইতিহাসের যোগসূত্র আছে। সেই ইতিহাস আবার যেনতেন নয়, প্যারিস নগরী কীভাবে গড়ে উঠলো—তারই ইতিবৃত্ত। তার খানিকটা এখানে তুলে ধরতে পারি।
বয়সের হিসেবে প্যারিস পুরনো। যথেষ্টই পুরনো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্যারিসের বের্সি এলাকা থেকে নিওলিথিক বা নব্যপ্রস্তরযুগের (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪,৫০০-২৬০০ সালে) একটি কাঠের নৌকা পাওয়া গেছে, যা প্যারিসের কার্নাবালে (Carnavalet) জাদুঘরে রয়েছে। অর্থাৎ অনায়াসেই বলা চলে যে, এখানকার লোকবসতি অন্তত ৬,০০০ বছরের পুরনো। আমি অবশ্য অত পেছনে যাব না—তার প্রয়োজনও নেই। আমরা বরং একলাফে চলে আসতে পারি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে, যখন অধুনা প্যারিসের গোড়াপত্তন হচ্ছিল। তখন ইউরোপে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রদায় ছিল কেল্ট, জার্মানিক, ইতালিক আর স্লাভরা। এই গ্রুপগুলোর ভেতরেও আবার অনেক শাখাপ্রশাখা ছিল। কেল্টদের একটা বড় অংশ পরিচিত ছিল গল (Gaul) নামে। লৌহযুগে গলরা যেখানে বসবাস করত, সেটাকেই আমরা আজ ফ্রান্স বলে চিনি। অভিবাসীদের মতো জায়গাটার নামও তখন ছিল গল।
পারিসি (Parisii) বলে একটি গল-গোত্র আশ্রয় নিয়েছিল সেন নদীর মাঝখানের এই দ্বীপটায়—যেখানে আজ আমি দাঁড়িয়ে। মূলত দুই কারণে জায়গাটাকে পারিসিদের মনে ধরেছিল। প্রথমত, চারিদিকে সেন নদীর প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকায় শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, আর দ্বিতীয়ত, নদীপথ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ মিলবে। বস্তুত বেশিরভাগ আধুনিক শহরের অবস্থানই যে নদীর পাড়ে, সেটি নিতান্ত কাকতালীয় ব্যাপার নয়।
নতুন আগন্তুকরা ধীরে ধীরে সেনকে ঘিরে তাদের বসতি গড়ে তুলল। তারা জায়গাটার নাম রাখল লুতেসিয়া (Lutetia)। মোটামুটি নির্বিঘ্নে কেটে গেল প্রায় দুশো বছর। খ্রিস্টপূর্ব ৫২ সাল এলো। লুতেসিয়া ততদিনে একটা গোছান অঞ্চল। তবে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইতিহাসের ওই সময়টা রোমানদের। তারা আগ্রাসীভাবে উত্তর ইউরোপে তাদের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে চলেছে, দখল করছে একের পর এক অঞ্চল। লুতেসিয়া দখল করতে জুলিয়াস সিজার পাঠালেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট টাইটাস ল্যাবিয়েনাসকে। তিনি রাজাকে হতাশ করেননি। প্রবল বিক্রমে লড়াই করলেও স্থানীয়দের পক্ষে রোমান রণকৌশলের সামনে টিকে থাকা সম্ভব হল না। রোমানরা লুতেসিয়া দখল করে নিলো।
দখলের পর রোমানরা জায়গাটাকে শুরুতে প্রচলিত লুতেসিয়া নামেই ডেকেছিল। শহরের নামটা প্যারিস হয়েছে আরও প্রায় চারশ বছর পরে। তবে হঠাৎ করে কোনো ডিক্রি জারির মাধ্যমে নয়, ধীরে ধীরে। অদ্ভুত ব্যাপার। নামটা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, উৎখাত করা পারিসি সম্প্রদায়দের থেকেই সেটা এসেছে। কী নির্মম পরিহাসের ব্যাপার!
লেখার এই পর্যায়ে একটা দুর্দান্ত ব্যঙ্গ-তথ্যচিত্রের (Mockumentary) কথা মনে পড়ছে—অনেকে হয়তো দেখে থাকবেন—Cunk on Earth। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ফিলোমিনা কাঙ্ক। তাকে অজ্ঞতার রানি বলা চলে। নিজের উপস্থাপিত তথ্যচিত্রে সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুলভাল তথ্য দেয়, আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের সিরিয়াস ভঙ্গিতে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে। একটা পর্বে জনৈক বিশেষজ্ঞকে কাঙ্ক জিজ্ঞেস করেছিল—প্রস্তরযুগের মানুষ তাদের হাতিয়ার মাটির তলায় পুঁতে রাখত কেন? বেখাপ্পা প্রশ্নের সামনে বিশেষজ্ঞটি শুরুতে থতমত খেয়ে যান, তারপর সামলে নিয়ে বলেন—এগুলো তখন ওপরেই ছিল, সময়ের পরিক্রমায় মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আমরা সেগুলো খুঁড়ে বের করেছি।
স্তরে স্তরে ইতিহাস চাপা পড়ার এই ব্যাপারটা দেখা যায় প্যারিসের ক্রিপ্ত আর্কিওলজিকেও। বলে রাখা ভালো—এটিই ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো ক্রিপ্ট। জায়গাটার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালের দর্শনার্থীদের জন্য একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কার পার্কিং করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। সেই উদ্দেশ্যে সামনের ফাঁকা জায়গাটায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে ক্রিপ্টটার সন্ধান পাওয়া যায়।
ক্রিপ্টের ভেতরকার পরিবেশটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, শীতল, শান্ত। দেখে বোঝার উপায় নেই যে মাথার ঠিক ওপরেই প্যারিস শহর গমগম করছে। ইচ্ছে করলেই জোরালো আলোর ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু তাতে অতীত খুঁড়তে চাওয়া দর্শনার্থীদের অনুভূতিটা মাঠে মারা যেত। এই ইন্টেরিয়রের নকশা যারা করেছে তাদের জবাব নেই।
ক্রিপ্টের দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার পথ করা আছে। আর নিদর্শনগুলো রাখা আছে মাঝখানে। এখানে রোমানযুগের একদম শুরুর দিকের লুতেসিয়ার কিছু কাঠামো আছে। রোমানদের বিপুল ইতিহাস এখানে সংক্ষেপে বিধৃত করা অসম্ভব ও অপ্রাসঙ্গিক। আপাতত কেবল এটুকু মাথায় রাখলেই চলবে যে রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান কেবল গায়ের জোরে হয়নি, হয়েছে উৎকর্ষতায়, সৃজনশীলতায়, সুনিপুণ পরিকল্পনায়, অসামান্য প্রকৌশল-দক্ষতায়।
সিতে দ্বীপটা নদীপথে বাণিজ্যের জন্য প্রশস্ত সে-কথা আগেই বলেছি। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের আমলে লুতেসিয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেক বেড়ে গেল। যিশুখ্রিস্টের জন্মের সময়সাময়িক কালের কথা সেটা। ক্রমে শহরের পরিসর বাড়ল। তৃতীয় শতকের দিকে দ্বীপটাকে আমূল সংস্কার করা হয়েছিল। তৃতীয় আর চতুর্থ শতকের এসব সংস্কারকৃত ভবনের নিদর্শনও ক্রিপ্টে পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, ১২ শতকের দিকে তৈরি পাথরে-বাঁধাই হাঁটাপথেরও বেশ খানিকটা এই ক্রিপ্টেই চাপা পড়ে ছিল। এখানে আরও আছে ১৭ শতকের একটি শিশু হাসপাতালের অংশবিশেষ। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগের ইতিহাস এখানে এসে মিশেছে। একই জায়গায় এরকম একাধিক সময়ের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া অবশ্য খুব অভিনব কিছু নয়। ক্রিপ্টগুলো এরকমই হয়। সময়ের সঙ্গে পুরনো কাঠামো নষ্ট হয়, নতুন সভ্যতা আসে, নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, আর পুরনো স্মৃতিচিহ্ন মাটিচাপা পড়ে যায়।
