
প্যারিস চতুর্থ কিস্তি: ইতিহাস-পাতিহাঁস
শিরোনাম পড়ে অনেকে হয়তো ভাবছে—এই রে, এবার শুরু হলো সাল-তারিখের কচকচানি!
আশ্বস্ত করে বলি, ইতিহাস মানেই সাল-তারিখ নয়। আমি প্রথাগত অ্যাকাডেমিক ইতিহাসের কথা বলছি না। তার বাইরেও ইতিহাস আমাদের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানবসভ্যতার বেশিরভাগ ঘটনারই রেকর্ড নেই, ফলে সংরক্ষণের অভাবে সেসব কালগর্ভে হারিয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির অবিশ্বাস্য অগ্রগতির ফলে এখন অবশ্য সেই বালাই নেই। এক মেটার (Meta) ডেটাবেজেই বোধহয় পাহাড়সমান ইতিহাস জমা হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের জন্য!
ইতিহাস আমাদের অতীতের ভুল ধরিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে টেকসই করে—এসব হচ্ছে কেজো কথা। এসবের বাইরেও ইতিহাস আমাদের নিজস্বতাকে পোক্ত করে, প্রচলিত চিন্তাভাবনার পেছনের কারণ আর যুক্তি বুঝতে সাহায্য করে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ইতিহাস আমাদের ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
ইংল্যান্ডের সারের রানিমিড (Runnymede) জায়গাটার কথা ধরা যাক। স্বাভাবিকভাবে সেখান দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হবে—এ-তো মামুলি জায়গা। ঘাস, লতাপাতা আর কাদামাটি ছাড়া বিশেষ কিছুই চোখে পড়ছে না। বড়জোর একটা ভালো পিকনিকের জায়গা হতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি জানবেন, ঠিক এই কাদামাটির ওপরে দাঁড়িয়েই ১২১৫ সালে বিদ্রোহী ব্যারনদের চাপে রাজা জন ‘ম্যাগনা কার্টা’-তে (Magna Carta) সিলমোহর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন? ওই সাধারণ ঘাসজমি নিমেষে হয়ে উঠবে আধুনিক গণতন্ত্রের তীর্থভূমি। আজকের দুনিয়ায় যে ব্যক্তিস্বাধীনতা বা আইনের শাসন নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, তার সূচনা কিন্তু ওই সাদামাটা জায়গাটিতেই।
ইতিহাস এমনই। জানা থাকলে আর সংযোগ ঘটাতে পারলে খুব সাধারণ বস্তু, ঘটনা কিংবা স্থানও অসাধারণ হয়ে ওঠে। তাছাড়া কোনো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা হার মানাতে পারে বর্তমানের সেরা থ্রিলারকেও। অর্থাৎ ইতিহাস একেবারে নিরস ব্যাপার নয়।
ইউরোপকে ইতিহাসের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না। ইউরোপীয়রা আধুনিক জীবনে প্রবেশ করেও ঐতিহাসিক চিহ্নগুলোকে সযত্নে রক্ষা করেছে। ফলে ইউরোপকে ভালোভাবে বুঝতে হলে ইতিহাসের পথ খানিকটা মাড়াতেই হয়।
ফ্রান্স কেবল শিল্পে নয়, ইতিহাসের দিক থেকেও কল্পনাতীত সমৃদ্ধ। বিশেষত প্যারিসের অলিগলিতে আক্ষরিক অর্থেই অজস্র ইতিহাসের ছড়াছড়ি—কখনো প্রকট, কখনো প্রচ্ছন্ন। এমনকি শিরোনামে ব্যঙ্গ করে যে-হাঁসের কথা লিখেছি, সেটাকেও চাইলে প্রাচীন ইতিহাস আর সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সম্ভব। কীভাবে? বিশেষভাবে উৎপাদন করা হাঁসের কলিজা থেকে প্রস্তুতকৃত একটি বিশ্বখ্যাত খাবার ‘ফোয়া গ্রা’, যাকে ফরাসি রন্ধনশিল্পের সিগনেচার আইটেম বলা যায়। প্রাচীন ফ্রান্সে প্রায় দেড়হাজার বছর বা তারও আগে এই রেসিপির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। সুনীলের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’-তে হোয়াইট ওয়াইন দিয়ে ফোয়া গ্রা খাওয়ার অত্যুৎকৃষ্ট বিবরণ আছে। আমার অবশ্য খাদ্যদ্রব্যটি আস্বাদন করা হয়ে ওঠেনি, ফলে সুনীলের মতো মুগ্ধতা ছড়াতে পারছি না।
আমার এই লেখার কেন্দ্রবিন্দু ভ্রমণ। এজন্য ফ্রান্সের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য নয়, সেটি সম্ভবও নয়। যা প্রাসঙ্গিক, সেটুকুই আনব কেবল। এখানে জানিয়ে রাখি, লেখার সময়ে আমি অজস্রবার তিনটি গ্রন্থের শরণ নিয়েছি। তবে বারবার তথ্যসূত্র উল্লেখ করে লেখাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। এজন্য শুরুতেই কৃতজ্ঞতাস্বীকার সেরে ফেলা যাক।
- France: A Short History (2021) by Jeremy Black
- The Cambridge Illustrated History of France (1999) by Colin Jones
- France: A History (2018) by John Julius Norwich
মাটিচাপা ইতিহাস
ইতিহাস সম্ভবত দুভাবে চাপা দেওয়া সম্ভব, ধামাচাপা আর মাটিচাপা। প্রথমটা আমরা হরহামেশাই দিচ্ছি। লোকে জানলে নিজের নাক কাটা যাবে, এমন তথ্য আমরা হরহামেশাই গায়েব করে ফেলি। ঐতিহাসিকভাবেও রাজকোষের টাকায় পালিত ভাড়াটে ইতিহাসবিদদের উৎপাত লক্ষণীয়। নিতান্ত পাপিষ্ঠকেও তারা অনেক সময় বিশ্ববিবেকের অবতার বানিয়ে ছাড়ে। তাছাড়া কে না জানে—ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের পক্ষে। এভাবে কত ইতিহাস যে বিদীর্ণ-বিকৃত-বিনষ্ট-বিপন্ন-বিবর্তিত হয়েছে তার গোনাগুনতি নেই। কিছু ইতিহাস আবার সময়ের পরিক্রমাতেই ঢাকা পড়ে যায়। কিছু আবার আক্ষরিক অর্থেই এমন গভীরে চলে যায় যে আর্কিওলজিস্ট দিয়ে খুঁড়ে তুলতে হয়। মাটিচাপা ইতিহাসের এই হলো মর্মার্থ।
