
দস্তইয়েফ্স্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসে রাসকোল্নিকফের মনস্তাত্ত্বিক পতনের কথা মনে পড়ছে আমার। শুরুতে দস্তইয়েফ্স্কি আমাদের ভাবিয়েছিলেন, হত্যাই বুঝি ঘৃণ্যতম অপরাধ। কিন্তু রাসকোল্নিকফের পরিণতি ক্রমশ আমাদের সামনে উন্মোচন করে যে, হত্যার চেয়েও বড়ো অপরাধ ছিল নিজের বানানো তত্ত্বে অন্ধবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং মানবিক বোধশক্তি হারিয়ে ফেলা। অপরাধ প্রকাশ্যে যতখানি ঘটে এবং যেটুকু অপরাধবোধ দেখা যায়, সেসবের বাইরেও লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায় অনেকখানি। সেই অদেখা অংশটুকুর মনস্তাত্ত্বিক বোঝা ওজনে বরং বেশি ভারি।
রাসকোল্নিকফের মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্ব আমাদের দেখায় যে, মানুষ গভীরভাবে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। বস্তুত মানুষের এই আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করেই মানবসমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে। একা টিকে থাকা প্রস্তর যুগে যেমন কঠিন ছিল, আজও তেমনই। আমরা জঁ-জাক রুসোর ‘সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট’-এও এই কথারই প্রতিফলন দেখি। আধুনিক মানুষ স্বেচ্ছায় সমাজের অনেকগুলো নিয়মের শেকল পায়ে পরে নিয়েছে, নিজের বানানো খাঁচায় নিজেই ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কেন? উত্তর হলো, নিজেরই স্বার্থে। সময়ের সঙ্গে আমাদের বেঁচে থাকার ধরন বদলেছে কেবল, কিন্তু পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রয়োজন কমেনি। বিচ্ছিন্ন হয়ে বেঁচে থাকা তাই আজও সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা বন্য পরিবেশেও একই। কিছু শিকারি প্রাণী ছাড়া বেশিরভাগকেই পরস্পর বোঝাপড়া করে দলবেঁধে টিকে থাকতে হয়। আমাদের মতো সেখানে তাদের লিখিত আইনকানুন নেই, কিন্তু অলিখিত নিয়মও কেউ সচরাচর ভাঙে না।
তবে মানুষ ভাঙে। নিজেরাই নিয়মকানুন গড়ে আমরা সেসব পদদলিত করি। দ্রোহ জিনিসটাকে এককথায় খারিজ করেও দিতে পারি না, কারণ আমাদের সভ্যতার উৎকর্ষের অনেকটাই এসেছে প্রথা ভাঙার প্রবণতা থেকে। সক্রেটিস, ব্রুনো কিংবা গ্যালিলিও যদি তখনকার সমাজের প্রথা মানতেন তাহলে আজকের পৃথিবী তৈরি হতো না। কিন্তু এগুলো নিতান্তই ব্যতিক্রম। মোটের ওপরে আমাদের কিছু সার্বজনীন বোঝাপড়া থাকতেই হয়। আর সেই বোঝাপড়া থেকে কেউ বিচ্যুত হলে বিচার বা শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, নিয়ম ভাঙা কখন সভ্যতার জন্য আশীর্বাদ, আর কখন অপরাধ? ভালো আর মন্দের এই পার্থক্য কিংবা বোধ কীভাবে কাজ করে?