ক্রিপ্ত আর্কিওলজিকের অন্যতম আকর্ষণ রোমান স্নানাগারের অংশবিশেষ। দেওয়াল খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল কাঠামোটা দেখে বোঝা যায় এটা বাথহাউজই। এখানে কী ধরনের সুবিধা ছিল জানলে চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য—সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম! বাইরে বসানো ফার্নেসের মাধ্যমে উৎপন্ন তপ্ত বায়ু প্রবাহিত হতো মেঝের নিচে আর দেওয়ালে থাকা নলে, যা স্নানাগারকে উষ্ণ রাখত। সেই প্রথম শতক থেকেই রোমানদের পাবলিক স্নানাগারগুলোতে এরকম হিটিং সিস্টেম বসানো শুরু হয়। প্রযুক্তিটির নাম হাইপোকস্ট (Hypocaust)। প্রকৌশলে রোমানরা যা করে গেছে তার জবাব নেই।
ক্রিপ্ট আলোকিত করে আছেন আরেক বিশিষ্টজন—ভিক্টর হুগো (ফরাসি উচ্চারণ অবশ্য উগো)। বলা হয়ে থাকে তিনি একাই নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালকে বাঁচিয়েছিলেন। ক্রিপ্টের বিভিন্ন স্থানে সেই গল্পই লেখা। ১১৬৩ সালে তৈরি হওয়া ভূবনবিখ্যাত ক্যাথেড্রালটি উনিশ শতকের দিকে এসে সীমাহীন অবহেলার শিকার হয়। এই অবস্থায় একজন লেখকের পক্ষে সর্বোচ্চ যা করা সম্ভব হুগো তাই করলেন। লিখলেন। ক্যাথেড্রালকে কেন্দ্র করে রচিত হলো প্রখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নোত্র্ দাম্’। ব্যাপক পাঠকপ্রিয় হলো সেটি। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।
ক্যাথেড্রালটাকে লোকে এতদিন অবহেলার বস্তু হিসেবেই জানত। ভেঙ্গেচুরে পড়ে আছে, বিশ্রী আর ভূতুড়ে দেখতে, কাছে যেতেই ইচ্ছে করে না। কিন্তু উপন্যাস সেই ধারণা খোলনলচে পাল্টে দিল। মানুষ ক্যাথেড্রালটাকে রীতিমত ভালোবেসে ফেলল। কেবল লেখা দিয়েই পাঠককে আন্দোলিত করে তুলেছেন হুগো, ক্যাথেড্রালটাকে স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন পাঠক-মানসে। তখন এরকম জনমত তৈরি হলো—আরে, এরকম অমূল্য জাতীয় সম্পদকে আমরা ফেলে রেখেছি, ছিছি! ফলে ক্যাথেড্রাল সংস্কারের প্রবল দাবি উঠল। অবশেষে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সংস্কার হলো। আর এই সংস্কার কিন্তু কেবল জানালা-দরজা সারানোতেই সীমাবদ্ধ রইল না। হুগোর লেখা জনমানসে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে সংস্কারের সময়ে ভবনের স্থাপত্যেও তার ছাপ পড়ল। মানে হুগোর উপন্যাসের সঙ্গে মিল রেখে এমন অনেককিছুই ক্যাথেড্রালে নতুন করে যুক্ত হলো যা মূল কাঠামোতে ছিলই না। আজকাল কি এরকম ভাবা যায়!
ডাক্তার গিলোটিনের দাওয়াই
ফরাসি বিপ্লবের কথা অনেকেই কমবেশি জানেন। যাঁরা একেবারেই জানেন না কিংবা ভাসা-ভাসা জানেন—তাঁদের আমি খানিকটা গভীরে নিয়ে যেতে চাই। খুব একঘেয়ে লাগবে না আশা করি। বিদগ্ধজনও পড়তে পারেন, এই সুযোগে রিভিশন হয়ে যাবে।
চরম বৈষম্য, অভাব আর অদূরদর্শিতা মিলে কী ঘটাতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে ফরাসি বিপ্লবকে। তখনকার পুরো ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনভাগে বিভক্ত ছিল, যেগুলোকে এস্টেট (Estate) নামে ডাকা হতো। প্রথম এস্টেট রোমান ক্যাথলিক চার্চকেন্দ্রিক সম্প্রদায় (Clergy), দ্বিতীয় এস্টেট অভিজাত সম্প্রদায় (Nobility) এবং তৃতীয় এস্টেট সাধারণ মানুষ (Commoners)। ক্ষমতাপ্রবাহ বিবেচনায় সবচেয়ে শক্তিমান ছিল প্রথম এস্টেট, আর সবচেয়ে অপাংক্তেয় তৃতীয় এস্টেট। ফরাসি রাজাকে তিন এস্টেটের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হতো।
প্রত্যেক এস্টেটের কাছ থেকে এরকম ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল—
প্রথম এস্টেট রাজার জন্য প্রার্থনা করবে।
দ্বিতীয় এস্টেট রাজার জন্য যুদ্ধ করবে।
তৃতীয় এস্টেট রাজার জন্য কাজ করবে।
শুনতে বেশ গালভরা লাগলেও এটি ছিল শোষণের চমৎকার একটি প্রক্রিয়া। বিস্তারিত বললে আরেকটু স্পষ্ট হবে।
প্রথম এস্টেট ছিল সবচেয়ে সংখ্যালঘু, সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এরাই ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান। এই এস্টেটের আওতাধীন ছিল বিশপ, যাজক, মঠবাসী সন্ন্যাসী ইত্যাদিরা। যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা হোক না কেন প্রার্থনার কাজ উৎপাদনমূলক নয় মোটেই। প্রচুর জমিও ছিল এদের মালিকানায়। কিন্তু এরা রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিত না বললেই চলে।
দ্বিতীয় এস্টেটের অংশ ছিল রাজপরিবারের সদস্য, ডিউক, কাউন্ট প্রমুখ। সরকার আর সামরিক বাহিনীর উঁচু পদগুলো এদের দখলে থাকত। দেশের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ জমি ছিল এদের কব্জায়। কিন্তু এরা সংখ্যায় ছিল মাত্র দেড় শতাংশ। এদেরও বেশিরভাগ ট্যাক্স রাষ্ট্রের তরফ থেকে মওকুফ করা ছিল। যেটুকু দিত তা নামেমাত্র।
তাহলে গেল দেড় আর আধা, মানে মাত্র দুই শতাংশ জনগোষ্ঠী। বাকি থাকে আটানব্বই শতাংশ, যারা তৃতীয় এস্টেটের মানুষ। বণিক, আইনজীবী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে কৃষক-শ্রমজীবী সকলেই এই বিরাট দলের অংশ। যেহেতু প্রথম দুই দল দিত না, এজন্য জানা-অজানা, সম্ভব-অসম্ভব যতপ্রকার ট্যাক্স আছে সবই এদের দিতে হত। আর সেই টাকাতেই প্রথমোক্ত দুই এস্টেট স্ফূর্তি করত, আয়েশ করত, যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলত। দীর্ঘকাল সাধারণ মানুষ এদের অনাচার সয়েছে। কিন্তু বেহিসাবি যুদ্ধ আর অপব্যয়ের ফলে অর্থনীতির অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। দুরবস্থা সামাল দিতে রাজা আরও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম দুই এস্টেটের প্ররোচনায় তিনি তৃতীয় এস্টেটের ওপরে কর বাড়ালেন এবং তা ক্রমশ বাড়িয়েই যাচ্ছিলেন। একটা পর্যায়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কর আরোপ করা শুরু হলো। এর সঙ্গে যুক্ত হলো ভোটের প্রহসন।
বিষয়টা ব্যাখ্যা করা দরকার—কারণ ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ভোটাভুটি প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ থেকেই।
ফ্রান্সের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এস্টেটের সাধারণ অধিবেশনের মাধ্যমে। সেখানে তিন এস্টেটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকত এবং ভোটাভুটি হতো। প্রত্যেক এস্টেটের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি করে ভোট। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা—আটানব্বই শতাংশ মানুষের জন্য একটি ভোট, আর দুই শতাংশ মানুষের জন্য দুটি ভোট! নিজেদের সুবিধা কমে যেতে পারে—এমন যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রথম আর দ্বিতীয় এস্টেট মিলেঝুলে একই ভোট দিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৃতীয় এস্টেটের ন্যায্য দাবিদাওয়া গ্রাহ্য হতো না। চোরে চোরে মাসতুত ভাই কথাটা তো আর এমনি-এমনি আসেনি! এই যেমন ধরুন:
ক) ধনীদের সুযোগসুবিধা কমাতে হবে।—বিপক্ষে দুই ভোট, পক্ষে এক ভোট!