প্যারিসের মাটিচাপা ইতিহাস দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা প্যারিসের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুখ্যাত দ্বীপ—ইল দে লা সিতে (Île de la Cité)। অপরিসর দ্বীপটির নামডাক জগদ্বিখ্যাত নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রাল (Notre-Dame Cathedral)-এর অবস্থানের কারণে। নোত্র্ দামের সামনে আমি অনেকবারই গিয়েছি। তবে ভেতরটা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর থেকে অদ্যাবধি সেটার সংস্কারকাজ চলছে। ২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের আগে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না, এমনতাই জেনেছি। বাইরে থেকে অবশ্য দেখা যায়, কিন্তু চারিদিকে ঘিরে থাকা দৈত্যাকার ক্রেন আর লোহালক্কড়ের ভিড়ে ব্যাপারটা ঠিক জমে না।
প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে আমার প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল ক্যাথেড্রালের ঠিক সামনে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ ‘ক্রিপ্ত আর্কিওলজিক’ বা ‘Crypte Archéologique’। নামেই বোঝা যাওয়ার কথা যে জায়গাটা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে বিখ্যাত—অর্থাৎ এর সঙ্গে ইতিহাসের যোগসূত্র আছে। সেই ইতিহাস আবার যেনতেন নয়, প্যারিস নগরী কীভাবে গড়ে উঠলো—তারই ইতিবৃত্ত। তার খানিকটা এখানে তুলে ধরতে পারি।
বয়সের হিসেবে প্যারিস পুরনো। যথেষ্টই পুরনো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্যারিসের বের্সি এলাকা থেকে নিওলিথিক বা নব্যপ্রস্তরযুগের (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪,৫০০-২৬০০ সালে) একটি কাঠের নৌকা পাওয়া গেছে, যা প্যারিসের কার্নাবালে (Carnavalet) জাদুঘরে রয়েছে। অর্থাৎ অনায়াসেই বলা চলে যে, এখানকার লোকবসতি অন্তত ৬,০০০ বছরের পুরনো। আমি অবশ্য অত পেছনে যাবো না—তার প্রয়োজনও নেই। আমরা বরং একলাফে চলে আসতে পারি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে, যখন অধুনা প্যারিসের গোড়াপত্তন হচ্ছিল। সেই সময়টায় পুরো ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রাইবাল গ্রুপ ছিল কেল্ট, জার্মানিক, ইতালিক ও স্লাভরা। এই গ্রুপগুলোর ভেতরেও আবার অনেক শাখাপ্রশাখা ছিল। কেল্টদের ভেতরের একটা বৃহৎ অংশের নাম ছিল গল (Gaul), যারা লৌহযুগে ফ্রান্স ও তার আশপাশের অঞ্চলে বসবাস করত। প্রাচীন ফ্রান্সের নামও ছিল গল। এই গল-দের ভেতরে পারিসি (Parisii) বলে একটি গোত্র আশ্রয় নিয়েছিল সেন নদীর মাঝখানের এই দ্বীপটায়—যেখানে আজ আমি দাঁড়িয়ে। মূলত দুই কারণে জায়গাটাকে পারিসিদের মনে ধরেছিল। প্রথমত, চারিদিকে সেন নদীর প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকায় শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, আর দ্বিতীয়ত, নদীপথ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ মিলবে। বস্তুত শুধু প্যারিস নয়, একালের বেশিরভাগ আধুনিক শহরের অবস্থানই যে নদীর পাড়ে, এটি নিতান্ত কাকতালীয় ব্যাপার নয়।
নতুন আগন্তুকরা ধীরে ধীরে সেনকে ঘিরে তাদের বসতি গড়ে তুলল। তারা জায়গাটার নাম রাখল লুতেসিয়া (Lutetia)। মোটামুটি নির্বিঘ্নে কেটে গেল প্রায় দুশো বছর। খ্রিস্টপূর্ব ৫২ সাল এলো। লুতেসিয়া ততদিনে একটা গোছানো অঞ্চল। তবে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইতিহাসের ওই সময়টা রোমানদের। তারা আগ্রাসীভাবে উত্তর ইউরোপে তাদের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে চলেছে, দখল করছে একের পর এক অঞ্চল। লুতেসিয়া দখল করতে জুলিয়াস সিজার পাঠালেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট টাইটাস ল্যাবিয়েনাসকে। তিনি রাজাকে হতাশ করেননি। প্রবল বিক্রমে লড়াই করলেও স্থানীয়দের পক্ষে রোমান রণকৌশলের সামনে টিকে থাকা সম্ভব হল না। রোমানরা লুতেসিয়া দখল করে নিল।
রোমানরা জায়গাটাকে শুরুতে প্রচলিত লুতেসিয়া নামেই ডেকেছিল। শহরের নামটা প্যারিস হয়েছে আরও প্রায় চারশ বছর পরে, তবে হঠাৎ করে কোনো ডিক্রি জারির মাধ্যমে নয়, ধীরে ধীরে। অদ্ভুত ব্যাপার। নামটা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, উৎখাত করা পারিসি সম্প্রদায়দের থেকেই সেটা এসেছে। কী নির্মম পরিহাসের ব্যাপার!
