
ক্যাডেট কলেজের আদলে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৬০০টি ‘মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এটিসহ বেশকিছু উন্নয়নমূলক প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে যাচ্ছে। প্রস্তাবনাটি শিগগিরই অনুমোদিত হয়ে যাবে, সংশ্লিষ্টরা এমনটাই প্রত্যাশা করছেন।
আপাতদৃষ্টিতে এই প্রকল্পটি চমকপ্রদ মনে হলেও এটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার আগে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিবিড়ভাবে নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে তাদের প্রথম বাজেট পাশ করেছে। প্রশংসনীয় ব্যাপার হলো, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরবর্তীতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট খাতে কীরূপ গুণগত পরিবর্তন আনবে, তার পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত শিক্ষাক্ষেত্রে এরকম একটি উদ্যোগকে সমাজতাত্ত্বিক এবং তুলনামূলক শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
যেকোনো সমাজে বৈষম্য কমছে কি না, সেটি নির্ভর করে সামাজিক সচলতা বা সোশ্যাল মবিলিটির ওপরে। সমাজে মেধা ও দক্ষতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত না হলে, সুযোগের সমতাবিধান করা না হলে একজন কৃষকের সন্তানের পক্ষে কেবল নিজ চেষ্টায় তার অর্থনৈতিক স্তর বদলে ফেলা দুরূহ।
বাংলাদেশে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। অনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করলে কেবল একটি প্রজন্মে নিজের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলা অসম্ভবের কাছাকাছি। মূল কারণ সম্পদের অসম বণ্টন, যা সরাসরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। দেশে এমন অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেগুলোর ব্যয়ভার বহন করা সিংহভাগ পরিবারের পক্ষেই অসম্ভব। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য যত বেশি, উন্নত শিক্ষার সুযোগও তত বেশি। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার বাজার উন্মুক্ত থাকলেও প্রতিযোগিতাটি শুরু থেকেই অসম হয়ে পড়ে। অনেকে হয়তো কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এই দুষ্টচক্র ভেঙে বেরিয়ে আসেন, কিন্তু এই ব্যক্তিগত লড়াই সেই শিশুটির সমতুল্য নয়, যে জন্মগতভাবেই সমস্ত সুবিধা নিয়ে বড়ো হচ্ছে।
সমতাভিত্তিক সমাজ বলতে এমন একটি সমাজকাঠামোকে বোঝায় যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান সুযোগ পাবে। ধনীর সন্তান যে-বিদ্যালয়ে যাবে, দরিদ্রের সন্তানও একই বিদ্যালয়ে পড়বে। এটি সরাসরি শিশুর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ বা কালচারাল ক্যাপিটালকে প্রভাবিত করে।
ইদানীং কর্পোরেট নিয়োগকর্তাদের একটি সাধারণ অভিযোগ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ভালো সিভিও বানাতে পারে না। অভিযোগটি অমূলক নয়। কিন্তু এই অজ্ঞতার পেছনের কাঠামোগত কারণটি আড়ালে থেকে যায়। নিয়োগকর্তারা স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে দক্ষ মানুষটিকে চাকরি দিতে চাইবেন। কিন্তু ওই কাঙ্ক্ষিত দক্ষতায় পৌঁছানোর পথটি একেকজনের জন্য কতটা অসম ও কণ্টকাকীর্ণ ছিল তা নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিবেচনার বাইরেই থেকে যায়।
সমবয়সী দুজন শিশুর কথা ধরা যাক। অবস্থাপন্ন পরিবারের শিশুটি যখন আর্ট গ্যালারিতে যাচ্ছে, চমৎকার বই উপহার পাচ্ছে, নেটফ্লিক্স দেখছে কিংবা বিদেশভ্রমণে যাচ্ছে, দরিদ্র পরিবারের শিশুটি এসব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবধান বাড়তে থাকে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুটি হয়তো নিজের মেধার জোরে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে, অদেখা পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে, কিন্তু ততদিনে ব্যবধান আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। কারণ সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুটিও উচ্চশিক্ষায় ঢুকেছে, আর সে খুব ভালো করেই জানে কোথায় ইন্টার্নশিপ করতে হবে কিংবা কীভাবে ভালো সিভি তৈরি করতে হয়। স্নাতক শেষে এই দুজন শিক্ষার্থী যদি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন, স্বভাবতই নিয়োগকর্তারা সেই প্রার্থীকেই বেছে নেবেন যাঁর দক্ষতা এবং বৈশ্বিক জানাশোনা বেশি। এখানে দায় ওই আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়, এমনকি পরিবারগুলোরও নয়। এই কাঠামোগত অসমতার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্রের।
সমতাবিমুখ সমাজে দরিদ্র পরিবারের শিশুর চেয়ে বিত্তবান পরিবারের শিশুরা এই সাংস্কৃতিক পুঁজির জায়গাতেই এগিয়ে থাকে। এজন্য একটি আদর্শ রাষ্ট্র তার প্রতিটি বিদ্যালয়কে ‘সাংস্কৃতিক পুঁজির সমতাবিধানের কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। পারিবারিক ও আর্থসামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি শিশুর সমান সুযোগ ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। ফলে গ্রামের ও শহরের স্কুল হবে সমমানের এবং সকল শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক পুঁজি গড়ার সুযোগও থাকবে সমান। এই সমতাবিধান কোনো কাল্পনিক ইউটোপিয়া নয়। নর্ডিক দেশগুলো এটি বাস্তবে করে দেখিয়েছে, বাল্টিক দেশগুলোও বর্তমানে একই পথে হাঁটছে।