খ) ধনীদের ট্যাক্স মওকুফ করতে হবে।—পক্ষে দুই ভোট, বিপক্ষে এক ভোট!
অর্থাৎ এই ভোটাভুটির কোনো প্রায়োগিক গুরুত্বই ছিল না। এজন্য থার্ড এস্টেট দাবি তুলল যে, ভোটের ক্ষেত্রে এস্টেট পদ্ধতিটাই বাতিল করতে হবে। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় একজন মানুষ একটি ভোটের অধিকারী হবে। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাকি দুই এস্টেট প্রমাদ গুনলো। আরে, ভিখিরির বাচ্চারা স্বাধীন হতে চাইছে যে! তাহলে ওদের শোষণ করব কী করে? সুতরাং বলাই বাহুল্য, প্রথম দুই এস্টেট কিছুতেই এই প্রস্তাবে সম্মত হলো না। এভাবে মোটামুটি স্থিরাবস্থায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। ঐক্যমত সুদূরপরাহত।
১৭ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেট বুঝে গেল যে, এই স্থিরাবস্থা আদৌ কাটবে না। তারা তখন সাহসী অবস্থান নিলো। বললো, ‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সুতরাং আমরাই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি।’ অর্থাৎ ঘোষিত হলো সেই চিরন্তন সত্যি—রাজা নন, জনগণই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশ্ন উঠতে পারে—এই সঙ্কটপূর্ণ সময়ে তৎকালীন ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই কোথায় ছিলেন? নিরোর মতো মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন না অবশ্য। তবে তিনি রাজধানী প্যারিসের বাইরে অবস্থান করছিলেন। আগের মাসেই তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু হয়েছিল। সেই শোকে অনেকটা মুহ্যমান ছিলেন। উপস্থিত থাকলেও অবশ্য খুব লাভ হতো না। একে তো এই বিপুল জলতরঙ্গ বালির বাঁধ দিয়ে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত ও শিক্ষিত মানুষ হলেও রাজার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব ছিল। বিক্ষোভ কীভাবে দমন করতে হয় সেই বাস্তববুদ্ধি তাঁর ছিল না।
তৃতীয় এস্টেটের বিদ্রোহ যাতে অতিসত্ত্বর দমন করা হয় সেজন্য প্রথম দুই এস্টেট রাজাকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। রাজা স্বভাবতই তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। যুগে যুগে শাসকদের এই এক দোষ। ক্ষমতার মোহে এবং ফাঁপা আত্মবিশ্বাসে অন্ধ হয়ে থাকেন।
২০ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেটের লোকজন (যারা ইতোমধ্যেই নিজেদেরকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্বোধন করতে শুরু করেছে) নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিতে ভার্সাইতে অবস্থিত মিটিং হলে উপস্থিত হয়। কিন্তু দেখা গেল সেটা তালাবদ্ধ করে রাখা। শুধু তাই নয়, চারিদিকে রাজপ্রহরীদের কড়া পাহারা। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হলো—কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য হল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা আছে। খোঁড়া যুক্তি শুনে মানুষজন আরও ক্ষিপ্ত হলো। তারা বিষয়টাকে এভাবে দেখল—‘তোদের ঢুকতেই দেব না, দেখি তোরা কীভাবে অ্যাসেম্বলি চালাস!’ উপস্থিতিদের ভেতরে একটা ভয়ও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিল। বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয়রা আশঙ্কা করছিল—রাজা তাদেরকে চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। এই ঝুঁকি মাথায় তারা আর বাড়ি ফিরতে চাইল না। এই ভীতি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে জোসেফ গিলোটিন নামক একজন চিকিৎসক এগিয়ে এলেন। নামটা পরিচিত লাগছে? হ্যাঁ, ইনিই গিলোটিন নামক কুখ্যাত হত্যাযন্ত্রটির আবিষ্কারক। তিনি অবশ্য তখনও গিলোটিন বানাননি। যাইহোক, ডাক্তার গিলোটিনের পরামর্শে সকলে মিলে সমবেত হলো পার্শ্ববর্তী রয়্যাল টেনিস কোর্টে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে উপস্থিত ৫৭৬ জন মিলে আওড়ালেন:
যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তম ও ন্যায্য সংবিধান প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছে না,
আমরা কেউ কারোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হব না;
পরিস্থিতি যা-ই হোক, তা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত থাকব।
বিখ্যাত ঘটনাটি টেনিস কোর্টের শপথ (Serment du Jeu de Paume) নামে পরিচিত। প্রকাশ্যভাবে রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে অস্বীকার করার সবচেয়ে বড় ঘটনা এটাই ছিল। বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনাও বলা চলে একে।
রাজা দেখা দিলেন আরও তিনদিন পরে, ২৩ জুনে, রয়্যাল সেশনে। সেখানে তিনি উপস্থিত তিনটি এস্টেটের উদ্দেশ্যে ক্রুদ্ধভাবে বললেন—তথাকথিত নবগঠিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্পূর্ণ অবৈধ। সবাইকে আগের তিন এস্টেট-ব্যবস্থাতেই ফেরত যেতে হবে—এরকম নির্দেশ দিয়ে তিনি সবাইকে চলে যেতে বললেন এবং নিজেও অন্তর্হিত হলেন। তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন ভয়টয় দেখালেই কাজ হয়ে যাবে। তাঁর যেটা জানা ছিল না—ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বেড়াল মারতে হতো আরও আগে।
অভিজাত আর যাজক, এই দুই এস্টেট রাজার নির্দেশ মেনে সুবোধ বালকের মতো বেরিয়ে গেল। কিন্তু নিজেদের আসনেই চুপচাপ গ্যাঁট হয়ে বসে রইল বিদ্রোহীরা। বেশ খানিকক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা। বাধ্য হয়ে রাজার প্রতিনিধি এসে এদের বললেন চলে যেতে।
সলতে পাকানো ছিল। সামান্য আগুনের প্রয়োজন ছিল। তারও ব্যবস্থা হয়ে গেল।
সকলের মধ্য থেকে বিপ্লবের অন্যতম নেতা মিরাবো উঠে দাঁড়ালেন। গলা উঁচিয়ে করলেন তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি—
তোমার প্রভুকে গিয়ে বলো—আমরা এখানে এসেছি জনগণের ইচ্ছেয়।
বেয়োনেট মেরে আমাদের বের করতে পারো তো করো;
আমরা এখান থেকে সরছি না।
এরপরের কয়েকটা দিন কাটলো বেশ বিশৃঙ্খলায়। হাওয়া বদলের আভাস বুঝতে পেরে অভিজাত আর যাজকদের অনেকেই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এসে যোগ দিলেন। কয়েকদিনের ভেতরে রাজাও এই নতুন অ্যাসেম্বলিকে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু রাজারাজড়া তো, ভেতরে ভেতরে অন্য মতলব আঁটছিলেন। প্যারিসকে ঘিরে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছিল রাজার আজ্ঞাবাহী জার্মান আর সুইস সৈন্যদল। প্যারিসে গুঞ্জন ছড়াল—এই সেনাদের ব্যবহার করে সদ্যগঠিত অ্যাসেম্বলিকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়াই রাজার অভিপ্রায়। তার মধ্যে রাজা আবার অর্থমন্ত্রী জ্যাক নেকারকে বরখাস্ত করে বসলেন ১১ জুলাইতে। ইচ্ছে করেই শনিবারে করেছিলেন কাজটা, বন্ধের দিনে, যাতে খবর বেশি না ছড়ায়। কাজ হলো না। এসব খবর বাতাসেরও আগে দৌড়োয়। জনবান্ধব বলে খ্যাত নেকার সাধারণ মানুষের চোখের মণি ছিলেন। ফলে মানুষ আরও ক্ষিপ্ত হলো। সবমিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের। মারামারি, লুটপাট কিছুই বাদ রইলো না। মারমুখী জনতার চোখে তখন উন্মাদনা। অস্ত্রের সন্ধানে তারা গেল ওতেল দেজ আঁভালিদে (Hôtel des Invalides)। জায়গাটা এখন মিউজিয়াম হিসেবেই পরিচিত, তবে সে-সময় সেটা ছিল একটা বিশাল হাসপাতাল আর যুদ্ধাহত সৈন্যদের আশ্রম। তবে জনতা সেখানে যাওয়ার কারণ হলো—অস্ত্রের একটা বড়সড় মজুদ সেখানে রাখা ছিল। খুব কাছেপিঠেই রয়্যাল আর্মির ক্যাম্প ছিল, কিন্তু তারা ইচ্ছে করেই নিষ্ক্রিয় ছিল। বাধা দেওয়াটা তখন বুদ্ধিমানের কাজও হতো না।
আঁভালিদ থেকে জনতা সংগ্রহ করল কয়েকটি কামান, সঙ্গে প্রায় ত্রিশ হাজার মাস্কেট (Musket)। মাস্কেট একপ্রকার বন্দুকের নাম। তখনকার সময়ে একে পদাতিক বাহিনীর অন্যতম আধুনিক অস্ত্র বিবেচনা করা হতো। আলেক্সঁদ্র দ্যুমার লেখা ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’-এর মাস্কেটিয়ার্স কথাটা এই মাস্কেট থেকেই এসেছে।
অস্ত্র তো হলো। গোলাবারুদ কোথায়?