নৈতিকতার এই মানদণ্ড বুঝতে গেলে ইমানুয়েল কান্টের ‘ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ’ ধারণাটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। বলা যায়, প্রথম এই বিষয়টি জেনেই আমি কান্টের দর্শনের প্রেমে পড়েছিলাম। কান্টের মতে মানুষের নৈতিকতা কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা আবেগের ওপর নির্ভর করে না। কোনো কাজ ভালো নাকি খারাপ, সেটা নির্ধারণ করার একটা সহজ উপায় আছে। নিজেকে খুব সহজ একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে: “আমি যে কাজটি করছি, সেটি কি পৃথিবীর সব মানুষের জন্য একটি সর্বজনীন নিয়ম হওয়া উচিত?” অর্থাৎ, আমি কি চাই সবাই এই কাজটি করুক এবং কাজটি সর্বজনীন বৈধতা পাক? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমার কাজটি নৈতিক নয়।
ধরুন আপনি চুরি করছেন। হয়তো খুব দামি কিছু নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আপনার মাথায় এলো, আমি কি চাই দুনিয়ার সবাই চুরি করুক? চুরি করা সবার জন্য নীতিগতভাবে বৈধ হয়ে উঠুক? আপনি তখন অনুধাবন করবেন যে, সকলেই চৌর্যবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়লে সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ আপনার বিবেকবোধ কাজ করছে এবং আপনি নিজেই নিজের জন্য একটা নৈতিক মানদণ্ড বেঁধে দিচ্ছেন। এভাবে দেখলে ব্রুনোও অনৈতিক কিছু করেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, সৌরজগতের কেন্দ্র পৃথিবী নয় এবং মহাবিশ্ব সীমিত কিছু নয়। সত্য প্রকাশের এই বিজ্ঞানসম্মত ধারণাকে যদি সর্বজনীন নিয়মে পরিণত করা হয়, তবে মানব সভ্যতার উৎকর্ষই আসবে, জ্ঞানচর্চার সুদীর্ঘ যাত্রা সমৃদ্ধই হবে। চার্চই বরং নৈতিকতার মানদণ্ডে ভুল ছিল, কারণ তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি সম্ভাব্য সত্যিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কেবল ক্ষমতার জোরে একটি অসত্য সর্বজনীন নিয়ম হলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যেত তাতে সন্দেহ নেই। মোটামুটি এই হলো নিয়ম মানার আর ভাঙার বোঝাপড়া।
‘অপরাধ ও শাস্তি’-তে রাসকোল্নিকফ ভেবেছিলেন, তিনি যেহেতু মহান লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছেন, কাজেই তাঁর জন্য মনুষ্যহত্যা বৈধ হতেই পারে। কিন্তু কান্টের তত্ত্ব অনুযায়ী, এরকম হত্যা কোনো অবস্থাতেই সর্বজনীন নিয়মে পরিণত হতে পারে না। লোকে তখন নিজের মতো হত্যার যুক্তি খুঁজে নেবে এবং মানবসমাজের ধ্বংসও অনিবার্য হয়ে পড়বে। সুতরাং এটি নীতিসিদ্ধ নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ ব্যক্তিগত দম্ভ কিংবা মনগড়া তত্ত্বের ওপর ভর করে যখন কেউ সমাজের নিয়ম ভাঙে, তখন তা অপরাধই। মানবসমাজকে এই স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বাঁচাতেই রাষ্ট্র ও সমাজ শাস্তির কাঠামো তৈরি করেছে।
মানুষ মানুষকে যে-শাস্তি দেয়, তা সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে। মৃত্যুদণ্ড সর্বযুগেই জনপ্রিয় শাস্তি ছিল, কারণ এখানে একধরনের চূড়ান্ত সমাপ্তি বা ‘ক্লোজার’ আছে। এরপর আর কিছুই করার নেই কারোর। তবে কেন আমরা আর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দিই না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মিশেল ফুকোর শরণাপন্ন হতে হয়। তিনি দেখিয়েছেন, একসময় জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো, কারণ রাষ্ট্র চাইতো তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদর্শন করতে। আধুনিক যুগে মৃত্যুদণ্ড লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে, কারণ আধুনিক রাষ্ট্র চায় মানুষের মন আর শরীরকে কাঠামোগত শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে। কেবল শারীরিকভাবে হত্যার মাধ্যমে সেটি আর সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। খুবই স্বাভাবিক। এসব ভাবলে বনফুলের একটা লেখা আমার মনে আসে প্রায়ই:
“এই পৃথিবীতে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য যে যুদ্ধ অহরহ চলিতেছে, তাহার নাম জীবন-যুদ্ধ। কোন ‘লীগ অব নেশনস্’-এর মধ্যস্থতায় তাহা কোনদিন থামিবে না। ভাবিয়া দেখিলে শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া ওঠে। মশা, মাছি, প্রতিবেশী হইতে আরম্ভ করিয়া সমগ্র বিশ্ব-জগতটাই আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতেছে। জীবন-যুদ্ধে সকলেই আমাদের শত্রুপক্ষীয়। এই বিরাট বিশ্বব্যাপী শত্রুবাহিনীর বিপক্ষে আমরা—নিধিরাম সরদারগণ—কি করিয়া টিকিয়া আছি, ইহা পরম বিস্ময়ের বস্তু।”