বিদ্যমান হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধুঁকতে দিয়ে নতুন বিদ্যালয় নির্মাণের এই প্রবল আগ্রহের পেছনে শিক্ষাদর্শনের চেয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির ভূমিকাই বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। প্রস্তাবিত ৬৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ৩০ হাজার কোটিই টাকাই খরচ হবে জমি অধিগ্রহণে এবং ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে দশতলা ভবন নির্মাণে। বিগত সরকারের সময়েও বিদ্যমান সড়ক মেরামতের চেয়ে উড়ালসড়ক নির্মাণের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। এর মূল কারণ, একদিকে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখানোর তাগিদ এবং অন্যদিকে বিশাল অর্থব্যয়ের সুযোগ। অন্যদিকে, বিদ্যমান স্কুলগুলোর মানোন্নয়ন বা শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করলে রাতারাতি বিশাল কোনো ভবন দৃশ্যমান হয় না, উদ্বোধনের ফলকও উন্মোচন করা যায় না। এই ‘কংক্রিট-নির্ভর’ উন্নয়ন মূলত একটি বিভ্রান্তিমূলক ও অ-টেকসই ব্যবস্থা, যা প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘মডেল’ বা আদর্শ বলার অর্থ কি এই যে, দেশের বাকি স্কুলগুলোকেও ভবিষ্যতে সমান অর্থব্যয় করে এরকম মডেলে রূপান্তর করা হবে? বাস্তবে সেটি একেবারেই অসম্ভব। দেশের অনেক বিদ্যালয়ে যখন পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীরা যখন বাংলায় সাবলীলভাবে পড়তেই সংগ্রাম করছে, সেখানে মুষ্টিমেয় বাছাইকৃত শিক্ষার্থীর জন্য এআই ল্যাব নির্মাণের পরিকল্পনা একটি নির্মম পরিহাস।
রাষ্ট্রের অর্থে নির্মিত এই কথিত ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্সগুলো’-ও শেষ পর্যন্ত নামীদামি বেসরকারি স্কুলগুলোর মতো এক্সক্লুসিভ ছিটমহলে পরিণত হবে, যেখানে সবার প্রবেশাধিকার থাকবে না। যারা এই বিশেষ ব্যবস্থায় ঢোকার সুযোগ পাবে, তারা সমাজে একটি নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করবে। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বোর্দিউ তাঁর ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ বা সাংস্কৃতিক পুঁজির তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই তথাকথিত ‘মেধাভিত্তিক’ বাছাই প্রক্রিয়া কীভাবে মূলত কাঠামোগত অসমতাকেই টিকিয়ে রাখে। ফলে প্রান্তিক শ্রেণির একটি শিশু মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল সাংস্কৃতিক পুঁজির অভাবে এই প্রতিযোগিতায় ছিটকে পড়বে। রাষ্ট্র এভাবেই ‘মেধার’ মোড়কে শ্রেণি-বৈষম্যকে বৈধতা দেয়।
সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোথায় এই স্কুলগুলো হবে, তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ সমীক্ষা হয়নি। ৩০০টি সংসদীয় আসনে সমানভাবে এগুলো ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনাকে তাই কোনো অবস্থাতেই শিক্ষাতাত্ত্বিক বলা যায় না, এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক মডেল। শিক্ষাবিদদের মতামত কিংবা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ছাড়া এ ধরনের ‘টপ-ডাউন’ বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়শই শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়।
তুলনামূলক শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, ‘ট্র্যাকিং’বা শিক্ষার্থীদের আলাদা করে এলিট স্কুলে পাঠানোর প্রবণতা শিক্ষার জন্য আত্মঘাতী। বৈশ্বিক শিক্ষার মানদণ্ডে সফল উদাহরণ ফিনল্যান্ড। ১৯৭০-এর দশকে ফিনল্যান্ড যখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করে, তখন তারা কোনো ‘মডেল স্কুল’ বা ‘এলিট স্কুল’ বানায়নি। তারা ‘পেরুস্কউলু’ (Peruskoulu) বা সমন্বিত স্কুল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলকে সমান মানে উন্নীত করার নীতি নিয়েছিল। তাদের শিক্ষাদর্শনের মূল কথা এক্সিলেন্স বা উৎকর্ষ নয়, বরং ইক্যুইটি বা সমতা। সমতা থাকলে উৎকর্ষ এমনিতেই আসে।
সরকার যদি ৬০০টি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ তৈরি করে, তবে দেশের বাকি ১৯ হাজার সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কি ‘সেন্টার অব নেগলেক্ট’ হিসেবেই থেকে যাবে? একটি রাষ্ট্র এভাবে ‘মডেল’ বিদ্যালয় বা ‘মডেল’ শিক্ষার্থী দিয়ে এগোতে পারে না, সেটি কোনো সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা, যা প্রতিটি সাধারণ স্কুলেই শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক এবং চিন্তাশীল হয়ে ওঠার সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। আমাদের একটি পরিষ্কার শিক্ষাদর্শন প্রয়োজন। আমরা ‘কী’ করছি, সেটি নিয়ে অস্থিরতার চেয়ে ‘কেন’ করছি, তা অনুধাবন করা বেশি জরুরি।
আশার কথা হলো, বিষয়টি এখনো অনুমোদিত নয়, প্রস্তাবনার পর্যায়েই আছে। তবে এই প্রস্তাবনাটি করেছে খোদ বাংলাদেশের শিক্ষার অভিভাবক সংস্থা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এমন একটি অবিবেচনাপ্রসূত এবং অদূরদর্শী প্রস্তাবনা কেনই বা উত্থাপন করা হলো?
(লেখাটির একটি সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে দৈনিক সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। লিংক এখানে।)