নিরাপত্তাজনিত কারণে গোলাবারুদের মজুদ থাকত বাস্তিল দুর্গের ভেতরে। বাস্তিলের ওপরে মানুষ আগে থেকেই প্রসন্ন ছিল না। মধ্যযুগের এই দুর্গটিকে ফরাসি রাজা তাঁর কুখ্যাত কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেখানে রাজবন্দিদের আটকে রেখে অত্যাচার করা হতো। উন্মত্ত জনতা বাস্তিলের দিকে ধেয়ে গেল। তবে এখানে কাজটা সহজ হলো না। জনতার সঙ্গে বাস্তিলের প্রহরীদের ভালোই রক্তারক্তি হলো। বেশকিছু লাশও পড়ল। শেষমেষ অবশ্য বাস্তিল পরাস্ত হলো। মানুষজন সেখানকার গভর্নরকে ধরে ফেলল। তবে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময়েই খুঁচিয়ে-পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো তাকে। পরবর্তী একদিনের ভেতরেই লোকজন বাস্তিলকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। অত্যাচারের প্রতীক বলেই জনমানসে এত আক্রোশ জমে ছিল।
আজকের দিনে বাস্তিলের জায়গায় একটি উন্মুক্ত চত্ত্বর হয়েছে। সেখানে বাস্তিল-পতন স্মরণে একটি সুউচ্চ টাওয়ার রয়েছে। জায়গাটা বেশ জমজমাট। বারতিনেক গিয়েছিলাম।
বাস্তিলের বিভিন্ন চূর্ণবিচূর্ণ অংশ ফেলা হয়েছিল বিভিন্নদিকে। কিছু কিছু আজও ট্রেস করা যায়। বাস্তিল থেকে খানিকটা দূরের Square Henri Galli নামের একটি পার্কে গিয়েছিলাম আমি। সেখানে বাস্তিলের অল্পকিছু খণ্ডিতাংশ অবহেলাভরে পড়ে আছে আজও। তাও পার্কের এমন অংশে যেখানে কেউ সহজে যায় না। সামনে একটা সাইনবোর্ড আছে, না থাকার মতোই। সবমিলিয়ে পতিত বাস্তিল নিয়ে ফরাসিদের বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই বলেই মনে হলো। সেটাই স্বাভাবিক।
বাস্তিল পতনের পর ক্ষমতা মোটামুটিভাবে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির হাতেই ন্যস্ত রইল। তবে তারা রাজতন্ত্রকে পুরোপুরি উৎখাত করল না। শুরুতে একধরনের সহাবস্থানের চেষ্টাই করেছিল তারা। পরিস্থিতি বুঝে রাজা বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি। কিন্তু এই অবস্থাতেই একটা মারাত্মক ব্যাপার ঘটে গেল।
২০ জুন ১৭৯১। রাজা ষোড়শ লুই এবং তাঁর স্ত্রী মারি অঁতোয়ানেত চাকরবাকরের ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করলেন। তাঁদের অভিলাষ ছিল পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে মিত্রদের সহায়তা নেওয়া এবং ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি গিয়ে এক পোস্টমাস্টারের হাতে তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন। শোনা যায় পয়সায় খোদাই করা রাজার ছবির সঙ্গে একটা উটকো চাকরের চেহারায় মিল দেখে তার সন্দেহ হয়েছিল। এ-থেকে শিক্ষণীয় হলো—সুযোগ থাকলেই সর্বত্র নিজের ছবি খোদাই করে বেড়াবেন না।
রাজাকে আবার প্যারিসে ফেরত পাঠানো হলো। এবার কিন্তু বিপ্লবীরা তাঁর ব্যাপারে আর সদয় রইলেন না। পালানোর চেষ্টা করে তিনি বিপ্লবের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, নিজেকেও অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছেন। ফ্রান্স এবারে রাজতন্ত্র ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরিভাবে রিপাবলিকের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। রাজপরিবারকে টেম্পল টাওয়ারে বেশ কিছুদিন বন্দি করে রাখা হলো। রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো ২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ তারিখে। অর্থাৎ ঠিক ওই দিনটা থেকে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই পরিণত হলেন কেবলই একজন লুই-তে।
লুইয়ের দুর্ভাগ্য তখনও শেষ হয়নি।
কিছুদিন পর সাবেক রাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তিনি বিদেশি রাজাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন, আর তাঁদের সহায়তা নিয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজখবর করে এর কিছু প্রমাণও পাওয়া গেল। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদেশি রাজারা কেন লুইকে সাহায্য করবেন? আসলে আঘাতটা এককভাবে ফরাসি রাজতন্ত্রের ওপরে ছিল না, ছিল পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই। অন্য রাজারা বেশ বুঝতে পারছিলেন—ফরাসি বিপ্লব সফল হলে তাদের দেশের মানুষও অধিকার ফিরে চাইবে, রাজতন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলবে। ফলে তাঁরা আসলে লুইয়ের নয়, নিজেদের স্বার্থই দেখছিলেন। ধরা পড়ে যাওয়ায় লুইয়ের অবশ্য আর রাজত্ব ফিরে পাওয়া হলো না।
২১ জানুয়ারি ১৭৯৩। ক্রোধোন্মত্ত জনতা ‘দেশদ্রোহের’ দায়ে অভিযুক্ত সাবেক রাজাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এলো বিপ্লব চত্ত্বরে (Place de la Révolution)। অনুমিতভাবেই জায়গাটার নাম বিপ্লবের পরে বদলানো হয়েছে; আগে নাম ছিল লুই পঞ্চদশ চত্ত্বর (Place Louis XV)। লুই পঞ্চদশ সম্পর্কে লুই ষোড়শের দাদু।
বিপ্লব চত্ত্বরে গিলোটিনের সামনে দাঁড়িয়ে বিপর্যস্ত রাজা আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। তীব্র হৈচৈ আর বাজনার শব্দে সেসব আর শোনা গেল না। ডামাডোলের ভেতরেই ছিন্ন হলো একসময়ের বিক্রমশালী ফরাসি রাজার মস্তক।