লেখার এই পর্যায়ে একটা দুর্দান্ত ব্যঙ্গ-তথ্যচিত্রের (Mockumentary) কথা মনে পড়ছে—অনেকে হয়তো দেখে থাকবেন—Cunk on Earth। যারা স্ট্যান্ডআপ এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ফিলোমিনা কাঙ্ক। তাকে অজ্ঞতার রানি বলা চলে। নিজের উপস্থাপিত তথ্যচিত্রে সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুলভাল তথ্য দেয়, আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের সিরিয়াস ভঙ্গিতে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে। একটা পর্বে জনৈক বিশেষজ্ঞকে কাঙ্ক জিজ্ঞেস করেছিল—প্রস্তরযুগের মানুষ তাদের হাতিয়ার মাটির তলায় পুঁতে রাখত কেন? বেখাপ্পা প্রশ্নের সামনে বিশেষজ্ঞটি শুরুতে থতমত খেয়ে যান, তারপর সামলে নিয়ে বলেন—এগুলো তখন ওপরেই ছিল, সময়ের পরিক্রমায় মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আমরা সেগুলো খুঁড়ে বের করেছি।
স্তরে স্তরে ইতিহাস চাপা পড়ার এই ব্যাপারটা দেখা যায় প্যারিসের ক্রিপ্ত আর্কিওলজিকেও। বলে রাখা ভালো—এটিই ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো ক্রিপ্ট। জায়গাটার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালের দর্শনার্থীদের জন্য একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কার পার্কিং করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। সেই উদ্দেশ্যে সামনের ফাঁকা জায়গাটায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে ক্রিপ্টটার সন্ধান পাওয়া যায়।
ক্রিপ্টের ভেতরকার পরিবেশটা বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, শীতল, শান্ত। দেখে বোঝার উপায় নেই যে মাথার ঠিক ওপরেই প্যারিস শহর গমগম করছে। ইচ্ছে করলেই জোরালো আলোর ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু তাতে অতীত খুঁড়তে চাওয়া দর্শনার্থীদের অনুভূতিটা মাঠে মারা যেত। অর্থাৎ এই ইন্টেরিয়রের নকশা যারা করেছে—তাদের জবাব নেই।
ক্রিপ্টের সীমানার দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার পথ করা আছে। আর নিদর্শনগুলো মাঝখানে। এখানে রোমানযুগের একদম শুরুর দিকের লুতেসিয়ার কিছু কাঠামো আছে।। রোমানদের বিপুল ইতিহাস সংক্ষেপে বিধৃত করা অসম্ভব। কেবল এটুকু মাথায় রাখলেই চলবে যে—রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান কেবল গায়ের জোরে হয়নি।
সিতে দ্বীপটা নদীপথে বাণিজ্যের জন্য প্রশস্ত সে-কথা আগেই বলেছি। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের আমলে লুতেসিয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেক বেড়ে গেল। যিশুখ্রিস্টের জন্মের সময়সাময়িক কালের কথা সেটা। ক্রমে শহরের পরিসর বাড়লো। তৃতীয় শতকের দিকে দ্বীপটার আমূল সংস্কার করা হয়েছিল। তৃতীয় আর চতুর্থ শতকের এসব সংস্কারকৃত ভবনের নিদর্শনও ক্রিপ্টে পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, ১২ শতকের দিকে তৈরি পাথরে-বাঁধাই হাঁটাপথেরও বেশ খানিকটা এই ক্রিপ্টেই চাপা পড়ে ছিলো। এখানে আরও আছে ১৭ শতকের একটি শিশু হাসপাতালের অংশবিশেষ। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগের ইতিহাস এসে মিশেছে। একই জায়গায় এরকম একাধিক সময়ের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া অবশ্য খুব অভিনব কিছু নয়। ক্রিপ্টগুলো এরকমই হয়। সময়ের সঙ্গে পুরনো কাঠামো নষ্ট হয়, নতুন সভ্যতা আসে, নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, আর পুরনো স্মৃতিচিহ্ন মাটিচাপা পড়ে যায়।
ক্রিপ্ত আর্কিওলজিকের অন্যতম আকর্ষণ রোমান স্নানাগারের অংশবিশেষ। দেওয়াল খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল কাঠামোটা দেখে বোঝা যায় এটা বাথহাউজই। এখানে কী ধরনের সুবিধা ছিল জানলে চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য—সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম! বাইরে বসানো ফার্নেসের মাধ্যমে উৎপন্ন তপ্ত বায়ু প্রবাহিত হতো মেঝের নিচে আর দেওয়ালে থাকা নলে, যা স্নানাগারকে উষ্ণ রাখত। সেই প্রথম শতক থেকেই রোমানদের পাবলিক স্নানাগারগুলোতে এরকম হিটিং সিস্টেম বসানো শুরু হয়। প্রযুক্তিটির নাম হাইপোকস্ট (Hypocaust)। প্রকৌশল খাতে রোমানরা যা করে গেছে তার জবাব নেই।
ক্রিপ্ট আলোকিত করে আছেন আরেক বিশিষ্টজন—ভিক্টর হুগো (ফরাসি উচ্চারণ অবশ্য ভিক্তর উগো)। ক্রিপ্টের বিভিন্নস্থানের লেখা যে কীভাবে তিনি একাই নোত্র্ দাম ক্যাথেড্রালকে বাঁচিয়েছিলেন। ১১৬৩ সালে তৈরি হওয়া ভূবনবিখ্যাত ক্যাথেড্রালটি উনিশ শতকের দিকে এসে সীমাহীন অবহেলার শিকার হয়। এই অবস্থায় একজন লেখকের পক্ষে সর্বোচ্চ যা করা সম্ভব হুগো তাই করলেন—লিখলেন। ক্যাথেড্রালকে কেন্দ্র করে রচিত হলো প্রখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নোত্র্ দাম’। ব্যাপক পাঠকপ্রিয় হলো সেটি। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।
ক্যাথেড্রালটাকে লোকে এতদিন অবহেলার বস্তু হিসেবেই জানত। ভেঙ্গেচুরে পড়ে আছে, বিশ্রী আর ভূতুড়ে দেখতে, কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না। অথচ উপন্যাসটা পড়ে মানুষ ক্যাথেড্রালটাকে রীতিমত ভালোবেসে ফেলল। কেবল লেখা দিয়েই পাঠককে আন্দোলিত করে তুলেছেন হুগো, ক্যাথেড্রালটাকে স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন পাঠক-মানসে। তখন এরকম জনমত তৈরি হলো—আরে, এরকম অমূল্য জাতীয় সম্পদকে আমরা ফেলে রেখেছি, ছিছি! ফলে ক্যাথেড্রাল সংস্কারের প্রবল দাবি উঠল। অবশেষের সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সংস্কার হলো। এই সংস্কার কিন্তু কেবল জানালা-দরজা সারানোতেই সীমাবদ্ধ রইলো না। হুগোর লেখা জনমানসে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে সংস্কারের সময়ে ভবনের স্থাপত্যেও তার ছাপ পড়ল। পুরনো ক্যাথেড্রালের অনেক বৈশিষ্ট্যই প্রতিস্থাপিত হলো উপন্যাসের রোমান্টিক বর্ণনার বৈশিষ্ট্য দিয়ে। এমন অনেককিছুই পরে যুক্ত হলো যা মূল কাঠামোতে ছিল না, কিন্তু হুগো উপন্যাসে লিখেছেন। আজকাল কি এরকম ভাবা যায়!
