
কাঁথামুড়ি দেওয়া দেহটায় যে মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, খুব ভালোভাবে লক্ষ না করলে বোঝা যায় না। উত্তুরে জানালাটা খোলা, ফিনফিনে সাদা পর্দাজোড়া উড়ছে সদ্যঋতুবতীর হঠাৎ নিত্যবস্তু হয়ে ওঠা অপাংক্তেয় ওড়নার মতো। বিছানার দুপাশে দাঁড়িয়ে দুজন—কৃষ্ণকায় পোশাকাবৃত মৃত্যুদূত আর শ্বেতশুভ্র বেশাচ্ছাদিত দেবদূত।
মৃত্যুদূত গম্ভীরভাবে বলেন, ‘দুমিনিট সময় দিচ্ছি, আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে। কিন্তু ওপরে গিয়ে কিছু জানাবেন না।’ কথাগুলো বলে তিনি একটু দম নেন। সারাদিন পৃথিবীময় ছুটোছুটি করে বেড়াতে হয়, ক্লান্তি আসা অস্বাভাবিক নয়। ‘কিন্তু আপনি এই শেষ সময়ে কী ভেবে এলেন বুঝতে পারছি না!’ বিস্ময় গোপন করেন না মৃত্যুদূত, ‘আধঘন্টা পর লোকটা মারাই যাবে। এই কয়েকটা মিনিটের জন্য তাকে খামোকা সুস্থ করে লাভ কী!’
দেবদূত উত্তর না দিয়ে মৃদু হাসেন। মৃত্যুদূত হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁর কার্যতালিকা নিয়ে। কিছুক্ষণ পর ইয়েমেনে একজন শিশু অপুষ্টিতে মরবে। তারপর নরওয়ের উত্তরে ছোট্ট গ্রামে স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতারিত হওয়া বিষণ্ণ যুবকটি সিলিং থেকে ঝুলে পড়বে, আর মিনিটদশেক পর কাঠমান্ডুর রাস্তায় বাস-লরির সংঘর্ষ—এই রে—বেশ বড়ো ব্যাপার দেখা যাচ্ছে! তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থলে যেতে হবে।
মৃত্যুদূত ব্যস্ততার কারণে আশপাশে আর খেয়াল করেন না। দেবদূত ধীরে ধীরে হাওয়ায় ভর করে এগোন শায়িত লোকটার মাথার দিকে। চুলে সস্নেহে হাত বোলান কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ তুলে নেন পাশের সাদা বালিশটা, শক্ত করে চেপে ধরেন মুখের ওপরে। কয়েকবার ঝাঁকি খেয়ে দেহটি স্থির হয়ে যায়।
ঘটনার আকস্মিকতায় মূঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন মৃত্যুদূত। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ খোলেন তিনি। তাঁর কণ্ঠস্বরে বিস্ময়, ক্ষোভ আর বিরক্তির মিশেল—‘আরে যন্ত্রণা, এ-কী করলেন! এই তাহলে আপনার জরুরি কাজ? সময়ের আগেই—উফ! মারতে চাইলে কি মারা যেত না? আপনিই না-হয় মারতেন। কিন্তু তার তো প্রক্রিয়া আছে, নিয়ম আছে, হাই-লেভেল ক্লিয়ারেন্স ছাড়া… আচ্ছা, আপনার মতো পুরনো লোককেও যদি এসব নতুন করে শেখাতে হয়—!’
মৃত্যুদূতের অস্থিরতা দেবদূতকে স্পর্শ করে না। তিনি কিছুটা অন্যমনস্কভাবে বলেন, ‘আপনি তো সবসময়ই মারছেন। এত প্রক্রিয়া মানেন আপনি?’
মৃত্যুদূতের রাগ একটু প্রশমিত হয়। যেন ছোট বাচ্চাকে বোঝাচ্ছেন, এমনভাবে বলেন, ‘আহা, এরকম ছেলেমানুষের মতো কথাবার্তা বললে তো হবে না। আমরা দুজনেই প্রফেশনাল। আমাদের কাজের গণ্ডি বেঁধে দেওয়া। আমার জীবহত্যার প্রি-অথোরাইজেশন আছে, বারবার নিতে হয় না। আপনি তো আর একই সুবিধা পাবেন না, তাই না? আবার দেখুন, আপনি যাকে ইচ্ছে ফটাফট সুস্থ করে তোলেন। আমি কি চাইলেই তেমনটা করতে পারব?’
‘তাহলে… তাহলে… আপনার আজকের দিনটা আমায় দিন।’ দেবদূত কাতরোক্তি করেন।
মৃত্যুদূত কড়াভাবে বলেন, ‘মোটেই না। আপনি ইতোমধ্যে ভালো ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছেন। এইচআর জানতে পারলে হয়তো আমার চাকরিটাই থাকবে না। ধুর, কেন যে আপনার কথা শুনতে গেলাম!’
দেবদূত বিষণ্ণগলায় স্বগতোক্তি করেন, ‘আজ যে আমার খুব ইচ্ছে করছে মানুষ খুন করতে।’
রচনাকাল: জানুয়ারি ২০১৮