লুইকে হত্যার ফল হলো সুদূরপ্রসারী। বিপ্লব শুরুর পরপরই তৎকালীন প্রুশিয়া (পরবর্তীতে ভেঙ্গেচুরে রাশিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড ইত্যাদির অংশ হয়েছে) এবং অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এবার সেই বিপ্লব-বিরোধী জোটে যোগ দিল গ্রেট ব্রিটেন, ডাচ রিপাবলিক, স্পেন, পর্তুগাল। নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে কথা! কিংবা সব শেয়ালের এক রা।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি তখন বেশ ঘোলাটে। ভেতরে-বাইরে সর্বত্রই শত্রু। বৈপ্লবিক সরকারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এই জটিল পরিস্থিতি ডেকে নিয়ে এলো একটা ভয়াবহ সময়কে—যা সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) নামে পরিচিত।
১৭৯৩ সালের এপ্রিলে ‘জনসুরক্ষা কমিটি’ নামে একটি কমিটি বানানো হয়েছিল। নেতৃত্বে ছিলেন জ্যাকোবিনদের নেতা মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের। বলে রাখা ভালো—ফরাসি বিপ্লবের ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে রাজনৈতিক সংগঠনটি তৈরি হয় তাকে জ্যাকোবিন ক্লাব নামে ডাকা হতো। এই নামের উৎপত্তি অবশ্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু থেকে নয়।
রবেস্পিয়েরের ছিলেন একটি অদ্ভুত চরিত্র। আইন নিয়ে পড়েছিলেন। গণতন্ত্রের সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবসময়ই। মানবাধিকারের ব্যাপারেও অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বিচারকের কাজ করেছেন। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন, কারণ এরকম শাস্তিকে তিনি মানবতাবিরোধী বলে মনে করতেন। একবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে একজন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড না দিলেই নয়। কিন্তু তাতে নিজের নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে হয়। স্রেফ এই কারণে রবেস্পিয়ের বিচারকের পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। দৃঢ়চিত্ত নীতিবান মানুষটিকে সঙ্গত কারণেই ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো, ডাকা হতো ‘The Incorruptible’ নামে। অর্থাৎ যাঁকে দিয়ে কখনো অন্যায় কিছু করানো সম্ভব নয়।
বিপ্লবের পর অবশ্য সবকিছু আমূল বদলে গেল। নৈতিকতার ধ্বজাধারী রবেস্পিয়েরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জনসুরক্ষা কমিটি বিনাবিচারে ধরপাকড় করতে শুরু করল। স্রেফ সন্দেহের বশে অজস্র মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড ছিল ডালভাত। কাউকে ফাঁসাতে হলে কেবল বলতে হতো—সে বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ব্যাস। বিচারব্যবস্থা বলতে কিছু নেই, কমিটির কথাই আইন। বিপ্লব চত্ত্বরের গিলোটিনে নির্বিচারে অভিযুক্তদের মুণ্ডুচ্ছেদ হতে থাকল। মাত্র ১০-১১ মাসে এভাবে খুন হলেন অন্তত ১৭,০০০ মানুষ। বলা বাহুল্য এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন নিরপরাধ, ছাপোষা মানুষ।
এইসব সময়ে মানুষকে উস্কে দিতে এমন কিছু মানুষ ফ্রন্টলাইনে চলে আসেন, বিপ্লবের আগে যাদের কোনো গুরুত্বই ছিল না। এরকমই উল্লেখযোগ্য একজন জ্যাঁ-পল মারাহ। ইতিহাসবিদ কলিন জোন্স মারাহকে বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘এমন একজন ব্যর্থ আর সস্তাদরের বুদ্ধিজীবী, যাকে বিপ্লব নতুনভাবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দেয়’।
মারাহ লোক হিসেবে নিকৃষ্ট হলেও সুলেখক ছিলেন। উত্তেজনা জাগাতে তাঁর জুড়ি ছিল না। একের পর এক আক্রমণাত্মক আর উস্কানিমূলক লেখা দিয়ে তিনি বিপ্লবের অন্যতম সারথি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন, সকল বিরোধীমত ধুয়েমুছে সাফা করে দেওয়া নিয়ে পুনঃপুন রক্ত-গরম-করা লেখা প্রসব করতে লাগলেন। তাঁর উগ্রবাদী পত্রিকার নামটাও ছিল গালভরা—জনগণের বন্ধু (Ami du peuple)।
মারাহর উত্থান ও পতন—দুটোই বেশ দ্রুত। ১৭৯৩ সালে শার্লত নামের এক তরুণীর ছুরিকাঘাতে মারাহ মারা যান। যমকটা সুন্দর না?
বাথটাবে শুয়ে থাকা মৃত মারাহর একটি ছবি বেশ বিখ্যাত। তিনি সে-সময় কিছু জটিল চর্মরোগে ভুগছিলেন বলে জ্বালাযন্ত্রণা কমাতে বেশিরভাগ সময় পানিতে শুয়ে থাকতেন। শার্লত কিছু ভয়ঙ্কর শত্রুর নাম জানাবেন বলে মারাহকে লোভ দেখিয়েছিলেন, আর এভাবেই বাথরুমে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন। এ-থেকে সাব্যস্ত হয় যে—অপরিচিত কাউকে ফট করে নিজের বাথরুমে ঢুকতে দেবেন না। মারাহ মরে গিয়ে অবশ্য উল্টো বীরের সম্মান পেতে শুরু করেন। অন্তত ওই কয়টা বছরের জন্য। আর হন্তারক শার্লতকে গিলোটিনে চড়ানো হয়েছিল। শারলত অবশ্য এরকম পরিণতির সম্ভাবনা জানতেন। জেনেবুঝেই ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন। ‘একটা দানবকে যেভাবেই হোক থামাতে হবে’ এই মোটিভেশনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ ছিল তাঁর কাছে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪।
সন্ত্রাসের রাজত্বের সমাপ্তি ঘটেছিল কিছুটা প্রহসনের ভেতর দিয়ে। সেদিন ছিল ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই। মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের সেদিন আবিষ্কার করলেন—তাঁর কমিটির লোকজন তাঁকেই গিলোটিনে চড়াতে নিয়ে এসেছে। হা হতোস্মি!—কিন্তু কেন? আসলে লোকজন সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছিল। তারা অনুভব করছিল, ক্ষমতার মোহে রবেস্পিয়ার অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন, নিজেই একনায়কে পরিণত হচ্ছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!