ডাক্তার গিলোটিনের দাওয়াই
ফরাসি বিপ্লবের কথা অনেকেই কমবেশি জানেন। যাঁরা একেবারেই জানেন না কিংবা ভাসা-ভাসা জানেন—তাঁদের আমি খানিকটা গভীরে নিয়ে যেতে চাই। খুব একঘেয়ে লাগবে না আশা করি। বিদগ্ধজনও পড়তে পারেন, এই সুযোগে রিভিশন হয়ে যাবে!
চরম বৈষম্য, অভাব আর অদূরদর্শিতা মিলে কী ঘটাতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে ফরাসি বিপ্লবকে। তখনকার পুরো ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনভাগে বিভক্ত ছিল, যেগুলোকে এস্টেট (Estate) নামে ডাকা হতো। প্রথম এস্টেট রোমান ক্যাথলিক চার্চকেন্দ্রিক সম্প্রদায় (Clergy), দ্বিতীয় এস্টেট অভিজাত সম্প্রদায় (Nobility) এবং তৃতীয় এস্টেট সাধারণ মানুষ (Commoners)। ক্ষমতাপ্রবাহ বিবেচনায় সবচেয়ে শক্তিমান ছিল প্রথম এস্টেট, আর সবচেয়ে অপাংক্তেয় তৃতীয় এস্টেট। ফরাসি রাজাকে এই তিন এস্তেটের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হতো। প্রত্যেক এস্টেটের কাছ থেকে এরকম ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল—
প্রথম এস্টেট রাজার জন্য প্রার্থনা করবে।
দ্বিতীয় এস্টেট রাজার জন্য যুদ্ধ করবে।
তৃতীয় এস্টেট রাজার জন্য কাজ করবে।
শুনতে বেশ গালভরা লাগলেও এটি ছিল শোষণের চমৎকার একটি প্রক্রিয়া। বিস্তারিত বললে আরেকটু স্পষ্ট হবে।
প্রথম এস্টেট ছিল সবচেয়ে সংখ্যালঘু, সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এরাই ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান। এই এস্টেটের আওতাধীন ছিল বিশপ, যাজক, মঠবাসী সন্ন্যাসী ইত্যাদিরা। প্রচুর জমিও ছিল এদের মালিকানায়। তবে যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা হোক না কেন, এসব কাজ উৎপাদনমূলক নয় মোটেই। কিন্তু এরা রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিত না বললেই চলে।
দ্বিতীয় এস্টেটের অংশ ছিল রাজপরিবারের সদস্য, ডিউক, কাউন্ট প্রমুখ। সরকার আর সামরিক বাহিনীর উঁচু পদগুলো এদের দখলে থাকত। দেশের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ জমি ছিল এদের কব্জায়। কিন্তু এরা সংখ্যায় ছিল মাত্র দেড় শতাংশ। এদেরও বেশিরভাগ ট্যাক্স রাষ্ট্রের তরফ থেকে মওকুফ করা ছিল। বাকি যেটুকু দিত—তা নামেমাত্র।
তাহলে গেল দেড় আর আধা, মানে মাত্র দুই শতাংশ জনগোষ্ঠী। বাকি থাকে আটানব্বই শতাংশ, যারা তৃতীয় এস্টেটের মানুষ। বণিক, আইনজীবী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে কৃষক-শ্রমজীবী সকলেই এই বিরাট দলের অংশ। যেহেতু প্রথম দুই দল দিত না, এজন্য জানা-অজানা, সম্ভব-অসম্ভব যতপ্রকার ট্যাক্স আছে সবই এদের দিতে হত। আর সেই টাকাতেই প্রথমোক্ত দুই এস্টেট স্ফূর্তি করত, আয়েশ করত, যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলত। দীর্ঘকাল সাধারণ মানুষ এদের অনাচার সয়েছে। কিন্তু বেহিসাবি যুদ্ধ আর অপব্যয়ের ফলে অর্থনীতির অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। দুরবস্থা সামাল দিতে রাজা আরও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম দুই এস্টেটের প্ররোচনায় তিনি তৃতীয় এস্টেটের ওপরে কর বাড়ালেন এবং তা ক্রমশ বাড়িয়েই যাচ্ছিলেন। একটা পর্যায়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কর আরোপ করা শুরু হলো। এর সঙ্গে যুক্ত হলো ভোটের প্রহসন। বিষয়টা ব্যাখ্যা করা দরকার—কারণ ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ভোটাভুটি প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ থেকেই।
ফ্রান্সের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এস্টেটের সাধারণ অধিবেশনের মাধ্যমে। সেখানে তিন এস্টেটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকত এবং ভোটাভুটি হতো। প্রত্যেক এস্টেটের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি করে ভোট। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা—আটানব্বই শতাংশ মানুষের জন্য একটি ভোট, আর দুই শতাংশ মানুষের জন্য দুটি ভোট! নিজেদের সুবিধা কমে যেতে পারে—এমন যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রথম আর দ্বিতীয় এস্টেট মিলেঝুলে একই ভোট দিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৃতীয় এস্টেটের ন্যায্য দাবিদাওয়া গ্রাহ্য হতো না। চোরে চোরে মাসতুত ভাই কথাটা তো আর এমনি-এমনি আসেনি! এই যেমন ধরুন:
ক) ধনীদের সুযোগসুবিধা কমাতে হবে।—বিপক্ষে দুই ভোট, পক্ষে এক ভোট!
খ) ধনীদের ট্যাক্স মওকুফ করতে হবে।—পক্ষে দুই ভোট, বিপক্ষে এক ভোট!