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য বেঁচে থাকার এই লড়াই আরও অসম। এখানে রাস্তা পার হওয়া মানে মৃত্যু-উপত্যকা পেরোনো। দূরপাল্লার বাস মাঝপথে কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়ে তার ঠিক নেই। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তমনে থাকার উপায় নেই, কে জানে অক্ষতদেহে ফিরবে কিনা! খাবারে বিষ, পানিতে বিষ, ওষুধে বিষ, প্রসাধনীতে বিষ। মানুষ দেখে, তার চারিদিকে যথেচ্ছাচার করেও অনেকে পার পেয়ে যায়। দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর চাকরি যায় না, তহবিল তছরুপে শাস্তি হয় না, শিশু নির্যাতক আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যায়। এসব দেখে দেখে সে অনেকটা অভ্যস্তই বলা চলে। কিন্তু তারপর হঠাৎ কিছু বীভৎস ব্যাপার সামনে আসে। এতটাই বীভৎস যে আর সহ্য করা সম্ভব হয় না। তখন মনে হয় এইসব প্রাতিষ্ঠানিক কালক্ষেপণ অর্থহীন, নিয়মের বেড়াজাল অপ্রয়োজনীয়। আমি দোষ দিই না তাঁদের। কিন্তু অপ্রিয় সত্য কাউকে না কাউকে বলতেই হয়। সেজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় বক্তব্যের বিরোধিতা করতে হচ্ছে। অভিযুক্তকে প্রকাশ্যে হত্যা করলে কখনোই সমাজে শাস্তির আদেশগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং আদর্শিক অন্ধত্ব নীতিসিদ্ধ মানুষকেও হিংস্র করতে পারে। এর অন্যতম প্রমাণ ফরাসি বিপ্লবের মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের। পেশায় তিনি ছিলেন আইনজীবী, বিচারক। বিপ্লবের আগে তিনি মৃত্যুদণ্ডকে চরম মানবতাবিরোধী কাজ মনে করতেন, এমনকি একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে বলে বিচারকের পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। ঠিক এরকম ইস্পাতকঠিন ছিল তাঁর নীতি। অথচ সেই রবেস্পিয়েরই পরবর্তীকালে ক্ষমতার পালাবদলে ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’-এর সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠেন। রুসোর তত্ত্বকে যাচ্ছেতাইভাবে অপব্যবহার করে, হাজার হাজার মানুষকে প্রতিবিপ্লবীর তকমা দিয়ে তিনি গিলোটিনে হত্যা করেন। উপন্যাসের রাসকোল্নিকফের মতো বাস্তবের রবেস্পিয়েরও নিজের তত্ত্বে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
অপরাধী যত জঘন্যই হোক, আইনি প্রক্রিয়ায় দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা আধুনিক আইনশাস্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। সুষ্ঠু বিচার বা ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ পাওয়া যেকোনো মানুষের অধিকার। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের বর্তমান বিচারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ, কারণ প্রচলিত কাঠামোতে ন্যায়বিচার প্রতিনিয়ত বিলম্বিত হয় এবং সিস্টেমের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কথা বলা কিংবা অকার্যকর ব্যবস্থাটিকেই ভেঙেচুরে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তোলার দাবি তোলা আমাদের মৌলিক অধিকার, নিঃসন্দেহে। সেই সুযোগ এসেছিল অবশ্য। কিন্তু জুলাই নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার আশার আলো অনেক আগেই নিভে গেছে, সম্ভবত দুমাস পরে, সেপ্টেম্বরেই। তারপরও বিচারব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে ভেবেছিলাম। দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত বিশেষ কিছুই দৃশ্যমান হয়নি।
কিন্তু কাঠামোর সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা ন্যায়বিচারের মূল ধারণাকেই ধ্বংস করে ফেলতে চাইছি, আর সেটাই বেশি ভয়ের। প্রতিশোধের আদিম প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিক বিচারের ধারণায় পৌঁছাতে মানবসভ্যতার শত শত বছর সময় লেগেছে। এরকম অন্ধ প্রতিশোধপরায়ণতাই ক্রসফায়ারের মতো বীভৎস বিষয়কে একসময় স্বাভাবিক করে তুলেছিল, যার বলি এমন অনেকেই হয়েছেন যাঁরা আদৌ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করেননি, কিংবা আদতে তেমন কোনো অপরাধই করেননি। আর কে না জানে, আমাদের অনৈতিক প্রত্যাশা শাসকশ্রেণিকে দানব হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিলে সেটি একসময় আমাদের কাছেই ফিরে আসে।