রবেস্পিয়ের মারা যাওয়ার পর অবশ্য ফ্রান্সে কিছুটা হলেও স্থিরতা ফিরে আসে।
মৃত রাজা আর জীবিত রানির প্রসঙ্গে ফিরে যাই। রাজাকে হত্যার পর বিধবা মারি অঁতোয়ানেতেঁকে আরও মাসছয়েক টেম্পল টাওয়ারে বন্দি করে রাখা হয়। আগেই বলেছি, সময়টা গোলমেলে। যার যা-ইচ্ছা করছে। একপর্যায়ে তাঁর দিকেও অভিযোগের তির ধেয়ে এলো। তিনি নাকি নিজেও এখন বিদেশি রাজ্যে গোপন খবরবার্তা পাঠাচ্ছেন। এই তথ্যের কিছুটা সত্যতা ছিল অবশ্য। রানি নিজে অস্ট্রিয়ান রাজপরিবারের রাজকন্যা ছিলেন। এই দুর্দিনে তিনি বাপের বাড়িতে স্রেফ ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্যের খবর পাঠাবেন আর ভাইঝির পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চাইবেন—এমন হতেই পারে না। রাজনৈতিক তথ্যেরও আদানপ্রদান হয়েছে। তবে সেসব অত গুরুতর কিছু ছিল না। সমস্যা হলো, অত্যুৎসাহী বিপ্লবীর অভাব নেই। তারা রানিকেও দেশদ্রোহের দায়ে সরিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠল। আগস্ট মাসে তাঁকে টেম্পল টাওয়ার থেকে জোর করে স্থানান্তর করা হলো কঁসিয়ের্জেরি (Conciergerie)-তে। সেখানে কিছুদিন নির্যাতন চালিয়ে অবশেষে ১৬ অক্টোবর ১৭৯৩ তারিখে গিলোটিনে হত্যা করা হলো।
বিপ্লবের ডামাডোলে অজস্র নামজাদা-নামহীন মানুষকে এভাবেই গিলোটিনে জীবন দিতে হয়েছে। কপালে অন্তিম সৎকারটাও জোটেনি। বেশিরভাগকেই ঠেসেঠুসে গণকবর দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সিমেট্রিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সিমেট্রির নাম মাদেলিন, যেখানে ফরাসি রাজা-রানিকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। গিলোটিনে মৃতদের সে-সময় অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই যেনতেনভাবে পুঁতে ফেলা হতো—যাতে এসবকে ঘিরে পরে সমাধিসৌধ-জাতীয় কিছু গড়ে না ওঠে। ১৭৯৪ সালে মাদেলিন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়, কারণ এর পরিবেশ ততদিনে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, পচা লাশের গন্ধে আশপাশের মানুষ টিকতে পারছে না। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে (কীভাবে, সেই আলাপে আপাতত যাচ্ছি না) জায়গাটা সংস্কার করে মৃতদের, বিশেষ করে রাজা আর রানির স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে শাপেল এক্সপিয়াতোয়ার। কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শাপেলের প্রতিটি ইটের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের স্মৃতি।
কথা হচ্ছে, এত ইতিহাস কেন টানলাম? জায়গাটার তাৎপর্য বোঝাতে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া এই বস্তু একটা পুরনো গম্বুজওয়ালা কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে গৌরবময় ফরাসি রাজতন্ত্রের পতনের প্রতীকও বলা যায় একে। কাজেই ইতিহাসই এর প্রাণ।
আমি যেদিন শাপেল ভ্রমণে যাই, জায়গাটা একেবারেই চুপচাপ ছিল। দর্শনার্থীদের ভিড় যৎসামান্য। শাপেল মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। আর খুবই ছোট কাঠামো। দশ মিনিটে দেখে ফেলা যায়। রাজতন্ত্র নিয়ে আমার কোনো মোহ নেই, রাজপরিবারের জন্য শোক করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে ভেতরের পরিবেশটা কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা তৈরি করে। ভেতরে সংরক্ষিত রাজা ষোড়শ লুই এবং রানি মারি অঁতোয়ানেতের মার্বেল পাথরের মূর্তিগুলো দৃষ্টিনন্দন। নির্জন, শান্ত পরিবেশে এই মূর্তিগুলোর সামনে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত খারাপ লাগা কাজ করে। কেন—তার কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।
শাপেলের কিউরেটরের কাছ থেকে জানলাম, মাদেলিন সিমেট্রির দেহাবশেষগুলো সরিয়ে প্যারিসের বিখ্যাত ক্যাটাকম্বে নেওয়া করা হয়েছিল। এখন সেগুলো ওখানেই আছে। ক্যাটাকম্ব মানে ভূগর্ভস্থ গণকবর, যেখানে সারে-সারে মৃতদের হাড়গোড় সাজানো থাকে। অনুমান করা হয় প্যারিস ক্যাটাকম্বে প্রায় ষাটলাখ মানুষের কঙ্কাল রয়েছে। শহরের নিচে এক বিশাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে এই সুড়ঙ্গপথ। প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে ক্যাটাকম্ব আর আইফেল টাওয়ারে যাওয়া যায় না। এজন্য পরিকল্পনা থাকলেও আমার শেষ পর্যন্ত ক্যাটাকম্বে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
বিপ্লব চত্ত্বরেও (প্লাশ দ্য লা রেভোল্যুসিওঁ) গিয়েছিলাম একাধিকবার। জায়গাটার নাম এখন অবশ্য প্লাশ দ্য লা কঁকর্দ, বাংলায় বলা যেতে পারে সম্প্রীতি চত্বর। বেশ বুদ্ধি করে নিরপেক্ষ নাম রেখে দিয়েছে! জায়গাটা উন্মুক্ত চত্ত্বর, যখন ইচ্ছে যাওয়া যায়। খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলাম যখন দেখি যে সেখানে ফরাসি বিপ্লব-সংক্রান্ত বিশেষ কিছুই নেই। একটা চমৎকার মিশরীয় ওবেলিস্ক আছে অবশ্য, তবে তার সঙ্গে বিপ্লবের সুদূরতম সম্পর্কও নেই। তাছাড়া অবহেলার ছাপও খুবই স্পষ্ট। এখানে-ওখানে দীর্ঘ কনটেইনার রাখা, এলোমেলো কাঠামো। কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলাম। ভুল ইতিহাস জেনে আসিনি তো! পরে ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম যে ১৭৯৫ সালেই জায়গাটার নাম রেভোল্যুসিওঁ থেকে কঁকর্দ করা হয়। একইসঙ্গে একে যথাসম্ভব অদর্শনীয়ও করে তোলা হয়। আসলে সন্ত্রাসের রাজত্বের স্মৃতি তখনও দগদগে হয়ে ছিল। এতগুলো মানুষের মৃত্যু সোজা ব্যাপার নয়। নামকরণ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে সদ্য সামাল দেওয়া বিপ্লবের পাগলা ঘোড়াটাকে আবার খ্যাপানোর ইচ্ছে ছিল না কারোরই।
অনেক পরে রাজা ষোড়শ লুইকে হত্যার জায়গাটা চিহ্নিত করে একটা ছোট্ট তাম্রফলক লাগানো হয়েছিল। খুব আহামরি কিছু নয় সেটা। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানটি মোটের ওপরে ঠিক ততটা গুরুত্ব পায় না বলেই মনে হয়েছে। এটাও বোধহয় ইচ্ছাকৃতই। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
প্যারিসের দুটি ঐতিহাসিক স্থান আমি পরপর দেখেছি—কঁসিয়ার্জরি এবং সঁৎ শাপেল। প্রথমে গিয়েছিলাম কঁসিয়ার্জরিতে (Conciergerie)। ফরাসি বিপ্লবের সময় এটি ছিল কুখ্যাত কারাগার, যেখানে বিচারের অপেক্ষায় থাকা বন্দিদের রাখা হতো। এর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দি মারি অঁতোয়ানেতকেও এখানেই রাখা হয়েছিল। সে-কথা আগেই বলেছি। জায়গাটা ঘোরার জন্য ট্যাবলেটনির্ভর ‘হিস্টোপ্যাড’ বা অডিওগাইডের চমৎকার একটা ব্যবস্থা আছে। এটা দিয়ে পুরনো দিনের পরিবেশটাকে চোখের সামনে প্রায় জীবন্ত করে তোলা যায়। তাছাড়া ভেতরকার অন্ধকারাচ্ছন্ন আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশও কারাগারের আদিম আর খাঁটি একটা অনুভূতি দেয়। রানিকে আটকে রাখা সেলটা দেখে আধুনিক মনে হলেও ওই সময়ের পরিস্থিতি চিন্তা করে আমার রীতিমত দমবন্ধ লাগছিল। সবচেয়ে অমানবিক ব্যাপারটি ছিল—রানিকে প্রহরীদের সামনেই পোশাক বদলাতে বাধ্য করা হতো। সত্যি বলতে এরকম নিষ্ঠুরতা কারোরই প্রাপ্য নয়। ব্যাপারগুলো হজম করা যায় না সহজে।