অর্থাৎ এই ভোটাভুটির কোনো প্রায়োগিক গুরুত্বই ছিল না। এজন্য থার্ড এস্টেট দাবি তুলল যে, ভোটের ক্ষেত্রে এস্টেট পদ্ধতিটাই বাতিল করতে হবে। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় একজন মানুষ একটি ভোটের অধিকারী হবে। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাকি দুই এস্টেট প্রমাদ গুনলো। আরে, ভিখিরির বাচ্চারা স্বাধীন হতে চাইছে যে! তাহলে ওদের শোষণ করব কী করে? সুতরাং বলাই বাহুল্য, প্রথম দুই এস্টেট কিছুতেই এই প্রস্তাবে সম্মত হলো না। এভাবে মোটামুটি স্থিরাবস্থায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। ঐক্যমত সুদূরপরাহত।
১৭ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেট বুঝে গেল যে, এই স্থিরাবস্থা আদৌ কাটবে না। তারা তখন এক সাহসী অবস্থান নিলো—‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সুতরাং আমরাই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি।’ অর্থাৎ জনগণই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, রাজা নন।
প্রশ্ন উঠতে পারে—এই সঙ্কটপূর্ণ সময়ে তৎকালীন ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই কোথায় ছিলেন? নিরোর মতো মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন না অবশ্য। তবে রাজধানী প্যারিসের বাইরে অবস্থান করছিলেন। আগের মাসেই তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু হয়েছিল। সেই শোকে অনেকটা মুহ্যমান ছিলেন। উপস্থিত থাকলেও অবশ্য খুব লাভ হতো না। একে তো এই বিপুল জলতরঙ্গ বালির বাঁধ দিয়ে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত ও শিক্ষিত মানুষ হলেও রাজার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব ছিল।
তৃতীয় এস্টেটের বিদ্রোহ যাতে অতিসত্ত্বর দমন করা হয় সেই লক্ষ্যে প্রথম দুই এস্টেট রাজাকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। রাজা স্বভাবতই তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। যুগে যুগে শাসকদের এই এক দোষ। ক্ষমতার মোহে এবং ফাঁপা আত্মবিশ্বাসে অন্ধ হয়ে থাকেন। সলতে পাকানোই ছিল। কেবল আগুন দেওয়ার অপেক্ষা।
২০ জুন ১৭৮৯। তৃতীয় এস্টেটের লোকজন (যারা ইতোমধ্যেই নিজেদেরকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্বোধন করতে শুরু করেছে) নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিতে ভার্সাইতে অবস্থিত মিটিং হলে আসে। কিন্তু দেখা গেল সেটা তালাবদ্ধ। শুধু তাই নয়, চারিদিকে রাজপ্রহরীদের কড়া পাহারা। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হলো—কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য হল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা আছে। খোঁড়া যুক্তি শুনে মানুষজন আরও ক্ষিপ্ত হলো। তারা বিষয়টাকে এভাবে দেখল—‘তোদের ঢুকতেই দেব না, দেখি কীভাবে অ্যাসেম্বলি চালাস!’ উপস্থিতিদের ভেতরে একটা ভয়ও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিল। বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয়রা আশঙ্কা করছিল—রাজা তাদেরকে চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। এই ঝুঁকি মাথায় তারা বাড়ি ফিরতে চাইল না। এই ভীতি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে জোসেফ গিলোটিন নামক একজন চিকিৎসক এগিয়ে এলেন। চেনা-চেনা লাগছে? হ্যাঁ, ইনিই গিলোটিন নামক কুখ্যাত হত্যাযন্ত্রটির আবিষ্কারক। তিনি অবশ্য তখনও গিলোটিন বানাননি। যাইহোক, ডাক্তার গিলোটিনের পরামর্শে সকলে মিলে সমবেত হলো পার্শ্ববর্তী রয়্যাল টেনিস কোর্টে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে ৫৭৬ জন মিলে আওড়ালেন:
যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তম ও ন্যায্য সংবিধান প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছে না, আমরা কেউ কারোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হব না; পরিস্থিতি যা-ই হোক, তা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত থাকব।
বিখ্যাত ঘটনাটি টেনিস কোর্টের শপথ (Serment du Jeu de Paume) নামে পরিচিত। প্রকাশ্যভাবে রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে অস্বীকার করার সবচেয়ে বড়ো ঘটনা এটাই ছিল। বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনাও বলা চলে একে।
রাজা দেখা দিলেন আরও তিনদিন পরে, ২৩ জুনে, রয়্যাল সেশনে। সেখানে তিনি উপস্থিত তিনটি এস্টেটের উদ্দেশ্যে ক্রুদ্ধভাবে বললেন—তথাকথিত নবগঠিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সম্পূর্ণ অবৈধ। সবাইকে আগের তিন এস্টেট-ব্যবস্থাতেই ফেরত যেতে হবে—এরকম নির্দেশ দিয়ে তিনি সবাইকে চলে যেতে বললেন এবং নিজেও অন্তর্হিত হলেন। তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন ভয়টয় দেখালেই কাজ হয়ে যাবে। তাঁর যেটা জানা ছিল না—ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অভিজাত আর যাজক, এই দুই এস্টেট রাজার নির্দেশ মেনে সুবোধ বালকের মতো বেরিয়ে গেল। কিন্তু নিজেদের আসনেই চুপচাপ গ্যাঁট হয়ে বসে রইল বিদ্রোহীরা। বেশ খানিকক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা। বাধ্য হয়ে রাজার প্রতিনিধি এসে এদের বললেন চলে যেতে।
সলতে পাকানো ছিল। সামান্য আগুনের প্রয়োজন ছিল। তারও ব্যবস্থা হয়ে গেল।
সকলের মধ্য থেকে বিপ্লবের অন্যতম নেতা মিরাবো উঠে দাঁড়ালেন। গলা উঁচিয়ে করলেন তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি—
তোমার প্রভুকে গিয়ে বলো—আমরা এখানে এসেছি জনগণের ইচ্ছেয়। বেয়োনেট মেরে আমাদের বের করতে পারো তো করো; আমরা এখান থেকে সরছি না।
