Published On: February 11, 2023Categories: FictionViews: 721 Comment on অনামিকা রেস্টুরেন্ট

সিরাজগঞ্জ-পাবনা হাইওয়ের মাঝামাঝি জনবিরল কোথাও বাসের পেছনের একজন চাকা দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানালেন। ড্রাইভার সেখানে থামতে চাইছিল না, কারণ সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, আর জায়গাটা নাকি ডাকাতে। আগের তুলনায় উৎপাত কমে গেলেও তবে আশপাশে লোকালয় না থাকায় নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই। গতি অসম্ভব কমিয়ে ওই অবস্থাতেই ড্রাইভার গাড়িটাকে মাইলপাঁচেক টেনে নেয়, বাজারমতো একটা জায়গায় ছোটোখাটো গ্যারেজের সামনে এনে দাঁড় করায়। গ্যারেজের মধ্যবয়সী মেকানিক আমাদের বাসের ছোকরা হেল্পারটির পূর্বপরিচিত। দুজনে মিলে দ্রুতই কাজে লেগে পড়ে। ড্রাইভার গ্যারেজের সামনে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে উদাসভাবে সিগারেট টানে, মাঝে মাঝে চোখমুখ কুঁচকে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করে। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা। শীতের সন্ধ্যার হিসেবে সময়টা বড়ো কম নয়। ইতোমধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরা বিভিন্ন বয়সী বিশ-পঁচিশজন শীতকাতর বিভ্রান্ত যাত্রী ইতস্তত ঘোরাফেরা করি, ইতিউতি তাকাই। বিক্ষিপ্ত কিছু দোকানপাট থাকলেও দেখতে নিতান্তই দীনহীন, অর্থাৎ মোটের ওপর জায়গাটা অখাদ্যই। এর মাঝে বাধল আরেক বিপত্তি। দুপুরে ব্যস্ততার কারণে মধাহ্নভোজ এড়িয়ে গিয়েছিলাম, সেই পাপ আচমকা মাশুল নেওয়ার জন্য গুঁতোগুঁতি করতে শুরু করে, ফলে অনুভব করি প্রচণ্ড খিদেয় পেট মোচড় দিচ্ছে। রাস্তার বিপরীত দিকের অনামিকা রেস্টুরেন্ট তখন আমার চোখে পড়ে। আশপাশে খাওয়ার আর কোনো জায়গা না থাকায় আমার শহুরে ও আধা-শহুরে সহযাত্রীদের অনেকেই সেদিকে এগোয়। রেস্তোরাঁ বলতে একটা মাঝারি আকারের প্লাস্টারবিহীন ইটের দেওয়ালের ঘর, তার ওপরে টিনের আচ্ছাদন। মেঝে কোনো এক সুপ্রাচীনকালে পাকা করা হয়েছিল, কালের ব্যবধানে এমনভাবে ফেটেফুটে গেছে যে মনে হয় ওসব তুলে ফেললেই ভালো হতো। রেস্তোরাঁটিতে তেমন লোকজন নেই, সম্ভবত হয়ও না; এসব জায়গায় যাত্রীবাহী বাস সাধারণত থামে না। ভেবেছিলাম পুরি-সিঙ্গারা জাতীয় কিছু খেয়ে নিলেই হবে, তারপর বাইরের দোকান থেকে এককাপ চা, সঙ্গে সিগারেট। কিন্তু ভেতরে ঢুকে কয়েকজনকে মুর্গির ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে দেখে ভেতরকার রাক্ষস আরেকবার গোঁত্তা মারে এবং আমি সিদ্ধান্ত বদলাই। ক্যাশ কাউন্টারের পাশের টেবিলে কিছুক্ষণ বসে থাকার খাবার আসে। চেহারা দেখে খানিকটা দমে যাই। ট্যালট্যালে ঝোল, সঙ্গে ব্রয়লার মুরগির কুৎসিত সাদাটে তিনটি টুকরো, যেগুলোর ভেতরে তেল-মশলা তেমন ঢুকেছে বলে মনে হয় না। হয়তো দুপুরে রাঁধা, কিংবা তারও আগে—কে বলবে? স্বাদগ্রন্থির পরামর্শ যথাসম্ভব অগ্রাহ্য করে দ্রুত খানিকটা খেয়ে ফেলি। খিদে কিছুটা মিটে গেলে অপ্রয়োজনীয় লড়াইতে ইস্তফা দিই। ‘তারচেয়ে কী পুরি-সিঙ্গারাই ভালো হতো না?’ বরফশীতল পানিতে চুমুক দিতে-দিতে ভাবি। এমন সময় একজন কাঁচাপাকা আটপৌরে চেহারার লোক ক্যাশ কাউন্টারের পাশে এসে দাঁড়ান। খুব নিচু আর নরম গলায় ডাকেন—‘সুবলদা!’