এরপর গেলাম সঁৎ শাপেলে (Sainte-Chapelle)। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাজা নবম লুই এটি নির্মাণ করেছিলেন যিশুখ্রিস্টের কাঁটার মুকুটসহ অন্যান্য পবিত্র নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য। কঁসিয়ার্জরির বিষণ্ণ অন্ধকারের ঠিক বিপরীত চিত্র এখানে। ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো যেন একরাশ আলোর রাজ্যে এসেছি। জায়গাটার সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ এর জগৎবিখ্যাত রঙিন কাঁচ। জানালাগুলো দিয়ে যখন দুপুরের রোদ ঠিকরে ভেতরে আসছিল, চারপাশটা এক অপার্থিব সৌন্দর্যে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। তবে পর্যটকদের এত বেশি ভিড় ছিল যে এই অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বেশিক্ষণ ভেতরে থাকা সম্ভব হয়নি।
সেনাপতি থেকে সম্রাট
ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে ফ্রান্সে প্রথম রিপাবলিকের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এরপর ফ্রান্সের অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে হালভাঙা নৌকোরর মতো। গিলোটিনের রক্তপিপাসা থেমেছে, কিন্তু দেশে শান্তি নেই। ‘ডিরেক্টরি’ নামে কমিটিভিত্তিক যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে তারা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষ চরম হতাশ। এত রক্তক্ষয় করে রাজতন্ত্র উৎপাটিত হলো বটে, কিন্তু কিছুই যে বদলালো না! ঠিক তখনই রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলেন কর্সিকা দ্বীপের একজন তরুণ আর্টিলারি অফিসার। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।
শুরুতে অবশ্য নেপোলিয়নকে কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। ফরাসি অভিজাতদের মতো বংশমর্যাদা তাঁর ছিল না। কিন্তু জাতে ওঠার সুযোগ এলো। ১৭৯৩ সালে ফরাসিদের তুলোঁ বন্দর ব্রিটিশদের দখলে চলে গিয়েছিল। তরুণ নেপোলিয়ন তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশদের হটিয়ে দিলেন। রাতারাতি তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। এরপর তাঁকে পাঠানো হলো ইতালিতে। সেখানে ফরাসি বাহিনীর অবস্থা তখন শোচনীয়। সৈন্যদের পায়ে জুতো নেই, আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে। নেপোলিয়ন আক্ষরিক অর্থেই গেলেন, দেখলেন, জয় করলেন। অসাধারণ রণকৌশল আর অনুপ্রেরণার জোরে সেই শতচ্ছিন্ন বাহিনীই একের পর এক যুদ্ধে জিততে শুরু করল। নেপোলিয়ন বুঝিয়ে দিলেন—তিনি আর দশজন সেনাপতির চেয়ে আলাদা।
১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে এলেন। মানুষ তখন ডিরেক্টরি সরকারের ওপর তিতিবিরক্ত। এই সুযোগটাই নিলেন তিনি। প্রায় রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ‘ফার্স্ট কনসাল’ ঘোষণা করলেন। মানুষ তাঁকে সানন্দেই মেনে নিল, কারণ তাঁরা মনেপ্রাণে চাইছিল নির্ভরযোগ্য কেউ দেশের শাসনভার নিক। নেপোলিয়ন তাঁর কাজ দিয়ে ইতোমধ্যেই সেই নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছিলেন।
ক্ষমতায় এসে নেপোলিয়ন কাজেকর্মে বুঝিয়ে দিলেন, যুদ্ধে জেতা আর দেশ চালানো যে এক ব্যাপার নয় তা তিনি জানেন। দেশজুড়ে রাস্তাঘাট, স্কুল, ব্যাংক তৈরি করলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা করলেন তা হলো নতুন আইনব্যবস্থা চালু করা। যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার সমান অধিকারও নিশ্চিত করলেন। এই একটি কাজ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে রীতিমত দেবতার আসনে বসিয়ে দিলো।
১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন নিজে-নিজেই সম্রাটের মুকুট পরে নিলেন। ফরাসিরা এটাকেও সানন্দে মেনে নিলো। ভেবে দেখুন, সেই ফরাসিরাই, যারা কয়েকবছর আগেও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছে!
সম্রাট হওয়ার পরের বছরই ঘটল নেপোলিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। অস্টারলিৎজের যুদ্ধে তিনি রাশিয়া আর অস্ট্রিয়ার সম্মিলিত সুবৃহৎ বাহিনীকে তিনি এমন এক কৌশলগত ফাঁদে ফেলে হারালেন—যা আজও বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক অ্যাকাডেমিতে পড়ানো হয়।
তবে নেপোলিয়নের সবচেয়ে বড়ো শক্তি সম্ভবত সামরিক কৌশল নয়। তিনি জানতেন কীভাবে মানুষের মন জয় করতে হয়। শোনা যায় তিনি নাকি একজন সাধারণ পদাতিক সৈন্যের নামও মনে রাখতেন, অবসরে সৈন্যদের সঙ্গে ক্যাম্পফায়ারে বসে গল্প করতেন। তাঁর জন্য সৈন্যরা যে হাসিমুখে প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল তা তো কেবল এমনি এমনিই নয়।
একজন সাধারণ অফিসার থেকে ফ্রান্সের একক নায়ক হয়ে ওঠার এই অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে অসামান্য। তবে এই উত্থান সবার ভালো লাগেনি, বিশেষত ইউরোপের অন্যান্য রাজপরিবারের কাছে নেপোলিয়ন ছিলেন খলনায়ক। একে তো তিনি ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, তার ওপর তিনি সচেতনভাবে ইউরোপজুড়ে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। ফলে এই পর্যায়ে অনেক দেশই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সদলবলে দাঁড়িয়ে যায়। এর ভেতরে অন্যতম রাশিয়া-প্রুশিয়া-ব্রিটেন-অস্ট্রিয়া। ১৮১৪ সালের যুদ্ধে সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে নেপোলিয়ন আর পেরে উঠিলেন না। জয়ীরা মিলে তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠায়। তবে সেখানে তাকে আটকে রাখা গেছে মাত্র একশ দিন। কৌশলে পালিয়ে এসে তিনি আবারও ক্ষমতা দখল করেন। তবে অল্পদিনের জন্যই। ১৮১৫ সালে বিখ্যাত ওয়াটারলু (Waterloo) যুদ্ধে ব্রিটিশ এবং প্রুশিয়ান বাহিনীর কাছে তিনি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। এবার আর ব্রিটিশরা ঝুঁকি নিতে চায়নি। মেরে ফেললেও হতো, তবে তাতে নেপোলিয়নকে শহিদের মর্যাদা দেওয়া হতো। ফরাসিদের ক্ষেপিয়ে তোলারও একটা সম্ভাবনা ছিল। এজন্য এবারও নির্বাসনের সিদ্ধান্তই এলো। কিন্তু এমন কোথাও পাঠাতে হবে যেখান থেকে পালানোর কোনো উপায় থাকবে না।
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত দুর্গম আর পাথুরে ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট হেলেনা। মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের দ্বীপটির চারদিকে স্রেফ অথৈ সমুদ্র। সেইসঙ্গে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কড়া পাহারা। সেখান থেকে পালিয়ে আসা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব ছিল। সম্ভবও হয়নি। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতিকে জীবনের শেষ ছয়টি বছর সেখানেই ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে। ধুঁকে ধুঁকে বলছি কারণ পরবর্তীতে পোস্টমর্টেমে মৃত্যুর কারণ বেরিয়েছিল পাকস্থলীর ক্যান্সার।
নেপোলিয়ন খুব করে চেয়েছিলেন যাতে তাঁকে ফ্রান্সে সমাহিত করা হয়। সঙ্গত কারণেই ব্রিটিশরা এতে সম্মত হয়নি। সেন্ট হেলেনাতেই একটা অজ্ঞাতনামা জায়গায় তাঁকে কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর উনিশ বছর পর ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ফরাসি সরকার নেপোলিয়নের দেহাবশেষ ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনে। রীতিমত রাজকীয় সম্মানে তাঁকে সমাহিত করা হয় ওতেল দেজ আঁভালিদে (Hôtel des Invalide)। নামটা পরিচিত লাগছে? হ্যাঁ, এখান থেকেই বিপ্লবের সময়ে ফরাসি জনতা অস্ত্র লুট করেছিল। এখানেই একটি বিশাল গম্বুজের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নেপোলিয়ন।