এরপরের কয়েকটা দিন কাটলো বেশ বিশৃঙ্খলায়। হাওয়া বদলের আভাস বুঝতে পেরে অভিজাত ও যাজকদের অনেকেই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এসে যোগ দিলেন। কয়েকদিনের ভেতরে রাজাও এই নতুন অ্যাসেম্বলিকে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু রাজারাজড়া তো। ভেতরে ভেতরে অন্য মতলব আঁটছিলেন। প্যারিসকে ঘিরে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছিল রাজার অধীনস্থ জার্মান আর সুইস সৈন্যদল। প্যারিসে গুঞ্জন ছড়ালো—সদ্যগঠিত অ্যাসেম্বলিকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দিতেই এত আয়োজন। এর মধ্যে রাজা আবার অর্থমন্ত্রী জ্যাক নেকারকে বরখাস্ত করে বসলেন ১১ জুলাইতে। ইচ্ছে করে শনিবারে করেছিলেন কাজটা, যাতে খবর বেশি না ছড়ায়। কাজ হলো না। এসব খবর বাতাসেরও আগে দৌড়োয়। নেকার সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তারা আরও ক্ষিপ্ত হলো। সবমিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের। মারামারি, লুটপাট কিছুই বাদ রইলো না। বিপুলসংখ্যক মারমুখী জনতা আত্মরক্ষার্থে অস্ত্রের সন্ধান করতে লাগল। অস্ত্র পাওয়াও গেল, কিন্তু বারুদ নেই। এখন উপায়? খোঁজ পাওয়া গেল—বারুদ মজুদ করা হয়েছে বাস্তিল দুর্গের ভেতরে। অন্তত আড়াইশ ব্যারেল। বাস্তিলের ওপরে মানুষ এমনিতেও প্রসন্ন ছিল না। মধ্যযুগের এই দুর্গটিকে ফরাসি রাজা কুখ্যাত কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন, যেখানে রাজবন্দিদের রাখা হত আর তাদের ওপরে অত্যাচার চলত। উন্মত্ত জনতার সঙ্গে বাস্তিলের প্রহরীদের ভালোই রক্তারক্তি হলো, বেশকিছু লাশও পড়ল। শেষমেষ অবশ্য বাস্তিল পরাস্ত হলো। মানুষজন গভর্নরকে ধরে ফেলল, তবে নিয়ে যাওয়ার সময়ে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে মেরে ফেলল—বিচারের বালাই রাখলো না। পরদিনের ভেতরে লোকজন বাস্তিলকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। সন্দেহ নেই অত্যাচারের প্রতীক বলেই জনমানসে এত আক্রোশ জমে ছিল। আজ বাস্তিলের জায়গায় রয়েছে একটি উন্মুক্ত চত্ত্বর, আর মাঝখানে বাস্তিল-স্মরণে সুউচ্চ টাওয়ার। জায়গাটা বেশ জমজমাট। বারতিনেক গিয়েছিলাম সম্ভবত। বাস্তিলের বিভিন্ন চূর্ণবিচূর্ণ অংশ ফেলা হয়েছিল বিভিন্নদিকে, যার কিছু কিছু আজও ট্রেস করা যায়। আমি গিয়েছিলাম অনতিদূরের Square Henri Galli নামের একটি পার্কে। সেখানে অবহেলাভরে পড়ে আছে বাস্তিলের অল্পকিছু খণ্ডিতাংশ, তাও পার্কের এমন অংশে যেখানে কেউ সহজে যায় না। সামনে একটা সাইনবোর্ড, যা না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। সবমিলিয়ে পতিত বাস্তিল নিয়ে ফরাসিদের বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই বলেই মনে হলো। সেটাই স্বাভাবিক বোধহয়।
বাস্তিল পতনের পর ক্ষমতা মোটামুটিভাবে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির হাতেই ন্যস্ত রইলো, তবে তারা রাজতন্ত্রকে পুরোপুরি উৎখাত করল না। একধরনের সহাবস্থানের চেষ্টা ছিল, যদিও বলাই বাহুল্য পুরো ব্যাপারটা খুবই নাজুক অবস্থায় ছিল। এই অবস্থায় একটা মারাত্মক ব্যাপার ঘটে গেল। ২০ জুন ১৭৯১ তারিখে রাজা ষোড়শ লুই এবং তাঁর স্ত্রী মারি অঁতোয়ানেত চাকরের ছদ্মবেশে প্যারিস ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলেন। রাজার অভিলাষ ছিল পার্শ্ববর্তী দেশের মিত্রদের সহায়তায় ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে এক পোস্টমাস্টারের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। পয়সার গায়ে খোদাই করা রাজার ছবির সঙ্গে একটা উটকো চাকরের চেহারায় মিল দেখেই তার সন্দেহ হয়েছিল।
ধরা পড়ার পর রাজাকে আবার প্যারিসে ফেরত পাঠানো হলো। এবার কিন্তু বিপ্লবীরা তাঁর ব্যাপারে আর সদয় নয়, তাদের সেই দায়ও নেই। তাদের মতে, তিনি রীতিমত বিপ্লবের শত্রুর মতো কাজ করেছেন। ফ্রান্স কিন্তু এবারে রাজতন্ত্র ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরিভাবে রিপাবলিকের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। রাজপরিবারকে টেম্পল টাওয়ারে বেশ কিছুদিন বন্দি করে রাখা হলো। রাজতন্ত্রকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করে ফেলা হলো ২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ তারিখে। অর্থাৎ এই দিন থেকে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই পরিণত হলেন কেবলই একজন লুই-তে।
এটিই অবশ্য তাঁর দুর্ভাগ্যের শেষ নয়।
কিছুদিন পর লুইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তিনি বিদেশি রাজাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন। এরকম যোগাযোগের বেশকিছু দালিলিক প্রমাণও পাওয়া গেল। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদেশি রাজাদের স্বার্থ কী? আসলে ফ্রান্সের পরিস্থিতিই তাদেরকে যোগাযোগে একরকম বাধ্য করে। তারা বুঝতে পারছিল যে বিপদ সমাসন্ন। ফরাসিদের এই পরিবর্তন ঠেকানো না গেলে একসময় তাদের দেশের মানুষরাও বিপ্লবে উৎসাহিত হবে। লুই অবশ্য সেভাবে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সফল হতেন কিনা তা বলা শক্ত, তবে এই অপচেষ্টা ধরা পড়ে যাওয়াতে জনতার রোষের সামনে তাঁর বাঁচার কোনো উপায় রইল না। বিপ্লবের আঁচে উন্মত্ত মানুষজনের সহনশীলতা তো এমনিতেই সরু সুতোর ওপরে ঝুলছিল। তাদের ভেতরে আর অবশিষ্ট অপরাধবোধটুকুও থাকল না। ২১ জানুয়ারি ১৭৯৩ তারিখে ক্রোধোন্মত্ত মানুষ সাবেক রাজাকে ধাওয়া করে নিয়ে এলো প্লাশ দ্য লা রেভোল্যুসুওনে, যার নাম আগে ছিল নামও ছিল প্লাশ লুই পঞ্চদশ। বিপর্যস্ত রাজা আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তীব্র হৈচৈ আর বাজনার শব্দে সেসব আর শোনা গেল না। গিলোটিনে ছিন্ন হলো একসময়ের বিক্রমশালী ফরাসি রাজার মস্তক।
