Published On: February 11, 2024Categories: FictionViews: 700 Comments on আপদ

মনকি রুমুর বাড়ির বেড়ালগুলোও আমাকে দেখতে পারে না। এমনিতে বেশ শান্ত ওরা, কিন্তু আমাকে দেখামাত্রই অদ্ভুতভাবে খেঁকিয়ে ওঠে। ওদেরই বা দোষ কী, আমি ওই বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখলে পুরো বাড়ির পরিবেশটাই কেমন থমথমে হয়ে পড়ে। ওর মা বারান্দা থেকে উঠে চলে যান, বাবা পত্রিকাটা গুটিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন আর বলেন, ‘যাই, গোসলের সময় হয়ে গেল। তুমি বসো, কেমন? আবার চলে যেয়ো না যেন—চা দিতে বলছি।’

আধঘণ্টা পর কাজের মেয়ের হাতে সেই চা আসে। সরভাসা বিস্বাদ ঠাণ্ডা চা। কখনো তা-ও আসে না। কিন্তু রুমুর বাবা আর আসতেন না।

আজ রুমুর বাবা উঠে যাওয়ার পর ভেতরবাড়ি থেকে রুমুর মায়ের ত্যক্তবিরক্ত গলা শুনতে পাই—‘কাজকর্ম করতেও দেবে না নাকি? প্রতিদিন আসার কী আছে, অ্যাঁ?’

সঙ্গে সঙ্গে চাপা আরেকটা নারীকণ্ঠ শোনা যায়—‘ছিঃ মা! আস্তে বলো। শুনবে তো!’ কুমুর গলা নাকি? বাড়ি এসেছে তাহলে। কুমু গতবছর পাশের জেলার একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। বরাবর ঘরকুনো মেয়ে ছিল, বাইরের জীবনে এখনও তেমন অভ্যস্ত হতে পারেনি। মাসে দুবার করে বাড়ি আসে।

কুমুর কথা শুনে যেন রুমুর মায়ের গলা আরো চিড়বিড়িয়ে ওঠে—‘শুনলে শুনুক। মেয়ে মরে গেছে ছয়বছর হলো, কিন্তু শয়তানটা কয়েকদিন পরপর এসে জ্বালাচ্ছে। কী চায় ও? কেন আসে? মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, তো ছিল—মেয়ে মরেছে, ওসবও শেষ। এখানে তোর কাজ কী? আমার আরেকটা মেয়ে আছে না? তার বিয়ে দিতে হবে না? লোকে কতোরকম কথা কানাকানি করে! বোঝে না শুয়োরের বাচ্চাটা?’

আজ চা হাতে কাজের মেয়েটির বদলে আসে কুমু। সেজন্যই আজকের চা ঠাণ্ডা নয়। বোধহয় কিছুটা অধোবদন হয়েই কুমু আমার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নিজের নখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর ইতস্ততভাবে বলে, ‘কেমন আছেন ভাইয়া?’

‘ভালো আছি। তুমি ভালো আছ, কুমু?’

‘হ্যাঁ। শানুআপা দেশে এসেছেন?’

‘না, এখনও আসেনি। সামনে সামারে বাচ্চাদের স্কুল ছুটি। তখন আসবে।’

‘ওরা সবাই ভালো আছে? দুলাভাই, গল্প, স্পর্শ?

‘হুঁ, ভালো। তোমার সেমিস্টার শেষ হয়েছে? কয় সেমিস্টার হলো?’

‘জি, সেকেন্ড সেমিস্টার। গতমাসে ফাইনাল দিলাম।’

আমি আর কথা খুঁজে না পেয়ে বারান্দার কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকি। পুরোনো দিনের লম্বা টানা বারান্দা। রুমু বলেছিল, এই বারান্দায় ওরা দুই বোন মিলে পড়ত। রুমুর পড়ার শব্দ নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর ছিল। চমৎকার গলা ছিল রুমুর। গানটান শেখেনি কখনও, কিন্তু খালি গলায় একটু গুনগুণ করলেও মুগ্ধ হয়ে শুনতে হতো। এই গাছপালা, দেয়াল, সবুজ ঘাস, ফুলবাগান—সবকিছুই আজও রুমুকে প্রগাঢ় মমতায় ধরে রাখে। আমি অনুভব করতে পারি।

কুমু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর মৃদু গলায় বলে, ‘আপনার আমেরিকায় যাওয়ার কথা, সেটার কী হলো?’

‘আমেরিকা? হ্যাঁ, যাওয়া যায় অবশ্য! আপা তো যেতেই বলে।’

‘যাওয়া যায়, কিন্তু যাবেন না—তাই তো?’

‘আরে না, তা কেন হবে! দেশে কিছু কাজ আছে, বুঝলে? কাজগুলো হয়ে গেলেই—’

‘কেন শুধু শুধু এত মিথ্যা বলা? দেশে আপনার কোনো কাজ নেই। আপনি যাচ্ছেন না, কারণ আমেরিকায় গেলে আপনি আর আমাদের বিরক্ত করতে পারবেন না।’

‘তোমাদের—ইয়ে—তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। তোমাদের তো বিরক্ত হওয়ারই কথা।’ আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ি।

‘রুমুপু মারা গেছে, ভাইয়া। এটা রিয়েলিটি। আপনি এটা চেঞ্জ করতে পারবেন না। পারবেন?’