ওতেল দেজ আঁভালিদ জায়গাটা বেশ বড়সড় কমপ্লেক্স ভবন। নেপোলিয়নের সমাধি এখানকার একটা ছোট্ট অংশে। অন্যদিকে একটা বড় অংশজুড়ে আছে মিউজে দ্য লার্মে (Musée de l’Armée) বা সামরিক জাদুঘর। এখানকার সংগ্রহ আক্ষরিক অর্থেই বিশাল, পাঁচ লক্ষেরও বেশি! মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সামরিক পোশাক, নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের টাইমলাইন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেডিও রিলে পর্যন্ত সব নিখুঁতভাবে সাজানো। এত এত জিনিস দেখতে দেখতে একসময় পায়ে রীতিমতো ব্যথা ধরে গিয়েছিল। যুদ্ধ জিনিসটা মোটেও আনন্দদায়ক কিছু নয়, আমি ভালোবাসিও না। তবে ইতিহাস জানার আগ্রহ থেকে এই সংগ্রহশালা আমার কাছে বেশ উপভোগ্যই লেগেছে।
রাজাগজার ব্যাপারস্যাপার
গল্পের খেই ধরে রাখতে আমি একলাফে ফরাসি রাজতন্ত্র পতনের ইতিহাসে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু পতনের আগে সেইসব রাজপরিবার কেমন জীবনযাপন করে গেছে, সেটা সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করা যায় কিনা? বিশেষত যখন আমার ভ্রমণতালিকায় ভার্সাইয়ের সেই প্রখ্যাত প্রাসাদ রয়েছে।
ভার্সাই প্রাসাদের (Château de Versailles) অবস্থান মূল প্যারিস থেকে খানিকটা দূরে। এর খুব কাছেই অবস্থিত ত্রিয়ানঁ (Trianon) এস্টেট। জায়গাগুলো আক্ষরিক অর্থেই অস্বাভাবিক বড়। পুরোটা ভালোভাবে দেখতে অন্তত একদিন সময় ব্যয় করা উচিত। দুই জায়গাতেই প্যারিস মিউজিয়াম পাস গ্রহণ করে। এজন্য পাস দিয়ে ঘোরাঘুরি চারদিনের ভেতরে একটি সম্পূর্ণ দিন এদিকটায় আসার জন্য রেখেছিলাম আমি।
ভার্সাই প্রাসাদের জাঁকজমক বর্ণনাতীত। বিশেষ করে সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা ‘হল অফ মিররস’ (Hall of Mirrors), যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এক অর্থে সেই ভার্সাই চুক্তিই জার্মানিকে উস্কেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে। জায়গাটা সুন্দর হলেও প্রাসাদের ভেতরে মানুষের এতটাই চাপ ছিল যে কোথাও একদণ্ড শান্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার জো ছিল না। কোনোরকমে কক্ষগুলো দেখে-টেখে আমি বেরিয়ে ত্রিয়ানঁ এস্টেটের দিকে হাঁটা দিলাম। এখানে রাজা আর রানির জন্য আলাদা ছোট ছোট প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা মূল প্রাসাদের রাজকীয় কড়াকড়ি থেকে কিছুটা দূরে নিরিবিলিতে সময় কাটাতে পারেন। দূরে মানে অতটা দূরেও নয়। হেঁটে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার।
ত্রিয়ানঁর মূল গেট দিয়ে ঢুকে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আদিগন্ত ফাঁকা মাঠ, সেখানে মুক্তভাবে চরতে থাকা বেশকিছু ঘোড়া-টোর ঘাস খাচ্ছে। সদর থেকে প্রাসাদের দূরত্ব অনেকখানি। সত্যিই এরকম পরিবেশ আশা করিনি। যাকে বলে ধারণার চেয়েও সুন্দর। ভার্সাইয়ের মূল প্রাসাদের চেয়ে এই জায়গাটাই আমার মনে ধরলো বেশি। প্রাসাদ অল্প অংশ জুড়ে। বেশিরভাগই ফাঁকা জায়গা। নিখুঁতভাবে ছাঁটা হেজ আর সবুজে ঘেরা সুবিশাল বাগান। সেখানকার একটি বেঞ্চে শুয়ে অনন্ত আকাশ আর চারপাশের সবুজ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি। বিশেষভাবে মনে দাগ কাটলো ‘কুইন্স হ্যামলেট’ (Queen’s Hamlet) নামের অংশটা, যেখানে রানি মারি অঁতোয়ানেতের জন্য একটা আস্ত কৃত্রিম গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছিল। ছাগল-হাঁস-ঘোড়ার খামার আর চেরি-আপেল-আঙুর বাগানগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে মনে হলো, ফরাসিরা রিস্টোরেশনের মাধ্যমে সেই পুরনো সময়টাকেই যেন নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছে।
মুগ্ধতার সঙ্গে অবশ্য খানিকটা বিশ্রী তেতো চিন্তাভাবনাও আমাকে মাঝে মাঝে খোঁচা দিচ্ছিল। হাজার হোক এসব ভোগবিলাস তো সাধারণ মানুষকে নির্বিচার শোষণ করেই সম্ভব হয়েছে।
বারান্দা থেকে ছাদে: অন্য এক প্যারিস
প্লাশ দ্য লা কঁকর্দ সংলগ্ন ওতেল দ্য লা মারিন (Hôtel de la Marine) অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। বিশাল ভবনটি শুরুতে রাজকীয় আসবাবপত্র এবং মুকুট সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে দীর্ঘকাল এটি ফরাসি নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর। সবগুলো কক্ষেই দৃষ্টিনন্দন রাজকীয় আসবাব আর সাজসজ্জার ছড়াছড়ি। তবে এখানকার সবচেয়ে মুগ্ধকর দিক থ্রিডি অডিওগাইড সিস্টেম। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার সাথে সাথে হেডফোনের অডিও নিজে থেকেই বদলে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন অদৃশ্য কেউ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে সেই সময়কার রাজকীয় গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা!
ভবনটির বারান্দা থেকে প্লাশ দ্য লা কঁকর্দ চত্বরের ভিউটাও দারুণ। উপর থেকে পুরো চত্বরটা দেখতে দেখতে হঠাতই মনের পর্দায় ফরাসি বিপ্লবের সেই ভয়াবহ দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল। মনে হলো এই বুঝি গিলোটিনের ব্লেড উপরে উঠল, আর নিচে উল্লাসরত হাজার হাজার মানুষের সামনে কারও মাথা কাটা পড়ছে, যাদের চোখে কেবলই রক্তের নেশা। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে কেন জানি।
এবারে প্যারিস ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ বিখ্যাত আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফের (Arc de Triomphe) কথা বলি। ১৮০৬ সালে অস্টারলিৎজের যুদ্ধে বিজয়ের নেপোলিয়ন পর এই মনুমেন্ট নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পঞ্চাশ মিটার উঁচু আর্কের নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ত্রিশ বছর।
ত্রিয়োম্ফের ছাদে ওঠার অভিজ্ঞতাটা মনে রাখার মতো। সেখানে গিয়ে জানলাম যে লিফট একদম উপর পর্যন্ত যায় না, বাকিটা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। বেশ উঁচুতে উঠতে হয় বলে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠেন, কেউ কেউ হালও ছেড়ে দেন। আমার চোখের সামনেই একজন উঠতে উঠতে ক্লান্ত হয়ে ধপ করে বসে পড়লেন। তবে কষ্ট করে একবার ছাদে পৌঁছতে পারলে সব ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে যেতে বাধ্য। আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফের ছাদে দাঁড়িয়ে পুরো প্যারিস শহরটাকে ৩৬০ ডিগ্রিতে দেখা যায়। প্রবল বাতাসের ঝাপটা সামলে যখন চারপাশটা দেখছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো প্যারিস শহরটাই যেন একটা জ্যান্ত মিউজিয়াম। এই অপরূপ দৃশ্য আর অভিজ্ঞতাকে ক্যামেরায় পুরোপুরি বন্দি করা অসম্ভব। তবে নিজের চোখ আর স্মৃতিই তো সবচেয়ে বড় ক্যামেরা।
ছবিঘর
Gallery
ছবির উপর ক্লিক করে বড়ো আকারে দেখুন | Click on the image for a larger view