নাম থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্লাশ দ্য লা রেভোল্যুসুওন জায়গাটা আদতে বানানো হয়েছিল রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের সম্মানার্থে। ভাগ্যের পরিহাসে সেখানেই এনে কতল করা হলো তাঁর নাতি ষোড়শ লুইকে।
লুইকে হত্যার ফল হলো সুদূরপ্রসারী। বিপ্লব শুরুর পরপরই প্রুশিয়া (বর্তমানে বিলুপ্ত) এবং অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এবার সেই জোটে যোগ দিল পার্শ্ববর্তী গ্রেট ব্রিটেন, ডাচ রিপাবলিক, স্পেন, পর্তুগাল সকলেই। নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে কথা! কিংবা সব শেয়ালের এক রা বললেও চলে। ফ্রান্সের পরিস্থিতি তখন বেশ ঘোলাটে। ভেতরে-বাইরে সর্বত্রই শত্রু—মানে প্রতিবিপ্লবীরা আরকি। বৈপ্লবিক সরকারেরও তখন অস্তিত্বের প্রশ্ন। ঠিক এই জটিল মুহূর্তটিই ডেকে নিয়ে এক ভয়াবহ সময়কে—ইতিহাসে যা আতঙ্কের শাসন (Reign of Terror) নামে পরিচিত। ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এই নৈরাজ্য কায়েম করা হলো জনসুরক্ষা কমিটি-র ব্যানারে, যার নেতৃত্বে ছিলেন জ্যাকোবিনদের নেতা মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের। এইবেলা বলে রাখা ভালো যে, ফরাসি বিপ্লবের ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে রাজনৈতিক সংগঠনটি তৈরি হয়, তাকে জ্যাকোবিন ক্লাস নামে ডাকা হতো। নামের উৎপত্তি খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু থেকে নয়।
জ্যাকোবিন-নেতা রবেস্পিয়েরের ছিলেন একটি অদ্ভুত চরিত্র। আইন নিয়ে পড়েছিলেন, গণতন্ত্রের সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবসময়ই। মানবাধিকারের ব্যাপারে এতটাই সিরিয়াস ছিলেন যে মৃত্যুদণ্ডের ঘোরবিরোধিতা করতেন। জনৈক অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, আর সেটা করতে গেলে নিজের নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে হবে—স্রেফ এই কারণে তিনি একবার বিচারকের পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। এসব ব্যাপারে তাঁর অবস্থান এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তাঁকে ন্যায়ের প্রতীক বিবেচনা করা হতো, নাম দেওয়া হয়েছিল The Incorruptible, অর্থাৎ যাঁকে দিয়ে কখনো অন্যায় করানোর উপায় নেই। বিপ্লবের পর অবশ্য নৈতিকতার ধ্বজাধারী সেই রবস্পিয়েরের নেতৃত্বেই জনসুরক্ষা কমিটি মানুষজনকে বিনাবিচারে ধরপাকড় করতে শুরু করল। এমনকি স্রেফ সন্দেহের বশে অজস্র মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিবিপ্লবী বা বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে—এরকম অভিযোগে কেউ ফেঁসে গেলে তার জীবনে অমানিশা নেমে এসেছে। বিচারটিচার তখন শিকেয়। কমিটির কথাই আইন। রাজাকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল, বন্দিদেরকে সেই প্লাশ দ্য লা রেভোল্যুসুওনে ধরে এনে নির্বিচারে গিলোটিনে মুণ্ডুচ্ছেদ হতে থাকল। মাত্র ১০-১১ মাসে এভাবে হত্যা করা হলো অন্তত ১৭,০০০ মানুষকে।
এ-সময় সাধারণ মানুষকে উস্কে দিতে এমন কিছু মানুষজন ফ্রন্টলাইনে চলে এলেন, বিপ্লবের আগে যাদের কোনো গুরুত্বই ছিল না। উল্লেখযোগ্য একজন জ্যাঁ-পল মারাহ, কলিন জোন্স যাঁকে বর্ণনা করেছেন—‘এমন একজন ব্যর্থ ও সস্তাদরের বুদ্ধিজীবী যাকে এই বিপ্লব নতুনভাবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দেয়’। মারাহ আর যাইহোক সুলেখক ছিলেন। একের পর এক আক্রমণাত্মক আর উস্কানিমূলক লেখা দিয়ে তিনি বিপ্লবের অন্যতম সারথি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন, সকল বিরোধীদেরকে ধুয়েমুছে সাফা করে দেওয়া নিয়ে পুনঃপুন রক্ত-গরম-করা লেখা প্রসব করতে লাগলেন। তাঁর উগ্রবাদী পত্রিকার নামটাও ছিল গালভরা—জনগণের বন্ধু (Ami du peuple)! মারাহর উত্থান ও পতন—দুটোই বেশ দ্রুত। ১৭৯৩ সালে শার্লত নাম্নী এক তরুণীর ছুরিকাঘাতে মারাহ মারা যান। যমকটা সুন্দর না?
বাথটাবে শুয়ে থাকা মৃত মারাহর ছবিটি বেশ বিখ্যাত। তিনি সে-সময় কিছু জটিল চর্মরোগে ভুগছিলেন বলে জ্বালাযন্ত্রণা কমাতে বেশিরভাগ সময় পানিতে শুয়ে থাকতেন। শার্লত মারাহকে লোভ দেখিয়েছিলেন কিছু ভয়ঙ্কর শত্রুর নাম জানাবেন বলে। এভাবেই বাথরুমে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন। এ-থেকে সাব্যস্ত হয় যে অপরিচিত কাউকে ফট করে নিজের বাথরুমে ঢুকতে দেবেন না। মারাহ অবশ্য মরে গিয়ে উল্টো বীরের সম্মান পেয়ে যান, অন্তত ওই কয়টা বছরের জন্য। আর শার্লতকে গিলোটিনে চড়ানো হয়। অথচ তিনি জেনেবুঝে এই বিশাল ঝুঁকি নিয়েছিলেন স্রেফ ‘একটা দানবকে থামাতে হবে’ এই মোটিভেশন নিয়ে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪।
আতঙ্কের শাসনের সমাপ্তি ঘটেছিল কিছুটা প্রহসনের ভেতর দিয়ে। সেদিন ছিল ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই। মাক্সিমিলিয়্যাঁ রবেস্পিয়ের আবিষ্কার করলেন—তাঁর কমিটির লোকজন তাঁকেই গিলোটিনে চড়াতে নিয়ে এসেছে। হা হতোস্মি!—কিন্তু কেন? আসলে লোকজন সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছিল। তারা অনুভব করছিল, ক্ষমতার মোহে রবেস্পিয়ার অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন, নিজেই একনায়কে পরিণত হচ্ছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!
