
গভীর নির্জন পথে: অন্যরকম অভিযাত্রার গল্প
‘গভীর নির্জন পথে’-কে একপ্রকার অভিযাত্রার গল্প বলা চলে। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই অন্বেষী লেখকের সঙ্গে পাঠকও যেন অজান্তে নেমে পড়বেন এক নিবিড় অনুসন্ধানে। প্রাজ্ঞ লেখক বুভুক্ষের মতো বাঙলার গাঁয়ে-গ্রামে পথে-প্রান্তরে খুঁজে ফেরেন এক অন্যরকম জগতকে। সে-জগৎ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। আমরা সে-জগতকে প্রত্যহ দেখি, শুনি—কিন্তু জেনেও জানি না। তাঁরা আমাদের খুব কাছের মানুষ, কিন্তু চেনা পৃথিবীটাকে তাঁরা একটু অন্যভাবে দেখেন। সেই দেখা আবার অনেকের পছন্দ হয় না।
এই বইতে রয়েছে সেইসব জগতকে খোঁজারই ইতিবৃত্ত। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে, প্রচলিত বড়ো ধর্মগুলোর সমান্তরালে বাঙলায় রয়েছে শত-শত বছরের পুরোনো বেশকিছু লোকধর্ম। আর এই ধর্মগুলোকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে এক অভিন্ন উপাসনা—সংগীত। এই ধর্মগুলোকেই জানার প্রয়াস লেখকের। তিনি অনুসারীদের সঙ্গে আলাপ করেন, জ্ঞানতৃষা নিবারণ করেন, আর ধর্মগুলোর তত্ত্বানুসন্ধান করেন।
আগেই বলেছি—বেশিরভাগ লোকর্মের সঙ্গে সঙ্গীত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এজন্য আমরা অনেক সময় এঁদের গড়পড়তাভাবে বাউল-ফকির ডেকে থাকি। বইটি পড়লে খানিকটা বোঝা যাবে যে, কেন এই সরলীকরণ সঠিক নয়। 
সুধীর চক্রবর্তী আমাদের দেখান যে, দীর্ঘকালব্যাপী নিভৃতে থাকা এসব সাধকদের পথটি যেমন কণ্টকাকীর্ণ, তেমনই দুর্জ্ঞেয়। বাঙলার লোকধর্মগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এমনিতেই যৎসামান্য জ্ঞান রাখে। আর কে-না-জানে যে অজ্ঞতার স্থান কখনো অপূর্ণ থাকে না, সেখানে বাসা বাঁধে অপতথ্য। অবশ্য এ-ও ঠিক যে এসব ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারীরাই আসলে চান না মানুষ এগুলো সম্পর্কে খুব বেশি জেনে ফেলুক। তাতে অবশ্য কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। তাঁরা নিজেদের সাধন-ভজন আর ক্রিয়াকর্ম নিয়ে থাকেন, সমাজের প্রথাসিদ্ধ জীবনযাপনের পথকে বিশেষ মাড়ান না, জোর করে নিজের মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করেন না। কিন্তু তাতে তো সব গোল মেটে না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে লোকধর্মের অনুসারীদের মত ও পথকে দলিত করবার অপচেষ্টা হয়েছে অসংখ্যবার। কারা করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না—সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীর মানুষজন। সংখ্যাগুরুদের হীনমন্যতা সর্বযুগেই সম্ভবত একই প্রকৃতির। সামান্য ব্যতিক্রমে তাঁরা অস্থির হয়ে ওঠেন, নিজেদের স্থানচ্যুতির শঙ্কায় পড়ে যান। মজার ব্যাপার হলো, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ঐতিহাসিকভাবেই এই ব্যাপারে হিন্দু আর মুসলিমদের ভেতরে ভীষণ ঐক্য—যেন কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। ফলাফল—সাধকদের ওপরে শারীরিক ও সামাজিক অত্যাচারের খড়্গ নেমে এসেছে বারংবার। বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা, চুলদাড়ি কেটে ফেলা কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু অত্যাচারিত মানুষগুলো নিতান্তই অহিংস, ফলে সবকিছু সহ্য করেছেন, কিন্তু স্বেচ্ছায় আরো গুটিয়ে গেছেন। ফলে তাঁদের একান্ত পথটি হয়ে উঠেছে আরো অনেক বেশি নির্জন।
এই গভীর নির্জন পথে হেঁটে সুধীর চক্রবর্তী বুঝতে চেয়েছেন এসব লোকধর্মের স্বরূপকে। অনুসারীদের ক্রিয়াকর্মের গভীর গোপনীয়তাকে। আপাত সরল গানগুলোর শব্দের ভাঁজে ভাঁজে নিঃসাড়ে লুকিয়ে থাকা নিগূঢ় তত্ত্বগুলোকে পেঁয়াজের খোসার মতো ক্রমশ ছাড়িয়েছেন। সেজন্য লেখক বহু বছর ধরে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় ভ্রমণ করেছেন; ঘুরেছেন সাধনপীঠে, আখড়ায়, মাজারে, মেলায়, উৎসবে, সাধকের গৃহে। বিভিন্ন তত্ত্ব জেনেছেন, বুঝেছেন, আবার তার পরপরই বুঝেছেন যে, আদতে কিছুই জানেননি, বোঝেননি। এভাবে নিয়ত ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে লেখক খুঁজেছেন সাহেবধনী সম্প্রদায়, বলরামী সম্প্রদায়, কর্তাভজা, ফকিরি আর সহজিয়া বৈষ্ণবধর্মকে।
গভীর নির্জন পথ মোটেও নিষ্কলুষ নয়। এ-পথে অজস্র শঠতা আছে, দুরাচার আছে। ভেকধারী সাধকও আছে অগুণতি। কামার্ত, লোভী, গেঁজেল, বহিরাবরণকেন্দ্রিক মানুষের ছড়াছড়ি আছে। তার মাঝেও লেখক খুঁজে ফেরেন সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসকে, অত্যাশ্চর্য ধর্মীয় সমন্বয়বাদকে, যেখানে জাতিভেদ নেই, বর্ণশ্রেষ্ঠ বলতে কিছু নেই। ঈশ্বরের বিমূর্ত কিংবা সাকার রূপের আরাধনার চেয়ে ‘মানুষ’-ই তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে পরমারাধ্য। ব্যক্তির মাঝে যে ঈশ্বরের বাস, তাঁরা তারই ভজন করেন, ভক্তিভরে।
বইটি পড়ে বেশ ঋদ্ধ হলাম। ননফিকশন হলেও ভাষা বেশ ঝরঝরে। শব্দচয়ন আর বর্ণনাভঙ্গি অনবদ্য। পুরো গ্রন্থটিই উপভোগ্য, তবে বিশেষ করে গৌরাঙ্গতত্ত্ব অনুসন্ধানের অংশটি আমার কাছে বেশ চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছে। এই অংশটি কোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলার বইয়ের টুইস্টের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