মানুষ এখন ন্যায়বিচারের বদলে দ্রুত প্রতিশোধ চায়। ফলে রাস্তায় সন্দেহভাজন কাউকে পিটিয়ে মারা বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হাততালি পড়ে। এমনকি আসামির পক্ষে আইনি লড়াই করতে আইনজীবীরা পর্যন্ত প্রকাশ্যে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা পেশাদারি নৈতিকতা ও আইনি অধিকারের চরম লঙ্ঘন। সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণিকে এরকম করতে দেখাটা বেদনাদায়ক। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, সভ্যতার এই পর্যায়ে এই অত্যন্ত সাধারণ ও মৌলিক কথাগুলো নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে।
‘শিক্ষা’ বিষয়ের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী হিসেবে আমি খুব ভালোভাবেই জানি, এটাই আমাদের সমাজের অ্যাকিলিস হিল। আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাদর্শনের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। মানুষকে চব্বিশ ঘন্টা বেঁধে রাখা যায় না, নজরদারির অধীনে রাখা যায় না। একজন মানুষ যেকোনো সময়ই অপরাধ ঘটাতে পারে। আমরা তার সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনি এবং অধিকাংশ মানুষের অপরাধপ্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করি শিক্ষা দিয়ে। সেই শিক্ষারই বেহাল দশা। সন্দেহ নেই যে আমাদের শিক্ষা মানবিক বোধ জাগাতে পারছে না, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না, সমালোচনামূলক বা ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং করাতে পারছে না। ঠিক এরই ধারাবাহিকতায় আমরা এমন এক শিক্ষিত সমাজ তৈরি করেছি, যারা হয় নিজে অপরাধ করে, নয়তো অপরাধ দিয়ে অপরাধের দমনকে উদযাপন করে। সম্মিলিত উল্টোযাত্রা হয়তো একেই বলে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন আর ধর্ষণ বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত। আমি অপরাধবিজ্ঞানী নই, তবে যেটুকু জানি ধর্ষণ জিনিসটা কোনোভাবেই ভাবাবেগের বশে ঘটা অপরাধ বা ‘ক্রাইম অব প্যাশন’ নয়। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা এ-বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। অর্থাৎ, আকস্মিক ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাবে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে, অপরাধবিজ্ঞানে এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। সুপ্রাচীনকাল থেকেই ধর্ষণ আধিপত্য বিস্তার আর ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার, মানুষের মগজে গেঁথে থাকা ক্ষমতার কুৎসিত ভাষা, পুরুষতন্ত্র থেকে যার জন্ম। এর মূল লক্ষ্য নারীকে বশ করে রাখা, তার মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তাকে মানুষের পরিবর্তে বস্তুবিশেষ হিসেবে বিবেচনা করা। ক্ষমতার এই সমীকরণটি যদি আপনি বোঝেন, তাহলে এটাও বুঝবেন কেন ছেলেশিশুরাও ধর্ষণের শিকার হয়। সমাজকাঠামোয় ছেলে কিংবা মেয়ে, উভয় শিশুই ক্ষমতাহীন ও দুর্বল। আমাদের মতো অনিয়ন্ত্রিত সমাজে সেটি আরও বেশি। ক্ষমতার চর্চায় দুর্বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা সবচেয়ে সহজ।
তবে সমাজে এত ধর্ষণ বাড়ার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি বড়ো কারণ হলেও সেটিই একমাত্র নিয়ামক নয়। এর শেকড় লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের গভীরে। নারীকে অধস্তন মানুষ হিসেবে দেখা এবং তাকে পাপের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি আমাদের সমাজে বহমান। এই কাঠামোগত অবমাননা অনেক সময়ই ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চ বা ধর্মীয় আলোচনার স্থানগুলো থেকেই বৈধতা পায়। সেখানে প্রায়শই নারীকে ‘পাপের কারখানা’ এবং শ্রমজীবী নারীদের ‘বেহায়া’ বা ‘জাহান্নামী’ বলে প্রকাশ্যে সম্বোধন করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ-ধরনের কথা প্রকাশ্যে বলেও তারা সামাজিক বা আইনি শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যান, উল্টো সমাজের একটি বড় অংশ থেকে স্বীকৃতিই পেয়ে আসছেন। এই স্বীকৃতি ইদানীং পরিণত হয়েছে একমুখী ভক্তিতে, যেখানে সমালোচনার স্থান অত্যন্ত সীমিত।
সুতরাং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুটো নিয়েই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
আপনি তারপরও তাৎক্ষণিক প্রতিবিধান হিসেবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড চাইতেই পারেন। আপনি বলতেই পারেন বিচারব্যবস্থাকে বাইপাস করেই আপনি সমস্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, আর তার অনেক কারণ রয়েছে।