রবেস্পিয়ের মারা যাওয়ার পর অবশ্য ফ্রান্সে কিছুটা হলেও স্থিরতা ফিরে আসে।
মৃত রাজা আর জীবিত রানির প্রসঙ্গে ফিরে যাই। রাজাকে হত্যার পর বিধবা মারি অঁতোয়ানেতেঁকে আরও মাসছয়েক টেম্পল টাওয়ারে বন্দি করে রাখা হয়। আগেই বলেছি, সময়টা গোলমেলে। যার যা ইচ্ছা করছে। একপর্যায়ে তাঁর দিকেও অভিযোগের তির ধেয়ে এলো। তিনি নাকি নিজেই এখন বিদেশি রাজ্যে গোপন খবরবার্তা পাঠাচ্ছেন। এই তথ্যে কিছুটা সত্যতা ছিল অবশ্য। রানি নিজে অস্ট্রিয়ান রাজপরিবারের কন্যা ছিলেন, ফলে বাপের বাড়িতে নুন-হলুদের তবে সেসব এত গুরুতর ছিল না যে তাঁকেও মেরে ফেলতে হবে। কিন্তু অত্যুৎসাহী বিপ্লবীর তো অভাব নেই। মারি অঁতোয়ানেতকে আগস্ট মাসে টেম্পল টাওয়ার থেকে সরিয়ে আনা হলো কঁসিয়ের্জেরি (Conciergerie)-তে। এটা নিয়ে পরে লিখব। সেখানে নেওয়ার পর প্রচুর নির্যাতন করে অবশেষে তাঁকেও গিলোটিনে হত্যা করা হলো। তারিখটা ১৬ অক্টোবর ১৭৯৩।
বিপ্লবের ডামাডোলে অজস্র নামজাদা-নামহীন মানুষকে এভাবে গিলোটিনে জীবন দিতে হয়েছে—যাঁদের কপালে অন্তিম সৎকারটাও জোটেনি। বেশিরভাগকেই ঠেসেঠুসে গণকবর দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সিমেট্রিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটির নাম মাদেলিন, যেখানে ফরাসি রাজা-রানিকে কবর দেওয়া হয়েছিল। গিলোটিনে মৃতদের সে-সময় অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই যেনতেনভাবে কবর দেওয়া হতো, যাতে এসব ঘিরে পরে সমাধিসৌধ-জাতীয় কিছু গড়ে তোলার সুযোগ না থাকে। হত্যাযজ্ঞ শেষে ১৭৯৪ সালে মাদেলিন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়, কারণ এর পরিবেশ ততদিনে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, গন্ধে আশপাশের মানুষ টিকতে পারছে না। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে (কীভাবে, সেই আলাপে আর যাচ্ছি না। নেপোলিয়নের প্রসঙ্গ এলে পাড়া যাবে নাহয়) জায়গাটা সংস্কার করে মৃতদের সম্মানার্থে গড়ে তোলা হয়েছে শাপেল এক্সপিয়াতোয়ার।
অর্থাৎ এই শাপেলের প্রতিটি ইটের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের স্মৃতি। দীর্ঘ ইতিহাস টানার কারণ আমার শাপেল-ভ্রমণ বর্ণনা করা। এতটা ইতিহাস না বললে আসলে জায়গাটার গুরুত্ব বোঝা যেত না। ঐতিহাসিক তাৎপর্যই তো এর প্রাণ! সেটা ছাড়া এই বস্তু একটা পুরনো গম্বুজওয়ালা কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়, তাই না?
জায়গাটা একেবারেই চুপচাপ। দর্শনার্থীদের ভিড় যৎসামান্য। গৌরবময় ফরাসি রাজতন্ত্রের পতনের প্রতীকই তো বলা যায় একে। শাপেল মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। খুবই ছোট কাঠামো। দশ মিনিটে দেখে ফেলা যায়। সেখানকার কিউরেটরের কাছ থেকে জানলাম, মাদেলিন সিমেট্রির দেহাবশেষগুলো সরিয়ে প্যারিসের বিখ্যাত ক্যাটাকম্বে নেওয়া করা হয়েছিল। এখন সেগুলো ওখানেই আছে। ক্যাটাকম্ব মানে ভূগর্ভস্থ গণকবর, যেখানে সারে-সারে মৃতদের হাড়গোড় সাজানো থাকে। অনুমান করা হয় প্যারিস ক্যাটাকম্বে প্রায় ষাটলাখ মানুষের কঙ্কাল রয়েছে। শহরের নিচে এক বিশাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে এই সুড়ঙ্গপথ। প্যারিস মিউজিয়াম পাস ব্যবহার করে ক্যাটাকম্ব আর আইফেল টাওয়ারে যাওয়া যায় না। পরিকল্পনা থাকলেও আমার শেষ পর্যন্ত ক্যাটাকম্বে যাওয়া হয়নি। অন্য কোনোবার—যদি সুযোগ হয়!
প্লাশ দ্য লা কঁকর্দে যাওয়ার সুযোগ অবশ্য হয়েছিল আমার। এটা আসলে একটা উন্মুক্ত চত্ত্বর। খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলাম যখন দেখি যে সেখানে ফরাসি বিপ্লব-সংক্রান্ত বিশেষ কিছুই নেই। একটা চমৎকার মিশরীয় ওবেলিস্ক আছে অবশ্য, তবে তার সঙ্গে বিপ্লবের সুদূরতম সম্পর্কও নেই। তাছাড়া অবহেলার ছাপ খুবই স্পষ্ট। এখানে-ওখানে দীর্ঘ কনটেইনার রাখা, এলোমেলো কাঠামো। কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলাম, ভুল ইতিহাস জেনে আসিনি তো! ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম যে ১৭৯৫ সালে জায়গাটার নাম রেভোল্যুসুওন থেকে কঁকর্দ করা হয় বটে, তবে একে যথাসম্ভব অদর্শনীয়ও করে তোলা হয়। আসলে আতঙ্কের শাসনের স্মৃতি তখনও দগদগে ছিল। এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে সদ্য সামাল দেওয়া বিপ্লবের পাগলা ঘোড়াটাকে আবার খ্যাপানোর ইচ্ছে ছিল না কারোরই। অনেক পরে অবশ্য রাজা ষোড়শ লুই হত্যার জায়গাটা চিহ্নিত করে একটা ছোট্ট তাম্রফলক লাগানো হয়। তবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি মোটের ওপরে ঠিক ততটা গুরুত্ব পায় না বলেই মনে হয়েছে। এটাও ইচ্ছাকৃতই। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
ছবিঘর
Gallery
ছবির উপর ক্লিক করে বড়ো আকারে দেখুন | Click on the image for a larger view