ক্যাশে বসা ম্যানেজারকে এতক্ষণ সেভাবে লক্ষ করিনি। অভিযোগ বা বিরক্তি প্রকাশের প্রয়োজন না পড়লে রেস্তোরাঁর ম্যানেজারের দিকে কে-ই বা তাকিয়ে থাকে? সুবলের চেহারায় তেমন বিশেষত্বও নেই। পঞ্চাশের মতো বয়স, গায়ে ঘিয়েরঙা আধময়লা পাঞ্জাবি, গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি যার সংখ্যাগরিষ্ঠই তাদের সেরা সময়টা পেরিয়ে এসেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে চোখে পড়ে তাঁর অন্যমনস্ক চেহারা। আচমকা এত বিক্রিবাটা বাড়তে দেখে উৎফুল্ল হয়েছেন কিনা বোঝা যায় না একেবারেই। নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর মতো নিরুত্তাপভাবে তিনি বলেন, ‘ও, তুই আয়ছিস।’

‘আলাম তো। আপনেক কুন সময় থেন উটকেচ্ছি! কনে গিছিলেন?’ আগন্তুক উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে চলেন, তবে খানিকটা গলা নামান, যদিও আমার শুনতে অসুবিধা হয় না—‘ওন্তে আর কিছু শুইনলেন, দাদা? অনু মা-রে আর মারধর করিছে?’

মহাকাশ ছেড়ে আচমকা যেন মর্তলোকে ফিরে আসতে হয় সুবলকে, গলাও বোধহয় একটু কেঁপে ওঠে—‘নারে, কী আর—নতুন কইরে কিছু শুনি নাই।’

‘কী করা যায়, ভাবিছেন কিছু? এবা কইরে দুইদিন পর পর করলি তো—’

‘লিয়ে আসপো।’ সুবল শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে বসেন। ‘আমার মা তো আমার কাছে বেশি হইয়ে যায় নাই, কাত্তিক।’ অপর্যাপ্ত আলোতে হয়তো ভুলই দেখি, কিন্তু সুবলের ভাবলেশহীন চোখজোড়া যেন মুহূর্তের জন্য জ্বলজ্বল করে ওঠে।

বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে কী ভেবে অনামিকা রেস্টুরেন্টের দিকে তাকাই। রংচটা হলদে সাইনবোর্ডটার দিকে চোখ পড়ে। পচে যাওয়া কাঠের ফ্রেম জায়গায় জায়গায় খসে গেছে, দুর্বল কাঠামোটা বাতাসে অল্প-অল্প দোল খায়। সেখানে বিবর্ণ হয়ে আসা সুবল চন্দ্র মোহন্ত আর অনামিকা নামদুটো হঠাৎ যেন হাঁচড়ে-পাঁচড়ে বেরিয়ে পড়তে চায়, সবকিছু ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চায়। এই বিষণ্ন শীতসন্ধ্যায় অনামিকা হয়তো কখনোসখনো মনের ভুলে বীভৎস সাইনবোর্ডটার কথা ভাবে। কিংবা শরীরের এখানে-ওখানে বসে যাওয়া দাগগুলোর ওপরে হাত বোলাতে বোলাতে অনেক বছর আগের সেই দিনটিকে তার মনে পড়ে যায়, যেদিন সুবলচন্দ্রের চওড়া কাঁধে বসে মুগ্ধচোখে চকচকে নতুন সাইনবোর্ডটাকে দেখছিল সে।

রচনাকাল: আগস্ট ২০১৭

Share with others

One Comment

  1. Tariqul Islam June 19, 2026 at 21:04 - Reply

    গল্পটা পড়ে আমি কেঁদে ফেলেছি, এত সুন্দর করে লিখেন আপনি। আপনার জন্য শুভকামনা। বই আকারে প্রকাশ করবেন প্লিজ।

Leave A Comment

Related reads