‘আরে না, ঠিক রুমুর জন্য না—ধরো—তোমাদেরই তো দেখতে আসি—এই এমনি একটু খোঁজখবর—’

‘আমরা আপুকে ভুলে যেতে চাচ্ছি। আপনি কি সেটা বুঝতে পারছেন না? মৃত মানুষকে মাঝে মাঝে স্মরণ করা যায়, সবসময় আঁকড়ে ধরে থাকলে চলে না। আমরা যদি পারি, আপনারও পারা উচিত। আপনার মুভ অন করা উচিত, নিজের জীবনকে গুছিয়ে নেওয়া উচিত। কেন শুধু শুধু এসব পাগলামি করছেন?’

‘হ্যাঁ—তা ঠিক—আমি তো প্রায় ভুলেই গেছি, বুঝলে—’

রুমু হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করে—‘আপনি ভুলে যান, মনে রাখুন, যা ইচ্ছা হয় করুন—প্লিজ আমাদের বাসায় আর আসবেন না। আপু মারা যাবার পর থেকে মায়ের মেজাজটা এমনিতেই খারাপ থাকে। আপনাকে দেখলে মা সহ্য করতে পারেন না, এটা তো বোঝেন নিশ্চয়ই। প্লিজ, আসা বন্ধ করুন।’

আমি মরা মাছের চোখে কুমুর দিকে তাকাই। বলি, ‘আচ্ছা।’

‘এমনি এমনি বললেন, নাকি ভেবে বললেন?’

‘ভেবেই বললাম। আচ্ছা কুমু, আমি যদি একটু কম কম আসি—যেমন ধরো, মাসে একবার—তাতেও কি তোমাদের অসুবিধা হবে?’

‘আসতেই হবে কেন? আমরা যদি আপুর শোক সামলে উঠতে পারি, আপনি কেন পারেন না? এইসব ভড়ং ভালো না। আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখার কিছু তো নেই আপনার।’ কুমুর গলা ক্রমশ রুক্ষ হয়ে ওঠে। আমি মাথা নিচু করে শুনি। কুমু রাগ করলে ওর গলা একদম রুমুর মতো শোনায়। দুই বোনের রাগী চেহারাও অনেকটা একরকম দেখায়। নাকি আমারই ধন্দ লাগে? অনেকদিন রুমুকে দেখিনি, ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দৈত্যাকার লরির ধাক্কায় থেঁৎলে যাওয়া রুমুর চেহারাটা অবশ্য আমার তেমন মনে পড়ে না, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনি সেদিকে। আমার বেশিরভাগ সময় কল্পনায় আসে যেই রুমু, তার পরনে লাল-সাদা জামা, ঠোঁটে বিদ্রুপ আর মুগ্ধতার মাঝামাঝি অদ্ভুত একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখা টানটান চেহারা। কী আশ্চর্য ব্যাপার—মরে যাওয়ার দিনে রুমুর পরনে ওই লাল-সাদা পোশাকটাই ছিল।

আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হয় কুমুর কথায়—‘আপনি রোজ এভাবে আসেন বলে মা আমাকে অনেক কথা শোনায়। ভয়ংকর সব কথা। নোংরা কথা। প্লিজ আপনি আর আসবেন না।’ কুমু অন্যদিকে ফিরে বলে। তার গলা কি ধরে আসে?

‘আচ্ছা আচ্ছা। বেশ তো, আর আসব না। এ-আর এমন কী। ও কী, কান্নাকাটির তো কিছু নেই! যাচ্ছি, কেমন? ভালো থেকো কুমু।’

আমি গেটের দিকে এগোই। পেছন থেকে কুমুর মায়ের গলা শুনতে পাই—‘গেল?’

‘যাবে না আবার? যেমন জঘন্য ব্যবহার তোমার।’

‘ওর সাথে ভালো ব্যবহারের কী আছে? ও কি আমার জামাই? তুই আসতে নিষেধ করিসনি?’

‘করেছি। বলেছে—আর আসবে না।’

‘ওইসব এমনি বলে। আগেও বলেছে। দুইদিন আসবে না, তারপর আবার আসবে। আসতে নিষেধ করেও লাভ হয় নাকি?’

‘এলে আসবে। তুমি খবরদার ওনাকে কিছু বলবে না। তাহলে আমি আর কখনও বাড়ি আসব না।’

আমি বাসার সামনে রিকশায় উঠতে উঠতে দেখি, বারান্দায় দুটো অশ্রুসজল নারীদেহ পরস্পরকে সতৃষ্ণভাবে জড়িয়ে ধরে আছে। রুমুর মায়ের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে যায়। কী আশ্চর্য, এতদিনের পরিচিত তীব্র বিদ্বেষের ছিটেফোঁটাও সেখানে আজ নেই।

রচনাকাল: জুন ২০১৮

Share with others

Leave A Comment

Related reads